সববাংলায়

ভাস্করাচার্য ।। ভাস্কর ১ ।। প্রথম ভাস্করাচার্য

প্রাচীন ভারত বিজ্ঞান এবং গণিতে বহুদূর অগ্রসর হয়েছিল। সেই সময়কার পন্ডিতেরা তাঁদের মেধা দিয়ে বিজ্ঞানচর্চাকে দারুণ এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতের এমন একজন গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী হলেন প্রথম ভাস্করাচার্য ( Bhaskara I)। আসলে দ্বাদশ শতাব্দীতেও একজন ভাস্করাচার্যের অস্তিত্ব ছিল এবং তিনিও একজন প্রতিতযশা গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ ছিলেন। সেই কারণে আমাদের আলোচ্য ভাস্করাচার্যের নামের পাশে অনেকেই প্রথম কথাটি ব্যবহার করেছেন। প্রথম ভাস্করাচার্য বিখ্যাত গণিতবিদ আর্যভট্টের কাজের ভাষ্য রচনা করেছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম গণিতবিদ যিনি হিন্দু-আরবি দশমিক পদ্ধতিতে সংখ্যা লিখেছিলেন। মৌলিক সংখ্যা এমনকি ভগ্নাংশের অধ্যয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এই ভাস্করাচার্যের নামে একটি স্যাটেলাইটও উৎক্ষেপণ করেছিল।

প্রথম ভাস্করাচার্য সপ্তম শতাব্দীর একজন গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন। মনে করা হয় আনুমানিক ৬০০ সালে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তবে তাঁর জন্মস্থান নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ভাস্করাচার্যের লেখা থেকে ভারতবর্ষের যে স্থানগুলির নাম জানা যায় তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, গুজরাট রাজ্যের সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে অবস্থিত বল্লভী, শিবরাজপুরা এবং দক্ষিণ গুজরাটের ভারুচ ও পূর্ব পাঞ্জাবের থানেসার। এই জায়গাগুলির নাম দেখে অনেক ঐতিহাসিক অনুমান করেন যে, গুজরাট রাজ্যের সৌরাষ্ট্রের অন্তর্গত আধুনিক ভাবনগরের কাছে বল্লভীতে ভাস্করাচার্যের জন্ম হয়৷ অন্য কয়েকটি সূত্র অনুসারে আবার, মহারাষ্ট্রের পারভানি জেলার বোরিতে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পন্ডিতেরাই মনে করেন ভাস্করাচার্য গুজরাটের সৌরাষ্ট্রে জন্মেছিলেন কিন্তু পরে অশ্মকে চলে যান। কেউ কেউ বলেন যে, ভাস্করাচার্য বর্তমান গুজরাটের অন্তর্গত খাম্বাত উপসাগরের পশ্চিম তীরে বসবাস করতেন।

প্রথম ভাস্করাচার্যের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত এবং সুস্পষ্ট ধারণা ও তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। কথিত আছে, ভাস্করাচার্য তাঁর বাবার কাছ থেকে জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আর্যভট্টের জ্যোতির্বিদ্যা ধারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পন্ডিত হয়েছিলেন। 

ভাস্করাচার্যের প্রধান কাজ বলতে মূলত তিনটি গ্রন্থের উল্লেখ করা যায়, সেগুলি হল: ‘আর্যভটিয়াভাষ্য’ (Aryabhatiyabhasya), ‘লঘুভাস্করিয়া’ (Laghubhaskariya) এবং ‘মহাভাস্করিয়া’ (Mahabhaskariya)। এই তিনটি গ্রন্থই আর্যভট্টের কাজের ওপর ভিত্তি করে রচিত।

প্রথম গ্রন্থটি অর্থাৎ ‘আর্যভটিয়াভাষ্য’ হল মূলত গণিত ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্টের গ্রন্থ ‘আর্যভটিয়া’-র ভাষ্য ও বিশ্লেষণ। আর্যভট্টের রচনাগুলিকে এই বইতে তিনি যথাযথভাবে পরিমার্জনা করেছিলেন বলা যায়। অনুমান করা হয় যে, আর্যভট্টের গ্রন্থটি ৫১০ সালে লিখিত হয়েছিল এবং প্রথম ভাস্করাচার্য এর ভাষ্য ‘আর্যভটিয়াভাষ্য’ ৬২৯ সালে রচনা করেছিলেন। আর্যভট্টের গ্রন্থের ৩৩টি শ্লোককে ঘিরে ভাস্করাচার্যের আলোচনা আবর্তিত হয়েছে। আর্যভট্টের এই বইয়ের আলোচনা করতে গিয়ে ভাস্করাচার্য চক্রাকার চতুর্ভুজ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনিই প্রথম গণিতবিদ ছিলেন যিনি এমন চতুর্ভুজ নিয়ে আলোচনা করেন যার চারটি বাহু সমান নয় এবং বিপরীত বাহুগুলির একটিও সমান্তরাল নয়। এই গ্রন্থে তিনি অনির্দিষ্ট সমীকরণ এবং ত্রিকোণমিতিক সূত্রের সমস্যাগুলিও ব্যাখ্যা করেন।

ভাস্করাচার্যের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বইটি হল ‘মহাভাস্করিয়া’। এই গ্রন্থটি ভারতীয় গাণিতিক জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত এবং এতে মোট আটটি অধ্যায় রয়েছে। এই গ্রন্থের মধ্যে গ্রহের দ্রাঘিমাংশ, সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ, উদ্ভিদ এবং তারার মধ্যে সংযোগ, গ্রহের উত্থান ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিশদে আলোচনা রয়েছে। এই বইয়ের কিছু অংশ আবার পরবর্তীকালে আরবিতে অনুদিত হয়েছিল।

ভাস্করাচার্যেরই আরেকটি কাজ, যেটিও কিনা আসলে আর্যভট্টের কাজের ওপর ভিত্তি করে রচিত, সেটি হল ‘লঘুভাস্করিয়া’। এই গ্রন্থটিতেও জ্যোতির্বিদ্যার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

গণিতবিদ হিসেবে ভাস্করাচার্যের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সাইন ফাংশনের মান গণনার জন্য একটি যুক্তিসঙ্গত আনুমানিক পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। এই পদ্ধতিটি দশমিক সংখ্যার পরিবর্তে মূলদ সংখ্যা (ভগ্নাংশ) ব্যবহার করে এবং গণনাকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং ব্যবহারিক করে তোলে।

দ্বিতীয়ত, একটি সংখ্যা হিসাবে শূন্যের ধারণার বিকাশ এবং গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। এটি ছিল গণিতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ, কারণ শূন্য বিভিন্ন গাণিতিক ক্রিয়াকলাপ এবং দশমিক সংখ্যা পদ্ধতির ভিত্তি হিসাবে কাজ করে।

ভাস্করাচার্য নতুন ত্রিকোণমিতিক সূত্র বের করেছিলেন এবং সাইন ও কোসাইন গণনার পদ্ধতি প্রদান করেছেন। ত্রিকোণমিতিতে তাঁর কাজ এই ফাংশনগুলির প্রয়োগকে প্রসারিত করেছে।

এছাড়াও বীজগাণিতিক সমীকরণ ও সমাধানের ক্ষেত্রে ভাস্করাচার্যের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি অনির্দিষ্ট সমীকরণ এবং দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের জন্য বীজগাণিতিক পদ্ধতি প্রবর্তন করেন। তিনিই সম্ভবত প্রথম সংস্কৃতে বৈজ্ঞানিক অবদানে ব্রাহ্মী সংখ্যা ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর গণিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল, অবস্থানগত সংখ্যা পদ্ধতিতে (positional numeral system) সংখ্যার উপস্থাপনা।

গণিত ছাড়াও জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রেও ভাস্করাচার্যের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভাস্করাচার্য গ্রহের মতো মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান নির্ভুলভাবে গণনা করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে গ্রহের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করার জন্য গাণিতিক পদ্ধতি ও সূত্র তৈরি করেন। এই গণনাগুলি গ্রহের গতি বোঝার জন্য অপরিহার্য ছিল।

এছাড়াও তিনি এক বছরের দৈর্ঘ্য, চান্দ্রমাসের সময়কাল ইত্যাদি জ্যোতির্বিদ্যাগত ধ্রবকগুলি নির্ণয় করেছিলেন। ভাস্করাচার্য সৌর ও চন্দ্রগ্রহণের বিষয়ে ব্যাপকভাবে অধ্যয়ন করেছেন। তিনি গ্রহণের ঘটনা এবং ধরণগুলির পূর্বাভাস এবং ব্যাখ্যা করার জন্য গাণিতিক মডেল এবং সূত্র তৈরি করেছিলেন।

সময়ের পরিমাপ ও বিভাজন বিষয়টিকে গবেষণার মাধ্যমে তিনি অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সঠিক টাইমকিপিংয়ের জন্য পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন এবং ক্যালেন্ডার তৈরি করেছিলেন যার দ্বারা জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনাও সম্ভব হয়েছিল। টাইমকিপিংয়ে তাঁর অবদান কৃষি, নৌচলাচল ইত্যাদি ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ভাস্করাচার্য মহাকাশীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থাকে সংজ্ঞায়িত করার এবং মহাজাগতিক বস্তুর সঠিকভাবে শনাক্ত ও চিহ্নিত করার পদ্ধতির উন্নতিসাধনের উপর কাজ করেছিলেন।

এছাড়াও প্রথম ভাস্করাচার্য পর্যবেক্ষণ এবং গণনার কাজে সাহায্যের জন্য জ্যোতির্বিদ্যার যন্ত্র যেমন অ্যাস্ট্রোলেবস এবং জিনোমনের ডিজাইন তৈরিতে ও সেগুলির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। এই যন্ত্রগুলি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কোণ পরিমাপ করতে, মহাকাশের কোনো বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করতে এবং সঠিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের গণনা করতে সাহায্য করেছিল।

ঐতিহসিকদের মতে, অশ্মকেই আনুমানিক ৬৮০ সালে এই মহান গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ প্রথম ভাস্করাচার্যের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading