বিবিধ

এক্সিট পোল ।। বুথ ফেরত সমীক্ষা

শেষ দফা ভোট শেষ হতে না হতেই আমরা দেখি খবরের চ্যানেলগুলিতে একটাই খবর ট্রেন্ডিং হতে থাকে তা এক্সিট পোল (Exit Poll) বা বুথ ফেরত সমীক্ষা। কিন্তু কি এই এক্সিট পোল?

কোন দলের পক্ষে অধিকাংশ ভোটার তাদের ভোট দিয়েছেন তা বুঝতে ভোটদান শেষে বুথ থেকে বেরিয়ে আসা ভোটারদের ওপর করা সমীক্ষাই হল এক্সিট পোল বা বুথ ফেরত সমীক্ষা। এই এক্সিট পোলের সাথে ওপিনিয়ন পোল বা জনমত সমীক্ষার একটি প্রকৃতিগত ফারাক আছে। জনমত সমীক্ষায় কোন ভোটারকে প্রশ্ন করা হয়ে থাকে তিনি তাঁর ভোটটি কোন দলকে দিতে আগ্রহী কিন্তু এক্সিট পোল বা বুথ ফেরত সমীক্ষায় ভোটারের থেকে জানতে চাওয়া হয় তিনি আসলে ভোটটা কাকে দিলেন।

এক্সিট পোলের ইতিহাস ঘাঁটতে গেলে দেখা যায় ডাচ সমাজতত্ত্ববিদ মার্সেল ভ্যান ড্যাম এবং আমেরিকান ভোট বিশেষজ্ঞ ওয়ারেন মিটোফস্কি এই এক্সিট পোল ধারনাটির জন্মদাতা। একটি মতানুযায়ী ১৯৬৭ সালে ডাচ আইনসভার নির্বাচনে ভ্যান ড্যাম প্রথম এই সমীক্ষা শুরু করেছিলেন। আবার অপর একটি মত অনুসারে আমেরিকার কেন্টাকির স্থানীয় একটি নির্বাচনে মিটোফস্কি সিবিএস নিউজের পক্ষে ১৯৬৭ সালে প্রথম এক্সিট পোল পদ্ধতিটি প্রয়োগ করেন। ভারতেও ১৯৬৭ সালেই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক ওপিনিয়ন (Indian Institute of Public Opinion) জাতীয় নির্বাচন অধ্যয়ন ( The National Election Study ) নামে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল। তবে এক্সিট পোল বলতে যা বোঝায় সেই ব্যাপারটি প্রথম ভারতে শুরু হয় ১৯৮৪ সালে প্রণয় রায়, ডেভিড বাটলার এবং অশোক লাহিড়ীর তত্ত্বাবধানে। তাঁরা তিনজন মিলিতভাবে ‘আ কমপেনডিয়াম অফ ইন্ডিয়ান ইলেকশনস’ (A compendium of Indian Elections) নামে একটি বই লেখেন যেখানে তাঁরা এই সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল তুলে ধরেন।

এক্সিট পোল সাধারণত সংবাদ পরিবেশনার সাথে যুক্ত বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থাগুলি করে থাকে। ভারতে যে বেসরকারী সংস্থাগুলি এই সমীক্ষা করে তাদের মধ্যে টুডে’স চাণক্য (TODAY’S CHANAKYA), এবিপি-সি ভোটার (ABP-C VOTER), নিউজ-এক্স নেটা (NEWS-X NETA), রিপাবলিক জন কি বাত (Republic jan ki baat), এবিপি-সিএসডিএস (ABP-CSDS), ইন্ডিয়া টুডে অ্যাক্সিস (INDIA TODAY AXIS) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এক্সিট পোল ছাড়াও ভারতে আরও একধরণের সমীক্ষা হয়ে থাকে- পোস্ট পোল সার্ভে বা ভোট পরবর্তী সমীক্ষা। শেষ দফার ভোটের শেষ ভোট পড়ার পর থেকে শুরু করে ভোট গণনার আগের দিন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ভোটারদের ওপর সমীক্ষা করা হয় এই সমীক্ষায়। ভারতে কেবল সেন্টার ফর দ্য স্টাডিস অফ ডেভেলপিং সোসাইটিস (Centre for the Studies of Developing Societies, CSDS) এই সমীক্ষা করে থাকে।

সারা বিশ্বেই এক্সিট পোলের যথার্থতা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে কারণ কোন সংস্থাই ঠিক কি পদ্ধতিতে এই সমীক্ষা করা হয়েছে তা প্রকাশ করে না। তবু মোটামুটিভাবে যতটা জানা গেছে তা হল- লোকসভা ভোট হলে দেশের মধ্যে এবং বিধানসভা ভোট হলে যে রাজ্যের ভোট সেই রাজ্যের মোট বিধানসভা কেন্দ্র থেকে কিছু কেন্দ্র যদৃচ্ছ ভাবে (random) বেছে নেওয়া হয়। এরপর এদের মধ্য থেকে আবার বাছা হয় কিছু ভোটকেন্দ্র। এই বাছাইটা কিন্তু করা দরকার ভৌগলিক, সামাজিক এবং জনতাত্ত্বিকভাবে। ভোটকেন্দ্র বাছাইয়ের পর এবার ২৫০০০- ৮০০০০০ ভোটারের ওপর সমীক্ষা করা হয় যেটাকে নমুনা (sample) হিসেবে ধরা হয়। এবার ভোটকেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে ভোটাররা বেরিয়ে আসার সময় তাঁদের জিজ্ঞেস করা হয় তাঁরা কাকে ভোট দিলেন। তবে সবাইকেই কিন্তু এই প্রশ্ন করা যাবে না। একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন মেনে, যেমন প্রত্যেক দশম ভোটারকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে হবে কিন্তু এর মাঝে অন্য কোন ভোটার যদি নিজে থেকেই এগিয়ে আসে বলার জন্য তাঁকে অগ্রাহ্য করতে হবে।

এক্সিট পোলের মূল সমস্যাই হল পরিচালনাকারী সংস্থা যদি নিজেই পক্ষপাতদুষ্ট হয় সেক্ষেত্রে এক্সিট পোলের কোন গুরুত্ব থাকে না। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের সমীক্ষা প্রশ্নের ধরন, ভাষা এবং ঠিক কোন সময়ে প্রশ্নটি করা হচ্ছে, তার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রায়শই অভিযোগ করতে দেখা যায় অনেক এক্সিট পোলই উদ্দেশ্যমূলক এবং বিরোধী দলের দ্বারা স্পনসর্ড। যেখানে এক্সিট পোলের আসল উদ্দেশ্য জনসাধারণের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির একটি সামগ্রিক ধারনা দেওয়া সেখানে পক্ষপাতদুষ্ট সমীক্ষার ফলে নির্দিষ্ট কোনও নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দের ওপর এ ধরনের পোল কুপ্রভাব ফেলতে পারে।

এক্সিট পোলের এই ধরণের প্রবণতার দিকটি মাথায় রেখেই ভারতীয় নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওপিনিয়ন পোল এবং এক্সিট পোলের ওপর নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে ২০০৪ সালে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে সংশোধনীর প্রস্তাব আনে আইন মন্ত্রকের কাছে। কমিশনের সঙ্গে এই বিষয়ে সহমত ছিল ৬টি জাতীয় দল এবং ১৮টি রাজ্যভিত্তিক দল। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রস্তাব আংশিকভাবে গৃহীত হয়। জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে ১২৬ (ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে কেবলমাত্র এক্সিট পোলের ওপর বিধিনিষেধ জারি করা হয়। এই ধারায় বলা হয় প্রথম দফার ভোটগ্রহণ থেকে শেষ দফার শেষ ভোটগ্রহণ অবধি ভোটের ফল সম্পর্কিত কোন এক্সিট পোল সংক্রান্ত প্রোগ্রাম বা নিবন্ধ সম্প্রচার ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট কোন মিডিয়াই প্রকাশ করতে পারবে না। এমনকি জ্যোতিষ, ট্যারট কার্ড রিডিং বা রাজনৈতিক বিশ্লেষক কেউই এ ধরনের পূর্বানুমান করতে পারবেন না।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন