সববাংলায়

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

বিভাগঃ , ,

বাংলা কবিতার সুদীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ কবিদের নাম যদি একত্র করা যায়, তবে সেই তালিকায় অবশ্যই ঠাঁই পাবেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (Nirendranath Chakraborty)। কবিতা ছাড়াও, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছড়া ইত্যাদি লিখেছেন এবং পাশাপাশি তিনি দীর্ঘকাল ধরে পত্রিকা সম্পাদনার কাজও করেছেন। অনুবাদের কাজেও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। টিনটিনের মতো বিখ্যাত কমিক সিরিজের অনেকগুলি অনুবাদ করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ। এমনকি ‘ভাদুড়ি মশাই’ নামে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি করেছিলেন এক গোয়েন্দা চরিত্রও। তবে এত কিছুর পরেও মূলত কবি হিসেবেই তাঁর আত্মপ্রকাশ এবং সর্বাধিক পরিচিতি। জটিল ভাষা ও কল্পনার অদ্ভুত ফানুস তিনি তাঁর কবিতাতে কখনই প্রশ্রয় দেননি, বরং সহজ ভঙ্গীতে মানুষকে, মানবতাকে, জীবনের অখন্ডতাকে কবিতায় ধরবার চেষ্টা করেছেন। এমনকি ক্ষমতার বিরূদ্ধেও তাঁর কবিতা গর্জে উঠেছে। লিখেছিলেন ‘নীরবিন্দু’ নামে এক অসাধারণ আত্মজীবনী। সাহিত্য আকাদেমির মতো পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন তিনি।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
তথ্যচিত্রটি দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৯২৪ সালের ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার চান্দ্রা গ্রামে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ছিল জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন কলকাতার একটি নামকরা কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। তবে নীরেন্দ্রনাথের বাবা একসময়ে দারুণ একজন ফুটবল খেলোয়াড়ও ছিলেন। মোহনবাগানেও খেলেছিলেন তিনি। অধ্যাপনা কর্মের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরেও কিছুদিন খেলা চালিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু দুদিক সামলানো যখন মুশকিল হয়ে পড়ে তখন বাধ্য হয়ে খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। এমনকি তিনি ক্যালকাটা রেফারিজ’ অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যও ছিলেন। নীরেন্দ্রনাথের শৈশবের পুরোটাই প্রায় কেটেছিল পূর্ববঙ্গে ঠাকুরদা, ঠাকুমার কাছে। মা, বাবা কলকাতায় থাকলেও তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে  বাংলাদেশেই। তবে কলকাতায় যে একেবারেই তখন আসতেন না তেমন নয়। তাছাড়া চান্দ্রা গ্রামে একটা সামান্য মাইনর স্কুল পর্যন্ত না থাকায় নীরেন্দ্রনাথের পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে তাঁর মা ভীষণই চিন্তিত ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনী অনুসারে, তিনি ১৯৩০ সালে, পুজোর ছুটিতে যখন তাঁর বাবা দেশে গিয়েছিলেন, তখন বাবার সঙ্গেই কলকাতায় চলে আসেন তিনি। ঠাকুরদা প্রথমে নীরেন্দ্রনাথের কলকাতায় যাওয়া কেন উচিত, সে-বিষয়ে প্রদত্ত যুক্তিগুলিতে সন্তুষ্ট না হলেও, পরে ইংরেজি শিক্ষার জন্য তাঁকে কলকাতায় যেতে বলেছিলেন।

এক নজরে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর জীবনী:

  • জন্ম: ১৯ অক্টোবর, ১৯২৪
  • মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
  • কেন বিখ্যাত: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আধুনিক বাংলাসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবি। কবিতা ছাড়াও লিখেছেন প্রবন্ধ, উপন্যাস, ছড়া ইত্যাদি। করেছেন পত্রিকা সম্পাদনা। বিখ্যাত সৃষ্টি ‘উলঙ্গ রাজা’, ‘কলকাতার যীশু’, ‘অমলকান্তি’ ইত্যাদি। আত্মজীবনীর নাম ‘নীরবিন্দু’।
  • পুরস্কার: সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার, তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার’ , ‘আনন্দ শিরোমণি’, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি লিট ইত্যাদি।

নীরেন্দ্রনাথের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় বঙ্গবাসী স্কুলে। সেই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করে দেওয়া হয় তাঁকে। তখন তাঁর বয়স সাত। গ্রামের বাড়িতে থাকতে তিনি কিন্তু বইপড়া ভালরকমই আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন কারণ ছোটবেলায় ঠাকুরদা ও ঠাকুমাকে কাশিদাসী মহাভারত পড়ে শোনানোর কথা তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়। এখানে উল্লেখ্য যখন তাঁর চার বছর বয়স ছিল, তখন তাঁর ছোটকাকা একবার কলকাতার পঞ্চম জর্জ বালিকা বিদ্যালয়ের হেড মিস্ট্রেসের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন ভর্তি করে দেওয়ার জন্য, কিন্তু তিনি পালিয়ে এসেছিলেন সেবার। যাই হোক, পরবর্তীকালে তিনি মিত্র ইন্সটিটউশন থেকে পড়াশোনা করেন। তারপর বঙ্গবাসী কলেজ এবং সেন্ট পলস কলেজে পড়াশোনা করেন।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল দৈনিক ‘প্রত্যহ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করার মাধ্যমে। তারপরে একে একে ‘মাতৃভূমি’, ‘অ্যাডভান্স’, ‘ভারত’, ‘কিশোর’, ‘সত্যযুগ’ প্রভৃতি পত্রপত্রিকায় তিনি কাজ করেছেন। পরে  ১৯৫১ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল ছোটদের জনপ্রিয় পত্রিকা ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকার পথ চলা। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে কাজ করা কালীন যেসব বিখ্যাত সাহিত্যিকরা কিশোরদের জন্য এখানে লিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। নীরেন্দ্রনাথের হাত ধরেই বাংলা কিশোর সাহিত্য  আরো বিকশিত এবং সমৃদ্ধ হয়েছিল। আনন্দবাজার পত্রিকার ‘বানান বিধি’ সংকলনে তাঁর বড় অবদান ছিল।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ছোটবেলা থেকেই ছড়া লিখতে ভালবাসতেন। কবিগানের কথা একনাগাড়ে মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ‘শ্রীহর্ষ’ পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে সাহিত্যজগতে তাঁর পদার্পণ। শিশুদের জন্য তাঁর জনপ্রিয় রচনা ‘শাদা বাঘ’, ‘বিবির ছড়া’ ইত্যাদি। ‘কবিতার ক্লাস’ ও ‘পিতৃপুরুষ’ নামে কবিতা বিষয়ক তাঁর দু’টি প্রবন্ধ গ্রন্থও রয়েছে।  ১৯৫৪ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নীল নির্জন’ প্রকাশিত হয়। এই বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন  সত্যজিৎ রায়। উল্লেখ্য যে, এই বইটিতে তাঁর নাম ছাপা হয়েছিল নীরেন্দ্র চক্রবর্তী। বইটির প্রকাশক ছিল সিগনেট প্রেস। তারপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে ‘অন্ধকার বারান্দা’ (১৯৬১), ‘নিরক্ত করবী’ (১৯৬৫), ‘নক্ষত্রজয়ের জন্য’ (১৯৬৯), ‘কলকাতার যিশু’ (১৯৬৯), ‘খোলা মুঠি’ (১৯৭৪), ‘কবিতার বদলে কবিতা’ (১৯৭৬), ‘আজ সকালে’ (১৯৭৮), ‘পাগলা ঘণ্টি’ (১৯৮১), ‘ঘর-দুয়ার’ (১৯৮৩), ‘সময় বড় কম’ (১৯৮৪), ‘ঘুমিয়ে পড়ার আগে’ (১৯৮৭), ‘দেখা হবে’ (২০০২)-সহ আরও অনেক কবিতার বই। ১৯৭১ সালে লেখা ‘উলঙ্গ রাজা’ তাঁর সেরা রচনাগুলির মধ্যে একটি। এছাড়াও তাঁর আরও দুটি জনপ্রিয় কবিতার নাম হল “অমলকান্তি” এবং “কলকাতার যীশু”। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীই প্রথম যিনি বাংলায় টিনটিন এবং আরও অনেক বিদেশী কমিক্স অনুবাদ করেছিলেন। টিনটিন কমিক্সের অনুবাদ করতে গিয়ে অনেক চরিত্রের নাম বদলে তার মধ্যে একপ্রকার বাঙালিয়ানার আমদানি ঘটিয়েছিলেন। যেমন, সাংবাদিক টিনটিনের সাদা রঙ-এর কুকুরটির নাম ছিল ‘স্নোয়ি’, বাংলায় অনুবাদের সময় সেই কুকুরের নাম তিনি রাখলেন ‘কুট্টুস’ এবং সেটাই প্রভূত জনপ্রিয়তা পেয়ে গিয়েছিল। কেবল নামের ক্ষেত্রেই নয়, এমন আরও নানা জায়গায় অনুবাদে টিনটিনের একরকম বঙ্গীকরণ যেন করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে আনন্দমেলায় প্রথম প্রকাশিত হয়  টিনটিনের দুটি গল্প – ‘বোম্বেটে জাহাজ’ এবং ‘লাল বোম্বেটের গুপ্তধন’। আরও উল্লেখ্য যে, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘ফ্যান্টম হু ওয়াকস’ নামের একটি কমিক স্ট্রিপের অনুবাদ করেছিলেন এবং ফ্যান্টমের নাম নীরেন্দ্রনাথই রেখেছিলেন অরণ্যদেব। এই অরণ্যদেব চরিত্রটি কালে কালে বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এমনকি একসময় দেশ পত্রিকার পাতাতেও কিছু ছোটগল্প রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ছোটগল্পও কিন্তু পাঠকদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করেছিল, সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

সারা জীবনে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রায় ৪৭টি বই লিখেছিলেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমির সভাপতির পদও সামলেছেন। চল্লিশের দশকে যে সময় তাঁর বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে সেই সময় যে কজন কবি রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত হয়ে লেখালেখির চেষ্টা করছিলেন তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল খুবই সহজ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সমাদৃত। যে কোনও রকম প্রশ্নের কাছে তিনি কখনওই জ্ঞানীর মতো দূরত্ব বজায় রাখেননি, বন্ধুত্বের আন্তরিকতায় পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করেছেন, জানার অহংকার নিয়ে নয়, জানানোর আনন্দ নিয়েই মেতে থেকেছেন। মানুষের প্রতি ভালবাসাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে মানুষের অন্দরমহলে এবং ক্রমশ এরই কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য এক মহীরুহ প্রতিষ্ঠান। নিজের কবিতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, ‘কবিতা লেখায় আমার কল্পনার হাত নেই তেমন। চারপাশে যা দেখি, শুনি, যা অভিজ্ঞতা হয় ঘুরতে ঘুরতে, তাই নিয়েই আমার কবিতা।’ ঠিক এভাবেই চিত্তরঞ্জন এভিনিউতে উলঙ্গ এক শিশুকে রাস্তা পার হতে দেখেই তিনি লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কলকাতার যিশু’। তবে সেই উলঙ্গ ছেলেটিকে যিশুর সঙ্গে তুলনা করতে কল্পনারই তো আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর লেখায় ‘কল্পনার হাত’ নেই কথাটা তাই সর্বাংশে মানা চলে না।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী আজীবন মোহনবাগানের সমর্থক ছিলেন এবং ব্রিজ (তাস) খেলতে ভালবাসতেন। বাংলা সাহিত্য জগতের প্রতিনিধি স্বরূপ তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন।

১৯৭৪ সালে ‘উলঙ্গ রাজা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য  নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ‘সাহিত্য আকাদেমি’ পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন তাঁর জীবনে। তার মধ্যে অন্যতম হল ১৯৫৮ সালে পাওয়া ‘উল্টোরথ পুরস্কার’, ১৯৭০ সালে  পাওয়া ‘তারাশঙ্কর স্মৃতি পুরস্কার’ ও ১৯৭৬ সালে  পাওয়া ‘আনন্দ শিরোমণি’ পুরস্কার। ২০০৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. লিট প্রদান করে। বেলজিয়াম সরকার নীরেন্দ্রনাথকে গবেষণার জন্য সেই দেশে আহ্বান করেছিল। কিছুদিন সেই দেশেও তিনি ছিলেন। তবে একদিন রাত্রে সেখানে তাঁর পাশের বাড়িতে আগুন লেগে দুটি শিশুর মৃত্যু হওয়ায় তিনি নিজে খুবই বিপর্যস্ত বোধ করেন এবং ফিরে আসেন দেশে। ১৯৯০ সালে বিশ্ব কবি সম্মেলনে নীরেন্দ্রনাথ ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

নীরেন্দ্রনাথের বিবাহ হয় সুষমা চক্রবর্তীর সাথে। তাঁদের তিন ছেলে মেয়ে আছে। দুই মেয়ের নাম শিউলি চক্রবর্তী এবং সোনালী চক্রবর্তী। দুজনেই শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত আছেন।

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ৯৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading