সববাংলায়

বারাসাতের কালীপুজো

উত্তর ২৪ পরগণার এক অন্যতম ইতিহাস প্রসিদ্ধ জনপদ বারাসাত। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দুর্গাপূজায় যেমন কলকাতা বিখ্যাত, জগদ্ধাত্রী পূজায় যেমন চন্দননগর বিখ্যাত, তেমনই বারাসাতের কালীপুজো র খ্যাতি সর্বজনবিদিত। মোগল আমলে রানি যোধাবাঈয়ের সঙ্গে যেমন এই কালীপূজার ইতিহাস জড়িয়ে আছে, তেমনই বাংলার রঘু ডাকাতের প্রসঙ্গও জুড়ে আছে বারাসাতের কালীপুজো র সঙ্গে। আজও অগণিত মানুষ কালীপুজোর দিন ভিড় করেন বারাসাতের মণ্ডপে মণ্ডপে। স্থানমাহাত্ম্য, ইতিহাস আর জনশ্রুতি একেবারে মিলেমিশে গেছে বারাসাতের কালীপূজায়।

ইতিহাসের ভিত্তিতে ‘আইন-ই-আকবরী’ বই থেকে জানা যায় ১৬০০ সালে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের ব্রাহ্মণ সেনাপতি শঙ্কর চক্রবর্তী থাকতেন এই বারাসাতে। মোগল সম্রাট আকবরের সেনারা প্রথমে দুবার প্রতাপাদিত্যের কাছে পরাস্ত হয়েছিলেন। শোনা যায় যুদ্ধের আগে যশোরের যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরে পুজো দিয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন বলে প্রতাপাদিত্য হয়ে উঠতেন অজেয়। তাঁকে হারানোর জন্য সেনাপতি মানসিংহ প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে যুদ্ধে নামার আগে যশোরেশ্বরী মন্দির থেকে কালীমূর্তিকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যান গোপনে আর সেবারই মানসিংহের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতাপাদিত্য পরাজিত হন। প্রথমে তাঁর সেনাপতি শঙ্কর চক্রবর্তীকে বন্দি করে মোগল বাহিনী। কিন্তু আকবরের স্ত্রী পরমা দয়াশীলা যোধাবাঈয়ের অনুরোধে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। শোনা যায় বারাসাতের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা শঙ্কর চক্রবর্তীই চালু করেছিলেন। রানি যোধাবাঈ কারাগারে বন্দি শঙ্কর চক্রবর্তীকে তর্পণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। শঙ্কর চক্রবর্তীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কিছুদিন পরেই। এদিকে মানসিংহ যে যশোরেশ্বরী কালীমূর্তি প্রতাপাদিত্যের রাজবাড়ির মন্দির থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, রাজস্থানের অম্বরে গিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতাপাদিত্য যখন বিগ্রহ সরানোর কথা জানতে পারেন, সে সময় যশোরেশ্বরী কালীর পূজারী রামানন্দ গিরি গোস্বামীকে শাস্তিস্বরূপ নির্বাসন দিয়েছিলেন তিনি। সেই রামানন্দ গোস্বামীই ঘুরতে ঘুরতে শুখাবতী নদীর তীরে বারাসাতের আমডাঙায় এসে ওঠেন। মানসিংহ এক স্বপ্নাদেশে এই স্থানে এসে উন্মাদ রামানন্দকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য কালী মায়ের এক শান্ত-সমাহিত মূর্তি নির্মাণ করান এবং তাকে প্রতিষ্ঠা দেন আমডাঙায়। কালীমূর্তি তৈরি হয়েছিল ১৫৬১ সালে আর সেই থেকেই এই কালীমন্দির ক্রমে করুণাময়ী কালী মন্দির নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। মনে করা হয় সেদিন থেকেই বারাসাতে কালীপুজোর প্রচলন হয়। পরবর্তীকালে ১৭৫৬ সাল নাগাদ নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই পথ দিয়ে যাওয়ার সময়েও এই কালীমন্দিরের দর্শন পেয়েছিলেন। দেবী কালীর কাছে প্রার্থনা করে মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ায় কৃষ্ণচন্দ্র ৩৬৫ বিঘা জমি মন্দিরকে দান করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। ফলে বারাসাতের আমডাঙার কালী মন্দিরের ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন তা বোঝাই যায়। এমনই আরেকটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে।

বারাসাতের কালীপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রঘু ডাকাতের স্মৃতিও। বারাসাতের ডাকাত কালীবাড়ি বলে আজও বিখ্যাত কাজীপাড়ার কাছাকাছি এক প্রাচীন ভগ্নপ্রায় মন্দির। এই মন্দির প্রায় তিনশো থেকে পাঁচশো বছরের পুরনো। জনশ্রুতিতে রয়েছে এই এলাকায় একসময় রঘু ডাকাত আর তার ভাই বিধু ডাকাত এই মায়ের মন্দিরে আরাধনা করে ডাকাতি করতে বেরোতেন। ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই এলাকায় ডাকাতদের বাড়বাড়ন্ত ছিল সেকালে। শোনা যায় অষ্টধাতুর একটি কালীমূর্তিকে এখানে পুজো করতেন রঘু ডাকাত। পুজোয় নরবলি ছিল প্রধান বিষয় আর সেই নরবলির রক্তে ভেসে যেত পাশের পুকুরটিও। তবে এখন সেই অষ্টধাতুর মূর্তি নেই। ভগ্নপ্রায় মন্দিরে কেবল একটি সুপ্রাচীন বটগাছ তার অজস্র শিকড় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই বটগাছকেই এখন কালীরূপে পুজো করেন ভক্তরা। মনস্কামনা পূরণের জন্য প্রত্যেক অমাবস্যা আর মঙ্গলবারে এখানে দেবী কালীর পুজো হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী একদিন রঘু ডাকাত দেবীর আরাধনা করে ডাকাতি করতে বেরোলে ধরা পড়ে যান। সেই রাগে-ক্ষোভে ফিরে এসে তরোয়ালের এক কোপে কালীমূর্তি ভেঙে ফেলেন তিনি। এরপর থেকে সেই ভাঙা কালীমূর্তিতেই পুজো হতো বলে জানা যায়। পরে কোনো এক সময় ভাঙা মূর্তিটিই চুরি হয়ে যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading