আষাঢ় মাসের আগমনের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রকৃতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। গ্রীষ্মের দাবদাহ পেরিয়ে বর্ষায় সিক্ত হয়ে ওঠে ধরণী। কৃষিনির্ভর ভারতীয় সমাজে এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে অম্বুবাচী বা অম্বাবাচী নামের এক প্রাচীন লোকাচার, যার শিকড় গেঁথে রয়েছে কৃষি, ধর্ম, সমাজ ও প্রকৃতি-ভাবনার গভীরে। বর্তমানে এই উৎসবের কথা মনে পড়লেই মানুষের মনে প্রথমেই ভেসে ওঠে অসমের কামাখ্যা মন্দির ও সেখানে অনুষ্ঠিত অম্বুবাচী মেলার কথা। কিন্তু ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, এই উৎসব কেবল কোনো নির্দিষ্ট মন্দিরকেন্দ্রিক ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি মূলত ভূমির উর্বরতা, বর্ষার আগমন এবং কৃষিজীবনের সঙ্গে যুক্ত এক প্রাচীন বিশ্বাস ও আচারব্যবস্থা, যার অস্তিত্ব বহু শতাব্দী ধরে বাংলাসহ পূর্বভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বিদ্যমান।
২০২৬ সালের অম্বুবাচী কবে?
- বাংলা তারিখ: ৭ আষাঢ়, ১৪৩৩ থেকে ১১ আষাঢ়, ১৪৩৩
- ইংরাজি তারিখ: ২২ জুন, ২০২৬ থেকে ২৬ জুন, ২০২৬
সংস্কৃত ‘অম্বু’ শব্দের অর্থ জল, আর ‘বাচী’ শব্দের অর্থ প্রকাশ বা নির্গমন। বর্ষার জলে পৃথিবীর সিক্ত হয়ে ওঠা এবং তার মাধ্যমে নতুন জীবনের সম্ভাবনার সূচনাকেই এই শব্দের মাধ্যমে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করা হয়েছে বলে মনে করা হয়। ভারতীয় ধর্মদর্শন ও লোকবিশ্বাসে পৃথিবীকে কেবল একটি গ্রহ হিসেবে নয়, বরং তাকে মাতৃরূপে কল্পনা করা হয়েছে। এই ধারণা অনুসারে পৃথিবী যেমন জীবজগতকে ধারণ করে, তেমনি তার গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় খাদ্যশস্য এবং জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপাদান। ফলে পৃথিবীকে একজন জননীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে বিশ্বাস করা হত, আষাঢ় মাসের সূচনালগ্নে বর্ষার জলে সিক্ত হয়ে বসুমতী মাতা ঋতুমতী হন। মানব সমাজে যেমন ঋতুস্রাবের পর নারী সন্তানধারণে সক্ষম হন, তেমনি বর্ষার সিক্ততায় পৃথিবীও নতুন শস্য উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হয়। আষাঢ় মাসে যখন বৃষ্টিতে মাটি ভিজে ওঠে, তখন তাকে রজঃস্বলা নারীর প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী এই সময় পৃথিবী বিশ্রাম গ্রহণ করে এবং নতুন সৃষ্টির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। প্রাচীনকালে কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্ষার আগমনের পূর্বে জমি সাধারণত শুষ্ক থাকত। প্রথম বৃষ্টিপাতের পর মাটির আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেত এবং কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হত। এই পরিবর্তনের মধ্যবর্তী সময়টিকেই অম্বুবাচীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
অম্বুবাচীকে কেন্দ্র করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের লোকাচার ও বিধিনিষেধ প্রচলিত রয়েছে। অঞ্চলভেদে রীতিনীতির কিছু পার্থক্য থাকলেও মূল বিশ্বাস প্রায় একই। এই সময় গৃহপ্রবেশ, বিবাহ, পূজা বা অন্যান্য মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান থেকে মানুষ বিরত থাকে। একই সঙ্গে কৃষিকাজও বন্ধ রাখা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী এই সময় বসুমতী মাতা ঋতুমতী অবস্থায় থাকেন। তাই তাঁর বুকে লাঙল চালানো বা মাটি খোঁড়াকে অনুচিত মনে করা হয়। অম্বুবাচীর তিনদিন জমিতে চাষ, বীজ বপন, গাছ লাগানো কিংবা মাটি কাটার কাজ সাধারণত করা হয় না। অনেক পরিবারে আগুনে রান্না করা খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন এবং ফলমূল, দুধ বা আগে থেকে বানিয়ে রাখা নিরামিষ খাবার খেয়ে থাকেন।
এছাড়াও বাংলার বহু অঞ্চলে এই কদিন গৃহদেবতা বা মন্দিরের দেবমূর্তিকে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার রীতি রয়েছে। বিশেষ করে কালী, দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, শীতলা, মনসা প্রভৃতি মাতৃশক্তির প্রতীক দেবীমূর্তির ক্ষেত্রে এই প্রথা পালন করা হয়। এই সময় নিত্যপূজা সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও অনেক ক্ষেত্রে যজ্ঞ বা বিশেষ আচার অনুষ্ঠিত হয় না। সাধারণত ধূপ, প্রদীপ ও প্রণামের মাধ্যমে দৈনন্দিন পূজা করা হয়। অম্বুবাচীর সময়কাল শেষ হলে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা, দেবমূর্তির আবরণ সরানো এবং বিশেষ পূজার আয়োজনের রীতি রয়েছে। অনেক পরিবারে এই দিন দেবতাকে ফল, আম, দুধ ইত্যাদি উৎসর্গ করা হয়। যদিও আধুনিক নগরজীবনে এর প্রভাব অনেকটাই কমে এসেছে, তবুও গ্রামীণ সমাজে এখনও নানা রূপে এই ঐতিহ্যের চিহ্ন দেখা যায়।
আজকের দিনে অম্বুবাচী বলতে সবচেয়ে বেশি পরিচিত অসমের কামাখ্যা মন্দিরে অনুষ্ঠিত অম্বুবাচী মেলা। শক্তি উপাসনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই মন্দিরে বিশ্বাস করা হয় যে এই সময় দেবী কামাখ্যা ঋতুমতী হন। এই উপলক্ষে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত, সাধু ও তান্ত্রিক কামাখ্যায় সমবেত হন। কয়েকদিন মন্দিরের গর্ভগৃহ বন্ধ রাখা হয় এবং পরে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় দর্শনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে ইতিহাসের বিচারে কামাখ্যা অম্বুবাচীর একমাত্র উৎস নয়। বরং বহু প্রাচীন লোকবিশ্বাস ও কৃষিভিত্তিক আচার পরবর্তীকালে কামাখ্যা মন্দিরকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর ধর্মীয় রূপ লাভ করেছে বলেই অধিকাংশ গবেষক মনে করেন।
অম্বুবাচী আমাদের সামনে এমন এক সময়ের ছবি তুলে ধরে, যখন মানুষ প্রকৃতিকে কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখত না। বরং প্রকৃতির প্রতিটি পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের জীবনকে যুক্ত করে দেখত। বর্ষার আগমন, মাটির উর্বরতা, কৃষির সূচনা এবং মানবজীবনের জৈবিক অভিজ্ঞতা – সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে তৈরি হয়েছিল এই আচার। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিশ্বাস ও রীতি আজ হারিয়ে যাচ্ছে। তবুও এই উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির ভিত কতটা গভীর এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা নিবিড় ছিল।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান