ধর্ম

বারোয়ারি দুর্গাপূজা

পলাশীর প্রান্তরে সিরাজের পরাজয়ের পর, সুবে বাংলার মসনদে তখন ব্রিটিশের রাজত্ব। এদিকে কলকাতা জুড়ে তখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাদে হাজার হাজার জমিদারের আখড়া। জমিদারি আর বাবুয়ানি এই নিয়ে কলকাতা মত্ত ছিল। কখনো বুলবুলির লড়াই, কখনো মোরগ লড়াই আর কখনো বা বাঈজি নাচের আসরে সুরার বন্যায় ডুবে থাকা এই বিনোদনের উপাদান জারি ছিল বহু বহু কাল পর্যন্ত। এরই মধ্যে জমিদারবাড়িগুলির এক অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছিল এই দুর্গাপূজা। কে কত আড়ম্বর করতে পারে এ ছিল তারই প্রতিযোগিতা। কলকাতায় দুর্গাপূজার সূচনার ইতিহাসে প্রথমে জমিদারবাড়ির বনেদী পুজোগুলিকেই আমরা দেখতে পাই। তখন পুজো ছিল বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, জমিদারদের পরিবার-আত্মীয়স্বজন ছাড়া খুব একটা বাইরের সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকতো না। কোথাও কোথাও দিন বিশেষে সাধারণ মানুষকে ভোগ খাওয়ানো হতো। সেদিনই হয়তো সদর ফটকের ফাঁক দিয়ে মা দুর্গার মৃন্ময়ী রূপ দেখতে পেতো তারা। এই রীতি ভেঙেই একদিন দেবীকে নিয়ে আসা হল সাধারণের মাঝে, সাধারণ মানুষের সম্মিলিত পূজায় দেবী দুর্গা এলেন বাড়ি থেকে বারোয়ারিতে। বনেদী বাড়ির ব্যক্তিগত পুজো থেকে সেই প্রথম কলকাতায় চালু হল বারোয়ারি দুর্গাপূজা । তবে তারও আগে কলকাতার বাইরে গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি পূজার জন্ম হয়।

‘বারোয়ারি’ শব্দটির উৎস অনেক প্রকার। বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিকেরা বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। কেউ বলেন ‘বারোয়ারি’ কথাটা এসেছে ‘বারো-ইয়ারি’ থেকে অর্থাৎ বারোজন বন্ধুর মিলিত উদ্যোগ। আবার কারো মতে, বারো জন ওয়ারিশ থেকে এসেছে ‘বারোয়ারি’ শব্দটি যার অর্থ একই বাড়ির বারো জন ভাগীদার। তবে সর্বজনগ্রাহ্য ব্যাপার হল ‘বারো-ইয়ারি’। ‘ইয়ার’ কথার মানে বন্ধু এ তো আমরা জানিই। প্রথমে বারো জন বন্ধু একত্রে মিলেই নাকি এই পুজো করেছিলেন বলে জানা যায় এবং এই পূজায় শুধু ঐ বারো জনই সমানভাবে অবদান রাখেন। এই পূজারই পরিবর্তিত রূপ সার্বজনীন দুর্গাপূজা যেখানে আপামর জনসাধারণ মিলিতভাবে সামর্থ্যমতো চাঁদা দিয়ে দেবী দুর্গার পূজা করে। কলকাতার কুমোরটুলির দুর্গাপুজো যেমন বাংলার প্রথম সার্বজনীন দুর্গাপুজো, ঠিক তেমনই ১৭৫৯ সালে বাংলার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা হয়েছিল হুগলির গুপ্তিপাড়ায়। তবে তা দুর্গাপূজা ছিল না, ছিল দেবী জগদ্ধাত্রীর পূজা। শোনা যায়, ১৭৫৮ সালের আগে গুপ্তিপাড়ায় মূলত সেন বংশের রাজাদের বংশধরেরা দীর্ঘকাল ধরে বনেদী জগদ্ধাত্রী পুজো করে আসছিল। ১৭৫৮ সালেই এলাকার সকল প্রতিবেশী তাঁদের সন্তান-সন্তুতিদের নিয়ে সেনবাড়ির এই পুজো দেখতে গেলে দ্বাররক্ষীরা তাঁদের ঢুকতে দেন না, এমনকি যারপরনাই অপমান করে তাড়িয়ে দেন। এই কথা তাঁদের স্বামী ও পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা জানতে পেরে আশেপাশের বারোটি গ্রামের বারো জন পুরুষ একজোট হয়ে ১৭৫৯ সালে প্রথম বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। গুপ্তিপাড়ায় আজও সেই জগদ্ধাত্রী দেবীর মন্দির রয়েছে এবং তিনি সেখানে দেবী বিন্ধ্যবাসিনী নামে পূজিতা হন। মন্দিরের গায়ে বসানো ফলক থেকেই জানা যায় ১১৬৬ বঙ্গাব্দ অর্থাৎ ১৭৫৯ সালে এই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় যে সংবাদ সেকালের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’-এ প্রকাশ পেয়েছিল। জগদ্ধাত্রী দেবী দুর্গারই আরেক রূপ। এর পরে পরেই কৃষ্ণনগরচন্দনগরে বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন শুরু হয়ে যায় এবং তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

তারপরে ১৯১০ সাল। চলে আসা যাক কলকাতায়। ভবানীপুর এলাকায় ‘সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভা’ প্রতিষ্ঠা করেন বারোজন বাঙালি ব্রাহ্মণ, এদের মধ্যে আবার স্বাধীনতা সংগ্রামীও ছিলেন। এই সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার পরিচালনাতেই প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা শুরু হয় কলকাতায়। জায়গাটা অত্যন্ত মাহাত্ম্যপূর্ণ। একে আদিগঙ্গার পাশের সতীঘাট, তারপর অনতিদূরেই সতীপীঠ কালীঘাট। শোনা যায় এই সতীঘাটেই নাকি সতীদাহ প্রথা বন্ধ হওয়ার আগে আগে মুখার্জী পরিবারের দুই পতিহীনা বধূর সতীদাহ হয়েছিল। এই সতীঘাটের কল্যাণে সংলগ্ন রাস্তাটির নাম হয়েছে বর্তমানে বলরাম বসু ঘাট স্ট্রিট। এই রাস্তাতেই হয় কলকাতার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপূজা। জনশ্রুতি আছে যে এই ঘাটেই নাকি রানি রাসমণি স্নান সেরে কালীঘাটে মায়ের পুজো দিতে যেতেন। এই বলরাম বসু ঘাট স্ট্রিটের বারোয়ারি দুর্গাপূজার পরে বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসব শুরু হয়ে গেলে পরে এই পুজোর জনপ্রিয়তা খানিক ক্ষুন্ন হয়। আগে ঘাটের ধারেই পুজো হতো, অনেক পরে নন্দদুলাল ঘোষ নামের জনৈক ব্যক্তি ঘাটের পাশে একটি পাকা ঠাকুরদালান গড়ে তোলেন। এক চালার দেবী মূর্তির পূজায় উপস্থিত থাকেন পাঁচজন প্রধান পুরোহিত এবং তাঁদের আরো পাঁচজন সহকারী। উদাত্ত কণ্ঠে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণে আর নহবতের বাজনায় সুপ্রাচীনকালের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। আজও এই পুজোয় কোনো বাজনা বা মাইক ব্যবহৃত হয় না। কলকাতার বারোয়ারি দুর্গাপূজা র ইতিহাসে ভবানীপুরের এই পুজোর পরেই ১৯২৬ সালে প্রচলিত হয়েছে সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজো। তারপর বারোয়ারির ধারণাটির বদলে চলে আসে সার্বজনীন কল্পনা। ফলে সমস্ত পুজোই তারপর থেকে সার্বজনীন দুর্গোৎসবের রূপ নেয়। কিন্তু তা হলেও বাংলার বুকে দুর্গাপূজার ইতিহাস ও তার বিবর্তনের ধারাক্রমে এই বারোয়ারি পুজোগুলির গুরুত্ব অপরিসীম।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


1 Comment

1 Comment

  1. Pingback: বাগবাজারের পুজো | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

অর্জুনের পুত্রকে কেন বিয়ে করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন সেই ভিডিও

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য