ইতিহাস

ঝলকারী বাঈ

ঝলকারী বাঈ( Jhalkari bai) একজন দলিত মহিলা সৈনিক যিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের মহিলা সেনার দায়িত্বে ছিলেন। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের দূর্গ ব্রিটিশ সৈন্য আক্রমণ করলে ঝলকারী বাঈ রানি লক্ষ্মীবাঈকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন।

১৮৩০ সালের ২২ নভেম্বর ঝাঁসির কাছে ভোজলা গ্রামে কোলি সম্প্রদায়ে ঝলকারী বাঈয়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম সাদোবা সিং এবং মায়ের নাম যমুনা দেবী। ঝলকারী বাঈ তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা ছিলেন। অনেক অল্প বয়সেই তাঁর মা মারা যান। তাঁর বাবা-ই তাঁকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে বড়ো করে তোলেন।

তাঁর পরিবার গরীব এবং কোলি সম্প্রদায়ভুক্ত হবার জন্যেই কোনো স্কুলে তাঁর প্রথাগত প্রাথমিক শিক্ষালাভ ঘটেনি। খুব ছোটো বয়স থেকেই ঝলকারী বাঈকে অস্ত্রচালনা, ঘোড়ায় চড়া, যুদ্ধকৌশল শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলেছিলেন তাঁর বাবা। সেই বয়সেই তাঁর অদম্য সাহসিকতার পরিচয় মেলে যখন গবাদি পশুদ চালনার লাঠি দিয়ে বনের মধ্যে তিনি একটি চিতাকে মেরে ফেলেন। ঝলকারী বাঈয়ের আরও বীরত্বের গাথা বুন্দেলখণ্ডের লোকস্মৃতিতে রয়ে গেছে, তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা কিংবদন্তী, নানা লোককথা। দলিত হিসেবে তাঁর এই সাহসিকতা উত্তর-পূর্ব ভারতে দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে গর্বের বিষয় হয়ে রয়েছে আজও। শোনা যায়, বনের মধ্যে একটি কুঠার দিয়ে তিনি আক্রমণোদ্যত একটি বাঘকে মেরেছিলেন। আবার একবার গ্রামের একটি বাড়িতে ডাকাত পড়লে, তাঁর একক সাহসে ও উদ্যমে ডাকাতেরা পালিয়ে যায়।

১৮৪৩ সালে পুরম্‌ মহাবীর কোলি নামে একজন সাহসী কুস্তিগীর এবং তীরন্দাজের সঙ্গে ঝলকারী বাঈয়ের বিয়ে হয়। পুরম্‌ ছিলেন ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সেনাবাহিনীর একজন দক্ষ সৈনিক, আগ্নেয়াস্ত্র ও তলোয়ার চালনায় বিশেষ পারদর্শী। গৌরী পূজার সময় গ্রামের অন্যান্য আরো মহিলাদের সঙ্গে ঝলকারী বাঈ লক্ষ্মীবাঈয়ের দূর্গে গিয়েছিলেন আর সেখানেই লক্ষ্মীবাঈ তাঁকে লক্ষ্য করেন। রানি লক্ষ্মীবাঈ নিজের সঙ্গে চেহারায়-মুখের আদলে সাদৃশ্য দেখে ঝলকারীকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। তাঁর মুখে নানাবিধ সাহসিকতার দৃষ্টান্তের পরিচয় পেয়ে নিজের নারীবাহিনী ‘দূর্গাদল’-এ তাঁকে সেই মুহূর্তেই নিযুক্ত করেন। ব্রিটিশ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রয়োজনে ‘দূর্গাদল’-এ থেকেই তিনি বন্দুক চালাতে এবং কামান ছুঁড়তে শেখেন।

ঝলকারী বাঈয়ের জীবনের সবথেকে স্মরণীয় ঘটনা ছিল সিপাহি বিদ্রোহের সময় লক্ষ্মীবাঈয়ের সঙ্গে ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা। মীরাটে ১৮৫৭ সালের ১০মে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ভারতীয় সিপাহিরা প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। পরে এই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র উত্তর-পূর্ব এবং মধ্য ভারত জুড়ে। এটি ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। ১৮৫৮ সালে ফিল্ড মার্শাল হিউ হেনরি রোজ (Hugh Henry Rose) ঝাঁসির দূর্গ আক্রমণ করেন পুরোপুরি বিদ্রোহের উৎসকে মুছে ফেলতে। লক্ষ্মীবাঈ আশা করেছিলেন কাল্পিতে পেশোয়া নানাসাহেবের সেনাদল হিউ রোজকে প্রতিহত করবে। ইতিমধ্যেই তখন হিউ রোজ তাঁতিয়া টোপিকে পরাজিত করায় লক্ষ্মীবাঈ আশা পূরণ হল না। লক্ষ্মীবাঈ এরপর ৪০০০ সৈন্য সহ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে। লক্ষ্মীবাঈ দীর্ঘদিন পর্যন্ত দূর্গে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারতেন, কিন্তু তাঁরই এক সৈন্যের বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়ে যান। একজন দ্বাররক্ষক দুল্‌হা জু (Dulha Ju) ব্রিটিশ সেনাদের সঙ্গে মিত্রতা করে দূর্গের একটি দরজা খুলে দিয়েছিলেন। তখন ঝলকারী বাঈ রানির স্থান অধিকার করে সৈন্যদের নির্দেশ দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যান। রানির সঙ্গে সাদৃশ্য থাকায় দূর্গে রানিকে সুরক্ষিত রেখে তিনি নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তবু শেষরক্ষা হয়নি। সৈন্যদের পরামর্শ দিয়ে ঝলকারী বাঈয়ের নির্দেশে ঘোড়ার পিঠে চেপে পালিয়ে গিয়েছিলেন লক্ষ্মীবাঈ। আর ব্রিটিশ সৈন্যের কাছে নিজেকে লক্ষ্মীবাঈ বলে পরিচয় দিয়ে ধরা দেন ঝল্‌কারী বাঈ। এতে গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। লক্ষ্মীবাঈয়ের একজন আত্মবিশ্বাসী ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ছিলেন ঝলকারী বাঈ, তাঁর এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এখনও। বুন্দেলখণ্ডের কিংবদন্তী অনুযায়ী, জেনারেল রোজ্‌ যখন তাঁকে স্বয়ং রানি মনে করে জিজ্ঞাসা করেন যে কী শাস্তি তিনি চান, নির্ভয়ে ঝলকারী বাঈ তাঁকে ফাঁসি দিতে বলেন। তখন জেনারেল তাঁর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন যে, ভারতের এক শতাংশ নারীও যদি ঝলকারী বাঈয়ের মত সাহসী হতেন তাহলে ব্রিটিশদের পরাজিত হয়েই ভারত ছেড়ে চলে যেতে হত।   

দলিত সম্প্রদায়ের সাহিত্য, নাটক ইত্যাদি নানা শিল্পমাধ্যমে ঝলকারী বাঈ অত্যন্ত প্রভাব ফেলেছিলেন। তাঁকে নিয়ে নানা কমিক্‌স, উপন্যাস, কবিতা, জীবনি, ‘নৌটঙ্কি’ নির্মিত হয়েছে। ‘বীরাঙ্গনা ঝলকারী বাঈ কাব্য’, ‘ঝাঁসি কি শেরনি’ নামের কবিতা, ‘অচ্যুত বীরাঙ্গনা নৌটঙ্কি’ নামের নাটক ইত্যাদি এর উদাহরণ। তাছাড়া তাঁর স্মৃতিতে ‘ঝলকারী সন্দেশ’ নামে একটি আঞ্চলিক পত্রিকাও প্রকাশিত হতে থাকে। উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডের লোকমুখে আজও শোনা যায় একটি ছড়া –

‘মাচা ঝাঁসি মে ঘমাসান, চাহুঁ অউর মাচে কিল্‌কারি থি

আংরেজো সে লোহা লেনে, রণ মে কুদি ঝলকারী থি।’

এর অর্থ – ঝাঁসিতে যুদ্ধের দামামা, আহত সৈনিকের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে। ইংরেজদের প্রতিহত করতে ঝলকারী একাই যুদ্ধে যোগ দিলেন। এই ছড়া, গান, নাটকগুলি দলিতদের মেলা বা সমাবেশের একটি লোক-ঐতিহ্যের অঙ্গ। এর মধ্যে একটি ঘটনা বারবার শোনা যায় যে, ঝলকারীকে একবার একটি গরুকে মারার জন্য দায়ী করা হয়েছিল, কিন্তু সেই গরুটি আদতে এক ব্রাহ্মণ লুকিয়ে রেখেছিল। পরে সত্য প্রকাশ পায়। ঔপনিবেশিক এবং রক্ষণশীল হিন্দুদের আখ্যানে এভাবে যে দলিত এবং মুসলমান উভয়কেই ‘পবিত্র গরুর হত্যাকারী’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা বেশ আশ্চর্যের। ঝলকারী বাঈয়ের এই গল্পগুলি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের বীরত্ব ও মহিমার ইতিহাসকেও চ্যালেঞ্জ জানায়। কোথাও কোথাও লোকমুখে শোনা যায় যে প্রতাপগড়ের শাসকের সহায়তায় রানি লক্ষ্মীবাঈ নেপালের জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন এবং এর পরে ১৯১৫ সালে ৮০ বছর বয়সে মারা যান। ফলে আসল শহীদ হলেন ঝলকারী বাঈ, দলিত বীরাঙ্গনা। রাজ্যের অধিকার বা প্রাসাদ, গহনা বা দামী পোশাক কোনটাই নেই, কোন রাজা-জায়গিরদার বা সামন্তপ্রভুর স্ত্রী না হয়েও ঝলকারী বাঈয়ের এহেন উজ্জ্বল কীর্তি হয়ত লক্ষ্মীবাঈয়ের ইতিহাসের আড়ালে অবহেলায় চাপা পড়ে গেছে।  

কোলি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঝলকারী বাঈয়ের মৃত্যুদিন ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ২০০১ সালে ঝলকারী বাঈয়ের স্মৃতিতে ভারত সরকার তাঁর ছবি দিয়ে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে। উত্তর ভারতের দলিত সম্প্রদায় তাদের মধ্যে এইরূপ একজন সাহসী নারীকে পেয়ে তাঁর মাহাত্ম্য স্মরণ করে প্রতিবছর ‘ঝলকারী জয়ন্তী’ পালন করে। তাছাড়া উত্তরপ্রদেশে তাঁর জন্মদিনে ‘গৌরব দিবস’ পালিত হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজে তা আজও যোগ্য স্বীকৃতি পায়নি। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ ঝলকারী বাঈয়ের স্মরণে ঝাঁসি দূর্গের ‘পাঁচমহল’-এ একটি সংগ্রহশালা তৈরি করেছে। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর ভোপালের গুরু তেগ বাহাদুর কমপ্লেক্সে ঝলকারী বাঈয়ের একটি মর্মর মূর্তি উন্মোচন করেন। ২০১৯ সালে বলিউডে একটি ছবি মুক্তি পায় ‘মনিকর্ণিকা’ নামে। এই ছবিতে যথাক্রমে লক্ষ্মীবাঈ এবং ঝলকারী বাঈয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন কঙ্গনা রানাওয়াত এবং অঙ্কিতা লোখাণ্ডে।  

ঝলকারী বাঈয়ের মৃত্যু নিয়ে পণ্ডিতমহলে মতানৈক্য আছে। অনেকের মতে ১৮৫৮ সালের ৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। আবার অনেকে মনে করেন জেনারেল রোজ্‌-এর থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি বেশ কিছুদিন বেঁচে ছিলেন এবং ১৮৯০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ১৮৫৮তেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে সর্বজনস্বীকৃত।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


তথ্যসূত্র


  1. Women Heroes and Dalit Assertion in North India: Culture, Identity and Politics: By Badri Narayan: chapter 5 : page-113-132
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.thebetterindia.com/
  4. https://feminisminindia.com/
  5. https://www.udayavani.com/
  6. https://timesofindia.indiatimes.com/
  7. https://www.researchgate.net/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন