ইতিহাস

অতুলপ্রসাদ সেন

বাংলা গানের এক অন্যতম দিকপাল, একাধারে গায়ক, গীতিকার ও সুরকার অতুলপ্রসাদ সেন (Atul Prasad Sen)। পেশায় আইনজীবী হলেও আইনের জটিলতা তাঁর গানকে রুদ্ধ করেনি, মাটির সুরে সহজ ভাষায় গান লিখেছেন অতুলপ্রসাদ। পরাধীন দেশে সমাজসেবা এবং রাজনীতিতেও যোগ দিয়েছেন তিনি আর সেই ভাবধারা থেকে লিখেছেন বহু দেশাত্মবোধক গান। বিলেত থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করে এসে লক্ষ্ণৌ বার অ্যাসোসিয়েশনে যুক্ত হন তিনি। পেশাগত দিক থেকে তিনিই ছিলেন আউধ বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম ভারতীয় সভাপতি। লক্ষ্ণৌতে থাকাকালীন উর্দু শিখে ঠুমরি, গজল ঘরানার পরিবেশে থেকে বাংলা ভাষায় প্রথম গজলটি লিখে ফেলেন অতুলপ্রসাদ। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য অতুলপ্রসাদ ছিলেন খামখেয়ালী সভার সদস্য। ‘ওঠ গো ভারতলক্ষ্মী’, ‘হও ধরমেতে ধীর’, কিংবা ‘মোদের গরব মোদের আশা আমরি বাংলা ভাষা’, বলো বলো বলো সবে শতবীণা বেণু রবে’ ইত্যাদি প্রায় সব দেশাত্মবোধক গানই তাঁর অমর লেখনীর ফসল। গানের জগতের পাশে সমান্তরালে বয়ে গেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনও। প্রায় দুশো গানের সৃষ্টিকর্তা অতুলপ্রসাদ বাঙালি সংস্কৃতিতে আজও স্মরণীয়।

১৮৭১ সালে ২০ অক্টোবর ঢাকায় মাতুলালয়ে এক বৈদ্য পরিবারে অতুলপ্রসাদ সেনের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রামপ্রসাদ সেন এবং মায়ের নাম হেমন্তশশী দেবী। তাঁদের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ বিক্রমপুরের মগরা গ্রামে। তাঁর দাদু কালীনারায়ণ গুপ্তই তাঁকে ভারতীয় বাদ্যযন্ত্র এবং ভক্তিগীতিতে আগ্রহী করে তোলেন। তাঁর বাবা রামপ্রসাদ সেন রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্য ছিলেন। মহর্ষির বদান্যতায় রামপ্রসাদ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেন। বাল্যকাল থেকে অতুলপ্রসাদ বাড়িতে ব্রাহ্ম পরিবেশে বড় হয়েছেন। বাবা রামপ্রসাদ সেন নববিধান ব্রাহ্মসমাজ এবং দাদু কালীনারায়ণ সেন ভারতীয় ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ছিলেন। দাদুর কাছেই তিনি জাত-পাতের সংস্কার ভাঙতে শিখেছেন। রামপ্রসাদের মৃত্যু হলে তাঁর মা হেমন্তশশী দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন ব্রাহ্মনেতা দুর্গামোহন দাশকে। মন থেকে এই ঘটনা মেনে নিতে পারেননি আর তাই এই ঘটনার পর থেকেই কলকাতায় মামা কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের বাড়িতে অভিমানে থাকতে শুরু করেন তিনি। মায়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে চাইতেন না। এই মামার মেয়ে হেমকুসুম তাঁকে দুঃখে সান্ত্বনা দিতেন, মনোবল জোগাতেন। পরবর্তীকালে এই হেমকুসুমকেই সকলের অমতে স্কটল্যাণ্ডের এক গ্রামীণ গির্জায় গিয়ে খ্রিস্টমতে বিবাহ করেন অতুলপ্রসাদ।

১৮৯০ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন অতুলপ্রসাদ সেন। ঐ বছরই দুর্গামোহন দাশের সহায়তায় ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যাণ্ড যাত্রা করেন তিনি। ইংল্যাণ্ড যাবার পথে ভেনিসের কাছে জাহাজে বসেই একটা বিদেশি গানের সুরে মোহিত হয়ে ঐ সুরকে মাথায় রেখে অতুলপ্রসাদ প্রথম লিখে ফেলেন একটি বিখ্যাত গান – ‘ওঠ গো ভারতলক্ষ্মী’। লণ্ডনের মিডল টেম্পলে ব্যারিস্টারি পড়াকালীন ব্রিটিশ মিউজিয়াম ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয় তাঁর। চিত্তরঞ্জন দাশ, সরোজিনী নাইডু, অরবিন্দ ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখদের সঙ্গে লণ্ডনেই সাক্ষাৎ ঘটে তাঁর। ব্যারিস্টারি পড়ার পাশাপাশি পাশ্চাত্য সঙ্গীত, নাটক, অর্কেস্ট্রা ইত্যাদি শুনতে শুনতে গানের ভিত তৈরি হয় তাঁর মনে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


কলকাতায় ফিরে কলকাতা হাইকোর্টে সত্যপ্রসন্ন সিংহের জুনিয়র হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় অতুলপ্রসাদের। এর পাশাপাশি ৮২, সার্কুলার রোডে একটা ভাড়াবাড়িতে নিজেই আইন অভ্যাস শুরু করেন। এরপরে ১৮৯৭ সালে সৎ বাবা দুর্গামোহন দাশ মারা গেলে রংপুর জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে অভ্যাস শুরু করেন অতুলপ্রসাদ। এর আগে যদিও ১৮৯৫ সালে কলকাতা হাইকোর্টের বার-লাইব্রেরি ক্লাবের সদস্য হন তিনি। ইতিমধ্যে বিবাহ এবং সন্তানাদি হওয়ায় আর্থিক চাপ বাড়তে থাকছিল। সেই জন্য অধিক অর্থ উপার্জনের আশায় মুমতাজ হোসেন নামে এক বন্ধুর পরামর্শে লক্ষ্ণৌতে চলে যান অতুলপ্রসাদ এবং সেখানে লক্ষ্ণৌ বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। লক্ষ্ণৌ আদালতে অভ্যাস শুরু করে পাশাপাশি তিনি শিখতে লাগলেন উর্দু ভাষা, ঠুমরি-টপ্পা-শায়েরির এক মহলে তাঁর এক নতুন জীবন শুরু হল। আইনজীবী অতুলপ্রসাদ সে সময় কাশীতে বিধবা আশ্রম প্রতিষ্ঠা কিংবা হরিজনদের সেবা আবার গোমতী নদীর বন্যায় দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করেন তিনি যা তাঁকে ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে মহান করে তোলে। লক্ষ্ণৌতে থাকাকালীনই বহু গান লিখেছেন অতুলপ্রসাদ। উনিশ শতক ও বিশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রবীন্দ্রনাথ, রজনীকান্ত সেনের মতো শ্রেষ্ঠ ভক্তিগীতি রচয়িতা ও গায়কদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। ১৯২২ সালে লক্ষ্ণৌতে ‘প্রবাসী বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হলে অতুলপ্রসাদ সেন ‘উত্তরা’ নামে একটি বাংলা ভাষায় পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এছাড়াও ‘এলাহাবাদ ল জার্নাল’ এবং ‘আউধ উইকলি নোটস’ নামে আরো দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন অতুলপ্রসাদ। ১৯২৯ সালে লক্ষ্ণৌয়ের ‘বেঙ্গলি ক্লাব’ এবং ‘ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশন’কে একত্রিত করে নতুনভাবে ‘বেঙ্গলি ক্লাব অ্যাণ্ড ইয়ং মেন্স অ্যাসোসিয়েশন’ চালু করেন তিনি। লক্ষ্ণৌয়ের সেবাশ্রমে তিনি নিজের খরচে বেঙ্গল কেমিক্যালস থেকে আর্তদের জন্য ওষুধ নিয়ে আসতেন এবং নিজের ইচ্ছাতেই মৃত্যুর আগে মাসিক ২৫ টাকা ধার্য করে গিয়েছিলেন সেবাশ্রমে চিকিৎসার জন্য।

হিন্দুস্তানি খেয়াল, ঠুমরি, দাদরা খুব মনোযোগ দিয়ে শিখেছিলেন তিনি। বাংলা গানের ধারায় প্রথম তিনিই ঠুমরি রীতির প্রচলন করেন। এমনকি বাংলা ভাষায় প্রথম গজল লিখেছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। আদতে লক্ষ্ণৌতে থাকাকালীন বহু উর্দু কবি ও পার্সি গজল গায়কের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটায় সেই প্রভাবটি তিনি বাংলা গানের ধারায় সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। মোট সাত-আটটি বাংলা গজল লেখেন তিনি। তাঁর রাগ-প্রধান সঙ্গীতের দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম স্বয়ং। আদপে তিনি ছিলেন একজন কবি। তাঁর লেখা ২১২টি মতো কবিতা তিনি নিজেই সুরারোপ করে গানের রূপ দিয়েছিলেন আর সেগুলিই পরবর্তীকালে অতুলপ্রসাদের গান নামে বিখ্যাত হয়। তাঁর নিজের বই ‘গীতিগুঞ্জ’তে অতুলপ্রসাদ এই সমস্ত গানগুলিকে দেবতা, প্রকৃতি, স্বদেশ, মানব এবং বিবিধ এই পাঁচটি শ্রেণিতে বিন্যস্ত করেন। তাঁর প্রায় প্রতিটি গানেই একটি বহুস্তরীয় আবেদন থাকে। ‘বঁধুয়া নিদ্‌ নাহি আঁখিপাতে’ গানটি অতুলপ্রসাদের লেখা একটি বিখ্যাত প্রেমসঙ্গীত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে অতুলপ্রসাদ লেখেন, ‘মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলাভাষা’।

১৯০৫ সাল থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে ভারতীয় জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন অতুলপ্রসাদ। গোপালকৃষ্ণ গোখলের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সখ্যতা ছিল। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে একাধিকবার অযোধ্যা থেকে অতুলপ্রসাদ কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন। লক্ষ্ণৌ মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের সহ-পৌরপ্রধানের পদে আসীন ছিলেন তিনি। ১৯১৭ সালে লিবারেল পার্টিতে যোগ দেন তিনি। রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত লক্ষ্ণৌ ক্যানিং কলেজ অতুলপ্রসাদের চেষ্টাতেই লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য ছিলেন অতুলপ্রসাদ। ১৯০২ সালে লক্ষ্ণৌতে স্থাপিত মহাকালী পাঠশালা পরবর্তীকালে তাঁর স্মৃতি বজায় রেখে ‘অতুলপ্রসাদ গার্লস মেমোরিয়াল কলেজ’-এ পরিণত হয়।

উঠ গো ভারতলক্ষ্মী, হও ধরমেতে ধীর, বলো বলো বলো সবে শতবীণা বেণু রবে ইত্যাদি তাঁর লেখা প্রতিটি দেশাত্মবোধক গান আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। একেকটি গানের পিছনে এক গভীর ইতিহাস লুকিয়ে ছিল। বালগঙ্গাধর তিলক কারাবন্দি হওয়ার পরে বাড়িতে অতিথি বিপিনচন্দ্র পাল ও শিবনাথ শাস্ত্রীর সামনে অতুলপ্রসাদ গেয়েছিলেন ‘কঠিন শাসনে করো মা শাসিত’ গানটি। রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ‘মোদের গরব মোদের আশা’ গানটির দুটি পংক্তিতে অতুলপ্রসাদ লেখেন – ‘বাজিয়ে রবি তোমার বীণে / আনলো মালা জগৎ জিনে’। রামপ্রসাদের কাছারির খাতায় গান লেখার মতোই, অতুলপ্রসাদের মামলার কাগজপত্র থেকেও তাঁর লেখা গান খুঁজে পাওয়া গেছে। স্বভাবকবি অতুলপ্রসাদ কখনো স্টিমারে যেতে যেতে, কখনো মধুপুরে আবার কখনো বা শিমূলতলায় থাকাকালীন বহু গান লিখেছেন তিনি। ১৮৯৬ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত ‘খামখেয়ালী সভা’র সদস্য ছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য অতুলপ্রসাদ লক্ষ্ণৌতে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের আগমনের সংবাদ পেয়ে ‘এসো হে এসো হে ভারতভূষণ’ গানটি লিখে এবং পাহাড়ী সান্যালকে দিয়ে গাইয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পরিশোধ’ কাব্যগ্রন্থটি অতুলপ্রসাদকে উৎসর্গ করেন। লক্ষ্ণৌতে তাঁর বাড়িতে মথুরা, হায়দ্রাবাদ, কাশী, ইন্দোর প্রভৃতি বিভিন্ন জায়গা থেকে বড়ো বড়ো সঙ্গীতশিল্পীদের যাতায়াত ছিল। অমল হোমের ভাষায় তিনি ছিলেন এক ‘অক্লান্তকণ্ঠ’ শিল্পী।

১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট অতুলপ্রসাদ সেনের মৃত্যু হয়।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও