বিশ্ব সাহিত্যের ভান্ডারকে যেসব সাহিত্যসাধক তাঁদের অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ করে তুলেছিলেন, সেই তালিকায় অবশ্যই উপরদিকে স্থান পাবেন প্রখ্যাত রাশিয়ান লেখক আন্তন চেখভ (Anton Chekhov)। মূলত ছোটগল্প এবং নাটকের জন্যই সারা বিশ্বের কাছে তিনি সমাদৃত। সাহিত্যে বাস্তবতাবাদ নিয়ে কথা বলতে হলে চেখভের সাহিত্যকে কোনমতেই বাদ দেওয়া চলবে না। থিয়েটারে আধুনিকতার প্রবেশ ঘটেছিল যাঁদের হাত ধরে চেখভ ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অন্যদিকে ছোটগল্পের নিত্যনতুন সম্ভাবনার দুয়ার তিনি খুলে দিয়েছিলেন তাঁর অসাধারণ লেখনীর জাদুতে। পেশায় একজন ডাক্তার ছিলেন তিনি, বলতেন ডাক্তারি তাঁর বৈধ স্ত্রী এবং সাহিত্য হল উপপত্নী। ‘দ্য সিগাল’ তাঁর উল্লেখযোগ্য এক সৃষ্টি।
১৮৬০ সালের ২৯ জানুয়ারি দক্ষিণ রাশিয়ার আজভ সাগর সংলগ্ন বন্দর-শহর তাগানরোগে পলিটসেস্কায়া স্ট্রিটে (পরে সেই রাস্তার নাম হয় চেখভ স্ট্রিট) আন্তন পাভলোভিচ চেখভের (Anton Pavlovich Chekhov) জন্ম হয়। তাঁর বাবা পাভেল ইয়েগোরোভিচ চেখভ (Pavel Yegorovich Chekhov) একজন প্রাক্তন সার্ফের (Serf) পুত্র ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ চেখভের মায়ের নাম ছিল ইয়েভগেনিয়া (Yevgeniya)। চেখভের বাবা পেশায় ছিলেন একজন মুদি। জীবিত ছয় সন্তানের মধ্যে চেখভ ছিলেন তৃতীয় সন্তান। চেখভের মা ইয়েভগেনিয়া একজন কাপড় ব্যবসায়ীর কন্যা ছিলেন এবং পিতার সঙ্গে রাশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার অভিজ্ঞতা তিনি শোনাতেন তাঁর সন্তানদের। চেখভের মায়ের গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। চেখভ পরে বলেছিলেন যে, তাঁরা তাঁদের প্রতিভা বাবার থেকে পেলেও, মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন আত্মা।
এখানে উল্লেখ্য যে, চেখভের পিতা গির্জার গায়কদলের সঙ্গে কেবল যুক্তই ছিলেন না, তা পরিচালনাও করতেন এবং ছিলেন একজন গোঁড়া খ্রিস্টান। তিনি সন্তানদের শাস্তি দেওয়ার জন্য অনেকসময় শারিরীকভাবেও নির্যাতন করতেন। এমনকি বাবার অমন নিষ্ঠুর আচরণের কারণে যে চেখভের শান্ত ও উদার মায়ের জীবনও তিক্ত ও অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল, সেকথাও পরবর্তীকালে উল্লেখ করেছিলেন চেখভ। মনে করা হয়, পরবর্তীকালে চেখভের সাহিত্যের মধ্যে লক্ষিত কপট চরিত্রগুলিতে তাঁর পিতার ছায়া প্রতিফলিত হয়েছিল। অতএব শৈশবের খুব একটা সুখের স্মৃতি চেখভের ছিল না, বরং তাকে দুর্ভোগ বলে মনে করেছিলেন তিনি।
প্রথমে তাগানরোগের একটি গ্রীক স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষালাভের পর চেখভ ভর্তি হয়েছিলেন তাগানরোগ জিমনেসিয়ামে। সেখানে পনেরো বছর বয়সে প্রাচীন গ্রীক ভাষার পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণে চেখভের এক বছর নষ্ট হয়েছিল। চেখভ নিজেও বাবার গায়কদলের পাশাপাশি গ্রীক অর্থোডক্স মনাস্ট্রিতে গায়ক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। ১৮৭৬ সালে তাঁদের পরিবারটি এক চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল। চেখভের কথাসাহিত্যের মধ্যেও এই আর্থিক দ্বন্দ্ব প্রাধান্য পেয়েছে বহুবার। সেই বছর মিরনভ নামের একজন ঠিকাদারের দ্বারা প্রতারিত হয়ে চেখভের বাবা একটি বাড়ি নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলেন। এমনকি ঋণের জালেও জড়িয়ে পড়েন তিনি। ঋণ খেলাপের ফলে জেল হওয়া থেকে বাঁচবার জন্য পরিবার নিয়ে চেখভের বাবা মস্কোতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তখন তাঁর দুই বড় ছেলে আলেকজান্ডার এবং নিকোলাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এদিকে পারিবারিক সম্পত্তি বিক্রি করে পড়াশোনা শেষ করবার জন্য চেখভ কিন্তু রয়ে গেলেন। আরও তিনবছর তাগানরোগে থেকেছিলেন চেখভ। তাঁকে নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেকেই বহন করতে হত। তা করবার জন্য তিনি টিউশনি পড়িয়েছেন, গোল্ডফিঞ্চ পাখি ধরে তা বিক্রয় করবার কাজও করেছিলেন, এমনকি সংবাদপত্রে ছোটখাটো স্কেচ বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করেছিলেন। তাগানরোগের পড়াশুনা শেষ করে ১৮৭৯ সালে মস্কোয় এসে তিনি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ আইএম সেচেনভ ফার্স্ট মস্কো স্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন এবং পরিবারের সঙ্গেও মিলিত হয়েছিলেন। তাঁর বাবা সেই সময় একজন শ্রমিকের কাজ করতেন এবং মা করতেন সেলাইয়ের কাজ। এই সময় থেকে পরিবার চালনার আর্থিক দায়িত্বও তাঁর কাঁধে এসে পড়েছিল এবং তার পাশাপাশি নিজের পড়াশোনার খরচও বহন করতে হত তাঁকে। সেই কারণেই কেবল অর্থের জন্য এই সময় থেকে রাশিয়ানদের জীবনাবলম্বনে হাস্যরসাত্মক ছোট ছোট গল্প রচনা শুরু করেন তিনি। এরমধ্যে অনেকগুলি রচনা ছদ্মনামেও লিখেছিলেন চেখভ। কখনও আন্তোশা চেখন্তে আবার কখনও ম্যান উইদআউট স্প্লীন নামে লিখেছিলেন। তাঁর প্রথম হাস্যরসাত্মক গল্পটি ১৮৮০ সালের মার্চ মাসে ‘ড্রাগনফ্লাই’ নামের একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। সেই ম্যাগাজিন তাঁর আরও নয়টি গল্প প্রকাশ করেছিল।
রাশিয়ানদের একদম রাস্তার বাস্তব জীবন থেকে তুলে আনা ব্যাঙ্গাত্মক রচনাগুলির জন্য খ্যাতি পেতে শুরু করেছিলেন চেখভ। ১৮৮২ সাল নাগাদ তিনি ‘ওস্কোলকি’ নামক নামকরা হাস্যরসের ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতে থাকেন। এই ম্যাগাজিনের প্রকাশক ছিলেন নিকোলাই লেকিন।
১৮৮৪ সালে একজন চিকিৎসক হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন চেখভ। যদিও সেই পেশা থেকে খুব কমই উপার্জন করতেন এবং দরিদ্র মানুষদের প্রায়শই বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন তিনি। ১৮৮৪ সালেই রাশিয়ার চিকিনোতে হাসপাতালে কাজ করতে গিয়েছিলেন চেখভ এবং সেবছরই তাঁর কাশির সঙ্গে রক্ত উঠেছিল। ১৮৮৬ সাল নাগাদ শরীর তাঁর আরও খারাপ হয়ে পড়লে ও যক্ষ্মার সমস্ত লক্ষণ দেখা গেলেও পরিবার ও বন্ধুদের কাছে তা স্বীকার করেননি তিনি। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৮৮৪ সালেই আন্তন চেখভ নিজেরই অর্থ ব্যয় করে তাঁর ছয়টি হাস্যরসের সংগ্রহ ‘দ্য টেলস অব মেলপোমেন’ নামক বইটি প্রকাশ করেছিলেন। এই গল্পগুলিতে চেখভের প্রখর বুদ্ধি ও হাস্যরসের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। অবশ্য এরও আগে ১৮৮২ সালে ‘দ্য প্র্যাঙ্ক’ নামে তাঁর লেখা এবং নিকোলাইয়ের ছবিতে সমৃদ্ধ একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। পরে চেখভ বলেছিলেন সেই বইতে সংকলিত বারেটি গল্প তাঁর লেখা সবচেয়ে সেরা বারোটি গল্প বলে তিনি মনে করেন।
১৮৮৬ সালের প্রথমদিকে চেখভকে সেন্ট পিটার্সবার্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাগজ নোভয়ে ভ্রেম্যা বা নিউ টাইমসে লেখবার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। এর মালিক ছিলেন আলেক্সি সুভরিন, যিনি পরবর্তীকালে চেখভের সবচেয়ে কাছের বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলেন। চেখভের এই সমস্ত লেখালেখি তাঁর প্রতি অন্যান্য সাহিত্যিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। চৌষট্টি বছর বয়সী বিখ্যাত রাশিয়ান লেখক দিমিত্রি গ্রিগোরোভিচ চেখভের গল্প ‘দ্য হান্টসম্যান’ পড়বার পর চিঠি লিখে চেখভের সত্যিকার প্রতিভা সম্পর্কে জানান। এমনকি চেখভকে তিনি কম পরিমাণে লেখার এবং সাহিত্যিক মানের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। চেখভের কাছে সেই চিঠি ছিল বজ্রপাতের মত। তিনি অকপটে জানিয়েছিলেন যে, সাংবাদিকেরা যেমন যান্ত্রিক পদ্ধতিতে আগুন বিষয়ে লেখেন সেভাবেই তিনি গল্পগুলি রচনা করেছিলেন এবং অর্ধ-সচেতন হয়ে, পাঠকের প্রতি কিংবা নিজের মনের প্রতি কোনোরকমভাবেই যত্নশীল না থেকে সেগুলি রচনা করেছেন।
১৮৮৬ সালেই চেখভের নিজস্ব নামে প্রথম বই ‘মোটলে স্টোরিজ’ প্রকাশিত হয় এবং এই বইটি বেশ প্রশংসিত হলে একটি নতুন প্রতিভা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন চেখভ। আর তিনি হাস্যরসের ম্যাগাজিনে হাস্যরসাত্মক লেখালেখি করেননি, বদলে খুবই গম্ভীর ও গভীর বিষয় নিয়ে গল্প ও নাটক লেখা শুরু করেন। ১৮৮৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লিটারারি ফান্ডের জন্য নির্বাচিত হন তিনি। সেই বছর আগস্ট মাসে ‘ইন দ্য টুইলাইট’ নামক তাঁর একটি ছোটগল্পের সংকলন প্রকাশিত হয়।
১৮৮৭ সালেই অত্যন্ত পরিশ্রমের ফলে অসুস্থ এবং ক্লান্ত হয়ে ইউক্রেন ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে আসার পর প্রায় উপন্যাসোপম একটি ছেটগল্প ‘দ্য স্টেপ’ (প্রকাশকাল ১৮৮৮) রচনা করেছিলেন চেখভ। এই রচনাটি অত্যন্ত উচ্চ সাহিত্যগুণসম্পন্ন রচনা ছিল বলেই সংবাদপত্রের বদলে এই লেখাটি ‘সেভের্নি ভেস্টনিক’ (‘দ্য নর্দান হেরাল্ড’) নামক একটি সাহিত্য-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
১৮৮৭ সালে কোর্শ নামের একজন থিয়েটার ম্যানেজার চেখভকে একটি নাটক লিখে দেওয়ার কথা বললে তিনি তাঁর প্রথম সম্পূর্ণ নাটক ‘ইভানভ’ রচনা করেছিলেন। তাঁর নাটকের হাত ধরেই থিয়েটারে বাস্তববাদী অভিনয় এবং আধুনিকতার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল বলা চলে। চেখভ এরপর যে সমস্ত নাটক রচনা করেছিলেন সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘দ্য সিগাল (রচনাকাল ১৮৯৫), ‘আঙ্কেল ভানিয়া’ (রচনাকাল ১৮৯৭), ‘দ্য থ্রি সিস্টার্স’ (রচনাকাল ১৯০০), ‘দ্য চেরি অরচার্ড’ (রচনাকাল ১৯০৩) ইত্যাদি। বিশেষত ‘দ্য সিগাল’ নাটকটি ততদিন পর্যন্ত প্রচলিত মঞ্চ নির্মাণের ঐতিহ্যবাহী অনেক উপাদানকে অস্বীকার করে এক নতুন ধারার আমদানি করেছিল।
১৮৮৮ সালের অক্টোবর মাসে চেখভ ‘একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এর পুশকিন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। সেই বছরই ‘দ্য লাইটস’, ‘দ্য নেম-ডে পার্টি’ এবং ‘অ্যান অ্যাটাক অব নার্ভস’-এর মতো রচনাগুলি তিনি সৃষ্টি করেন। ১৮৮৯ সালে যক্ষ্মা রোগে তাঁর ভাই নিকোলাইয়ের মৃত্যুর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে চেখভ রচনা করেন ‘আ ড্রেরি স্টোরি’।
১৮৮৯ সালে তাঁর নাটক ‘দ্য উড ডেমন’ ব্যর্থ হলে তিনি সাহিত্য থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে এসে সমাজবিজ্ঞানের দিকে মনোনিবেশ করেন। সেই সূত্র ধরেই ১৮৯০ সালে চেখভ ট্রেন, ঘোড়ার গাড়ি ও স্টিমারে করে রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে সাখালিন দ্বীপের কাতোরগাতে চলে যান। সেখানে তিনি তিনমাসের জন্য ছিলেন এবং একটি আদমশুমারীর জন্য সেখানকার বসবাসকারী এবং আসামীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এই সাখালিনের আড়াই-তিন মাস যাত্রার বিবরণ দিয়ে যে চিঠিগুলি তিনি তাঁর বোনকে লিখেছিলেন, তা চেখভের অন্যতম সেরা কাজগুলির মধ্যে পড়ে। সাখালিনের মানুষের, দুঃসহ দুর্বহ জীবনযাত্রা দেখে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন চেখভ। মহিলা ও শিশুদের চরম দুরাবস্থা তাঁকে ভীষণই কষ্ট দিয়েছিল৷ ১৮৯৩ এবং ১৮৯৪ সালে যে তিনি ‘অস্ট্রোভ সাখালিন’ (দ্য আইল্যান্ড অফ সাখালিন) রচনা করেন, তা আসলে কোনো সাহিত্য নয়, বরং সামাজিক বিজ্ঞান হিসেবে সেটিকে ব্যাখা করা যায়। চেখভের দীর্ঘ ছোটগল্প ‘দ্য মার্ডার’-এও সাখালিনের অভিজ্ঞতার প্রভাব ছিল। এই গল্পের শেষ অংশটির পটভূমিও ছিল সাখালিন। জানা যায় যে, চেখভ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কিছু স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন।
সাখালিন থেকে ১৮৯২ সালে চেখভ চলে যান মেলিখোভোতে। এই মেলিখোভোতে চেখভকে এক অসাধারণ দরদী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন৷ বহুদূর থেকে তাঁর কাছে মানুষ আসতেন চিকিৎসার জন্য। রুগী দেখতে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁর লেখার সময়ও কমে গিয়েছিল। ডাক্তার হিসেবে রাশিয়ান সমাজের সকল স্তরের মানুষের সঙ্গে এক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের সুযোগ হয় তাঁর। কৃষকদের দুঃখ, দৈন্যে ভরা জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন তিনি, যে অভিজ্ঞতা তাঁর ‘পিজেন্টস’ নামক ছোটগল্পকে প্রভাবিত করে। অভিজাত সম্প্রদায়ের মানুষজনকেও নিবিড়ভাবে দেখেছিলেন তিনি। সেই ১৮৯৩-৯৪ সালে তিনি জেভেনিগোরোডে একজন জেমস্টভো ডাক্তার হিসেবে কাজ করেছিলেন। ১৮৯৪ সালে এই মেলিখোভোতে বসেই ‘দ্য সিগাল’ নাটকটি লিখতে শুরু করেন তিনি। ১৮৯৬ সালের অক্টোবরে এই নাটকের মঞ্চায়নে দর্শকদের ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও উদাসীনতা চেখভকে থিয়েটার ত্যাগ করায় প্রায় বাধ্য করেছিল৷ পরিচালক ভ্লাদিমির নেমিরোভিচ-ড্যানচেঙ্কো ‘দ্য সিগাল’-এর রচনায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি কনস্ট্যান্টিন স্ট্যানিস্লাভস্কিকে মস্কো আর্ট থিয়েটারের জন্য এটি পরিচালনা করতে রাজি করেছিলেন, এর ফলে নাটক লেখার প্রতি চেখভের আগ্রহ পুনরায় ফিরে আসে।
মেলিখোভোতে চেখভ দেশীয় একটি এস্টেটে বসবাস করেন এবং সেখানে স্কুল, ত্রাণ শিবির, ক্লিনিক, ফায়ার স্টেশন ইত্যাদি খুলে সমাজ ও জনগণের উন্নতির জন্য কাজ শুরু করেন।
১৮৯৭ সালে মস্কো সফরে যাওয়ার সময় ফুসফুসের রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন চেখভ। তখন ডাক্তাররা তাঁর শরীরে যক্ষ্মার উপস্থিতির কথা জানান এবং জীবনযাপন পদ্ধতির পরিবর্তনের উপদেশ দেন। ১৮৯৮ সালে বাবার মৃত্যুর পর ইয়াল্টায় জমি কিনে ‘দ্য হোয়াইট ডাচা’ নামে একটি বাড়ি তৈরি করেন এবং পরের বছর মা ও বোনের সঙ্গে সেখানে চলে আসেন। সেখানে টলস্টয়, ম্যাক্সিম গোর্কির মত অতিথিরা আসতেন। ইয়াল্টাতে বসে আর্ট থিয়েটারের জন্য আরও দুটি নাটক ‘থ্রি সিস্টার্স’ এবং ‘দ্য চেরি অরচার্ড’ রচনা করেন তিনি।
১৯০১ সালের ২৫ মে একপ্রকার গোপনেই এক রাশিয়ান অভিনেত্রী ওলগা নিপারকে (Olga Knipper) বিবাহ করেন চেখভ। ওলগা বেশিরভাগ সময়ই অভিনয়ের জন্য মস্কোতে থাকতেন। ১৯০২ সালে ওলগা গর্ভপাতের শিকার হন। কেউ কেউ বলেন যখন তাঁরা আলাদা ছিল তখন এই ঘটনা ঘটে, অবশ্য অনেকে এই তত্ত্বকে গুরুত্ব দেননি। ইয়াল্টায় চেখভ তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ডগ’ রচনা করেন। চেখভের কয়েকটি গল্পগ্রন্থ হল, ‘ইনোসেন্ট স্পিচেস’ (১৮৮৭), ‘চিল্ড্রেন’ (১৮৮৯), ‘গ্লুমি পিপল’ (১৮৯০), ‘ওয়ার্ড নম্বর ৬’ (১৮৯৩) ইত্যাদি।
১৯০৩ সালের মে মাসে মস্কো সফরে যান চেখভ। ১৯০৪ সালের মে মাস নাগাদ যক্ষ্মায় প্রচন্ডভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ৩ জুন ওলগার সঙ্গে জার্মানির ব্ল্যাক ফরেস্টের জার্মান স্পা শহরে ব্যাডেনউইলারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অবশেষে সেখানেই ১৯০৪ সালের ১৫ জুলাই মাত্র ৪৪ বছর বয়সে এই মহান সাহিত্যিক আন্তন চেখভের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান