ইতিহাস

জে. আর. ডি. টাটা

ভারতীয় তথা বিশ্ব বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা টাটা পরিবারের অন্যতম কৃতী সদস্য ছিলেন জাহাঙ্গীর রতনজি দাদাভয় টাটা (Jehangir Ratanji Dadabhoy Tata), সংক্ষেপে জে. আর. ডি. টাটা। ভারতীয় বিমানচালনার পথিকৃৎ জে. আর. ডি. টাটা ছিলেন ভারতের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিমানচালক। তিনিই ভারতের প্রথম বিমান চলাচলের পথ তৈরি করেন। পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে নেতৃত্ব দিয়ে টাটা গোষ্ঠীকে ভারতের সর্ববৃহৎ শিল্প-সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।  

১৯০৪ সালের ২৯ জুলাই ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জে. আর. ডি. টাটার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল রতনজি দাদাভয় টাটা (Ratanji Dadabhoy Tata) এবং মায়ের নাম সুজান সুনি ব্রিয়ের (Suzanne Sooni Briere)।

জে. আর. ডি. টাটার মা ফরাসি হওয়ায় তাঁর জীবনের একটা বড় সময় ফ্রান্সে কাটে। প্রাথমিকভাবে তিনি ফ্রান্সের জ্যান্সন দি সাইলি বিদ্যালয়ে (Janson De Sailly School) পড়াশোনা করতেন। পরবর্তীকালে তিনি লন্ডন, জাপান, এমনকি ভারতের মুম্বাই শহরের ক্যাথেড্রাল অ্যান্ড জন কনন বিদ্যালয়ে (Cathedral and John Connon School) পড়াশোনা করেন। ফ্রান্সের নাগরিক হওয়ায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফরাসি সৈন্য দলের হয়ে যুদ্ধেও যান।

বিমান চালনার প্রতি জে. আর. ডি. টাটার আগ্রহ জন্মায় তাঁর বন্ধুর বাবা লুই ব্লেরিওটের (Louis Bleriot) মাধ্যমে। ১৯২৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ভারতের প্রথম বিমান চালকের লাইসেন্সটি পান। পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় অসামরিক বিমান চালনার জনক হিসেবে পরিচিত হন। তিনি ভারতের প্রথম জাতীয় বাণিজ্যিক বিমানপথ টাটা এয়ারলাইন্স (Tata Airlines) প্রতিষ্ঠা করেন, ১৯৪৬ সালে যা এয়ার ইন্ডিয়াতে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

১৯২৫ সালে একজন অবৈতনিক শিক্ষানবিশ হিসেবে টাটা সন্সে (Tata Sons) যোগ দেন তিনি। ১৯৩৮ সালে মাত্র চোঁত্রিশ বছর বয়সে তিনি টাটা গোষ্ঠীর অধ্যক্ষ নির্বাচিত হন। ১৪টি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বদানের মাধ্যমে তিনি যে যাত্রা শুরু করেছিলেন তাঁর অবসরের সময় তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৫। তিনি অধ্যক্ষ থাকাকালীন টাটা গোষ্ঠীর সম্পদ ১০০ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার (US $ 100 Million) থেকে বেড়ে ৫ বিলিয়ন আমেরিকান ডলারে (US $ 5 Billion) পৌঁছে যায়।

তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম ব্যবসায়ী যিনি কর্পোরেট সামাজিক দায়িত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যে সাফল্য দেশ এবং দেশের মানুষের কাজে লাগে না তার কোনো মূল্যই নেই। তিনি ১৯৩২ সাল থেকে স্যার দোরাবজি টাটা ট্রাস্টের (Sir Dorabji Tata Trust) একজন অছিসদস্য (Trustee) ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই এই ট্রাস্ট ১৯৪১ সালে মুম্বাইতে এশিয়ার প্রথম ক্যান্সার হাসপাতাল টাটা মেমোরিয়াল সেন্টার ফর ক্যান্সার, রিসার্চ অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট (Tata Memorial Center for Cancer, Research and Treatment) গড়ে তোলে।

এর আগে তিনি ১৯৩৬ সালে টাটা ইন্সটিটিউট অফ সোশাল সায়েন্স (Tata Institite of Social Sciences, TISS) প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (Tata Institute of Fundamental Researsh, TIFR)। এছাড়াও ন্যাশনাল সেন্টার ফর পার্ফর্মিং আর্টস (National Center for Performing Arts), ১৯৪৫ সালে টাটা মোটরস (Tata Motors)এর প্রতিষ্ঠা তাঁর উদ্যোগেই হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জে. আর. ডি. টাটা ভারতের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমানপথ হিসেবে এয়ার ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনালকে (Air India International) প্রকাশ্যে আনেন। ১৯৫৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে এয়ার ইন্ডিয়ার অধ্যক্ষ এবং বোর্ড অফ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের (Board of Indian Airlines) অধিকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করেন। এই দ্বিতীয় পদটিতে তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বহাল থাকেন।

ব্যবসায়ী তথা একজন মানুষ হিসেবে জে. আর. ডি. টাটা ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং সহকর্মীদের প্রতিও তিনি স্নেহবৎসল ছিলেন।তিনি আট ঘন্টার শ্রমদিবস, বিনামূল্যে চিকিৎসা সাহায্য, কর্মীদের প্রভিডেন্ট পরিকল্পনা, এবং শ্রমিকদের দুর্ঘটনা হলে তাঁদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা সংক্রান্ত নীতির কথা জনসমক্ষে আনেন যা পরবর্তীকালে ভারতে শ্রমিক বা কর্মীদের বিধিবদ্ধ দাবী হিসাবে স্বীকৃত হয়।

১৯৫৬ সালে দিল্লীতে প্রতিষ্ঠিত ভারতের প্রথম স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ অ্যাপ্লায়েড ইকোনমিক রিসার্চের (National Council of Applied Economic Research) একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন জে. আর. ডি. টাটা । ১৯৬৮ সালে তিনি টাটা কন্সাল্টেন্সি সার্ভিসেস (Tata Consultancy Services) এবং ১৯৮৭ সালে টাইটান ইন্ডাস্ট্রিজ (Titan Industries) প্রতিষ্ঠা করেন।

বিমানচালনায় তাঁর আকাশছোঁয়া সাফল্যের জন্য ১৯৪৮ সালে ভারতীয় বায়ু সেনা তাঁকে (Indian Air Force) গ্রুপ ক্যাপ্টেনের (Group captain) তকমা দেয়। ১৯৬৬ সালে তিনি এয়ার কমোডোর (Air Commodore of India) পদে উন্নীত হন। পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে তাঁকে এয়ার ভাইস মার্শাল (Air Vice Marshal) পদে উন্নীত করা হয়। এছাড়াও, বিমান চালনার জন্য জে. আর. ডি. টাটাকে অনেক সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। যেমন, ১৯৭৯ সালে টনি জানাস অ্যাওয়ার্ড (Tony Jannus Award), গোল্ড এয়ার মেডেল অফ দ্য ফেডারেশন এরোনটিক ইন্টারন্যাশনাল (Gold Air Medal of the Federation Aeronautique International), দি এডওয়ার্ড ওয়ার্নার অ্যাওয়ার্ড অফ দ্য ইন্টারন্যাশনাল সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন, কানাডা (The Edward Warner Award of the International Civil Aviation Organisation, Canada), ড্যানিয়েল গাগনহেইম মেডেল (Daniel Guggenheim Medal)।

১৯৫৫ সালে জে. আর. ডি. টাটা পদ্মবিভূষণ পান। ১৯৮৩ সালে ফরাসি লিজিয়ন অফ অনর (The French Legion of honour) সম্মানে ভূষিত করা হয় তাঁকে। ১৯৯২ সালে তাঁর নিঃস্বার্থ মানবিক উদ্যোগের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয় তাঁকে। সরকারি প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার বহু আগে ভারতে পরিবার পরিকল্পনা আন্দোলনের সূত্রপাত এবং সফলভাবে তাকে কার্যকরী করার জন্য সেই বছরেই জে. আর. ডি. টাটা জাতিসংঘ জনসংখ্যা সম্মান (United Nations Population Award) পান।

১৯৯৩ সালের ২৯ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে কিডনিতে সংক্রমণের ফলে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে জে. আর. ডি. টাটার মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে ভারতীয় সংসদ ভবন (Indian Parliament) স্থগিত রাখা হয়, যা সাধারণত সংসদের সদস্য ভিন্ন অন্য কারোর জন্য করা হয়না। মহারাষ্ট্র সরকার জে. আর. ডি. টাটার স্মৃতিতে নাসিক ফাটাতে শহরের প্রথম দুইতলা ব্রিজটির নামকরণ করেন ভারতরত্ন জেআরডি টাটা ওভারব্রিজ।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।