সববাংলায়

জানুয়ারিতে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা

জানুয়ারিতে শীত ভালই রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। শীতকাল বেড়ানোর জন্য আদর্শ সময়। ভাবছেন তো কোথায় যাওয়া যায়? জানুয়ারিতে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা।

১) পূর্বস্থলী

ছাড়ি গঙ্গার ধারে শীতকালে পিকনিক করতে আসা এবং ছাড়ি গঙ্গার বুকে নৌকাভ্রমণের অসাধারণ অভিজ্ঞতা পেতে আপনাকে যেতে হবে পূর্বস্থলী। পাখিপ্রেমীদের কাছে অবশ্য এখানে যাওয়ার কারণ হল শীতকালে উত্তরবঙ্গ তথা উত্তর এশিয়া, ইউরোপ, তিব্বত, সাইবেরিয়া থেকে পরিযায়ী পাখিদের ভিড় দেখা। জায়গাটি পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী ২ পঞ্চায়েত সমিতির অন্তর্গত চুপি গ্রামে অবস্থিত। লেকের পাড়ে যেখানে পিকনিক করা হয় তার নাম কাষ্ঠশালী। লেকের অন্যপাড়ে যে জায়গাটি আছে, তাকে বলে চুপির চর।

পূর্বস্থলী এসে দ্রষ্টব্য বা ঘোরার জায়গা মূলত দুটিই। পিকনিক স্পট এবং ছাড়ি গঙ্গা লেক। দলবল নিয়ে শীতকালে পিকনিক করতে আসার জন্য এটা আদর্শ স্থান হলেও মানুষের ক্রমাগত ভিড় আর হই-হট্টগোলে কয়েক বছর ধরেই পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা কমছে। তাদের কথা মাথায় রেখে পিকনিক করার সময় একটু সংযত হওয়া দরকার।

ভূগোলের ছাত্র এবং পাখিপ্রেমীদের পছন্দের জায়গা হতে পারে ছাড়ি গঙ্গা লেক। অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ নিয়ে ভূগোলের বইতে আমরা পড়েছি, এই লেকে গিয়ে সেটা দেখা যায়। গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছে এই অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। নৌকা করে এই লেক ঘুরে দেখা যায়। বড় নৌকায় সর্বাধিক ৮ জন এবং ছোট নৌকায় সর্বাধিক ৪ জন ভ্রমণ করতে পারে। নৌকা আগে থেকে বুক করার কোন উপায় নেই। স্পটে এসেই বুক করতে হবে। অন্যান্য আরও নিয়মসমেত পূর্বস্থলী ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে

২) শুশুনিয়া পাহাড়

আপনাকে যদি বলা হয় জানুয়ারিতে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা, তাহলে সেই তালিকায় অবশ্যই রাখা দরকার বাঁকুড়ার উল্লেখযোগ্য পাহাড় শুশুনিয়া। এই পাহাড় শুধু পর্যটক বা পর্বতারোহীদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রাচীনতম শিলালিপিটি এই পাহাড়েই অবস্থিত এবং বিভিন্ন প্রাচীন জীবাশ্ম থাকার ফলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছেও এই জায়গার গুরুত্ব অপরিসীম। পাহাড়ের একপারে বড়ু চণ্ডীদাসের জন্মভিটে ছাতনা। আর অন্যদিকে আদিবাসী ঘেরা গ্রাম। যাঁদের জীবন ও জীবিকা জুড়ে রয়েছে এই পাহাড়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পাহাড়ের কোলে বাস করেন স্বয়ং ভোলা মহেশ্বর। এখানে তাঁর একটি মন্দিরও রয়েছে। ফিবছর শ্রাবণ মাসে এখানে বসে শ্রাবণী মেলা। মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে শুশুনিয়ার ঝরণা থেকে জল সংগ্রহ করতে ছুটে আসেন অগনিত ভক্ত।

পাহাড়ের তিনটি ধাপ। প্রথম পাহাড় ওঠার পর উপর থেকে চারিদিকে সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। সঙ্গে পরিমাণমত জল বিস্কুট রাখবেন। খুব বেশি নেওয়ার দরকার নেই, কারণ প্রথম পাহাড়ে ওঠার কিছুটা ধাপে ধাপেই এখানে জল বিস্কুটের অস্থায়ী দোকান। তারপর দ্বিতীয় পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রাস্তা চলে গেছে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। আপনি ইচ্ছা করলে সারা দিনই এই পাহাড়ে ট্রেকিং করতে পারবেন। তবে বিকালের আগে অবশ্যই নেমে আসবেন। স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ধ্যের পরে লজের বাইরে বেরোতে নিষেধ করে। পাহাড়ে ওঠার সময় হনুমানদের থেকে সাবধান থাকবেন। পাহাড়ে ওঠার মুখেই সাধারণত তারা থাকে। তবে মানুষজনকে খুব বিরক্ত করে না এবং পাহাড়ের ওপরেও তাদের উৎপাত নেই বললেই চলে।

এখানের পাথরের শিল্প বিখ্যাত। বাঁকুড়ার ঘোড়ার মূর্তি তো একপ্রকার বাংলার আইকন বলা যায়। সেগুলোও এখানে পাওয়া যায়, আপনি কিনতে পারেন। শুশুনিয়া ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে

৩) দেউলটি

যদি আপনি বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী হন এবং আপনাকে বলা হয় জানুয়ারিতে ঘুরে দেখুন বাংলার পাঁচ জায়গা, তাহলে সেই তালিকায় অবশ্যই থাকবে দেউলটি। দেউলটির প্রধান আকর্ষণ হল এখানকার সামতাবেড় নামক গ্রামে বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখক কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আবাসস্থল। এছাড়াও টেরাকোটার মন্দিরও সেখানে প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। দেবতার দেউল থেকে দেউলটি স্থানের নামকরণ হয়েছিল বলে জনশ্রুতি থাকলেও সেটাই সত্যি কিনা তা অবশ্য অজানা।দেউলটির সামতা গ্রামের ইতিহাস বহু প্রাচীন।

সরকার কর্তৃক ঐতিহ্যমন্ডিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং পর্যটকদের বাড়িটি ঘুরে দেখবারও সুযোগ করে দেওয়া হয়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এখানে ১২ বছর অবস্থান করেছিলেন এবং এখানে বসেই রচনা করেছিলেন ‘দেবদাস’, ‘বৈকুণ্ঠর উইল’, ‘দেনা পাওনা’, ‘মহেশ’, ‘রামের সুমতি’-র মত কালজয়ী সব সাহিত্য। তাছাড়াও রূপনারায়ণের একটি সুবিস্তীর্ণ চেহারা এখানে দেখতে পাওয়া যাবে। চাইলে নদীর বুকে নৌকোবিহারও করা যাবে। দেউলটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান হল মদনগোপাল জিউ-এর মন্দির। আটচালা স্টাইলের এই মন্দিরটি ১৬৫১ সালে মন্ডলঘাট পরগণার জমিদার মুকুন্দ প্রসাদ রায় চৌধুরী দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটির সংস্কার করে।

আগে এখানে হোটেল সংখ্যা খুব কম ছিল। তবে দেউলটি ইতিমধ্যেই পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, ফলে এখন এখানে থাকবার জন্য হোটেল পেতে অসুবিধা হয় না। দেউলটি ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে

৪) ব্যারাকপুর

এই জানুয়ারিতে ঘুরে আসুন প্রাচীন শহর ব‍্যারাকপুর। এখানেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সেনানিবাস গড়ে ওঠে। আবার ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ শুরুও হয়েছিল এখানে। ঐতিহাসিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই ব্যারাকপুর বহু পর্যটকদের কাছে এক আকর্ষনীয় স্থান।

ব‍্যারাকপুরের দ্রষ্টব‍্য স্থানগুলো একটি টোটো ভাড়া করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখে নিতে পারেন। আবার প্রতিটি জায়গায় আলাদা ভাবে যাবার জন্যও আলাদা করে টোটো ভাড়া করতে পারেন। নিজের গাড়ি নিয়ে গেলে সবচেয়ে সুবিধা হয়। ব‍্যারাকপুরে তালপুকুর অঞ্চলে সোনার অন্নপূর্ণা মন্দির খুবই প্রাচীন একটি মন্দির। এই মন্দিরটি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে রানী রাসমণির কনিষ্ঠা কন্যা জগদম্বা দেবী তৈরী করেছিলেন। এছাড়া এই অঞ্চলের যে ঘাটে গান্ধীজির চিতাভস্ম অর্পণ করা হয়েছিল সেই ঘাটটির নাম গান্ধী ঘাট। গান্ধী ঘাটের পাশে অবস্থিত জওহরকুঞ্জ পার্ক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আরবান রিক্রিয়েশন ফরেস্ট্রি ডিভিশন দ্বারা পরিচালিত জনপ্রিয় পিকনিক স্পট।

ভারতীয় সিপাহী মঙ্গল পাণ্ডের স্মৃতিরক্ষার্থে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলে সুরেন্দ্রনাথ কলেজের পাশে রয়েছে মঙ্গল পান্ডে পার্ক। মঙ্গল পাণ্ডে পার্কের কাছে অবস্থিত বার্থোলোমিউ চার্চও একটি দর্শনীয় স্থান। অন্যান্য দর্শনীয় স্থান সমেত সমগ্র ব্যারাকপুর ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে

৫) গৌড়

এই জানুয়ারিতে ঘুরে আসতে পারেন প্রাচীন বঙ্গদেশের রাজধানী গৌড়। বহু রাজবংশের উত্থান পতনের নীরব সাক্ষী গৌড় আজ রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে আগের জৌলুশ হারিয়েছে অনেকটাই। তবুও ইতিহাসের টানে প্রতিবছরই দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর মানুষ আসেন গৌড় ভ্রমণে। শোনা যায়, একসময় গুড়ের ব্যবসার জন্য এই জনপদ ছিল বিখ্যাত আর সেই থেকেই গৌড় নামটা এসেছে। আবার পুরাণ বলে, সূর্যবংশীয় রাজা মান্ধাতার দৌহিত্র গৌড় এই অঞ্চলের অধীশ্বর ছিলেন, সেখান থেকেই এই নামকরণ।

ঐতিহ্যবাহী এই জনপদের বেশিরভাগ অংশ এখন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার অন্তর্গত, বাকি অংশ পড়েছে বাংলাদেশের রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। গৌড় ভ্রমণে বেরিয়ে প্রথমেই দেখে নেওয়া যেতে পারে পিয়াস বারি বা পিয়াজবাড়ি। পিয়াসবাড়ির কাছেই শ্রীচৈতন্যের স্মৃতিবিজড়িত রামকেলি গ্রাম। গৌড়ের সৌধগুলোর মধ্যে অন্যতম বারোদুয়ারী বা বড়সোনা মসজিদ। এছাড়াও গৌড়ের অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ দিল্লির কুতুব মিনারের আদলে তৈরি ফিরোজ মিনার। এছাড়া রয়েছে ইউসুফ শাহের তৈরি এক গম্বুজওয়ালা মসজিদ চিকা মসজিদ।

ইতিহাসের খোঁজে আসা পর্যটকেরা আশপাশে ঘুরে দেখে নিতে পারেন তাঁতিপাড়া মসজিদ, ছোটসোনা মসজিদ, লোটন মসজিদ, গুণমন্ত মসজিদ, চমকাটি মসজিদ, কোতোয়ালি দরওয়াজা। শোনা যায়, এই কোতোয়ালি দরওয়াজা দিয়েই নাকি বখতিয়ার খলজি গৌড়ে প্রবেশ করেন। গৌড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এরকম অজস্র জায়গা সমেত গৌড় ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে


সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব সংকলন

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading