সববাংলায়

আজাদ হিন্দ ফৌজ

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বহু মানুষের বীরত্বের ইতিহাস যেমন তেমনি সংঘবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সংগ্রামেরও ইতিহাস। এই সংগ্রাম কেবল ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, ভারতের বাইরে বিভিন্ন জায়গাতেও ব্রিটিশরাজের বিরূদ্ধে লড়াই করবার জন্য মানুষ একজোট হয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, আজাদ হিন্দ বাহিনী (Azad Hind Fauj) যা পরবর্তীকালে ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল আর্মিতে (Indian National Army) পরিণত হয়েছিল। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে জাপান সমর্থিত এই সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠেছিল। রাসবিহারী বসু, মোহন সিং-এর মতো নেতাদের হাত ধরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ে উঠেছিল। পরবর্তীকালে রাসবিহারী বসু এই বাহিনীর দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর হাতে। এই সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল, জাপানের সহায়তায় ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের উচ্ছেদ করা। এই বাহিনী সরাসরি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আনয়ন করতে না পারলেও ব্রিটিশ শাসনের ভিত তারা নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৪২ সালের ১ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রাসবিহারী বসু সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন। অবশ্য প্রতিষ্ঠার সময়ে এর সেনাপতি ছিলেন মোহন সিং। পরবর্তীকালে সুভাষচন্দ্রের হাতে চলে যায় এই সেনাবাহিনীর দায়িত্ব।

তবে এই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের নেপথ্যের ইতিহাসটুকু জানা জরুরি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই জাপান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ছিল নির্বাসিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের প্রধান আশ্রয়স্থল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর জাপান মিত্রপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ১৯৪২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাপানের হাতে সিঙ্গাপুরের পতন ঘটলে ১৪নং পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মোহন সিং-সহ অনেক ব্রিটিশ-ভারতীয় সৈন্য জাপানের হাতে বন্দী হয়। কেবল সিঙ্গাপুর নয়, জাপানের মালয় অভিযানেও প্রচুর ভারতীয়কে বন্দী করা হয়েছিল। মোহন সিং তখন উদ্যোগ নিয়ে জাপানের হাতে বন্দী ভারতীয় সেনাদের ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর আহ্বানে প্রায় ২৫,০০০ সেনা যোগ দেয়, যে সংখ্যা ক্রমে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৪০,০০০-এ। সেসময় বিপ্লবী রাসবিহারী বসু জাপানে ভারতের স্বাধীনতার জন্য তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছিলেন। ১৯৪২ সালের ২৮ মার্চ রাসবিহারী টোকিওতে অবস্থানরত ভারতীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে এক সভায় আহ্বান করেন এবং স্থির করা হয় যে একটি ভারতীয় স্বাধীনতা সংঘ এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ের জন্য একটি সেনাবাহিনী গঠন করা হবে। এরপর জুন মাসে রাসবিহারীর নেতৃত্বে ব্যাংককে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবাসী স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের নিয়ে এক সম্মেলন আয়োজিত হয়। এই সভাতেই গঠিত হয়েছিল ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লীগ’। সভাপতি হয়েছিলেন স্বয়ং রাসবিহারী বসু। সেই ১৯৪২ সালেরই ১ সেপ্টেম্বরই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ গঠিত হয়েছিল। তারা যথেষ্ট জাপানি সাহায্য এবং সমর্থনও পেয়েছিল। জাপান সমর্থিত এই বাহিনীর একমাত্র লক্ষ্যই ছিল ভারত থেকে ব্রিটিশরাজের উচ্ছেদ ঘটিয়ে স্বাধীনতা আনয়ন।

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে আজাদ হিন্দ ফৌজকে লীগের অধীনস্থ থাকতে হবে। ভারতীয় নেতাদের এও আশঙ্কা ছিল যে আজাদ হিন্দ ফৌজকে জাপানি পুতুল বলেও মনে হতে পারে তাই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ফৌজ তখনই যুদ্ধে যাবে যখন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সেই আহ্বান জানাবে। জাপানের কাছে পেশ করা এই প্রস্তাব বিদাদারি প্রস্তাব নামে খ্যাত। তবে, বিদাদারি প্রস্তাব থেকে উদ্ভূত দাবিগুলিতে জাপান তাৎক্ষণিকভাবে সম্মত হয়নি। অন্যদিকে রাসবিহারী এবং লীগের মধ্যেও চিন্তার পার্থক্য ছিল। আসলে জাপানে রাসবিহারী দীর্ঘদিন বসবাস করছিলেন এবং তাঁর এক জাপানি স্ত্রী ও সন্তান ছিল যে কিনা ইম্পেরিয়াল জাপানি সেনাবাহিনীর অংশ ছিল। আবার মোহন সিং চাইছিলেন সামরিক কৌশল এবং যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ফৌজের স্বায়ত্তশাসন, লীগের অধীনতা থেকে মুক্তি। এরফলে ক্রমে আইএনএ এবং লীগের মধ্যে ও জাপানের সঙ্গেও মতবিরোধ দেখা দেয়। রাসবিহারী ছাড়া আইএনএ নেতৃত্ব পদত্যাগ করেন এবং মোহন সিং ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে ইউনিট ভেঙে দেন এবং ফৌজের সেনাদের যুদ্ধবন্দী শিবিরে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

সেই ১৯৪২ থেকে ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে আজাদ হিন্দ বাহিনীকে ধরে রাখবার জন্য সংগ্রাম করছিলেন রাসবিহারী বসু। ১৯৪৩ সালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমজেড কিয়ানিকে। একটি নীতি নির্ধারণী সংস্থা গঠন করা হয় এবং তাকে লীগের অধীনস্থ রাখা হয়।
এরপরেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিলেন।

১৯৪১ সালের ১৭ জানুয়ারি নেতাজি সুভাষচন্দ্র কলকাতা ছেড়েছিলেন এবং আফগানিস্তান, রাশিয়া হয়ে জার্মানিতে উপস্থিত হয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স লীগের সভাতে সুভাষচন্দ্রকে জার্মানি থেকে জাপানে নিয়ে আসবার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সুভাষচন্দ্র কিন্তু জার্মানি থেকে তখন ভারতের স্বাধীনতার জন্য কাজ করছিলেন। জার্মান সরকারের সহায়তায় সেখানে ‘আজাদ হিন্দুস্থান’ বেতারকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সুভাষচন্দ্র সেখান থেকে নিয়মিত ভারতের স্বাধীনতা পক্ষে প্রচার করতেন। এমনকি রাসবিহারীদের আহ্বানে সুভাষচন্দ্র ১৯৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আবিদ হাসানকে সঙ্গে নিয়ে সাবমেরিনের করে জার্মানি থেকে জাপানের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালের ১৩ মে তিনি জাপানের রাজধানী টোকিও-তে এসে উপস্থিত হন। জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। জাপানি পার্লামেন্টে ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুক্তি সংগ্রামকে সাহায্যের নীতি ঘোষণা করে। সেবছর ৪ জুলাই সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সভায় রাসবিহারী বসু স্বয়ং সুভাষচন্দ্রের হাতে লীগের সকল দায়িত্ব অর্পণ করে দেন। ২৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সুভাষ আজাদ হিন্দ বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহন করেন এবং তার আমূল পুনর্গঠনের কাজে মন দেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ পরিচিত হয় ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল আর্মি (INA)নামে। দলে দলে হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ এমনকি বালক-বালিকারাও এই দলে যোগ দিতে অগ্রসর হয়। এই সেনাদলে আবার যে-কয়টি ব্রিগেড বা বাহিনী ছিল সেগুলি হল ‘গান্ধী ব্রিগেড’, ‘আজাদ ব্রিগেড’ এবং ‘নেহরু ব্রিগেড’। বালক-বালিকাদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘বাল-সেনাদল’। নারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে ‘ঝাঁসির রানি ব্রিগেড’ এমনকি বেশ কিছু বাছা বাছা সেনা নিয়ে নেতাজির অনিচ্ছা সত্ত্বেও গড়ে উঠেছিল ‘সুভাষ ব্রিগেড’।

১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর নেতাজি সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করেছিলেন। এই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু (রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও যুদ্ধমন্ত্রী), এস এ আইয়ার (পররাষ্ট্র ও প্রচারমন্ত্রী), ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগল (নারী বিষয়ক ও কন্যা বাহিনীর প্রধান) প্রমুখ। কিছুদিনের মধ্যেই জাপান, জার্মানি, ইতালি ইত্যাদি পৃথিবীর মোট নয়টি রাষ্ট্র এই সরকারকে সমর্থনও করেছিল। এমনকি জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাজো আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ দুটি আজাদ হিন্দ্ সরকারের হাতে তুলে দেন। নেতাজি এই দুই দ্বীপপুঞ্জের নাম রাখেন ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’। দলে দলে ভারতীয়রা আজাদ হিন্দ বাহিনীতে যোগদান করতে শুরু করে।

১৯৪৩ সালের ২৩ অক্টোবর আজাদ হিন্দ সরকার ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাও করেছিল। ১৯৪৪ সালের ৪ জানুয়ারি নেতাজি রেঙ্গুনে আসেন এবং সেখানে তাঁর প্রধান সামরিক দপ্তর গড়ে ওঠে। এরপর আজাদ হিন্দ বাহিনীর ভারত অভিযান শুরু হয়েছিল। নেতাজি ‘দিল্লি চলো’ ধ্বনি তোলেন সেনাবাহিনীর সামনে। জাপানের সহায়তায় এবং নেতাজির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ফৌজ মণিপুরে ঢুকে পড়েছিল। মনিপুরের মৈরং-এ ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে। ইম্ফল দখলের আগে বিপর্যয় শুরু হলে তারা পিছু হটতে থাকে ঠিকই, তবুও ১৫০ মাইল ভারতীয় এলাকা তারা ব্রিটিশমুক্ত করতে পেরেছিল।

অন্যদিকে আমেরিকা জাপানকে আক্রমণ করলে যুদ্ধের গতি পরিবর্তিত হয়। স্বদেশ রক্ষার জন্য জাপানি বিমানবহর এবং সেনাবাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে প্রস্থান করলে বিমানের অভাবে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভীষণ অসুবিধার মধ্যে পড়ে যায়। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বর্ষা এসে পড়ায় সেনাদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব ঘটে। এছাড়াও বিষাক্ত পোকার কামড়, রোগ, শীত, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি নানা কারণে অনেক সৈন্যের মৃত্যু হয়। এইসব প্রতিকূলতার জন্য এবং ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপান মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে আজাদ হিন্দ দলও অস্ত্রত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল।

আজাদ হিন্দ ফৌজের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণভাবে সফল না হলেও তারা ইংরেজ শাসনের ভিত যে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এমনকি আই এন এ-এর সৈন্যদের বিচারের জের ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহে ঘৃতাহুতি দিয়েছিল। এই সমস্ত কিছুর প্রভাবেই ব্রিটিশরা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয় ও ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘স্বদেশ, সভ্যতা ও বিশ্ব’, জীবন মুখোপাধ্যায়, শ্রীধর পাবলিশার্স, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ, জানুয়ারি, ২০২১।
  2. https://en.m.wikipedia.org/
  3. https://www.insightsonindia.com//
  4. https://vajiramandravi.com//
  5. https://learn.culturalindia.net/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading