ইতিহাস

হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি

হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি (Harendra Coomer Mookerjee) একজন খ্যাতনামা বাঙালি রাজনীতিবিদ ছিলেন । অবশ্য কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই নয়, তিনি একজন অধ্যাপক এবং শিক্ষাসংস্কারকও বটে। এইচ. সি মুখার্জি (H.C. Mukherjee) নামেও তিনি পরিচিত। ভারতীয় সংবিধান তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর। পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত তৃতীয় রাজ্যপাল হয়েছিলেন হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি। সর্বোপরি তাঁর মতো দানশীল মানুষ খুবই দুর্লভ। দুর্ভাগ্যজনক ব্যপার হল বর্তমানকালে এই ব্যক্তিত্ত্ব কেবল কিছু সরকারী নথিপত্রের মধ্যেই আবদ্ধ রয়ে গেছেন। অধিকাংশ মানুষই বিস্মৃত হয়েছেন এই শিক্ষাব্রতী এবং ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসের একজন উল্লেখযোগ্য মানুষ হরেন্দ্র কুমার মুখার্জিকে।

অবিভক্ত বঙ্গদেশে ১৮৭৭ সালের ৩ অক্টোবর এক বাঙালি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি। তাঁর পিতা ছিলেন লালচাঁদ মুখার্জি এবং মাতা প্রসন্নময়ী মুখার্জি। বিখ্যাত শরৎচন্দ্র পন্ডিত, যিনি ‘দাদাঠাকুর’ নামেই মানুষের কাছে সমধিক পরিচিত ছিলেন, তিনি হরেন্দ্র কুমার মুখার্জির একজন ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন। যখন তিনি রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন তখন মাঝেমধ্যেই এই দাদাঠাকুরকে রাজভবনে বিনা বাধায় প্রবেশ করতে দেখা যেত। তাঁদের সম্পর্কে এতটাই নৈকট্য ছিল যে দাদাঠাকুরের অনবদ্য রসিকতাগুলিকেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি খুব খোলা মনে বন্ধুর মতোই গ্রহণ করতেন।

হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি এম.এ, পিএইচডি, এবং ডি.লিট অর্জন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম ভারতীয় হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন । তিনি ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি একজন মানবহিতৈষী এবং ছাত্রদরদী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন।

১৮৯৮ সাল থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত, দীর্ঘ এই পনেরো-ষোলো বছর হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি কলকাতার সিটি কলেজের ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনা করেছিলেন। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন পদে নিযুক্ত থেকে একজন দক্ষ এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষাব্রতীর মতোই দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কখনও কোনো বিভাগের সেক্রেটারি, কখনও যুক্ত থেকেছেন কলা বিভাগের স্নাতকোত্তর পঠনপাঠন পরিষদের সঙ্গে, আবার কখনও কলেজ পরিদর্শকের দায়িত্বও পালন করেছেন অসামান্য দক্ষতায়। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কার্যনির্বাহ করেছিলেন।

অধ্যাপক থাকাকালীন তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রথমে তিন লক্ষ এবং পরবর্তীতে আরও এক লক্ষ টাকা দান করেছিলেন। এছাড়াও প্রয়োজনীয় শিক্ষার পথ বাধামুক্ত করবার কথা তিনি যে ভীষণই গুরুত্ব সহকারে চিন্তা করতেন তা বোঝা যায় যখন দেখা যায় নিজের বাবা এবং মায়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বৃত্তির ব্যবস্থা করে দেন ছাত্রছাত্রীদের জন্য। বৃত্তিগুলি যথাক্রমে ‘লালচাঁদ মুখার্জি বৃত্তি’ এবং ‘প্রসন্নময়ী মুখার্জি বৃত্তি’ নামে পরিচিত৷ এই বৃত্তির তহবিলে প্রথমে দুই লক্ষ এবং পরে আরও পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেছিলেন। শ্রীমতী প্রসন্নময়ী মুখার্জি বৃত্তি সাধারণত বাণিজ্য এবং ব্যবসা পরিচালন বিভাগের ছাত্রদের জন্যই গড়ে উঠেছিল। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিসাধনের ভাবনা এর পিছনে কাজ করেছিল নিশ্চয়ই। লালচাঁদ মুখার্জি বৃত্তি মূলত তথ্য ও প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, আইন এবং সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদের প্রদান করা হয়ে থাকে। এছাড়াও মেয়েদের পরিষেবাকারিণী বা নার্সিং প্রশিক্ষণের জন্য বঙ্গবালা মুখার্জি বৃত্তির ব্যবস্থা করেন তিনি। এই বৃত্তিগুলি ছাত্রছাত্রীদের বিদেশে পড়াশুনা করতে সাহায্য করে।

তিনি বাঙালি খ্রীশ্চানদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন এবং তাদের জন্য কাজ করেছেন আজীবন। কলেজ পরিদর্শক থাকাকালীন খ্রীশ্চান যুবকদের শিক্ষায় কোনো অসুবিধা তৈরি হচ্ছে কিনা সেসবের দিকেও সজাগ দৃষ্টি ছিল তাঁর। এমনকি সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশের পর তিনি সর্বভারতীয় খ্রীশ্চান পরিষদের (All India Council of Indian Christians) সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। আসলে ধর্ম যে কখনও শিক্ষা বা সাধারণ অধিকারের বাধা হতে পারে না, এই বিশ্বাস তাঁর ছিল। হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’ এবং ‘বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’তেও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

যে কারণে হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি ভারতের ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে থাকবে তা হল সংবিধানের খসড়া রচনার জন্য গণপরিষদের সহ-সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি সংবিধান সভার প্রাদেশিক সংবিধান কমিটি এবং সংখ্যালঘু অধিকার উপ-কমিটির চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সংখ্যালঘুদের জন্য আওয়াজ তুলেছিলেন হরেন্দ্র কুমার। সংখ্যালঘুদের উত্থানের জন্য প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রে এমনকি রাজনীতির ক্ষেত্রেও তাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থার কথা বলেছিলেন তিনি৷ ভারত বিভাগের পর এই সিদ্ধান্তটি পরিবর্তন করে তিনি সংখ্যালঘুদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন। এই সিদ্ধান্তকেই পরবর্তীকালে সংখ্যালঘুদের দ্বারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সপক্ষে ব্যাখা করা হয়েছিল।

১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ ভেঙে যাওয়ার পর ১৯৫১ সালের ১ নভেম্বর তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন৷ তিনি পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় রাজ্যপাল এবং তিনিই প্রথম কোনো বাঙালি যিনি রাজ্যপাল হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালের ৭ অগাস্ট মৃত্যু পর্যন্ত তিনি এই পদ অলঙ্কৃত করেছেন৷ রাজ্যপালদের তালিকায় এখনও পর্যন্ত হরেন্দ্র কুমার মুখার্জিই এক ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি একজন পূর্ণ সময়ের বাঙালি রাজ্যপাল ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর আরেক বাঙালি ফণীভূষণ চক্রবর্তী মাত্র তিনমাস রাজ্যপাল ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারী ইডেন গার্ডেনসে ভারত সরকার প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করেছিল৷ তখন রাজ্যপাল হিসেবে হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি সেই উৎসবের প্রধান বক্তা এবং উদ্বোধক ছিলেন।

হরেন্দ্র কুমার সারা জীবন প্রভূত দানধ্যান করেছেন। দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নিজের কাছে রাখতেন৷ যা উপার্জন করেছেন তার প্রায় সবটুকুই দান করে দিয়েছেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর সারাজীবনের সঞ্চয় ১৭ লক্ষ টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন প্রিয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে। তাঁর জীবন নিয়ে পদ্মিনী সেনগুপ্ত ‘হরেন্দ্র কুমার মুখার্জি’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
১৯৫৬ সালের ৭ আগস্ট এই শিক্ষাসংস্কারক এবং উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদ ও পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় রাজ্যপাল হরেন্দ্র কুমার মুখার্জির মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।