সিংহল দ্বীপ যাকে আমরা শ্রীলঙ্কা বলেই চিনি, কিংবদন্তি অনুযায়ী বাংলার এক রাজার পুত্রই সেই দ্বীপের নামকরণ করেছিলেন সিংহল এবং দীর্ঘদিন সেই সিংহল দ্বীপ শাসন করেছিলেন। বঙ্গদেশ থেকে যাওয়া সেই রাজপুত্র বিজয় সিংহ নামে পরিচিত। তবে এই বিজয় সিংহের জন্মের ইতিহাস না জানলে কেন তিনি দ্বীপটির নাম সিংহল রেখেছিলেন তা বুঝতে পারা যাবে না। এই বিজয় সিংহকে নিয়ে ঐতিহাসিক মহলে নানারকম ধোঁয়াশা রয়েছে। প্রাচীন বৌদ্ধ সংকলন ‘মহাবংশ’ এবং ‘দ্বীপবংশ’-তে এই বিজয় সিংহের বংশবৃত্তান্ত এবং লঙ্কাদেশে তাঁর আগমন ও শাসন প্রতিষ্ঠার বৃত্তান্তের বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি হিউয়েন সাং-ও তাঁর রচনাতে বিজয় সিংহের উল্লেখ করেছিলেন। বিজয় সিংহের বীরত্বের কাহিনী নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মতো কবিরাও সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি মাইকেল মধুসূদন দত্তও বিজয় সিংহের কাহিনি অবলম্বনে মহাকাব্যের পরিকল্পনা করলেও শেষমেশ তা বাস্তবায়িত হয়নি।
সাম্প্রতিক পোস্ট
লঙ্কাদেশ এবং সিংহল নামকরণের বৃত্তান্তে যাওয়ার আগে বিজয় সিংহের বংশবৃত্তান্ত এবং অতীতবৃত্তান্ত জেনে নেওয়া প্রয়োজন। সিংহলীদের উৎপত্তি সম্পর্কে যেসব কিংবদন্তি রয়েছে সেই সবগুলিতেই একজন রাজপুত্রের লঙ্কাদ্বীপে আগমন এবং একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠার কথা রয়েছে। এই রাজপুত্রই বিজয় সিংহ নামে পরিচিত। বিজয় সিংহের বংশের অনুসন্ধান করতে গিয়ে এই বাংলার সঙ্গে যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
আনুমানিক পঞ্চম বা ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রাচীন বৌদ্ধ সংকলন ‘মহাবংশ’, ‘দ্বীপবংশ’ ইত্যাদিতে শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায়। পালি ভাষায় লিখিত এইসব গ্রন্থের কাহিনীর সঙ্গে পুরাণ, মিথ, কিংবদন্তি, লোককথা ইত্যাদিও মিশে গিয়ে বিজয় সিংহের সম্পর্কে এক অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। ঐতিহাসিকদের মতে বিজয় সিংহ সিংহল দেশ খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩ থেকে ৫০৫ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন।
‘মহাবংশ’ অনুসারে বঙ্গদেশের রাজা কলিঙ্গের রাণী মায়াবতীকে বিবাহ করলে সেই দম্পতির এককালে সুসীমা (কেউ বলেন সুপ্পাদেবী) নামের এক সন্তানের জন্ম হয়েছিল৷ জন্মের পর নাকি তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, পশুর সঙ্গে অদূর-ভবিষ্যে তাঁর সঙ্গম স্থাপিত হবে। প্রাপ্তবয়স্ক রাজকুমারী সুসীমাকে তাঁর আত্মবিশ্বাস এবং ব্যক্তিত্বের জন্য অনেকে উপহাস করত, সেই কারণেই এই নানারকম সমালোচনায় ব্যথিত হয়ে স্বাধীন এক জীবনের খোঁজে রাজ্য ছেড়ে চলে যান তিনি। যাত্রার সময় একদল বণিকের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর যারা মগধের দিকে যাচ্ছিল। সেই দলে যোগ দেন রাজকুমারী। রাঢ়দেশে (বর্তমান বাংলার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ) লালার জঙ্গলে সেই দলটিকে ক্ষুধার্ত এক সিংহ আক্রমণ করে। দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গিয়ে নিজেদের জীবন বাঁচায়৷ সিংহ সুসীমাকে নিয়ে যায় তার আস্তানায় এবং ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী সুসীমার সঙ্গে সেই পশুর মিলন ঘটে। এখানে উল্লেখ্য যে, দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, সেই সিংহ আসলে পশু ছিলই না, বরং ‘সিংহ’ নামে অত্যন্ত নির্মম এবং ভয়ঙ্কর এক ডাকাত ছিল যে বণিকদের আক্রমণ করেছিল। যাই হোক, তাঁদের মিলনে দুটি সন্তানের জন্ম হয়। ছেলেটির নাম হয় সিংহবাহু এবং মেয়ের নাম হয় সিংহসিবলী।
সন্তানেরা বড় হয় এবং সিংহবাহু তাঁর মাকে জিজ্ঞেস করে কেন সিংহ এবং তাঁকে এত আলাদা দেখাচ্ছে! তখন রাজকুমারী সিংহবাহুকে তাঁর রাজকীয় বংশের কথা বলেন এবং বঙ্গদেশে পিতার রাজ্যে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
একদিন সিংহ যখন বাইরে ছিলেন তখন সিংহবাহু এবং সিংহসিবলীকে নিয়ে পালিয়ে যান সুসীমা। প্রথমে একটি গ্রামে পৌঁছান তাঁরা, যেখানে বঙ্গদেশের একজন জেনারেলের সঙ্গে দেখা হয় তাঁদের। সেই জেনারেল ছিলেন সুসীমার খুড়তুতো ভাই, যার সঙ্গে পরবর্তীকালে সুসীমার বিবাহ হয়।
অন্যদিকে সিংহ তাঁর নিখোঁজ পরিবারকে খুঁজতে খুঁজতে একেরপর এক গ্রাম তছনছ করতে থাকে। তখন বঙ্গের রাজা ঘোষণা করেন যে সিংহকে হত্যা করতে পারবে তাকে পুরস্কৃত করা হবে। সিংহবাহু তখন অমিতবিক্রমে নিজের পিতা সিংহকে হত্যা করেছিলেন। এরপর রাজধানীতে ফিরে এসে দেখেন বঙ্গের রাজার মৃত্যু হয়েছে এবং সিংহবাহু তখন মুকুট পরে সিংহাসনে বসেন। অবশ্য পরবর্তীতে সুসীমার স্বামী সেই জেনারেল সিংহাসনে বসলে সিংহবাহু নিজের জন্মস্থান লালতে গিয়ে সিংহপুরা শহর প্রতিষ্ঠা করেন। সিংহবাহু তাঁর বোন সিংহসিবলীকেই বিবাহ করেন এবং তাঁদের মোট ৩২টি সন্তান হয়। তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন বিজয় সিংহ।
এখানে উল্লেখ্য যে, এই সিংহপুরার বর্তমান অবস্থান নিয়ে সংশয় রয়েছে। অনেকে সিংহপুরা আসলে বাংলার সিঙ্গুরকে মনে করেন, কেউ আবার ওড়িশার জাজপুরের কাছে সিংপুরের কথা বলেন, আবার কেউ কেউ লালাকে গুজরাটের জায়গা বলে মনে করে সিহোর-কে সিংহপুরা বলে থাকেন। আরেকটি তত্ত্ব অনুযায়ী অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলামের কাছে সিংগুপুরমের কথাও উঠে আসে। এমনকি থাইল্যান্ড বা মালয় উপদ্বীপেও এর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
এখন দেখা যাক বিজয় সিংহ কীভাবে লঙ্কায় উপস্থিত হয়েছিলেন। এই বিজয় সিংহ স্বভাবে ছিলেন একজন লুন্ঠনকারী, দুর্বৃত্ত। সাধারণ মানুষকে নির্যাতন, এমনকি হত্যা করে তাদের সম্পত্তি হরণের কাজে একটুও দ্বিধান্বিত হতেন না তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা। প্রজারা বিজয়দের এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তাঁদের শাসক সিংহবাহুর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু সিংহবাহু তাঁর পুত্রের স্বভাব এবং দুর্বৃত্তিকে রোধ করতে সক্ষম হননি। শেষে বিরক্ত এবং হতাশ সিংহবাহু দুর্বৃত্ত বিজয় সিংহ এবং তাঁর বন্ধুদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। নির্বাসিত রাজপুত্র তিনটি জাহাজ নিয়ে তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে সমুদ্রে ভেসে পড়েন। প্রথম জাহাজে ছিলেন বিজয় সিংহ এবং তাঁর ৭০০জন অনুসারী, দ্বিতীয় জাহাজে ছিলেন তাঁদের স্ত্রী ও প্রেমিকারা এবং তৃতীয় জাহাজে সন্তানেরা ছিল। প্রাথমিকভাবে নির্বিঘ্নেই যাত্রা করছিলেন তাঁরা কিন্তু হঠাৎ একদিন ভয়ানক এক ঝড়-ঝঞ্ঝার মুখে পড়ে সকলে বিভ্রান্ত হয়ে যান। সেই সামুদ্রিক ঝড়ে জাহাজ তিনটি পথভ্রষ্ট হয়ে পৃথক পৃথক দিকে চলে যায়। বাচ্চাদের জাহাজটি গিয়ে পৌঁছয় নাগদ্বীপে, মহিলাদের জাহাজটি গিয়ে পড়েছিল মহেন্দ্রদ্বীপে এবং বিজয় সিংহদের জাহাজটি গিয়েছিল সুপ্পারাক নামক স্থানে। সেই সুপ্পারাকের বাসিন্দারা ছিল খুব ভাল, তাঁরা বিজয় সিংহদের আতিথেয়তায় ত্রুটি রাখলেন না কোন। সকলে সুস্থ হয়ে ওঠার পর সেই বাসিন্দাদের ওপরেই বিজয় সিংহ ও তাঁর দলবল আক্রমণ করে। তবে দ্বীপবাসীদের কাছে পরাজিত হয় তাঁরা এবং দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয় তাঁদের।
এরপর তাঁদের জাহাজ দক্ষিণদিকে অগ্রসর হয়। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই ভেসে যেতে থাকেন তাঁরা। তাঁদের খাদ্য, পানীয় ইত্যদি প্রয়োজনীয় সামগ্রীও প্রায় শেষের পথে তখন। সেই সময় তাঁদের জাহাজ গিয়ে ভেড়ে তাম্রপর্ণীতে, রাবণের দেশে। এই ভূমি তখন যক্ষরাজ মহাকালসেনের অধীনস্থ ছিল৷ বৌদ্ধ সাহিত্য অনুসারে যেদিন বিজয় সিংহের জাহাজ তাম্রপর্ণীতে নোঙর করে সেদিনই নাকি উত্তর ভারতের কুশীনগরে গৌতম বুদ্ধ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। মহাবংশ অনুসারে, গৌতম বুদ্ধ দেবতাদের কাছে লঙ্কায় বিজয়কে রক্ষা করার প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, যাতে সেখানে বৌদ্ধধর্মের বিকাশ ঘটে। ইন্দ্র লঙ্কার রক্ষকত্ব পদ্মবর্ণের দেবতাকে দিয়েছিলেন যিনি বিজয়কে রক্ষা করার জন্য তপস্বীর ছদ্মবেশে এসেছিলেন। উইলহেম গেইগার এই পদ্মবর্ণের দেবতাকে বিষ্ণু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। আবার সেনারথ পরানভিথান বরুণ দেবতার কথা বলেছিলেন।
এই এলাকাটিকে তাম্রপর্ণী বা তাম্বাপান্নি (তামা-লাল-হাত) নামে তাঁরা অভিহিত করে কারণ, এখানকার পুরুষদের হাত এলাকার লাল মাটির রঙে রাঙা ছিল।
বিজয় সিংহ তাঁর অনুগামীদের হাতে তাঁদের প্রতিরক্ষার্থে একটি করে সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন। এক যক্ষিণী কুকুরের রূপ ধরে তাঁদের কাছে এসেছিল। তাঁদের মধ্যে একজন অনুগামী ভেবেছিল এই কুকুরটি আসলে বাসস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং সে কুকুরটিকে অনুসরণ করে। অনুসরণ করতে করতে একসময় কুভেনি নামের এক যক্ষিণীকে দেখতে পায় যে সুতো কাটছিল। কুভেনি সেই ছেলেটিকে গ্রাস করবার চেষ্টা করেও বিজয় সিংহের জাদু সুতোর জন্য তা পারেনি। তাকে হত্যা করতে না পেরে কুভেনি সেই অনুগামীটিকে খাদের মধ্যে ফেলে দেন। ৭০০জন অনুগামীর সঙ্গেই তা করে কুভেনি৷ পরে সঙ্গীদের খুঁজতে খুঁজতে বিজয় সিংহ চলে আসেন কুভেনির কাছে এবং তাঁকে পরাজিত করে সঙ্গীদের মুক্ত করে দিতে বলেন তিনি। বিজয়ের প্রতি অনুগত থাকবেন এই মর্মে কুভেনি নিষ্কৃতি চান বিজয়ের কাছে। বিজয় এবং তাঁর অনুগামীদের জন্য কুভেনি খাদ্যের ব্যবস্থা করেন। কুভেনি ক্রমে ক্রমে বিজয়ের প্রেমে পড়েন এবং তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। কুভেনি বিজয় সিংহকে বলেছিলেন যে, এই দ্বীপটি যক্ষদের এবং এখানে বিজয় ও তাঁর অনুগামীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য যক্ষরা কুভেনিকে হত্যা করতে পারে। সেই কুভেনিরই সাহায্যে বিজয় কুভেনির পিতাকে হত্যা ও যক্ষদের পরাজিত করতে পেরেছিলেন এবং তাম্রপর্ণীর রাজা হয়েছিলেন। কুভেনি এবং বিজয়ের দুটি সন্তান ছিল।
বিজয় সিংহ রাজ্যের নাম তাম্রপর্ণী থেকে বদলে নিজের পারিবারিক রাজবংশের নামে এখানকার নামকরণ করেছিলেন সিংহল। তারপর থেকেই এখানকার অধিবাসীরা সিংহলী নামে পরিচিত হতে থাকে।
তবে কুভেনির সঙ্গে জীবনযাপনে আর সন্তুষ্টি আসছিল না বিজয় সিংহের। তাছাড়া বিজয় যেহেতু সেখানে রাজার মুকুট পেয়েছিলেন তাই একজন সত্যিকারের রাজকন্যাকে বিবাহ করে সেই নারীকেই রাণী ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই কারণেই মধুরার (এই মধুরাকে অনেকে তামিলনাড়ুর মাদুরাই বলে মনে করেছেন) পান্ড্য রাজার কন্যাকে বিবাহ করে কুভেনিকে বিতাড়িত করেন বিজয় সিংহ। মধুরার অন্যান্য অনেক নারীকে বিজয় সিংহের অনুগামীরা বিবাহ করেছিলেন। দুই সন্তানকে রেখে যেতে বললেও কুভেনি শিশুদের সঙ্গে করেই লঙ্কাপুরের ইয়াক্কা শহরে নিয়ে আসেন। গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে কুভেনিকে সেখানে হত্যা করা হয়।
এরপর থেকেই বিজয় সিংহ সমস্ত মন্দ পথ ত্যাগ করে ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে লঙ্কা শাসন করেছিলেন। তিনি ৩৮ বছর সিংহল শাসন করেছিলেন। তাঁর কোন উত্তরাধিকারী না থাকায় মৃত্যুর আগে জমজ ভাই সুমিত্তকে চিঠি লিখেছিলেন সিংহলের শাসনভার নেওয়ার জন্য। কিন্তু সুমিত্ত তখন সিংহপুরার রাজা হয়েছেন এবং তিনিও যথেষ্ট বৃদ্ধ তাই নিজের ছোট ছেলে পান্ডুবাসুদেবকে সিংহলের শাসনভার নিতে বলেন। তাঁদের রাজবংশ সেখানে পরবর্তী ছয় শত বছর রাজত্ব করে।
এই কাহিনিকে অবশ্য তামিল লেখক সাচ্চি পোনাম্বালাম কল্পকাহিনী বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান