সববাংলায়

জুডো খেলা

জাপানে উদ্ভুত জুডো খেলা (Judo Game) আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিশেষত অলিম্পিকে এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি মূলত একটি জাপানি মার্শাল আর্ট। এই মার্শাল আর্ট বিশ্বে সর্বাধিক অনুশীলন করা হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতায় যখন জুডো খেলা হয়, তখন সাধারণত এটি একটি ইনডোর গেম হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। দুজন প্রতিপক্ষের মধ্যে এই নিরস্ত্র লড়াই চলে। জাপানে ছাড়াও জুডো খেলাতে আরও যেসমস্ত দেশ অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে: ব্রাজিল, ফ্রান্স, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত প্রভৃতি।

জুডোর ইতিহাসের খোঁজ করতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে অনেকটা। জুডোর সঙ্গে জাপানি জুজুৎসুর একটা সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাবে। কামাকুরা যুগ থেকে এডো সময়কাল পর্যন্ত সামুরাই নামক পেশাদার এক শ্রেণির যোদ্ধাদের দ্বারা জাপান শাসিত হয়েছিল। তলোয়ার, ধনুক এবং তীর দিয়ে যুদ্ধ করার পাশাপাশি, সামুরাইরা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের সাথে লড়াই করার জন্য জুজুৎসু তৈরি করেছিল। এডো যুগের শুরুতে জুজুৎসুর বিভিন্ন শৈলী বিকশিত হয় এবং অস্ত্র ছাড়া কেবল হাত-যুদ্ধ সামরিক প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৬৮ সালে আধুনিক মেইজি যুগের পত্তনের পর সামুরাই শাসনের অবসান ঘটে। এক পশ্চিমা সংস্কৃতি জাপানে প্রবেশ করে। সামুরাইদের সঙ্গে সঙ্গে জুজুৎসুও পতনের দিকে এগিয়ে যায়। সেই সময় কানো জিগোরো নামে এক যুবক এই বিষয়ে সচেতন হয়ে ওঠেন। তাঁকেই আমরা আধুনিক জুডোর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জানি। এই কানো জিগোরো পড়াশোনায় ভাল হলেও তাঁর ছোটখাটো শারীরিক গঠনের জন্য তিনি হীনমন্যতায় ভুগতেন। সেই কারণে ১৭ বছর বয়সে তিনি  জুজুৎসুর তেনজিন শিনিও-রিউ স্টাইলের একজন মাস্টার ফুকুদা হাচিনোসুকের কাছে একজন শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি জুজুৎসু শৈলীর সেরা উপকরণগুলির সঙ্গে কুস্তি, মার্শাল আর্টের একটি সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ১৮৮২ সালের মে মাস নাগাদ আধুনিক জুডো খেলার জন্ম দিয়েছিলেন। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। জাপানের বাইরে জুডো চালু করার জন্য ১৮৮৯ সালে জিগোরো ইউরোপ সফর করেন। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি এবং তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৬৪ সালে অলিম্পিকে জুডো খেলার অন্তর্ভুক্তি ঘটে।

যে পোশাক পরে এই জুডো খেলা হয়ে থাকে, তাকে বলা হয় জুডোগি এবং জুডো খেলোয়াড়রা জুডোকা নামে পরিচিত হন। আন্তর্জাতিক জুডো খেলার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হল, ইন্টারন্যাশানাল জুডো ফেডারেশন। ১৪ বাই ১৪ মিটার একটি মাদুর বা তাতামির ওপর এই খেলাটি অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে ১০ বাই ১০ মিটার জায়গা থাকে মূল লড়াইয়ের জন্য। জুডোগি বা জুডোর পোশাকের সঙ্গে একটি বেল্ট পরতে হয় এবং একেকরকম রঙের বেল্ট খেলোয়াড়ের পদমর্যাদার ইঙ্গিত দেয়।
জুডো খেলা পরিচালনার জন্য একজন হেড রেফারিসহ দুজন সহকারী রেফারি থাকেন। মাদুরে পা রাখার আগে অবশ্যই দুই খেলোয়াড়কে নত হতে হবে একে অপরের কাছে। প্রত্যেক জুডোগি গোড়ালি এবং কব্জির উপরে ৫ সেন্টিমিটারের বেশি হবে না।

জুডো খেলায় ইপ্পন হল সর্বোত্তম স্কোর করার পন্থা। এই ইপ্পন লাভের প্রথম উপায়টি হল প্রতিপক্ষকে এমনভাবে মাটিতে ফেলা যাতে তার পিঠ মাটি স্পর্শ করে। ইপ্পন স্কোর করার আরেকটি বিকল্প হল এমন কৌশলে প্রতিপক্ষকে একটি জটিল শারীরিক প্যাঁচে আটকে ফেলা যাতে সে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় কিংবা অন্তত ২৫ সেকেন্ড প্রতিপক্ষকে যদি ম্যাটের ওপর অচল করে রাখা যায় তবেও ইপ্পন স্কোর করা সম্ভব। ইপ্পন যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ পয়েন্ট তেমনি ওয়াজা-আরি হল অর্ধেক পয়েন্ট। একটি বাউটে দুটি ওয়াজা-আরি কেউ অর্জন করতে পারলে তা ইপ্পনের সমান বিবেচিত হয়। আরেক ধরনের স্কোর হল ইউকো। সাধারণত ছোটখাটো থ্রো বা লকের মাধ্যমে এই পয়েন্টটি স্কোর করতে পারেন খেলোয়াড়েরা।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় একেকটি বাউট বা দফার জন্য পাঁচ মিনিট নির্ধারিত থাকে এবং যে খেলোয়াড় ইপ্পন (সর্বোত্তম স্কোর) অর্জন করতে পারে সে-ই জয়লাভ করে। কিন্তু যদি কেউ ইপ্পন স্কোর করতে না পারে তবে বাউটের শেষে যার স্কোর সর্বোচ্চ হয় সে জয়লাভ করে। কিন্তু যদি ম্যাচ ড্র হয়ে যায় তবে গোল্ডেন স্কোর দ্বারা ফলাফল নির্ধারিত হয়। তাতেও যদি শেষমেশ খেলা অমীমাংসিত থাকে তবে রেফারি এবং বিচারকের সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়।

নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য যে দু’রকম শাস্তি দেওয়া হয় জুডোতে সেগুলি হল: শিডো এবং হানসোকু মেক। শিডো সাধারণত ছোটখাটো নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য দেওয়া হয় এবং হানসোকু দেওয়া হয় গুরুতর নিয়মভঙ্গের জন্য। কোনো খেলোয়াড় যদি চারটি শিডো পান তবে তাঁর প্রতিপক্ষ একটি ইপ্পন স্কোর লাভ করেন। আবার এমনটাই ঘটে একটিমাত্র হানসোকু পেলেই।
জুডো খেলায় কনুই ছাড়া শরীরের অন্য কোনো জয়েন্টে আক্রমণ করা নিষিদ্ধ। এছাড়াও প্রতিপক্ষকে লাথি বা ঘুষি মারা, প্রতিপক্ষের মুখ স্পর্শ করা বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো আঘাত করা জুডো খেলায় সম্পূর্ণরূপে অবৈধ। জুডো খেলা যে দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে তাতেই প্রতিপক্ষের আঘাত বিষয়ে সচেতন থাকার কথা বলা হয়।

বর্তমানে জুডো খেলা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের মধ্যে জুডো খেলার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতিযোগিতা অবশ্যই অলিম্পিক, প্যারা-অলিম্পিক এবং কমনওয়েলথ গেমস। এরপরই জুডোর যে প্রতিযোগিতার কথা আসে সেটি হল ইন্টারন্যাশনাল জুডো ফেডারেশন আয়োজিত ওয়ার্ল্ড জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়াও আরও কয়েকটি জুডো প্রতিযোগিতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: এশিয়ান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ, আফ্রিকান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ, জুডো গ্রাঁ প্রি, ইউরোপীয় জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ, প্যান আমেরিকান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি।

জুডো খেলায় যে সমস্ত খেলোয়াড়রা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন: ইয়াসুহিরো ইয়ামাশিতা (জাপানি, ১৯৭৭ সালে অলিম্পিক খেতাব, ১৯৮৪ সালে জাপানের জাতীয় পুরস্কার), তাদাহিরো নোমুরা (জাপানি, তিনটি অলিম্পিক স্বর্ণপদক, ১৯৯৭ সালে বিশ্ব জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক), অ্যান্টন গিসিঙ্ক (ডাচ, বিশ্ব জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে দুবার স্বর্ণজয়ী প্রথম অ-জাপানি খেলোয়াড়, ২১টি ইউরোপীয় শিরোপার বিজেতা), ইলিয়াস ইলিয়াডিস (গ্রীক, ২০০৪ সালে অলিম্পিক স্বর্ণপদক), টেডি রিনার (ফরাসি, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ১০টি স্বর্ণপদক, ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৫টি স্বর্ণপদক) প্রমুখ।

আমাদের ভারতবর্ষও কিন্তু জুডো খেলায় পিছিয়ে নেই একেবারেই। ভারতে জুডো ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই বছরেই আন্তর্জাতিক জুডো ফেডারেশনের সাথে সংস্থাটির অধিভুক্তিকরণ হয়। ভারতীয় জাতীয় জুডো দল সিউলে অনুষ্ঠিত ১৯৮৬ সালে এশিয়ান গেমসে প্রথমবারের মতো একটি আন্তর্জাতিক জুডো ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছিল। ভারত তার প্রথম আন্তর্জাতিক চ্যাম্পিয়নশিপে মোট ৪টি ব্রোঞ্জ পদক জিতেছে। ভারতীয় জুডোকারা অলিম্পিক গেমসেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সফলভাবে। কয়েকজন সফল ভারতীয় জুডো খেলোয়াড়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: কাওয়াস বিলিমোরিয়া (অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম জুডোকাদের মধ্যে ইনি অন্যতম। কমনওয়েলথ জুডো টুর্নামেন্ট, দক্ষিণ এশিয়ান জুডো টুর্নামেন্টে বিভিন্ন পদক জয় করেছেন এবং অর্জুন পুরস্কার পেয়েছিলেন), নরেন্দ্র সিং (প্রথম ভারতীয় যিনি দুটি অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন এবং অর্জুন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন), অবতার সিং (দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে সোনা জিতেছিলেন) প্রমুখ। এছাড়া পুরুষদের পাশাপাশি ভারতীয় বেশ কিছু মহিলাও আন্তর্জাতিক স্তরের জুডো খেলায় নিজেদের অসাধারণ দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তেমনই কয়েকজন ভারতীয় মহিলা জুডোকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: তাবাবি দেবী (এশিয়ান ক্যাডেট চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জয়ী এবং অলিম্পিক ইভেন্টে পদক জেতা প্রথম ভারতীয়), কল্পনা দেবী (জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৪টি স্বর্ণপদক, কমনওয়েলথ জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক), সুশীলা লিকাম্বাম (বুদাপেস্ট গ্র্যান্ড স্ল্যামে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন) প্রমুখ।

এভাবেই ক্রমে ক্রমে ভারতও জুডো খেলায় আন্তর্জাতিক স্তরে নিজের আসন সম্মানের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading