বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসকে অনবদ্য অভিনয় দক্ষতায় ঋদ্ধ করেছেন যে সমস্ত অভিনেতা পাহাড়ী সান্যাল (Pahari Sanyal) নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন ঘরানার অভিনয়ে সমান পারদর্শী ছিলেন তিনি। তবে কেবল বাংলা চলচ্চিত্রেই নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রের জগতেও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছিল একসময়। উল্লেখযোগ্য যে, ইংরেজি ভাষার একটি ছবিতেও অভিনয় করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। অভিনয়ের পাশাপাশি খুব ভালো গান গাইতেন তিনি, পুরোনো বেশ কিছু বাংলা ছবিতে তাঁর গান শুনতে পাওয়া যায়। অতুলপ্রসাদী গানের প্রথম সারির একজন গায়ক ছিলেন তিনি। মূলত পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও বিদ্যাসাগর, গিরিশচন্দ্র ঘোষের মতো বিখ্যাত বাঙালিদের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের সম্পদ হয়ে রয়েছে।
১৯০৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত দার্জিলিংয়ের হিল স্টেশনে পাহাড়ী সান্যালের জন্ম হয়। যদিও তাঁর খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে ব্রতীন্দ্রনাথের মতে, সিমলার কাছে কসৌলি শহরে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নগেন্দ্রনাথ সান্যাল এবং ডাকনাম ছিল পাহাড়ী। পার্বত্য এলাকার মানুষ হওয়ার কারণে এমন ডাকনাম হয়েছিল তাঁর। তবে পরবর্তীকালে এই পাহাড়ী নামেই তিনি কর্মজীবনে সকলের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র দেড় বছর বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন তিনি। পাহাড়ীর বাবা নৃপেন্দ্রনাথ সান্যল (Nripendranath Sanyal) সামরিক বিভাগে চাকরি করতেন এবং প্রবল সঙ্গীতানুরাগী মানুষ ছিলেন। নগেন্দ্রনাথ অর্থাৎ পাহাড়ীর আরও তিন সহোদর হলেন সত্যেন্দ্রনাথ, বীরেন্দ্রনাথ ও ধীরেন্দ্রনাথ এবং তাঁর দুই বোনের নাম ছিল পটেশ্বরী ও কমলেশ্বরী।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে সাপ্লাই বিভাগে চাকরি ছিল বলে পাহাড়ীর বাবাকে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হত। কসৌলিতে জন্ম হলেও শৈশবকালটা লক্ষ্ণৌতেই কাটিয়েছিলেন তিনি। পাহাড়ীর বাবা লক্ষ্ণৌয়ের মডেল হাউজ পাড়ায় একটি বসতবাড়ি কিনেছিলেন। সেই বাড়িতেই বড় হয়েছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। বাবা যেহেতু একজন সঙ্গীতপিপাসু মানুষ ছিলেন, তাই ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতের বাতাবরণের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। তাছাড়াও লক্ষ্ণৌ শহরের সাঙ্গীতিক পরিবেশেরও বিপুল প্রভাব পড়েছিল তাঁর ওপর। সেখানকার হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিবেশ, বিভিন্ন গানের মজলিশ খুব ছোট থেকেই তাঁর মধ্যে একটি সঙ্গীতের বোধ জাগিয়ে তুলেছিল। বারো বছর বয়সে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর বাবা মেসোপটেমিয়ান ক্যাম্পেন যুদ্ধে মারা গেলে, বড় দাদার কাছেই মানুষ হন তিনি। পাহাড়ীর নিজের জেঠতুতো দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথও সঙ্গীতের ব্যাপারে খুবই উৎসাহ দিতেন তাঁকে। ২১-২২ বছর বয়সে অর্থাৎ ১৯২৭ বা ১৯২৮ সালে লক্ষ্ণৌয়ের মেরিস কলেজ অফ হিন্দুস্থানী মিউজিকে পড়বার সময় তিনি প্রতিভা সেনগুপ্তের (Pratibha Sengupta) প্রেমে পড়ে তাঁর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। প্রতিভা তাঁর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় ছিলেন। বিবাহের কয়েক বছর পরে সন্তানের জন্ম দিতে গিয়েই প্রতিভা সেনগুপ্তের মৃত্যু হয়েছিল। এই ঘটনার দীর্ঘদিন পরে অভিনয় জগতে যখন প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন পাহাড়ী সান্যাল, তখন অভিনেত্রী মীরা বসুকে (Mira Basu) বিবাহ করেন তিনি এবং তাঁদের কন্যার নাম ছিল লুকু সান্যাল। প্রতিভার মৃত্যুর পরে, কেউ বলেন পাহাড়ী সান্যাল রামপুরের রাজার রাজসভায় কোর্ট সিঙ্গার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন, আবার কারও মতে, তিনি দেওয়ারের মহারাজার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজে যোগ দিয়েছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করবার পর আরও উচ্চস্তরের পড়াশোনা করবার জন্য তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সে ভর্তি হন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং অনুরাগ এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অধ্যয়নের জন্য লক্ষ্ণৌয়ের ‘মেরিস কলেজ অফ হিন্দুস্থানী মিউজিক’-এ ভর্তি হয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও উস্তাদ মহম্মদ হোসেন, নাসির খান, এহমদ খানের মতো সঙ্গীতজ্ঞদের কাছ থেকে রীতিমতো তালিম নিয়েছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। কথিত আছে যে, পাহাড়ী সান্যালের গানের গলা এতটাই মধুর ছিল যে তাঁর রেওয়াজ করা শুনে নাকি বিখ্যাত সাহিত্যিক ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় আমন্ত্রণ ছাড়াই তাঁদের ঘরে ঢুকে পড়েছিলেন।
লক্ষ্ণৌতে ব্যারিস্টার এবং প্রখ্যাত গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেনের সঙ্গেও পরিচয় হয়েছিল পাহাড়ী সান্যালের এবং পিতৃতুল্য এই মানুষটির সঙ্গে এক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও গড়ে উঠেছিল তাঁর। এরপর থেকে অতুলপ্রসাদের মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ ষোল বছর তাঁদের মধ্যে এক মধুর সম্পর্ক অটুট ছিল। অতুলপ্রসাদও পাহাড়ীকে বাবার মতই স্নেহ করতেন। নিজের অধিকাংশ গান তিনি পাহাড়ীকে শিখিয়ে গিয়েছিলেন অতুলপ্রসাদ। পাহাড়ী সান্যাল অতুলপ্রসাদী গানের ধারার প্রথম সারির একজন গায়ক ছিলেন। অতুলপ্রসাদ সেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথেরও খুব কাছের মানুষ ছিলেন এবং তাঁর উদ্যোগেই শান্তিনিকেতনে গিয়ে পাহাড়ীর বসবাসের একটি কথাবার্তা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি।
১৯৩২ সালে পাহাড়ী সান্যাল চলে আসেন কলকাতা শহরে। এখানে বন্ধু চিত্রগ্রাহক কৃষ্ণগোপালের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দক্ষ অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়ার সঙ্গে। ১৯৩২ সালে নিউ থিয়েটার্সের প্রযোজনায় এবং প্রমথেশ বড়ুয়ার পরিচালনায় পাহাড়ী সান্যাল ‘রূপলেখা’ ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পেলেও চুক্তিগত সমস্যার কারণে শেষ পর্যন্ত সেই ছবিতে অভিনয় করা হয়নি তাঁর। এরপর দেবকী বসু তাঁকে নিয়ে আসেন নিউ থিয়েটার্সে। সেখানে ১৫০ টাকা মাসিক বেতনে অভিনেতা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অভিনয়-দক্ষতার পাশাপাশি সুগায়ক হওয়ার কারণেও তিনি অনেক ছবিতে সুযোগ পেয়েছিলেন। পাহাড়ী সান্যাল অভিনীত প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি প্রেমাঙ্কুর আতর্থী পরিচালিত ‘ইহুদি কি লড়কি’। ১৯৩৩ সালেই দেবকী বসুর পরিচালনায় হিন্দি ভাষায় নির্মিত সাঙ্গীতিক ছবি ‘রাজরাণী মীরা’ ছবিতে চাঁদ ভট্টের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। সেই বছরেই ছবিটির একটি বাংলা রূপও মুক্তি পেয়েছিল ‘মীরাবাঈ’ নামে। সেই সময় কলকাতা শহরেই হিন্দি এবং বাংলা দুই ভাষারই ছবির শ্যুটিং হত এবং এই দুই ভাষার ছবিতেই প্রথম দিকে সমানে অভিনয় করে গিয়েছেন তিনি। লক্ষ্ণৌতে শৈশব ও কৈশোরের অনেকগুলি বছর অতিবাহিত করার সুবাদে পাহাড়ীর হিন্দি ভাষার উপর দখল ছিল ভালোই। এমনকি ‘রাজরাণী মীরা’র মত ‘দেবদাস’ (১৯৩৫), ‘বড়দিদি’, ‘মায়া’, ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৭) ইত্যাদি ছবির বাংলা ও হিন্দি দুটি রূপেই সমান দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন তিনি। প্রথম দিকের ছবিগুলিতে তাঁর গাওয়া গানও শোনা যায়। শচীন দেব বর্মণের গাওয়া সমস্ত গান পুনরায় রেকর্ড করার জন্য পাহাড়ীকে ব্যবহার করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক ‘ইহুদি কি লড়কি’র সময়ে। এছাড়াও ‘মীরাবাই’ ছবিতেও তাঁর কন্ঠে অনেকগুলি গান ছিল। ‘ভাগ্যচক্র’ হল ভারতবর্ষের প্রথম ছবি যেখানে প্লে-ব্যাক গান ব্যবহার করা হয়েছিল। পাহাড়ী সান্যাল সেখানে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে গেয়েছিলেন ‘কেনো পরান হলো বন্ধনহারা’ গানটি। ‘করোরপতি’ ছবিতে কে.এল সায়গলের সঙ্গে যুগলে ‘জো চাকরি দিলা দে’ গানটি গেয়েছিলেন তিনি। আবার কানন দেবীর সঙ্গে যৌথভবে তিনি গেয়েছিলেন ‘মস্ত্ পবন শেক’ গানটি। আবার ‘নৌকাডুবি’ ছবির হিন্দি রূপ ‘মিলন’-এ ‘ওহ কাহে আপ কি দো চাহ কা ইনাম’ গানের জন্য প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন পাহাড়ী সান্যাল। যদিও শুরুর দিকের এই ছবিগুলিতে তাঁর গাওয়া গান যত বেশি আকর্ষণীয় এবং যতটা শ্রুতিনন্দন ছিল, তাঁর অভিনয় তখনও ততটা উজ্জ্বল ছাপ রাখতে পারেনি। পাহাড়ী সান্যালই সম্ভবত ছিলেন শেষ গায়ক-অভিনেতা। প্রমথেশ বড়ুয়া, সায়গল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কানন দেবী-দের মতো গুণী শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর।
তিরিশের দশকের শেষের দিকে এবং চল্লিশের দশকের গোড়া থেকেই অভিনয়ে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে থাকেন পাহাড়ী সান্যাল। ১৯৪১ সালে হেমচন্দ্র চন্দরের পরিচালনায় ‘প্রতিশ্রুতি’ ছবিতে কুমারনাথের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করার জন্য তিনি বেঙ্গল ফিল্ম জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছিলেন। এরপর চল্লিশের দশকের গোড়াতে তিনি বম্বে চলে যান। সেখানে একের পর এক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ‘মৌজ’ (১৯৪৩), ‘মহব্বত’ (১৯৪৩), ‘ইনসান’ (১৯৪৪), ‘আনবান’ (১৯৪৪), ‘প্রীত’ (১৯৪৫), ‘মিলন’ (১৯৪৬) এবং ‘শ্রাবণ কুমার’ (১৯৪৬) ইত্যাদি সেই সময়কার পাহাড়ী সান্যালের অভিনীত অন্যতম উল্লেখযোগ্য ছবি।
এরপর কলকাতায় ফিরে এসে প্রচুর বাংলা ছবিতে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে ছবি বিশ্বাস, বিকাশ রায়, কমল মিত্রদের মতো অভিনেতার সঙ্গে অভিনয় করতে থাকেন তিনি। এই সময় থেকে যেসব ছবিতে অভিনয় করেছিলেন পাহাড়ী সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘সাধারণ মেয়ে’ (১৯৪৮), ‘রং বেরং’ (১৯৪৮), ‘উল্টোরথ’ (১৯৪৯), ‘বিদ্যাসাগর’ (১৯৫০), ‘বাবলা’ (১৯৫১), ‘সদানন্দের মেলা’ (১৯৫৪), ‘শাপমোচন’ (১৯৫৫) এবং ‘সাহেব বিবি গোলাম’ (১৯৫৬)। বিখ্যাত বাঙালি মনীষী বিদ্যাসাগরের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকমহলের প্রশংসা তো অর্জন করেছিলেনই, পাশাপাশি ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মহাকবি গিরিশচন্দ্র’ নামক জীবনীমূলক ছবিতে গিরিশচন্দ্র ঘোষের চরিত্রে যে অভিনয় করেছিলেন তিনি তা ব্যাপক সমাদর লাভ করেছিল। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেনদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে পাহাড়ী সান্যাল নজরকাড়া অভিনয় করে গিয়েছেন যেসব ছবিতে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘পৃথিবী আমারে চায়’ (১৯৫৭), ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭), ‘দীপ জ্বেলে যাই’ (১৯৫৯), ‘হাসপাতাল’ (১৯৬০), পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র ‘সাত পাকে বাঁধা’ (১৯৬৩) ইত্যাদি। ‘দীপ জ্বেলে যাই’ ছবিতে যেমন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মত সিরিয়াস চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন দক্ষতার সঙ্গে, তেমনি পাশাপাশি ‘ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিসটেন্ট’ বা ‘একটি রাত’-এর মতো ছবিতে অত্যন্ত মজাদার চরিত্রেও একইরকম পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে চিত্ত বসু পরিচালিত ‘জয়া’ ছবিতে পার্শ্ব চরিত্রাভিনেতা হিসেবে বিএফজেএ (BFJA) পুরস্কার জিতেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। এছাড়াও তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি চলচ্চিত্র হল ‘কায়াহীনের কাহিনী’ (১৯৭৩), ‘গৃহদাহ’ (১৯৬৭), শক্তি সামন্তের পরিচালনায় ‘আরাধনা’ (১৯৬৯) ইত্যাদি।
পাহাড়ী সান্যালের মতো প্রতিভা বিশ্ববরেণ্য পরিচালক সত্যজিৎ রায়েরও চোখ এড়িয়ে যায়নি। প্রথমে সত্যজিতের পরিচালনায় তুলসী চক্রবর্তী অভিনীত ‘পরশ পাথর’ (১৯৫৭) ছবিতে একটি ছোট্ট দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। সেই দৃশ্যটিতে সত্যজিৎ তাঁকে দিয়ে খুব সামান্য একটু গানও গাইয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গীত প্রতিভাকে সুযোগমতো ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ।যেমন ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ (১৯৬৯) ছবিতে পাহাড়ী সান্যালকে সদাশিব ত্রিপাঠীর চরিত্রটি দিয়েছিলেন সত্যজিৎ এবং তাঁকে দিয়ে অতুলপ্রসাদের একটি গান গাইয়েছিলেন যা বিশেষভাবে দর্শককে আকৃষ্ট করে। সত্যজিৎ-এর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ (১৯৬২) ছবিতে পাখিপ্রেমী জগদীশের চরিত্রেও অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল। তাঁর আরেকটি গুণ ছিল যে তিনি বাংলা এবং হিন্দি ছাড়াও উর্দু, ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষাও ভীষণ ভালোভাবে জানতেন। মূল ভাষায় ফরাসি সাহিত্য সাবলীলভাবে পড়তে পারতেন তিনি। ১৯৬৩ সালে মার্চেন্ট-আইভরির উদ্যোগে জেমস আইভরি পরিচালিত ইংরেজি ভাষায় নির্মিত ‘দ্য হাউসহোল্ডার’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন পাহাড়ী সান্যাল।
কেবলমাত্র যে রূপোলি পর্দার জগতেই তাঁর বিচরণ ছিল, তেমনটা নয়। থিয়েটারের মঞ্চেও দাপিয়ে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সালে বিশ্বরূপা রঙ্গমঞ্চে ‘আসামী হাজির’ নাটকে তাঁর অপূর্ব অভিনয় নাট্যমোদীদের প্রভূত প্রশংসা লাভ করেছিল। দীর্ঘ চার দশক জুড়ে বাংলা হিন্দি মিলিয়ে প্রায় দেড়শ ছবিতে অভিনয় করেছেন পাহাড়ী সান্যাল।
১৯৭৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি ৬৭ বছর বয়সে পাহাড়ী সান্যালের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান