সববাংলায়

শিবাজী

ভারতে মারাঠা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন শিবাজী (Shivaji)। তিনি ‘ছত্রপতি শিবাজী’ নামেই সমধিক পরিচিত। ভোঁসলে বংশীয় শিবাজী বিজাপুরের আদিলশাহী সাম্রাজ্য থেকে একটি ছিটমহল অধিকার করে সেখানেই মারাঠা সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। ১৬৭৪ সাল নাগাদ তিনি প্রথম ‘ছত্রপতি’ অভিধায় ভূষিত হন। মারাঠা সামরিক বাহিনীর যে বিপুল খ্যাতি ছিল ইতিহাসে তার প্রধান কৃতিত্ব ছিল শিবাজীর। তাঁরই সুযোগ্য পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে মারাঠাদের সামরিক বাহিনী উন্নত হয়, পরে একটি নৌ-বাহিনীও নির্মাণ করেছিলেন তিনি। তাছাড়া তিনি ভারতের প্রাচীন হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষার ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দুই শতাব্দী পরেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা ছিলেন শিবাজী। তাঁর বীরত্ব ও মহান প্রশাসনিক দক্ষতার কথা আজও ভারতীয়দের মধ্যে সুবিদিত।

আনুমানিক ১৬৩০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পুনে জেলার জুন্নার শহরের কাছে শিভনেরি দূর্গে শিবাজীর জন্ম হয়। তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। মহারাষ্ট্র সরকার ১৯ ফেব্রুয়ারি দিনটিকেই বর্তমানে ‘শিবাজী জয়ন্তী’ হিসেবে স্থির করেছে এবং প্রতি বছর এই দিনটি পালন করা হয় গুরুত্ব সহকারে। শিবাজীর বাবা শাহজী ভোঁসলে দাক্ষিণাত্য সাম্রাজ্যের একজন মারাঠা সেনাপতি ছিলেন। শিবাজীর মায়ের নাম জিজাবাঈ। স্থানীয় দেবী শিবাই-এর নামানুসারে শৈশবে তাঁর নামকরণ করা হয়েছিল। শিবাজীর ঠাকুরদাদা মালোজি আহমেদনগর সাম্রাজ্যের একজন সুযোগ্য সেনাধ্যক্ষ ছিলেন এবং ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত হিয়েছিলেন। শিবাজীর জন্মের সময় দাক্ষিণাত্য জুড়ে তিনটি প্রধান শক্তি ছিল – বিজাপুর, আহমেদনগর এবং গোলকোণ্ডা। ১৬৩৬ সালে বিজাপুরের আদিলশাহী সাম্রাজ্যের দক্ষিণের অঞ্চলগুলি আক্রমণ করে এবং সেই সময় মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এই অঞ্চলগুলি। পশ্চিম ভারতে মারাঠা উত্থানের অন্যতম নেতা ছিলেন সেই সময় শিবাজীর বাবা শাহজী যিনি বিজাপুরকে এই আক্রমণে সাহায্য করেছিলেন। বিজিত রাজ্যগুলির মধ্যে একটি জায়গীর জমি খুঁজছিলেন শাহজী যা থেকে বার্ষিক নির্দিষ্ট কিছু কর পাওয়া সম্ভব হত। কিন্তু বিজাপুরের মদতে এতদিন যে মুঘলদের বিরোধিতা করেছিলেন শাহজী, এরপরে মুঘলদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে শাহজীকে তাঁর পরিবার নিয়ে দূর্গ থেকে দূর্গে পালিয়ে পালিয়ে ঘুরতে হয়। শিবাজীর জন্মের সময় বিজাপুরের সেনা হিসেবে কাজ পান শাহজী এবং অনুদানস্বরূপ পুনে জেলাটি লাভ করেন তিনি। সেই থেকে পুনেতেই বেড়ে ওঠেন শিবাজী। বিজাপুরের শাসক আদিলশাহের অনুমতিক্রমে অধুনা ব্যাঙ্গালোর অঞ্চলে শাহজীর বদলি হয় এবং সেই সময় পুনের শাসনভার অর্পিত ছিল দাদোজি কোন্দাদেও-র উপর। তাঁর মৃত্যু হলে ১৬৪৭ সালে প্রশাসনিক ক্ষমতার ভার নেন শিবাজী স্বয়ং। শাসন ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল বিজাপুর সাম্রাজ্য আক্রমণ।

১৬৪৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিজাপুরের তোর্না দূর্গ দখল করেন শিবাজী এবং ঐ দূর্গে সঞ্চিত সকল ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন। তাছাড়া পুনের কাছে পুরন্ধর, কোন্ধনা এবং চাকান দূর্গ দখল করেন তিনি। এর সাথে সুপা, বারামতি ও ইন্দাপুর দূর্গকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন শিবাজী। তোর্না দূর্গ থেকে পাওয়া ধন-সম্পদ দিয়ে তিনি রায়গড়ে নতুন একটি দূর্গ নির্মাণ করেন। শিবাজীর এই উত্থানে ভীত হয়ে ১৬৪৮ সালে বিজাপুরের সুলতান আদিলশাহের নির্দেশে শাহজীকে বন্দি করা হয়। ১৬৪৯ সালে কর্ণাটক দখল করার পরে শাহজীকে মুক্ত করেন আদিলশাহ। ১৬৬৪-৬৫ সাল নাগাদ শিকার করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় শাহজীর মৃত্যু হয় বলে জানা যায়। ১৬৫৬ সালে শিবাজী বিজাপুরের সহকর্মী মারাঠা সামন্ত চন্দ্ররাও মোরেকে হত্যা করেন এবং তাঁর কাছ থেকে মহাবালেশ্বরের কাছে জাভালি উপত্যকা দখল করেন। আদিলশাহ শিবাজীর এই উত্থান ভালোভাবে মেনে নেননি এবং শিবাজীর কাছে তাঁর সৈন্যদের পরাজয় তাঁকে পীড়িত করে তুলেছিল। ১৬৫৭ সালে আফজল খান নামে এক প্রবীণ সেনাপতিকে তিনি পাঠান শিবাজীকে আটক করে আনার জন্য। শিবাজীর সঙ্গে আলোচনা করার জন্য ১৬৫৯ সালে একটি মিলনমেলায় উভয়ের সাক্ষাৎ হয়। শিবাজী বুঝতে পেরেছিলেন যে এটা হয়ত কোনও ফাঁদ বা চক্রান্ত হতে পারে। তাই আগে থেকেই বর্ম পরিহিত হয়ে এবং একটি ধাতব বাঘ নখ পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে আফজল খানের সঙ্গে দেখা করতে যান শিবাজী। শিবাজীকে আফজল খান ছুরি দিয়ে আক্রমণ করলে, বর্ম পরিধানের জন্য শিবাজী বেঁচে যান আর এই আঘাতের প্রত্যুত্তরে বাঘ নখ দিয়ে শিবাজী আফজল খানকে হত্যা করেন। প্রতাপগড় দূর্গেই তাঁদের সাক্ষাতের কথা ছিল। আফজল খানের মৃত্যু হলে, শিবাজীর নির্দেশে তাঁর সৈন্যবাহিনী বিজাপুরী সৈন্যদের উপর হামলা করে এবং মারাঠাদের হাতে প্রায় তিন হাজার বিজাপুরী সৈন্যের মৃত্যু হয়। আদিলশাহ এবং শিবাজীর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চলতে থাকে। কোলাপুরের যুদ্ধে বিশাল বিজাপুরী সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে কৌশলে জিতে যান শিবাজী। তারপর ১৬৬০ সালে আদিলশাহী সেনারা পানহালার দূর্গ দখল করলে ১৬৭৩ সালে শিবাজী সেই দূর্গ পুনরুদ্ধার করেন।

বিজাপুরী সালতানাতের সঙ্গে শিবাজীর দ্বন্দ্ব ক্রমে চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং তারপরে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে শিবাজীর প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হয়। ১৬৫৭ সালে শিবাজীরা যখন আহমেদনগর এবং জুন্নারের কাছে মুঘল অঞ্চলে লুটপাঠ চালান, সেই সময় তাঁদের মধ্যে সংঘাত আরও চরমে ওঠে। ঔরঙ্গজেব শিবাজীকে দমন করার জন্য তাঁর মামা ও দাক্ষিণাত্যের শাসক শায়েস্তা খাঁকে পাঠান। শায়েস্তা খাঁ শিবাজীর অধিকার থেকে বেশ কয়েকটি দূর্গ দখল করেন এবং পুনা দূর্গটিও ছিনিয়ে নেন। পরে শিবাজী তাঁকে হত্যা করে পুনা দূর্গ পুনরুদ্ধার করেন। কোঙ্কন অঞ্চলে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে শিবাজীর কোষাগার প্রায় শূন্য হয়ে যায় আর তাই মুঘল বাণিজ্য কেন্দ্র সুরাট লুঠ করেন শিবাজী। এই ঘটনা ঔরঙ্গজেবকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। তাঁর নির্দেশে সেনাপতি জয় সিং প্রায় দেড় লক্ষ সেনা নিয়ে শিবাজীকে আক্রমণ করেন। শিবাজীর সেনারা এতে পেরে না ওঠায় ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে বাধ্য হন শিবাজী। ১৬৬৫ সালে শিবাজী ও জয় সিংয়ের মধ্যে পুরন্দর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যেখানে মুঘলদেরকে ২৩টি দূর্গের অধিকার ছেড়ে দেন শিবাজী এবং ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তাঁকে ৪ লক্ষ টাকা দেন। ঔরঙ্গজেবের আমন্ত্রণে পুত্র সম্ভাজীকে নিয়ে আগ্রা দূর্গে যান শিবাজী এবং সেখানে তাঁকে গৃহবন্দি করেন ঔরঙ্গজেব। কিছুদিন আগ্রায় বন্দি থাকার পরে ছদ্মবেশে কৌশলে তাঁর ছেলেকে একটি ঝুড়িতে লুকিয়ে রেখে সেই ঝুড়ি মাথায় করে আগ্রা দূর্গ থেকে পালাতে সমর্থ হন শিবাজী।

শাসন ক্ষমতায় থাকার সময় ইংরেজদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন শিবাজী। কিন্তু ১৬৬০ সালে পানহালার দূর্গ দখলের সময় ইংরেজরা বিজাপুর সালতানাতকে সহায়তা করেছিলেন। ক্রমে ১৬৭০ সালে ইংরেজরা তাঁকে যুদ্ধের সামগ্রী বিক্রি করতে অস্বীকার করলে শিবাজী ক্ষুব্ধ হন। এই ক্ষোভের কারণে রাজাপুরে ব্রিটিশ কারখানাগুলি লুঠ করেছিলেন শিবাজী।

ক্রমে শিবাজী পুনা ও কোঙ্কন উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলে দূর্গগুলি পুনরুদ্ধার করেন এবং দাক্ষিণাত্য জুড়ে হিন্দু সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬৭৪ সালে প্রায় ৫০ হাজার লোকের সমাবেশের সামনে পণ্ডিৎ গাগা ভট্ট মারাঠাদের রাজা হিসেবে শিবাজীর রাজ্যাভিষেকের অনুষ্ঠান পালন করেন। ছত্রপতি, শাককর্তা, ক্ষত্রিয় কুলবন্ত ইত্যাদি বেশ কয়েকটি উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

ছত্রপতি হিসেবে সর্বোচ্চ সার্বভৌম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন শিবাজী। তিনি প্রশাসনিক কাজকর্মের জন্য আটজন মন্ত্রীর একটি গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন। এই আটজন মন্ত্রী হল যথাক্রমে পেশোয়া বা প্রধানমন্ত্রী যিনি রাজার অনুপস্থিতিতে রাজার প্রতিনিধিত্ব করতেন, তারপরে মজুমদার বা নিরীক্ষক যিনি রাজ্যের অর্থনৈতিক দিক সামলাতেন, তৃতীয় স্থানে ছিলেন পণ্ডিতরাও, তারপরে দবির বা পররাষ্ট্র সচিব, সেনাপতি বা সামরিক অধ্যক্ষ এবং তারপরে ক্রমান্বয়ে ন্যায়াধীশ বা প্রধান বিচারপতি, ক্রনিকার বা নথিকারক এবং সচিব। শিবাজী তাঁর রাজসভায় ফারসি ভাষার বদলে মারাঠি ও সংস্কৃত ভাষার প্রচলন করেছিলেন। নিজে একজন হিন্দু হয়েও সকল ধর্মের প্রতি সহনশীল মনোভাব ছিল শিবাজীর। তিনিই প্রথম মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎখাত করতে রায়তওয়ারী বন্দোবস্ত চালু করেছিলেন। তাছাড়া ভারতের প্রশাসনিক বিভাগের নানাবিধ উন্নয়নের কাজেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।

আনুমানিক ১৬৮০ সালের ৩ এপ্রিল ৫২ বছর বয়সে রায়গড় দূর্গে আন্ত্রিকের সমস্যার কারণে দীর্ঘ রোগ ভোগের পর শিবাজীর মৃত্যু হয়।   


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading