খেলা

বিয়ন বর্গ

বিয়ন বর্গ (Björn Borg) একজন পৃথিবী বিখ্যাত প্রাক্তন সুইডিশ টেনিস খেলোয়াড় যিনি এগারোটি গ্র্যান্ডস্লাম খেতাব জিতেছিলেন। বিশ্বে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনিই প্রথম ৬ বার ফ্রেঞ্চ ওপেন সিঙ্গলসে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৭৭-১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিশ্বের এক নম্বর টেনিস খেলোয়াড়।

১৯৫৬ সালের ৬ জুন সুইডেনের স্টকহোমে বিয়ন বর্গের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল বিয়ন রুনে বর্গ। তাঁর বাবার নাম ছিল রুনে বর্গ এবং মায়ের নাম ছিল মার্গারেথা বর্গ । তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। তাঁর বাবা একটি টেবিল টেনিস টুর্নামেন্টের জয়ী হয়ে একটি সোনালী টেনিস র‍্যাকেট পান যেটির ওপর বিয়ন বর্গের ছোট থেকেই আকর্ষণ ছিল। পরবর্তীকালে তাঁর বাবা তাঁকে এই র‍্যাকেটটি দিয়ে দেন তাঁর টেনিস খেলোয়াড় হিসেবে জীবন শুরু করার জন্য।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার খেলোয়াড় হিসেবে বিয়ন বর্গ টেনিস খেলা শুরু করেন। ওই বয়সেই তিনি সুইডেনের সেরা জুনিয়র খেলোয়াড়দের হারিয়ে দিতেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি ইতালিয়ান ওপেন- এ জয়লাভ করেন এবং পরবর্তী বছরে অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সে তিনি ফ্রেঞ্চ ওপেন বা ফরাসি ওপেনে জয়লাভ করেন। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি ‘অরেঞ্জ বোল জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ’ (Orange bowl junior championship)- এ জয় লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি প্রথমবার ডেভিস কাপে (Davis Cup) জয়লাভ করেন। তিনি পরপর সিঙ্গলসে ১৬ টি কাপ জিতে বিল টিলডেনের (Bill Tilden) ১২ টি কাপ জয়ের রেকর্ড ভাঙেন। বর্গ মোট ৪১ টি সিঙ্গেল ম্যাচে জয়লাভ করে এবং পাঁচটি চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে যে রেকর্ড গড়েন তা তাঁর আগে কেউ করতে পারেননি। তিনি ১৬টি গ্র্যান্ড প্রিক্স সুপার সিরিজ (Grand Prix Super Series) খেতাব জয় করেন। ১৯৮০ সালে উইম্বলডন টেনিসে (Wimbledon Tennis) বিয়ন বর্গ এবং জন ম্যাকেনরোর (John McEnroe) ম্যাচটি টেনিসের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৮১ সালে তিনি ইংল্যান্ডে উইম্বলডন টেনিসে প্রথম জন্ ম্যাকেনরোর  কাছে পরাজিত হন। যদিও তিনি চারটে গ্র্যান্ডস্ল্যাম ইভেন্টের মধ্যে ইউএস ওপেন (US Open) এবং অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে (Australian Open) কখনোই জিততে পারেননি। ইউএস ওপেনে ১৯৭৬, ১৯৭৮, ১৯৮০, ১৯৮১ সালে তিনি ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত জিততে পারেননি। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র ২৬ বছর বয়সে হঠাৎই তিনি পেশাদারী টেনিস থেকে অবসর গ্রহণ করেন। যদিও ১৯৯১-১০৯৩ সালে তিনি আবার প্রত্যাবর্তন করেন কিন্তু সফল হননি।

বিয়ন বর্গ প্রধানত বেসলাইন থেকে শক্তিশালী গ্রাউন্ড স্ট্রোক খেলতেন। তিনি প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে ব্যাকহ্যান্ডে খেলতে ভালবাসতেন। এক্ষেত্রে তিনি দুই হাতই ব্যবহার করতেন যদিও ডান হাতের আধিপত্য বেশি থাকত। বেশিরভাগ সময় তিনি বলটিকে কোর্টের পিছন দিক থেকে জোরে টপস্পিনে মারতেন। তিনি খুবই ঠাণ্ডা মাথায় খেলতেন যার জন্য তাঁকে ‘Ice Man’ বলা হত। বিয়ন বর্গ খেলার সময় খুবই সিরিয়াস থাকতেন। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটা পয়েন্টে জয়ী হতে চাইতেন। ১৫ বছর বয়স থেকে তিনি কোচ হিসেবে পেয়েছিলেন লেনর্ট বার্গেলিনকে (Lennart Bergelin)। তাঁর সাফল্যের পেছনে কোচের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাগে অনুষ্ঠিত ‘Laver Cup’ প্রতিযোগিতায় তিনি ছিলেন বিজয়ী ‘টিম ইউরোপ’- এর‌ ক্যাপ্টেন। পরবর্তী বছরেও তিনি এই টিমের কোচ ছিলেন। শিকাগোতে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতাটিতে তাঁর দল পুনরায় জয়ী হয়েছিল।

শুধুমাত্র খেলার জন্য নয়, তাঁর ব্যক্তিগত স্টাইলের জন্যও তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল, হেডব্যান্ড, অসাধারণ খেলার স্টাইল, নম্র ব্যবহার এবং আকর্ষণীয় চেহারা তাঁকে ভক্তদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছিল।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিনবার বিয়ে করেন। বিয়ন বর্গ রোমানিয়ান টেনিস খেলোয়াড় মারিয়ানা সিমিওনেস্কু(Mariana Simionescu)- কে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই  বুখারেস্টে-এ বিয়ে করেন। কিন্তু ১৯৮৪ সালে তাঁদের ডিভোর্স হয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে এক সুইডিশ মডেলের গর্ভে তাঁর এক সন্তান হয় যদিও তাঁদের মধ্যে বিয়ে হয়নি। পরবর্তীকালে ১৯৮৯ সালে ইতালিয়ান গায়িকা লোরদানা বার্তে (Loredana Bertè)-কে বিয়ে করেন। এক্ষেত্রেও ১৯৯৩ সালে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তৃতীয়বার ২০০২ সালের ৮ জুন তিনি আবার বিয়ে করেন এবং ২০০৩ সালে তাঁর এক সন্তানও হয়।

খেলা থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি মঁতে কার্লোয় একটি পেন্টহাউস, নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে একটি প্রাসাদোপম বাড়ি এবং সুইডিশ উপকূলের ধারে একটি ছোট দ্বীপ কেনেন। পরবর্তীকালে তিনি ‘বিয়ন বর্গ ফ্যাশন লেভেল’-এর মালিক হন। ২০০৬ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে বনহ্যাম অকশন হাউস তাঁর উইম্বলডনের প্রত্যেকটি ট্রফি এবং তাঁর র‍্যাকেট দুটি নিলামে তুলতে চায়। কিন্তু এই ঘটনায় জন ম্যাকেনরো, আন্দ্রে আগাসি, জিমি কোনর্সসহ অনেকেই তাঁদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং নিলামে নিষেধ করেন। অবশেষে সবার অনুরোধে তিনি অকশন হাউস থেকে নিজের ট্রফি গুলো নিজেই কিনে নেন।

২০১৭ সালে ‘বর্গ ভার্সেস ম্যাকেনরো’ নামে একটি আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে Eugene Scott বিয়ন বর্গের জীবনী লেখেন। বইটির নাম ‘বিয়ন বর্গ: মাই লাইফ এন্ড গেম’ (Björn Borg: My Life and Game) ১৯৮৭ সালে আন্তর্জাতিক টেনিসে ‘হল অফ ফেম’ – এ (Hall of Fame) তাঁর নাম লিপিবদ্ধ হয়। ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮০ সালে তিনি ‘ITF’ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন। ১৯৭৬, ১৯৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮০ সালে তিনি ‘ATP player of the year’ হন।
তিনি মোট ৭৭ টি সর্বোচ্চ সিঙ্গেলস খেতাব এবং চারটি ডাবলস খেতাব পান।
১৯৭৯ তিনি বিবিসি-র থেকে‌ ‘Sports Personality of the Year Overseas Personality award’ পান।

২০০৬ সালে ১০ ডিসেম্বর মাসে তিনি ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (British broadcasting corporation) থেকে একটি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (Lifetime Achievement Award) লাভ করেন। বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় বরিস বেকার (Boris Becker) এই পুরস্কারটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ‘Dagens Nyheter’ পত্রিকার তরফ থেকে তাঁকে সুইডেনের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।