ধর্ম

ভীষ্ম কৃষ্ণকে যুদ্ধে অস্ত্র না তুলে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করালেন কীভাবে

দ্রোণ বধ নিয়ে অর্জুন যুধিষ্ঠিরের ঝগড়া

মহাভারতের ভীষ্মপর্বে ৫৮তম ও ৫৯তম অধ্যায়ে ভীষ্ম কৃষ্ণকে যুদ্ধে অস্ত্র না তুলে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করালেন কীভাবে সে কথা বর্ণিত আছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আগে শ্রীকৃষ্ণ প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন না তিনি। তিনি শুধুই অর্জুনের রথের সারথি হবেন।

যুদ্ধের তৃতীয় দিনে পান্ডবরা ‘অর্ধচন্দ্র’ ব্যূহ (সৈন্য সাজানোর পদ্ধতিকে ব্যূহ সাজানো বলা হয়) এবং কৌরবরা ‘গরুড়’ ব্যূহ তৈরি করে যুদ্ধ শুরু করে। সেদিনের যুদ্ধে ভীষ্ম, দ্রোণ, অর্জুন, ভীম, ঘটোৎকচ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, যুধিষ্ঠির, নকুল, সহদেব প্রভৃতি পান্ডব ও কৌরবপক্ষের মহাযোদ্ধারা সবাই বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। দুই সৈন্যদলেরই হাজার হাজার যোদ্ধা মারা যেতে থাকেন। যুধিষ্ঠির এবং ধৃষ্টদ্যুম্নের পরাক্রম কৌরব সৈন্যদলের কাছে ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠতে থাকায় ভীষ্ম এবং দ্রোণ নিজের নিজের সৈন্য নিয়ে এসে তাঁদের দুজনকে আক্রমণ করেন। কিন্তু কোনোভাবেই পান্ডবপক্ষের এই দুই বীরকে আটকানো সম্ভব হয় না। মহারাজ যুধিষ্ঠির এবং পাঞ্চালকুমার ধৃষ্টদ্যুম্নের হাত থেকে বাঁচতে ভীষ্ম ও দ্রোণের সামনেই কৌরবদের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে থাকে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

এই ঘটনা দেখে দুর্যোধন ভীষণ রেগে যান। ক্রুদ্ধ দুর্যোধন ভীষ্মকে বলেন, “পিতামহ! আমি যা বলছি আপনি তা শুনুন। দ্রোণাচার্য, অশ্বত্থামা, কৃপ প্রভৃতি মহাবীরেরা এখনো বেঁচে আছেন, তবুও আপনাদের সামনেই পান্ডবদের ভয়ে ভীত আমাদের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আমি দেখতে পাচ্ছি, আপনারা আমার সৈন্যদের মৃত্যু দেখেও চুপ করে আছেন এবং পান্ডবদের কোন ক্ষতি করছেন না। এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে যে আপনারা সবাই পান্ডবদের সঙ্গে পক্ষপাতিত্ব করছেন। যদি আপনার এটাই উদ্দেশ্য ছিল, তাহলে কী কারণের জন্য আপনি আমাকে আগে একথা বলেননি? একথা জানলে আমি কখনোই পাঁচ পান্ডব, সাত্যকি ও ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙ্গে সামনাসামনি যুদ্ধ করতে যেতাম না। শুধু আপনার এবং গুরু দ্রোণের কথা শুনেই আমি এবং আমার ভাইয়েরা কর্ণের সঙ্গে এই যুদ্ধ করতে রাজি হয়েছি। যাই হোক, যদি আমাদের পক্ষ ত্যাগ করার কোনো উদ্দেশ্য আপনাদের না থাকে, তবে দয়া করে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করুন এবং কৌরব পক্ষের সৈন্যদের রক্ষা করুন।”

দুর্যোধনের এমন কটু কথা শুনে পিতামহ ভীষ্ম খুব দুঃখ পেলেন। তিনি বিষণ্ণ গলায় দুর্যোধনকে বললেন, “মহারাজ! দেবতাদের সবাইকে নিয়ে নিজে দেবরাজ ইন্দ্র যুদ্ধ করতে এলেও তাঁরা পান্ডবদের হারাতে পারবেন না, একথা আমি আগে তোমাদের বারবার বলেছি। তোমরা তখন অহংকারে মত্ত হয়ে আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলে। যাই হোক, আমি বুড়ো হয়েছি, তবুও আমি আমার সাধ্যমত সর্বশক্তি দিয়ে পান্ডবদের হারানোর চেষ্টা করছি। তোমরা দেখো, আজ আমি সৈন্যদলের সঙ্গে পান্ডবদের অবশ্যই আটকে দেব।”

এই কথা বলে মহাবীর ভীষ্ম ভীষণ রেগে গিয়ে নিজের সমস্ত শক্তি ব্যবহার করে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ আরম্ভ করলেন। বিপক্ষ দলের কোন যোদ্ধাই তাঁর সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারলেন না। তাঁর ধনুকের টঙ্কারের শব্দ পর্বত ভেঙে পড়ার শব্দকেও হার মানিয়ে দিল। চারদিকে কেবল, “রক্ষা করো, রক্ষা করো” এই শব্দই শোনা যেতে লাগল। যোদ্ধাদের হাজার হাজার দিব্য অলঙ্কারযুক্ত হাত ও মাথা মাটিতে গড়াগড়ি যেতে লাগল। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় বড় রক্তের নদী তৈরি হল। অসংখ্য স্তূপাকার মৃতদেহ দেখে চিল, শকুন প্রভৃতি শিকারী পাখি এবং হায়না, শেয়াল প্রভৃতি পশুদের আনন্দের সীমা রইল না।

পান্ডব সৈন্যদলের এমন দুরবস্থা দেখে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে ডেকে বললেন, “পার্থ! তুমি বলেছিলে তুমিই ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতিকে হত্যা করবে। এখন সময় এসে গেছে। তাড়াতাড়ি ভীষ্মকে আটকাও। নাহলে আজ পান্ডবদের পরাজয় কেউ আটকাতে পারবে না।”
অর্জুন তখন বললেন, “বাসুদেব! আপনি তাড়াতাড়ি ভীষ্মের কাছে রথ নিয়ে চলুন। আজ আমি নিশ্চয়ই তাঁকে বধ করে নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করব।”

এরপর অর্জুন ও ভীষ্মের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। কিন্তু অর্জুন অনেক যুদ্ধ করেও ভীষ্মকে হারাতে পারলেন না। ভীষ্ম ঠিক আগের মতোই পান্ডবদের সৈন্যদের মারতে মারতে অর্জুনকে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলেন। পান্ডবসৈন্যরা তখন প্রাণভয়ে রণভূমি থেকে পালিয়ে যেতে লাগল। এই ঘটনা দেখে সাত্যকি চিৎকার করে পান্ডব সৈন্যদলকে উৎসাহ দিতে লাগলেন। এদিকে শ্রীকৃষ্ণ মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন, “মহাবীর ভীষ্ম সৈন্যসমেত পান্ডবদের কথা দূরে থাকুক, ইচ্ছা করলে একদিনে সমস্ত দৈত্যদানবকে ধ্বংস করে দিতে পারেন। এই মুহূর্তে পান্ডবসৈন্যরা প্রাণভয়ে রণভূমি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এবং তা দেখে কৌরবরা আনন্দিত হচ্ছে। তাই আজ আমিই পৃথিবীর ভার লাঘব করার জন্য ভীষ্মকে বধ করব। অর্জুন শুধু ভীষ্মের গৌরব রক্ষা করার জন্যই তাঁর সাথে ভালো করে যুদ্ধ করছেন না।”

এই ভেবে বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ রাগের ভরে রথের উপর উঠে দাঁড়িয়ে সাত্যকিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “সাত্যকি! যারা পালাচ্ছে তাদের যেতে দাও। যে রাজারা এখনো যুদ্ধ করছেন চাইলে তাঁরাও পালিয়ে যেতে পারেন। আজ আমিই ভীষ্ম এবং দ্রোণের সঙ্গে সমস্ত কৌরব সৈন্যদের ধ্বংস করব। আমি রেগে গেলে কেউ বাঁচতে পারবে না। আমি এখনই ভীষ্ম, দ্রোণ এবং সব কৌরবদের হত্যা করে মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে রাজা বলে ঘোষণা করব।”

এই বলে কৃষ্ণ নিজের সুদর্শন চক্র হাতে নিলেন এবং ভীষ্মের দিকে ছুটে চললেন। কৃষ্ণের ভয়ানক মূর্তি দেখে কৌরব সৈন্যদলের মধ্যে হাহাকার শুরু হল। সবাই ভীষণ ভয় পেয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে লাগল। কিন্তু পিতামহ ভীষ্ম একটুও ভয় পেলেন না। তিনি নিজের ধনুর্বাণ ফেলে দিয়ে জোড়হাতে মাটিতে বসে পড়লেন। কৃষ্ণকে প্রণাম করে বললেন, “হে মধুসূদন! তুমি সব দেবতার শ্রেষ্ঠ দেবতা। আজ যদি তোমার হাতে আমার মৃত্যু হয়, তাহলে আমার অবশ্যই স্বর্গ লাভ হবে। এই আমি অস্ত্র ত্যাগ করলাম। এসো, আমাকে বধ করো।”

এইসময় অর্জুন ছুটে এসে কৃষ্ণের পা জড়িয়ে ধরলেন। কৃষ্ণকে মিনতি করে বললেন, “হে মাধব! দয়া করে শান্ত হোন। আপনি নিজের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবেন না। আমি শপথ করছি, কর্তব্য পালনে আর অবহেলা করব না। সব শক্তি দিয়ে আমি যুদ্ধ করব। বাসুদেব! দয়া করে অস্ত্র ত্যাগ করুন!”

অর্জুনের প্রার্থনায় কৃষ্ণ শান্ত হলেন। তিনি সুদর্শন চক্রকে হাত থেকে নামিয়ে আবার অর্জুনের রথে ফিরে এলেন। এরপরে অর্জুন ভীষণ যুদ্ধ শুরু করলেন। ভীষ্ম, দ্রোণ প্রভৃতি সমস্ত কৌরব মহাবীর তাঁর কাছে হেরে গেলেন। সেদিনের যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত পান্ডবদেরই জয় হল।

তথ্যসূত্র


  1.  ‘মহাভারত’, কালীপ্রসন্ন সিংহ, ভীষ্মপর্ব, অধ্যায় ৫৮ ও ৫৯, পৃষ্ঠা ৪০৭-৪১০
  2. ‘ছেলেদের মহাভারত’, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, বসাক বুক স্টোর প্রাইভেট লিমিটেড, তৃতীয় মুদ্রণ, ভীষ্মপর্ব, পৃষ্ঠা ১২৮-১২৯

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

মনোরথ দ্বিতীয়া ব্রতকথা নিয়ে জানতে


মনোরথ দ্বিতীয়া

ছবিতে ক্লিক করুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন