ইতিহাস

চিনির ইতিবৃত্ত

আজকের ব্যস্ত পৃথিবীতে মানুষের রসনা নিবারণের জন্য যত রকমের খাদ্য প্রস্তুত করা হয় তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চিনি দ্বারা সমৃদ্ধ। অথচ চিনির মূল আধার ইক্ষুর সমন্ধে আমরা কতটুকু জানি? আমরা কি জানি ইক্ষু আবাদে এ উপ-মহাদেশের অধিবাসীদের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে? খ্রিস্টপূর্বে যষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত এশিয়া মহাদেশের বাহিরের বাসিন্দারা মধুকেই একমাত্র মিষ্টির আধার বলে জানত। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব এক হাজার বছর পূর্ব হতেই এ মহাদেশের অধিবাসীরা চিনি এবং চিনির আধার ইক্ষুর সঙ্গে পরিচিত ছিল।

আখ বা ইক্ষু (বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum officinarum) পোয়াসি পরিবারের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ। এর রস চিনি ও গুড় তৈরির জন্য ব্যবহার হয় বলে এর চাষ করা হয়। আখ শব্দের উৎপত্তি “ইক্ষু” থেকে। আখ হচ্ছে বাঁশ ও ঘাসের জাতভাই। বঙ্গদেশে এর যে প্রজাতি চাষ হয় তার বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum officinarum।

ভুট্টা, গম ও ধান— তথা প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর মতো আখও একটি ঘাসজাতীয় ফসল। এমনকি ফসল তিনটির মতো এটিও ঘাসজাতীয় শস্যের পোয়াচাই (Poaceae) গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। আখের জনপ্রিয়তা ও ব্যবহার উপযোগিতার পেছনে এর স্বতন্ত্র উপাদান সুক্রোসেরই ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। মানুষ সুক্রোসের বহুমুখী ব্যবহার শিখে নেয়াই মূলত বিশ্বব্যাপী আখের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। এর উপস্থিতির কারণেই আখের স্বাদ এতটা মিষ্টি। আবার এটি থেকে ইথানলও প্রস্তুত হয়।

ইক্ষুর আদি নিবাস নিউগিনি। বলা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৬ হাজার বছর আগেও ইক্ষু নামক বস্তুটি আদিম অধিবাসীদের নিকট অপরিচিত ছিল না। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ বছর আগে অন্নের অন্বেষণে মানুষের সঙ্গে সঙ্গে ইক্ষুও অভিভাসিত হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারতে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বদিকে। সুদূর আফ্রিকা থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ইক্ষু ভারত আর পারস্য-উপ-সাগরীয় এলাকায় কিভাবে প্রবেশ করল তা গবেষকদের গবেষণার বিষয়। কিন্তু এ উপমহাদেশের বাসিন্দাদের নিকট খ্রিস্টপূর্ব পাঁচ হাজার বছর পূর্বেও যে চিনি নামক বস্তুটি অজানা ছিল না তা’ কিন্তু অজ্ঞাত নয়। তবে সে চিনি যে আজকের আধুনিক চিনি নয়- তা’ বলাইবাহুল্য। শুধু কি তাই- এ উপমহাদেশেই ইক্ষু রস থেকে চিনির আদিরূপ রূপান্তরের প্রক্রিয়া আবিষ্কৃত হয়। অর্থাৎ আধুনিক বয়লিং হাউসের প্রাচীনতম সংস্করণ আর কি। ভারতে চিনির আদিরূপ ছিল আজকের র-সুগার, ব্রাউন সুগার, গুড় ইত্যাদি। ভারতীয় উপমহাদেশের ইক্ষুতথ্য জানা যায় অথর্ব বেদ থেকে। খ্রিস্টপূর্ব  ১৫০০-৮০০ সালে রচিত এ গ্রন্থে ইক্ষুকে মিষ্টি আকর্ষণকারী প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ‘‘ইক্ষু’’ নামটি কিন্তু তখন থেকেই প্রচারিত। সুশ্রুত সংহিতাতেও বারো প্রজাতির ইক্ষুর উল্লেখ আছে। আজকের সুগার কথাটির উৎপত্তি সম্ভবতঃ সংস্কৃত ‘‘শর্করা’’ থেকে। চীনে ইক্ষুর আবির্ভাব ঘটে ধর্ম আর ব্যবসার সংমিশ্রণে। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে ভারত সম্রাট হর্ষ এবং চীনা সম্রাট ‘‘তেইজং’’-এর সময় এ উপমহাদেশে বৌদ্ধদের মহাবোধী মন্দিরের ধর্মগুরুদের নেতৃত্বে দুইজন দক্ষ আখচাষীও চীনের বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শনে যান। ধর্ম কর্মের পাশাপাশি আখচাষীরা চীনাদের ইক্ষু ও চিনি উৎপাদনে যথাযথ প্রশিক্ষণদান করে চীনে ইক্ষুর বিস্তৃতি ঘটাতে সাহায্যে করেন।

ভাষা তাত্ত্বিকদের মতে সংস্কৃত ‘শর্করা’ থেকে আরবিতে ‘শক্কর’ এবং ঐ থেকেই ইংরেজিতে ‘Sugar’। ইংরেজি candy শব্দটিও সংস্কৃত ‘শর্করা খণ্ড’ থেকে সৃষ্ট।

কেউ কেউ বলেন যে বর্তমানের সাদা চিনি, চীন থেকেই এসেছে এবং সেই জন্যেই নাম চিনি। তাদের মতে, ঘন আখের রস থেকে ‘কেলাসকার’ (Crystal) এর পরিশোধন করে সাদা চিনিতে পরিণত করার প্রথা চীন থেকেই ভারতে আসে। অন্যদের মতে, চীনেমাটির মত সাদা দেখতে বলে এর নাম হয় চিনি এবং এটা পুরোপুরি ভারতীয় আবিষ্কার। চিনির সাথে চীনের যোগ থাকলেও মিছরি কিন্তু পুরোপুরি দেশজ। এর সাথে মিশরের কোন সম্পর্ক নেই।

বিশ্বে আখ চাষের ইতিহাস চার হাজার বছরেরও বেশি সময়ের পুরনো। এশিয়ার ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় ফসলটির চাষ শুরু হলেও, ঠিক কোন জায়গা থেকে এটি ছড়িয়ে গিয়েছিল, তার কোনো হদিস পাওয়া যায় না। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ফসলটির উৎপত্তি। এ অঞ্চলে প্রায় চার হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে ঘাসজাতীয় ফসলটির উপস্থিতি ছিল বলে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদের মধ্যে আবার কারো কারো ধারণা, প্রকৃতপক্ষে এখানে আখের উপস্থিতি আরো প্রাচীন। তবে গোটা উপমহাদেশে ফসলটির ব্যাপক চাষাবাদ ছড়িয়ে পড়ে আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। ওই সময়ের মধ্যেই উপমহাদেশীয় কৃষকরা আখ থেকে চিনি উৎপাদনের কলাকৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

কিছু গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে চিনির আবিষ্কার আর ব্যবহার ভারতেই প্রথম। আখের চাষ ভারতে প্রায় ইতিহাসের গোড়া থেকেই। তাই সভ্যজগতে চিনির প্রচলন ভারত থেকেই শুরু হয় বলে গবেষক ও ঐতিহাসিকদের একাংশ মনে করেন।

চিনির আগে মধুই ছিল একমাত্র মিষ্টি। কেক, মিষ্টি, বিভন্ন খাবার ইত্যাদিতে মিষ্টত্বের জন্য মধুই ব্যবহার করা হত।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন সাহিত্যে আখ ও আখের ব্যবহারের বর্ণনা পাওয়া যায়। এমনকি ভারতবর্ষ পরিভ্রমণে আসা প্রাচীন পরিব্রাজকদের বর্ণনাতেও আখকে এখানকার অন্যতম প্রধান ফসল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পুরাণেও আখের ব্যবহার সম্পর্কে বলা রয়েছে। বলা হয়, মহাদেব শিবের ধ্যানভঙ্গের উদ্দেশ্যে কামদেব ইক্ষুদণ্ড নির্মিত ধনুকে শরযোজনা করেছিলেন। প্রাচীন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ (খ্রিস্টপূর্ব ২০০-৩০০ সালে রচিত), ‘সুশ্রুত সংহিতা’ (চরক সংহিতার সমসাময়িক গ্রন্থ) ও ভবপ্রকাশ নির্ঘণ্টতেও আখের ভেষজগুণের বর্ণনা রয়েছে। এমনকি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক কালের (৫৬০ খ্রিস্টপূর্ব) রচনাতেও আখের রস থেকে গুড় বানানো ছাড়াও মদিরা প্রস্তুতের বিবরণ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময়ও কোনো ধরনের মৌমাছির সহায়তা ছাড়াই বৃক্ষকাণ্ড চিবিয়ে মধুপানের বিষয়টি হানাদার গ্রিকদের বেশ অবাক করেছিল। আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের বিবরণে “Honey Reed”এর কথা বোধহয় আখ প্রসঙ্গে। তিনিও নাকি দেশে ফেরতকালে ইক্ষু নিতে ভুল করেননি।

লিখিত ইতিহাসে শর্করার কথা গুপ্ত যুগে পাওয়া যায়। কিন্তু সে শর্করা, চিনি, না গুড়, না brown sugar সে কথা জানা যায় না। হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে চীনের সঙ্গে ভাব সম্পর্ক একটু ঘনিষ্ঠ হয় বৌদ্ধ ধর্মের মাধ্যমে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সেই সময় চীনে শর্করার প্রচলন এবং দক্ষিণ চীনে আখ চাষের প্রবর্তন। ৬৪৭ খ্রিস্টাব্দে চীনের সম্রাট চু’ৎসাই হাং বিহারে চিনি প্রস্তুতের কৌশল শেখার জন্য এক প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন বলেও উল্লেখ রয়েছে ইতিহাসে।

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাংয়ের ভ্রমণ বিবরণেও ভারতবর্ষে আখ উৎপাদনের বর্ণনা পাওয়া যায়। চীনা রাষ্ট্রদূত চু’ৎ-সা-ইয়ের (১২১৮ খ্রিস্টাব্দ) ভ্রমণ বিবরণে আখ থেকে গুড় ও চিনি উৎপাদনের উল্লেখ পাওয়া যায়। আফ্রিকান পর্যটক ইবনে বতুতার বাংলা ভ্রমণ অভিজ্ঞতাতেও এর বর্ণনা রয়েছে।

মধ্যযুগে আরব ব্যবসায়ীদের কাছে চিনি, ‘মিষ্টি নুন’ বা “Sweet salt” নামে পরিচিত ছিল। ক্রুসেডারদের বিবরণেও এই নামের উল্লেখ দেখা যায়। আরবরা ভারত থেকেই এই “Sweet salt”, রোমে আর কনস্ট্যানটিপোলের বাজারে আনত। ঢাকাই মসলিনের মতই খুব চাহিদা ছিল চিনির।

খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারসিকরাও চিনির দানার সঙ্গে পরিচিত ছিল। তবে এটা তাঁরা সংগ্রহ করত সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চল থেকে। জানা যায় খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রহীক ঐতিহাসিক ‘হিরোডোটার্স’ ও ইক্ষু সম্বন্ধে জ্ঞাত ছিলেন। ইক্ষুর বিশ্বভ্রমণে এর পরের অবদান মুসলমানদের। ৬০০-১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইক্ষু মেডিটেরিয়ান এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দেশ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা ইক্ষুকে পৌঁছে দেয় উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত। ৭১৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইক্ষুর আবাদ ছড়িয়ে পড়ে মিসর, সিরিয়া, সাইপ্রাস, ক্রীট এবং স্পেন অবধি। দশম শতকে মেসোপটামিয়ার এমন কোনো গ্রাম ছিল না যেখানে ইক্ষু আবাদ হত না। এর পরের ইতিহাস ইউরোপীয় বণিকদের। ১৪২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে পর্তুগীজ কর্তৃক ইক্ষু তাড়িত হয় ম্যাডেইরা পর্যন্ত। সেখান থেকে ইক্ষু অগ্রসর হয় ক্যানোরী দ্বীপপুঞ্জে, অ্যাজোর এবং দক্ষিণ আফ্রিকায়।

উপমহাদেশে মুসলিম আগমনের পর আখের চাষ ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্যের উর্বর ভূমিগুলোতেও। খ্রিস্টীয় ১১ শতকের দিকে এসে দেখা গেল, ইউরোপের মোটামুটি সবগুলো দেশই আখ আমদানি করছে। অন্যদিকে আমেরিকা মহাদেশে ফসলটিকে পরিচিত করানোর কৃতিত্ব সম্পূর্ণই ক্রিস্টোফার কলম্বাসের। আটলান্টিক পেরিয়ে ইউরোপ থেকে নিউ ওয়ার্ল্ডে তিনিই প্রথম ফসলটি নিয়ে যান। সেটা ১৫ শতকের কথা। ষোড়শ শতকের শুরুতে মেক্সিকোয় স্থাপিত হয় আমেরিকা মহাদেশের প্রথম চিনিকল। ওই সময় গুজব রটে, রানী এলিজাবেথের নাকি চিনি ছাড়া একেবারেই চলে না। ফলশ্রুতিতে ইউরোপে চিনির ব্যবহার শুরু হয় সম্পদ ও বিলাসিতার পণ্য হিসেবে।

কিন্তু পরবর্তী সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী চিনির ব্যবহার বাড়তে থাকে। যদিও সে সময় পণ্যটির দাম ছিল এখনকার চেয়েও বেশি। এমনকি ১৯ শতকের শুরুতেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দামি একটি পণ্য হিসেবে কদর ছিল চিনির। প্রকৃতপক্ষে কয়েক শতক আগে গৃহস্থালিতে এখনকার মতো নিত্যপণ্য হিসেবে চিনি ব্যবহার করার কথা ভাবতে গেলে, সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটিকেও আঁতকে উঠতে হতো।

সে সময় বিশ্বব্যাপী চিনির কদর ছিল বিলাসপণ্য হিসেবে। পরবর্তীতে ফসলটির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্যাপী দৈনন্দিন জীবনে চিনির ব্যবহারও বাড়তে থাকে। যদিও পণ্যটির দাম ছিল অনেক বেশি। আমেরিকা মহাদেশ বা নিউ ওয়ার্ল্ড আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত রীতিমতো চিনির ক্ষুধায় ভুগছিল ইউরোপীয়রা। সে সময় পণ্যটি এতটাই দামি ছিল যে, মধ্যযুগের ইউরোপীয় ধনীরা বছরে গড়ে এক চামচ করে চিনি খাওয়ার সুযোগ পেতেন। এই পণ্যটি এতটাই দামি ছিল যে, ক্যাস্টিলের রানী ইসাবেলা একবার ক্রিসমাসে নিজ কন্যাকে সবচেয়ে দামি উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আর এর জন্য উপহার হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ছোট এক বাক্স চিনি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইক্ষুর রস অনেক সময় অনেক কারণে, অনেক দেশ বা জাতির জন্য তেতো হয়েছে। ইউরোপীয় বণিকদের ইক্ষু আবাদ, চিনির ব্যবসা আর দাস ব্যবসা বিস্তার আমেরিকার ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। মার্কোপোলোর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, ভেনিস একদা ইউরোপে একচেটিয়া চিনির ব্যবসা করত। কিন্তু ১৪৯৮ সালে ভাস্কো-ডা-গামার ভারত আগমন এবং ব্যবসা বৃদ্ধিতে সেটি খর্ব হয়ে যায়।

ক্যারিবিয়ানে আখ চাষ, বিশ্বের ইতিহাসের রক্তাক্ত ও কালো এক অধ্যায় রূপে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।

উত্তর আমেরিকায় আখ চাষের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের ঘৃণ্যতম এক অধ্যায়ের গল্প। এখানকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ দ্বীপপুঞ্জের আবহাওয়া, জলবায়ু, পরিবেশ ও ভূমি আখ চাষের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। লোভী ঔপনিবেশিকরা বিষয়টি বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে আখ উৎপাদনে। প্রয়োজন পড়ে প্রচুর শ্রমিকের। এ চাহিদা মেটানোর জন্য ঔপনিবেশিকরা দ্বারস্থ হয় দাসপ্রথার দিকে।

ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আখ চাষের ইতিহাসের কথা ভাবলেই এখন সবার আগে মাথায় আসে দাসপ্রথার কথা। ক্যারিবিয়ানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৪০ লাখ দাস ধরে আনা হয়েছিল। এদের প্রায় সবারই শেষ ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়েছিল সুগার প্ল্যান্টেশন। তারও আগে ক্যারিবিয়ানের স্থানীয় আদিবাসীদের কয়েকটি গোত্রকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল দাসপ্রথা। দিন-রাত খাটুনি আর ঔপনিবেশিকদের নির্যাতন সইতে না পেরে কত মানুষ সে সময় মারা গিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায় জ্যামাইকার কথা। দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আখ চাষ। স্প্যানিশ সেটেলাররা এখানে প্রথম পা রেখেছিল ১৫১০ সালে। শিগগিরই দ্বীপটিতে আখ চাষ শুরু করল তাঁরা। আদিবাসী আরাওয়াকদের বন্দি করে দাস হিসেবে আখের প্ল্যান্টেশনে খাটাত ঔপনিবেশিকরা। ১৬ শতকের শেষ নাগাদ গোটা আরাওয়াক নৃগোষ্ঠী ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায়। আখের ক্ষেতে অমানুষিক শ্রম, নির্যাতন এবং ইউরোপীয়দের সঙ্গে করে বয়ে আনা রোগজীবাণুর আক্রমণে টিকতে না পেরে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় জাতিগোষ্ঠীটি। এরপর শ্রমিকের চাহিদা মেটাতে স্প্যানিশরাই এখানে প্রথম আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাসদের দিয়ে সুগার প্ল্যান্টেশনে খাটাতে থাকে। এরপর ১৬৫৫ সালে দ্বীপটির দখল চলে যায় ব্রিটিশদের হাতে।

দ্বীপ ও চিনির প্ল্যান্টেশনের মালিকানা বদলে গেলেও আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাসদের জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন হয় না। ভোর ৪টা থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অমানুষিক খাটনি খাটতে হতো তাঁদের। দাসদের মধ্যে আনুগত্য তৈরির জন্য নিয়মিতভাবেই তাঁদের মধ্যে থেকে কাউকে না কাউকে পুড়িয়ে বা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হতো। এছাড়া অমানুষিক নির্যাতন ছিল তাঁদের প্রতিদিনের সঙ্গী।

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের দিকে বেশ কিছু দাস বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে জ্যামাইকায়। শেষ পর্যন্ত এখানকার দাসদের স্বাধীনতা মেলে ১৮৩৮ সালের দিকে।

প্ল্যান্টেশনের এসব দাসের যেমন আখ ক্ষেতে তপ্ত সূর্যের নিচে অমানুষিক খাটুনি খাটতে হতো, তেমনি চিনিকলের বয়েলিং হাউজের সিদ্ধ করা গরমেও কাজ করতে হতো। রুক্ষ পরিবেশে অমানুষিক খাটুনি খাটার কারণে দাসদের মধ্যে মৃত্যুহারও ছিল অনেক বেশি। কোনো সুগার কলোনিতে দাসদের সংখ্যা ইউরোপীয়দের চেয়ে দশ গুণেরও বেশি ছিল। ফলে ইউরোপীয় প্ল্যান্টার বা চিনি উৎপাদনকারীরা প্রতিনিয়তই দাস বিদ্রোহের আতঙ্কে থাকত।

ক্যারিবীয় অঞ্চলে আখ ও তামাক চাষের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ধরে আনা দাসের সংখ্যাও বাড়তে শুরু করে। ইংল্যান্ডের মাটিতে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয় ১৭৭২ সালে। নিজেদের ভূমিতে হাত সাফ রাখলেও ব্রিটিশ প্ল্যান্টাররা কিন্তু ঠিকই উপনিবেশগুলোয় এর চর্চা ও আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে এনে দাস ব্যবসা চালু রাখে। বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টে তুমুল বিতর্ক উঠলে ১৮০৭ সালে আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করার ঘৃণ্য প্রথা রদ করা হয়। কলোনিগুলোর দাসদের মুক্তি ঘোষণা করে বিল আনা হয় ১৮৩৩ সালে। যদিও কোথাও কোথাও তা বাস্তবায়ন হতে আরও অনেক সময় লেগে গিয়েছিল।

এখন অবশ্য ইউরোপ এর বেশির ভাগ দেশেই চিনির উৎপাদন বিট (Beet) থেকে। আখের মত অত না হলেও বিট এও প্রচুর চিনি আছে এবং তা বের করা খুব একটা কষ্ট সাপেক্ষ নয়। বিট চাষের জন্য অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা জলবায়ুর দরকার যা ইউরোপ এর বেশির ভাগ দেশেই আছে। উনবিংশ শতাব্দীতেই ইউরোপে বিট থেকে চিনির উৎপাদন চালু হয়। উপনিবেশ এবং দেশজ উৎপাদনের ফলে চিনি ইউরোপ এ জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য হয়।

এছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকায় চিনি বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি। বর্তমানে ভারত ছাড়া ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড আর চীন সর্বাধিক চিনি রপ্তানি করে।

তথ্যসূত্র


  1. Sweetness and power: The Place of Sugar in Modern History by Sidney Mintz, Penguin Books (১৯৮৬)।
  2. Sugar: A Global History by Andrew Smith, Reaktion Books (২০১৫)।
  3. Sugar: A Bittersweet History by Elizabeth Abbott, Gerald Duckworth & Co Ltd (২০১০)।
  4. Sugar: The World Corrupted: From Slavery to Obesity by James Walvin, Robinson (২০১৭)।
  5. Sugar Changed the World: A Story of Magic, Spice, Slavery, Freedom, and Science by Marc Aronson and Marina Budhos, Clarion Books (২০১৭)।
  6. Blood and Sugar by Laura Shepherd-Robinson, Mantle (২০১৯)।
  7. A Tall History of Sugar by Curdella Forbes, Akashic Books (২০১৯)।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!