সববাংলায়

বনানী চৌধুরী

বনানী চৌধুরী ( Banani Choudhury) ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম মুসলিম অভিনেত্রী। যে সময়টায় মুসলিম নারীদের বাইরে বের হওয়াতেই নিষেধাজ্ঞা ছিল, সে সময় হিন্দু ছদ্মনাম ব্যবহার করে চলচ্চিত্রে আসেন এই অভিনেত্রী। তাই বাঙালি মুসলিম নারীদের চলচ্চিত্রের অগ্রপথিক হিসেবে পরিচিত বনানী চৌধুরী। তখনকার সময়ের বিখ্যাত নায়িকা সন্ধ্যারানী, মঞ্জু দে, ভারতী দেবী কিংবা অনুভা গুপ্তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রেখেছিলেন বনানী চৌধুরী।

১৯২৪ সালের মে মাসে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বনগাঁ-তে বনানী চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম বেগম আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি। তাঁর বাবা মুন্সী আফসার উদ্দীন আহমদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। চাকরির সুবাদে তাঁর কর্মস্থল ছিল বনগাঁতে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত পিতৃনিবাস ছিল বৃহত্তর যশোর জেলার শ্রীপুর থানার সোনাতনদি গ্রাম। বর্তমানে গ্রামটি বাংলাদেশের মাগুরা জেলাতে অবস্থিত। নয় ভাই বোনের মধ্যে বনানী ছিলেন চতুর্থ। তাঁর স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী কলকাতা ওয়াকফের কমিশনার ছিলেন। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ছিল দুই সন্তান। বড় ছেলে পানু ছিলেন লন্ডন প্রবাসী ডাক্তার এবং ছোট ছেলে বুলেট বাংলাদেশে গোল্ড লিফ টোবাকো কোম্পানীতে চাকরি করতেন।

বনানী চৌধুরী তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেছিলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদিঘী গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৩৬ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন তাঁর বিয়ে হয়ে যায় চাচাতো ভাই রাজ্জাক চৌধুরীর সঙ্গে। স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী উৎসাহ দিয়ে বনানী চৌধুরীকে লেখাপড়া করান। স্বামীর উৎসাহেই ১৯৪১ সালে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। পরবর্তীকালে তিনি আই.এ এবং বি.এ পাসও করেন।

শৈশব থেকে বনানী চৌধুরী সাংস্কৃতিক অঙ্গণে প্রতিভার বিকাশ ঘটান। স্কুলে অনুষ্ঠিত মঞ্চ নাটকে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি করে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেয়ে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তিনি।

শৈশব থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আলাদা দুর্বলতা ছিল বনানী চৌধুরীর। আর তাঁর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী। বলা যায় বনানী চৌধুরীর চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার পেছনে প্রধান অবদান রয়েছে তাঁর স্বামীর।

শিক্ষা জীবন শেষ করেই চলচ্চিত্র অঙ্গণে যুক্ত হন বনানী চৌধুরী। স্বামী রাজ্জাক চৌধুরী তাঁর দুই বন্ধু, কথাশিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায় ও সুলতান আহমদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন বনানীকে।  প্রধান নায়িকা চরিত্রে বনানীকে পছন্দ করা হলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় ধর্ম ও সামাজিকতার দৃষ্টিভঙ্গি; কারণ তখন এমন একটা সময় চলছিল যখন কঠিন পর্দা মেনে চলতে হত মুসলিম নারীদের। বাইরে বের হওয়ার চিন্তাও করতে পারত না অনেক নারী। চলচ্চিত্র তো অনেক ‍দূরের বিষয়, সামাজিক গান বাজনা করার কথাও কল্পনা করতে পারত না মুসলিম বাঙালি নারীরা। তাই তখন আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি নামের পরিবর্তে ছদ্ম নাম দেয়া হল বনানী চৌধুরী। সেই যুগে সহস্র বাধা অত্রিক্রম করে উপমহাদেশের প্রথম বাঙালি মুসলিম নারী হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখলেন অভিনেত্রী বনানী চৌধুরী ওরফে আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি।

চিত্র পরিচালক গুনময় বন্দোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে ‘বিশ বছর আগে’ নামক চলচ্চিত্র দিয়ে রূপালি পর্দায় অভিনয় শুরু করেন বনানী চৌধুরী। যদিও ছবিটি মুক্তি পেতে দুই বছর সময় লেগে গিয়েছিল। কিন্তু এরই মধ্যে তাঁর লাবন্যময়ী সৌন্দর্য ও নিঁখুত অভিনয় ‍আকৃষ্ট করেছিল সেই সময়ের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের। তাই ‘বিশ বছর আগে’ সিনেমাটি মুক্তির আগেই বেশ কিছু চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।

১৯৪৭ সালে তাঁর অভিনীত প্রথম ছবি মুক্তি পায় সুশীল মজুমদার পরিচালিত ‘অভিযোগ’। এই ছবিটির মাধ্যমে তিনি জয় করে নেন লাখো মানুষের হৃদয়। ছবিটিতে নায়িকার চরিত্রে তাঁর সাথে ছিলেন সুমিত্র দেবী। এছাড়াও অভিনয় করেছিলেন দেবী মুখোপাধ্যায়, অহিন্দ্র চৌধুরী, রবি রায়, ছবি বিশ্বাস ও মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য।

১৯৪৭ সালেই তাঁর অভিনীত আরোও দুইটি ছবি মুক্তি পায়। একটি ‘পূর্বরাগ’ অন্যটি বিভূতি দাস পরিচালিত ‘তপোভঙ্গ’। এ সিনেমাতেও নায়িকা চরিত্রে দুজন অভিনয় করেছেন। বনানী চৌধুরীর সাথে ছিলেন সন্ধ্যারানী। অভিনয়ে সন্ধ্যারানীর ছোট বোন প্রমীলা ত্রিবেদীর সহপাঠী ছিলেন বনানী। একই সালে অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পূর্বরাগ’ সিনেমায় রানীর চরিত্রে অভিনয় করেন বনানী। তাঁর বিপরীতে ছিলেন দীপক মুখোপাধ্যায়। ১৯৪৭ সালে বনানী চৌধুরী ইস্টার্ন টকিজের নিজস্ব শিল্পী হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। দুই বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে তিনি তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। সিনেমাগুলি হচ্ছে ‘নন্দরানীর সংসার’, ‘পরশ পাথর’ ও ‘মহাসম্পদ’।

এর পর ১৯৪৮ সালে তাঁর প্রথম অভিনীত ‘বিশ বছর আগে’ ছবিটি মুক্তি পায়। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ‘চলার পথে’ সিনেমায় অভিনয় করে বেশি প্রশংসিত হন তিনি।

১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে তাঁর অভিনীত ‘মায়াজাল’ ‘বিষের ধোঁয়া’, ও ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ সিনেমা তিনটি আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন’ সিনেমায় মাস্টার দার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সারা বাংলায় প্রশংসিত হন।

একটা সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করা শুরু করেন বনানী চৌধুরী। বাংলাদেশের বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করে আবার কলকাতায় চলে যান। বাংলাদেশে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম জহির রায়হান পরিচালিত ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ সিনেমা। ১৯৭০ সালে তৎকালী পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকাতেই জহির রায়হানের এই সিনেমায় তিনি যুক্ত হন। কিন্তু জহির রায়হান নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত ছবিটি মুক্তি পায়নি।

বাংলাদেশে তাঁর অভিনীত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ‘বদনাম’ ‘আল্লাহ মেহেরবান’ ‘আকাশ পরি’ ও ‘সুখ দুখের সাথী’।

বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তিনি বেশ কিছু খ্যাতনামা অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।  তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন ছবি বিশ্বাস, জহর গাঙ্গুলী, পাহাড়ী সান্যাল ও মলিনা দেবী। জহির রায়হান ছাড়াও কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন নীতির বসু, প্রমথেশ বড়ুয়া, হেমেন গুপ্তের মতো পরিচালকদের সঙ্গে। চলচ্চিত্র ছাড়াও কলকাতার মঞ্চ ও বেতারের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বনানী চৌধুরী।

শেষ বয়সে বাংলাদেশে নায়ক রাজ্জাক পরিচালিত ‘বদনাম’ সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। ১৯৮৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিনেমাটিতে নায়ক রাজ্জাক ও বুলবুল আহমেদের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চরিত্রে অভিনয় করেও বেশ প্রশংসিত হন তিনি।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে একটা সময় বনানী চৌধুরী চলচ্চিত্র জগত থেকে অব্যাহতি নিয়ে স্বামীর সঙ্গে কলকাতায় চলে আসেন স্থায়ীভাবে। সেখানে ১ নম্বর পার্ক স্টীট, পার্ক সার্কাস এর বাসায় বসবাস করতেন তাঁরা। ১৯৯৪ সালের শেষের দিকে স্বামীর মৃত্যুর পর একা হয়ে যান বনানী। তখন তাঁর স্বজনরা তাঁকে নিয়ে আসেন বাংলাদেশে। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর ফলে তিনি প্রচন্ড শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তারপর খুব বেশিদিন বাঁচেননি।

১৯৯৫ সালের ৫ জানুয়ারি, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে বনানী চৌধুরীর মৃত্যু হয়। ঢাকার বনানী কবরখানাতে তাঁকে কবর দেয়া হয়।

মুসলিম নারী আনোয়ারা নাহার চৌধুরী লিলি, হিন্দুনাম্নী বনানী চৌধুরী হয়ে এক অর্থে বিদ্রোহ করেই চলচ্চিত্র অঙ্গণে এসেছিলেন। সফলও হয়েছেন তিনি। অন্যান্য মুসলিম নারীদের চলচ্চিত্র জগতে আসার পথ মসৃণ করে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর আসল পরিচয় জানার পর অনেক মুসলিম অভিনেত্রী চলচ্চিত্র অঙ্গণে যুক্ত হওয়ার সাহস পান। তাই শুধু সুন্দরী নায়িকা বা আকর্ষণীয় অভিনয়ের জন্যই নয়, তাঁর এই অবদানের জন্য আজও ইতিহাসের পাতায় প্রথম মুসলিম নারী অভিনেত্রী হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে বনানী চৌধুরীর নাম।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading