বসন্তের সূচনা কাল অর্থাৎ ফাল্গুন মাসে সারা ভারতে পালিত হয় একটি বিপুল জনপ্রিয় উৎসব, যার নাম ‘হোলি‘। পশ্চিমবঙ্গে ‘দোলযাত্রা’ বা ‘বসন্তোৎসব’ নামে উদযাপিত হলেও বাংলাদেশ, বিহার ও ঝাড়খন্ডে এই উৎসব ‘ ফাগুয়া উৎসব ‘ (fagua) নামেই বেশি পরিচিত। সাধারণত চা-বাগানের শ্রমিক ও আদিবাসী মানুষদের মধ্যেই এই উৎসবটি বেশি জনপ্রিয় ।
দোলযাত্রার মতোই এই ফাগুয়া উৎসবও পালিত হয় ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার দিনে যা ‘দোলপূর্ণিমা’ নামে পরিচিত। ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় করে এই উৎসবের তারিখ পড়ে। ফাগুয়া , দোল বা হোলি—যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই উৎসবের পিছনে আছে দানবরাজ হিরণ্যকশিপু ও তাঁর ছোট ছেলে প্রহ্লাদের কথা। দৈত্যদের রাজা হিরণ্যকশিপু ছিলেন ভীষণ অত্যাচারী। তাঁর বড় ভাই হিরণ্যাক্ষও ছিলেন তাঁরই মত নিষ্ঠুর। ভগবান বিষ্ণু এই রাক্ষস হিরণ্যাক্ষকে বধ করেছিলেন।হিরণ্যকশিপু জানতেন যে তাঁরও মৃত্যু হবে ভগবান বিষ্ণুর হাতে। তাই তিনি বিষ্ণুকে তাঁর শত্রু বলে মনে করতেন। রাজা হওয়ার পর তিনি তাঁর রাজ্যে বিষ্ণুর পূজা নিষিদ্ধ করেন এবং ঘোষণা করলেন, যাঁরা তাঁর আদেশ না মেনে লুকিয়ে বিষ্ণুর পূজা করবে তাঁদের সবাইকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। এই আদেশের ফলে সারা রাজ্যে বন্ধ হয়ে গেল বিষ্ণুর পূজা।
কিন্তু হিরণ্যকশিপুর ছোট ছেলে প্রহ্লাদ ছিল একজন পরম বিষ্ণুভক্ত। বাবার আদেশ না মেনেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে বিষ্ণুর পূজা করত। একদিন তার বিষ্ণু পূজার দৃশ্য হিরণ্যকশিপুর চোখে পড়ে যায়। তিনি প্রহ্লাদকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যেন সে বিষ্ণুর পূজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রহ্লাদ বাবার কোন কথাই কানে তোলে না। সে বলে যে কিছুতেই সে তার হরিকে ত্যাগ করতে পারবে না। ছেলের অবাধ্যতা দেখে রাগে জ্বলে ওঠেন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু। তাঁর আদেশে সৈন্যরা প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য উঁচু পর্বতের উপর থেকে ফেলে দেয়। কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদের কোন ক্ষতি হলনা।
এরপর হিরণ্যকশিপু বারবার চেষ্টা করেন প্রহ্লাদকে মেরে ফেলতে। কখনও তাকে ক্ষ্যাপা হাতির সামনে ছেড়ে দেন, আবার কখনও বিষধর সাপ ভর্তি গুহায় প্রহ্লাদকে বন্দি করে রাখেন। কিন্তু প্রহ্লাদ তার ইষ্টদেব ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় সব সময়েই বিপদ থেকে বেঁচে যায়। এভাবে তাঁর পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে দেখে দেখে চিন্তায় পড়ে যান রাজা হিরণ্যকশিপু। তখন তাঁর মনে পরে রাক্ষসী হোলিকার কথা। হোলিকা ছিল হিরণ্যকশিপুর বোন। সে ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিল যে আগুন তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
হিরণ্যকশিপু হোলিকাকে ডেকে পাঠান। সে এসে দাদাকে প্রণাম করে এবং তাকে হঠাৎ ডেকে পাঠানোর কারণ জিজ্ঞাসা করে। হিরণ্যকশিপু তখন তাকে প্রহ্লাদের কথা বলে জানান যে নিজের ছেলে হয়েও প্রহ্লাদ তাঁর শত্রু। আর তাই তিনি প্রহ্লাদকে মেরে ফেলতে চান। সব শুনে হোলিকা বলে যে সে প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করবে। ব্রহ্মার বরের কারণে তার কোনো ক্ষতি হবে না, কিন্তু প্রহ্লাদ নিশ্চয়ই আগুনে পুড়ে মারা যাবে।
হিরণ্যকশিপু এই প্রস্তাবে রাজি হন। তাঁর আদেশে সৈন্যরা এক বিশাল অগ্নিকুন্ড তৈরি করে। প্রহ্লাদকেও তার ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। তারপর হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে তুলে নিয়ে সেই বিশাল আগুনে প্রবেশ করে। কিন্তু হোলিকা ব্রহ্মার বরের আসল মানে ভুলে গিয়েছিল। ব্রহ্মা প্রকৃতপক্ষে তাকে এই বর দিয়েছিলেন যে, কোন অগ্নিকুন্ডে হোলিকা যদি একা প্রবেশ করে তবেই তার কোন ক্ষতি হবেনা। তার সাথে যদি অন্য কেউ সেই আগুনে ঢোকে, তবে হোলিকা পুড়ে মারা যাবে। প্রহ্লাদকে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই সেই আগুন হোলিকাকে পোড়াতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এবারও ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদে বেঁচে যায় প্রহ্লাদ।
সেই দিনটি ছিল ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথির আগের দিন। পরের দিন অর্থাৎ পূর্ণিমার দিন, হোলিকা রাক্ষসীর মৃত্যুর খবর সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। অশুভ শক্তির বিনাশ হওয়ায় সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎসব। রাজ্যবাসীরা একে অপরকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকে। হোলিকা রাক্ষসীর নাম অনুসারেই এই উৎসবের নাম হয় ‘হোলি’। এইভাবেই প্রচলিত হয় ‘হোলি’ উৎসব।
আবার বৈষ্ণবদের মত অনুযায়ী, ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার দিন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে রাধিকা ও অন্যান্য গোপিনীদের সঙ্গে বিভিন্ন রং নিয়ে প্রথম দোলযাত্রা উৎসব পালন করেছিলেন। সেই থেকেই এই উৎসবের আরম্ভ বলে মনে করেন বৈষ্ণবরা।
বিহার, ঝাড়খন্ড ও বাংলাদেশে ফাগুয়া উৎসব তিনদিন ধরে পালিত হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে থেকেই সব বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয়। বাড়ির দেওয়ালে আঁকা হয় বিভিন্ন রঙের আলপনা। ছোট ছেলেমেয়েরাও বিভিন্ন রং ও আবির জোগাড় করতে শুরু করে। আর শুরু হয় নাচের মহড়া। নাচে-গানে পারদর্শী নারী ও পুরুষদের নিয়ে ছোট ছোট নাচের দল তৈরি করা হয়। এইসময় তিনদিন ধরে চা-বাগানগুলি বন্ধ থাকে। চা-বাগানের মালিকরাও এই উৎসবের জন্য শ্রমিকদের ভাতা দিয়ে থাকেন। উৎসবের দিন চা-শ্রমিকরা তাঁদের নাচের দলের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ও অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাচ দেখিয়ে বেড়ান। নাচের পারিশ্রমিক হিসেবে তাঁদের টাকাপয়সা ও আরও নানা জিনিস দেওয়া হয়। তাঁরা বিভিন্ন রংবেরঙের পোশাক পরে কেউ কেউ রাধা ও কৃষ্ণ সাজে, কেউ সাজে গোপিনী বা রাধাকৃষ্ণের সখী। নাচের সঙ্গে বাংলা গান ও লোকগীতি ছাড়াও গাওয়া হয় বিভিন্ন আধুনিক গানও। এই নাচগুলি অনেক রকমের হয়। এদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল লাঠি নাচ। এক একটি চা-বাগান থেকে দুটি বা তিনটি এরকম লাঠি নাচের দল তৈরি হয়। ঝাড়খন্ডে এই নাচকে উৎসবের নামে নামকরণ করা হয়েছে ‘ফাগুয়া নাচ’ বলে। সেখানকার অধিবাসীরা রঙিন কুর্তা ও পাজামা পরে, কোমরে একটি কাপড়ের টুকরো বাঁধে ও মাথায় রঙিন পাগড়ি পরে এই নাচে যোগ দেয়। বাজনা হিসেবে থাকে ঢাক, ঢোল, নাগাড়া, মন্দার, বাঁশি প্রভৃতি লৌকিক বাদ্যযন্ত্র। লোকগানের তালে তালে তার সঙ্গেই চলে রং ও আবির খেলা। ছোটরা বড়দের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করে। বড়রাও উপহার দেন ছোটদের। প্রত্যেকের ঘরে তৈরি হয় বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার। বিবাহিত মেয়েরাও এই সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়ি ফিরে আসে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান