সববাংলায়

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

বিভাগঃ , ,

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (Akhteruzzaman Elias) বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত কবি ও সাহিত্যিক। যদিও তাঁর সৃষ্টির ঝুলিতে রয়েছে মাত্র দুটি উপন্যাস ও সামান্য কিছু ছোটগল্প তবুও এই স্বল্প সম্পদই যথেষ্ট ছিল বাঙালির মনে তাঁর পাকাপোক্ত বাসভূমি তৈরি করতে। এত স্বল্প পরিমাণ সাহিত্য সৃষ্টি সত্ত্বেও তিনি বাঙালির মনে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন তাঁর অনন্য ভাষাশৈলীর কারণেই। আখতারুজ্জামান বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাঁর বিভিন্ন লেখায় মাঝে মাঝেই মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ের সামাজিক অবস্থার চিত্র ফুটে উঠতে দেখা যায়।

১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস এবং মায়ের নাম বেগম মরিয়ম ইলিয়াস। তাঁর বাবা ছিলেন পূর্ববাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ও মুসলিম লীগের সাংসদীয় সম্পাদক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোট তিন ভাই হলেন: শহিদুজ্জামান ইলিয়াস, নূরুজ্জামান ইলিয়াস ও খালেকুজ্জামান ইলিয়াস। ১৯৭৩ সালে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সুরাইয়া তুতুল ইলিয়াসের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সুরাইয়া সিরাজগঞ্জ মহিলা কলেজের লেকচারার ছিলেন। ১৯৭৪ সালে তাঁদের পুত্র আন্দালিব ইলিয়াসের জন্ম হয়।

১৯৪৯ সালে আখতারুজ্জামানের শিক্ষাজীবনের সূত্রপাত ঢাকার সেন্ট ফ্র্যান্সিস জেভিয়ার্স স্কুল থেকে। এরপর ১৯৫০ সালে তিনি ভর্তি হন কে়. এল. জুবিলি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণিতে এবং তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষা সম্পূর্ণ না করেই ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৪ সালে ইলিয়াসের বাবা-মা ঢাকা থেকে বগুড়াতে চলে যান ও ইলিয়াস বগুড়া জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৮ সালে ইলিয়াস বগুড়া জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ হন।

এক নজরে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস:

  • জন্ম: ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩
  • মৃত্যু: ৪ জানুয়ারি, ১৯৯৭
  • কেন বিখ্যাত: বাংলাদেশের সাহিত্যিক। বিখ্যাত উপন্যাস ‘চিলে কোঠার সেপাই’, ‘খোয়াবনামা’।
  • পুরস্কার: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ ইত্যাদি।

১৯৫২ সালে আজাদ পত্রিকার ছোটদের পাতায় তাঁর লেখা গল্প প্রথম ছাপা হয়। ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ ঘটতে শুরু করে। এই সময়ে তাঁর লেখালিখির হাতেখড়ি ছোটগল্পের হাত ধরে। সাওগত পত্রিকায় সেই সময় তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছিল। এছাড়াও তিনি জীবনের প্রথম ভাগে লিখেছেন কিছু কবিতাও, তবে এ ছিল তাঁর নিতান্তই শখ। তাঁর সাহিত্য প্রতিভার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমেই। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ তাঁকে নিয়ে আসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সমালোচকেদের মতে তাঁর ভাষা যেমন ছিল ক্ষুরধার, তেমনই বাহুল্যবর্জিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়তেই তিনি ‘স্বাক্ষর’ পত্রিকার সাথে যুক্ত হন। এম়.এ পাশ করার পর তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন জগন্নাথ কলেজের লেকচারার হিসেবে। এরপর তিনি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের উপ-পরিচালক, ঢাকা মহাবিদ্যালয়ের বাংলা অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি তিনি মফিজউদ্দিন শিক্ষা কমিশনেরও সদস্য ছিলেন। এছাড়াও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি তাঁর যথেষ্ট সমর্থন ছিল। সেই সময় তাঁর বহু লেখায় মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ ব্যবস্থার ছবি ফুটে উঠেছে। এমনকি তিনি নিজেও মুক্তিযুদ্ধকে মন থেকে সমর্থন করেছেন। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে ‘আসন্ন’ নামক লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর ‘চিলেকোঠায়’ নামক একটি গল্প প্রকাশিত হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যে শুধুমাত্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেই সমর্থন করেছেন তা নয়, সেই সময়কার চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং পরবর্তীকালে ভারতবর্ষের নকশালবাড়ি আন্দোলনের বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহকেও তিনি পূর্ণ সমর্থন জানান। ইলিয়াসের লেখা ‘প্রতিশোধ’, ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’’, ‘খোঁয়ারি’’, ‘মিলির হাতে স্টেনগান’’, ‘অপঘাত’, ‘জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল’’, ‘রেইনকোট’ প্রভৃতি গল্পে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের সমসাময়িক সামাজিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ছবি আমরা দেখতে পাই। সব মিলিয়ে ইলিয়াসের লেখা বইয়ের সংখ্যা খুবই কম; তাঁর ঝুলিতে রয়েছে মাত্র দুটি উপন্যাস, পাঁচটি গল্প গ্রন্থ ও একটি প্রবন্ধ সংকলন। তাঁর রচিত বিখ্যাত দুটি উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’। ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটিকে মনে করা হয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাঁর উপন্যাস ‘চিলেকোঠার সেপাই’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড থেকে। আখতারুজ্জামান শুধুমাত্র যে তাঁর নিজের দেশেই প্রশংসিত এবং সংবর্ধিত হয়েছেন তা নয়, ভারতেও তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত লেখক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ মিশন কর্তৃক আয়োজিত গ্রন্থ মেলায় অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য কলকাতায় আসেন এবং সেই বছরই জুন মাসে কলকাতার ‘প্রতিভাস প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি। এরপর ১৯৯৪ সালে তিনি ঢাকা কলেজের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দান করেন এবং ওই বছরেই দৈনিক ‘জনকণ্ঠ’ নামক ম্যাগাজিনের সাহিত্য পাতায় তাঁর ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে শুরু করে কিন্তু পুরো উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার আগেই ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক কারণে ‘খোয়াবনামা’ ছাপা বন্ধ করে দেন। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের শিল্পী সাহিত্যিকদের উপর নেমে আসে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের আক্রমণ এবং প্রণীত হয় ‘ব্লাসফ্লেমি আইন। এই ন্যাক্কারজনক আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও নেতৃত্ব দেন ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’কেও। জীবন সায়াহ্নে উপস্থিত হয়ে আখতারুজ্জামান লিখতে শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘করোতোয়া মাহাত্ম্য’, তবে লেখাটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। এখানে উল্লেখ্য তাঁর লেখা বহুল প্রশংসিত এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তীকালে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাস এবং ‘কান্না’ গল্পের অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তাঁর লেখা ছোট গল্প ‘রেইনকোট’ অবলম্বনে ২০১৪ সালে ‘মেঘমল্লার’ নামক একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয় এবং তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘খোয়াবনামা’ অবলম্বনে নাটকও মঞ্চস্থ করা হয়েছে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন কঠোর ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক ছিলেন তেমনই সেই নিষ্ঠার ছবি আমরা দেখতে পাই তাঁর লেখার মধ্যেও; লেখালিখির সঙ্গে তিনি কোনদিনও আপোষ করেননি বরং তাঁর লেখার রসদ খুঁজতে তিনি ছুটে বেরিয়েছেন গ্রামে গ্রামে, মিশেছেন বহু মানুষের সাথে, সাহিত্যের মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর অভিজ্ঞতার বিভিন্ন জীবন কাহিনী। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন, “কি পশ্চিমবাংলা কি বাংলাদেশে তিনিই শ্রেষ্ঠ লেখক”। তাঁর বেশ কিছু লেখা অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

সাহিত্যকীর্তির জন্য আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অসংখ্য পুরষ্কার পেয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পুরষ্কার হল: ১৯৭৭ সালে ‘হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার’, ১৯৮৩ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’, ১৯৮৭ সালে ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ১৯৯৬ সালে ‘আনন্দ পুরস্কার’, ‘সাদাত আলী আখন্দ পুরস্কার’, ও ‘কাজী মাহবুবুল্লাহ স্বর্ণপদক’ ইত্যাদি। ১৯৯৯ সালে তিনি মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ পুরস্কার পান।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং বেশ দেরিতে রোগটি ধরা পড়ার কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৯৬ সালের ২০ মার্চ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ক্যান্সারে আক্রান্ত ডান পা পুরোপুরি কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading