হাজার প্রতিকুলতা পেরিয়ে যে সমস্ত নারী তাঁদের প্রতিভার গুণে, ইচ্ছেপূরণের অদম্য জেদ নিয়ে এবং কর্মের প্রতি একনিষ্ঠতার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেছিলেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত (Sudipta Sengupta) তাঁদের মধ্যে অন্যতম। আন্টার্কটিকায় পা রাখা প্রথম মহিলাদের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। সেখানে ভূতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন তিনি। অনেক সরকারী নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে নিজের পারদর্শিতা এবং মেধার গুণে অবশেষে এই দুঃসাহসিক অভিযানে সামিল হতে পেরেছিলেন সুদীপ্তা। বাংলায় লেখা তাঁর বিখ্যাত একটি বই রয়েছে ‘আন্টার্কটিকা’ নামে। সুদীপ্তা প্রথিতযশা ভূতাত্ত্বিক গবেষক এবং অধ্যাপকও ছিলেন। বিভিন্ন শিলার গঠন এবং বিকৃতি নিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে গবেষণা করেছেন তিনি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন, বিদেশের বহু প্রতিষ্ঠানেও ভূতত্ত্বের শিক্ষিকা হিসেবে কাজের সুযোগ হয়েছিল তাঁর। তবে কেবল ভূতাত্ত্বিক গবেষণা এবং অধ্যাপনার গন্ডিতে আবদ্ধ থাকেননি সুদীপ্তা সেনগুপ্ত। তাঁর স্বপ্নের কাছে পৌঁছতে যে পর্বতারোহণ প্রয়োজন তা তিনি জানতেন। প্রথম এভারেস্ট-জয়ী বিখ্যাত পর্বতারোহী তেনজিং নোরগের কাছে সুদীপ্তা পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন। ভারত এবং ইউরোপের বেশ কয়েকটি পর্বতে কৃতিত্বের ছাপ রেখেছিলেন তিনি। ‘জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুদীপ্তার। ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানে অবদানের জন্য অত্যন্ত সম্মানীয় ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনগর‘ পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল তাঁকে।
১৯৪৬ সালের ২০ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত কলকাতা শহরে একটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে সুদীপ্তা সেনগুপ্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবা জ্যোতিরঞ্জন সেনগুপ্ত (Jyoti Ranjan Sengupta) পদার্থবিদ্যায় এম. এসসি পাশ করেছিলেন এবং পেশায় ছিলেন একজন আবহাওয়াবিদ। সুদীপ্তার মা পুষ্প সেনগুপ্তও (Pushpa Sengupta) স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। পুষ্প এবং জ্যোতিরঞ্জনের তিন সন্তানের মধ্যে সুদীপ্তা ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। বাবার চাকরির কারণে তাঁরা ভারত এবং নেপাল এই দুই দেশেই দীর্ঘ সময় যাপন করেছিলেন। নেপালে দীর্ঘসময় কাটানোর ফলে ছোটবেলা থেকেই পাহাড় দেখেছেন সুদীপ্তা এবং বরাবর তাঁকে টেনেছে পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গ। পাহাড় তাঁকে এত আকৃষ্ট করেছিল যে স্কুলের শেষ এবং কলেজের শুরুতে সুদীপ্তা একটি রক-ক্লাইম্বিং কোর্সও করেছিলেন।
প্রথম দিকে বাবার কাছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিকের কথা শুনে শুনে সুদীপ্তা প্রথমে বাবার মতোই একজন পদার্থবিদ হওয়ার পরিকল্পনা করলেও পরবর্তীকালে তিনি জানতে পেরেছিলেন যে ভূতাত্ত্বিক হলে বিজ্ঞানের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণের সুযোগও মিলবে। সেই কারণে তিনি বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ভূতত্ত্বকে।
স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে ভারতবর্ষের অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অসাধারণ কৃতিত্ব সহ ভূতত্ত্ব বিষয়ে প্রথমে স্নাতক এবং পরবর্তীকালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত। এরপর গবেষণার দিকে অগ্রসর হন সুদীপ্তা। সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির নির্বাচিত সদস্য এবং স্ট্রাকচারাল জিওলজিস্ট সুবীর কুমার ঘোষের তত্ত্বাবধানে সুদীপ্তা গবেষণা শুরু করেন এবং ১৯৭২ সালে গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করে সম্মানীয় পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।
তবে এই গবেষণা চলাকালীনই ১৯৭০ সালে তিনি ‘জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’তে একজন ভূতাত্ত্বিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত। পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর আরও একবছর অর্থাৎ ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত এখানে কাজ করেছিলেন তিনি। এরপর তাঁর বিদ্যায়তনিক সাফল্যের পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে যখন ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যের ‘রয়্যাল কমিশন ফর দ্য এক্সিবিশন অফ ১৮৫১’ বৃত্তিটি লাভ করেন সুদীপ্তা এবং পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য পরবর্তী তিন বছর তিনি লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে অতিবাহিত করেন। এরপর আর তাঁকে ঘুরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ তাঁর জীবনকে আরও বিচিত্র অভিজ্ঞতার দিকে চালনা করে নিয়ে গেছে।
সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির ‘ইনস্টিটিউট অফ জিওলজি’তে ডসেন্ট হিসেবে যোগদান করেন এবং ছয় মাস কাজ করার পর অধ্যাপক হ্যান্স রামবার্গের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক জিওডায়ানমিক্স প্রজেক্টের জন্য ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিন বছর গবেষণার কাজ করেছিলেন তিনি। এই সময় প্রচুর জায়গায় ভ্রমণ করেছিলেন তিনি এবং প্রাক-ক্যামব্রিয়ান শিলা গঠন ও নরওয়েজিয়ান ক্যালেডোনাইডস বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৭৯ সালেই ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন সুদীপ্তা এবং আবারও ‘জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’তে একজন সিনিয়র ভূতাত্ত্বিক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী তিন বছর এখানেই কাজ করতে থাকেন সুদীপ্তা। মূলত শিলার গঠন এবং বিকৃতি বিষয়ে গবেষণায় তিনি দক্ষ ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনি যেখান থেকে পড়াশোনা করেছিলেন সেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েই স্ট্রাকচারাল জিওলজির প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু এরপরে তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় উপস্থিত হয় যদিও তার জন্যে তাঁকে লড়াই করতে হয়েছে অনেক।
পর্বতারোহণের স্বপ্ন ছোটবেলা থেকেই তাড়না করেছে সুদীপ্তাকে। তিনি হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে বিখ্যাত পর্বতারোহী এবং প্রথম এভারেস্ট-জয়ী তেনজিং নোরগের কাছে অ্যাডভান্সড পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। ভারত এবং ইউরোপে অসংখ্য পর্বতারোহণ অভিযানে সামিল থেকেছেন সুদীপ্তা। এমনকি লাহৌল অঞ্চলে তাঁরা একটি নামহীন পর্বতে অভিযান করেছিলেন যেখানে তার আগে কারও পদচিহ্ন পড়েনি। সেই পর্বত-চূড়াটির নাম তারা রেখেছিলেন ‘মাউন্ট ললনা’। ১৯৬১ সালে আন্টার্কটিকা চুক্তি স্বাক্ষরিত এবং কার্যকর হলেও বেশিরভাগ বৈজ্ঞানিক অভিযান পুরুষদের নিয়েই হত। কোনো মহিলা বৈজ্ঞানিককে প্রথম দিকে সরকার থেকে এইরকম অভিযানের জন্য অনুমতি দেওয়া হত না, কারণ সরকার মনে করত এই দুর্গম অভিযানে অংশগ্রহণ করে কাজ করার জন্য মহিলা বৈজ্ঞানিকরা অনুপযুক্ত। এছাড়াও অনেকে ব্যঙ্গ করে বলত যদি আন্টার্কটিকায় বিউটি পার্লার থাকত তাহলে মহিলারা সেখানে অনায়াসে চলে যেত। এত কটুক্তি এবং ব্যঙ্গের প্রত্যুত্তর প্রথম দিয়েছিলেন রাশিয়ান ভূতাত্ত্বিক মারিয়া ক্লেনোভা যিনি ছিলেন প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী যিনি আন্টার্কটিকা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬০ এবং ৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য আন্টার্কটিকা অভিযানে নারী বিজ্ঞানীদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল। কিন্তু ভারতবর্ষ তখনও আন্টার্কটিকা অভিযানে সামিল হয়নি। ১৯৮১ সালে ভারত প্রথম আন্টার্কটিকা অভিযানের আয়োজন করেছিল। কিন্তু এই প্রথম অভিযানে সুদীপ্তা অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ১৯৮২ সালের দ্বিতীয় অভিযানের জন্য আবেদন করেও প্রত্যাখাত হয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ১৯৮৩ সালের তৃতীয় অভিযানে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী হিসেবে নির্বাচিত হন সুদীপ্তা। যদিও তিনি একা মহিলা ছিলেন না, সঙ্গে ছিলেন একজন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ড: অদিতি পন্থ। অধ্যাপক সুদীপ্তা সেনগুপ্ত পূর্ব আন্টার্কটিকার শিরমাচর পাহাড়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করেন। আন্টার্কটিকার দুর্গম পরিবেশ, তুষার ঝড় ইত্যাদি প্রতিকূলতার মধ্যেও গবেষণাকর্ম চালিয়ে গিয়েছেন অকুতোভয় সুদীপ্তা সেনগুপ্ত। তিনি বলতেন দুর্গার দেশের মেয়ে তিনি, তাঁদের ভিতরে মা দুর্গা বাস করেন। এভাবে মনের জোর তিনি তো পেয়েইছিলেন তাছাড়া উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে ঘুরে ঘুরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে এই আন্টার্কটিকা অভিযানে প্রভূত সাহায্য করেছিল। সুদীপ্তার গবেষণা এটা বুঝতে সাহায্য করেছিল যে আন্টার্কটিকার পূর্ব উপকুলরেখায় পাওয়া শিলার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে প্রাপ্ত শিলার প্রভূত সামঞ্জস্য রয়েছে। এই অভিযানের সময় ভারতের ‘দক্ষিণ গঙ্গোত্রী’ নামক প্রথম স্টেশনটি নির্মিত হয়।
১৯৮৯ সালের অভিযানে সুদীপ্তা দ্বিতীয়বার আন্টার্কটিকা সফরে গিয়েছিলেন এবং শিরমাচর পাহাড়ে আরও গবেষণার কাজ করেন তিনি। কেবলমাত্র ভারতবর্ষের নয়, বিদেশেরও প্রচুর নামকরা জার্নালে তাঁর গবেষণাধর্মী লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আন্টার্কটিকার লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলায় তিনি রচনা করেছিলেন ‘আন্টার্কটিকা’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থটি৷ ২০০২ সালে ‘জার্নাল অফ স্ট্রাকচারাল জিওলজি’র সম্পাদকমন্ডলীতে ছিলেন তিনি। ‘ইভোল্যুশন অফ জিওলজিকাল স্ট্রাকচারস ইন মাইক্রো টু ম্যাক্রো-স্কেলস’ গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছিলেন সুদীপ্তা সেনগুপ্ত।
সুদীপ্তা সেনগুপ্ত আন্টার্কটিকায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভূতত্ত্ব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য নানা সময়ে বিবিধ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৯১ সালে ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ভারত সরকারের শীর্ষ সংস্থা ‘কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ তাঁকে ‘শান্তিস্বরূপ ভাটনগর’ পুরস্কারে ভূষিত করে। ভারত সরকারের কাছ থেকে তিনি পেয়েছিলেন ‘ন্যাশনাল মিনারেল অ্যাওয়ার্ড’ বা জাতীয় খনিজ পুরস্কার (১৯৯৭) এবং আন্টার্কটিকা অ্যাওয়ার্ড (২০০১)। এছাড়াও লেডিস স্টাডি গ্রুপের কেরিয়ার এবং পেশা পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে।
২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশানাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির সদস্য হিসেবে কাজ করেছিলেন।সুদীপ্তা নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে ‘ওমেন ইন সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ শীর্ষক ফোরামের অংশ ছিলেন। যাদবপুরের ভূতত্ত্ব বিভাগ থেকে অবসর নেওয়ার পর কলকাতাতেই বাকি জীবনটা কাটিয়েছিলেন তিনি।
বর্তমানে ভূতাত্ত্বিক এবং অধ্যাপক সুদীপ্তা সেনগুপ্ত নিরন্তর গবেষণা করে চলেছেন।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান