সববাংলায়

কণাদ

ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রের ভান্ডার যাঁর অবদান ছাড়া সম্পূর্ণ হতে পারে না, তিনি হলেন বিখ্যাত দার্শনিক কণাদ (Kaṇāda)। কাশ্যপ, কণভুজ, কণভক্ষ ইত্যাদি নামেও তিনি পরিচিত। ভারতীয় বৈদিক দর্শনের প্রধান ছটি ধারা, যথা, ন্যায়, বৈশেষিক, সাংখ্য, যোগ, মীমাংসা এবং বেদান্ত-এর মধ্যে বৈশেষিক দর্শনশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কণাদ। তিনি দর্শনের সঙ্গে পদার্থবিদ্যাকে মিশিয়ে, যুক্তি ও বাস্তববাদ প্রয়োগ করে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও অস্তিত্বের ধারণাটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন। জন ডাল্টনের প্রায় ২৫০০ বছর আগে তিনি পরমাণু তত্ত্ব তৈরি করেছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যা করা এইসব ধারণা কণাদ সূত্র নামে পরিচিত। কণাদের ধারণাগুলি চরকের মতো পন্ডিতদেরও প্রভাবিত করেছিল বলে জানা যায়।

কণাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়, এমনকি জন্ম-মৃত্যু সম্পর্কেও নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি পণ্ডিতেরা, কেবল কিছু সূত্রানুসারে অনুমান করা হয়েছে মাত্র।

কণাদের জন্মস্থান, জন্মসময় ইত্যাদি নিয়ে কোনও সুনিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। আনুমানিক ৬০০ বা ৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমান ভারতের গুজরাট রাজ্যের অন্তর্গত প্রভাস ক্ষেত্রের কাছে কণাদের জন্ম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। জন্মের পর সম্ভবত তাঁর নাম রাখা হয়েছিল কাশ্যপ। অবশ্য অনেকে কণাদের গোত্র কাশ্যপ ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সম্ভবত উলুকা নামের একজন দার্শনিকের পুত্র ছিলেন। হয়তো-বা এই উলুকা নিজেও কোনও একটি দর্শনের ধারা চর্চা করতেন। অবশ্য কেউ কেউ উলুকা কণাদেরই অপর আরেকটি নাম বলে মনে করেন। সেই কারণে কণাদের প্রবর্তিত দর্শন ‘ঔলুক্যদর্শন’ নামেও খ্যাত।

সম্ভবত, শৈশব থেকেই কণাদ ছিলেন গভীর মনোযোগী একজন মানুষ। যেকোনো বিষয়কেই বিশদে, গভীরভাবে বুঝতে পারতেন এবং ছোট ছোট জিনিসগুলিও তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যেত না কখনও। সোমশর্ম্মা নামের একজন কণাদের গুরু ছিলেন বলে মনে করা হয়।

কণাদের জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা বহুল প্রচলিত রয়েছে। ছোটবেলায় একবার বাবার সঙ্গে প্রয়াগে তীর্থযাত্রায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে তিনি দেখেছিলেন হাজার হাজার তীর্থযাত্রী গঙ্গা তীরবর্তী মন্দিরগুলিতে নিবেদনের জন্য ফুল ও চাল ছড়িয়ে রাস্তা ভর্তি করে ফেলছেন। চালের ক্ষুদ্র দানাগুলি হঠাৎ কণাদকে ভীষণ আকৃষ্ট করেছিল। তিনি তখন সেই চালের একেকটি কণা মাটি থেকে খুঁটে খুঁটে সংগ্রহ করতে থাকেন। একজন ভিক্ষুকও সেই চাল খেতে পারবে না, তবুও কণাদ কেন তা সংগ্রহ করছেন, এটি জানার কৌতুহলেই তাঁর চারপাশে মানুষের ভিড় জমে গিয়েছিল। কণাদকে এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে, একটি কণার স্বতন্ত্র কোনও মূল্য নাও থাকতে পারে, কিন্তু শত শত কণা সংগ্রহ করা গেল, তা একজন ব্যক্তির খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পারে, অতএব পৃথিবীর সমস্ত ধনসম্পদের মতো প্রত্যেকটি কণারই গুরুত্ব রয়েছে। কথিত রয়েছে, এই যে একটিমাত্র কণারও গুরুত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন বলেই তিনি কণাদ নামে পরিচিত হয়েছিলেন সর্বসাধারণের মধ্যে। অবশ্য ন্যায়-কন্দলী অনুসারে, শস্যক্ষেত্রে পড়ে থাকা শস্যকণা খেয়ে জীবনধারণ করতেন বলেই তাঁর নাম নাম কণাদ বা কণভক্ষ হয়েছিল।

পদার্থের অবিনাশী কণা যা পরমাণু নামে পরিচিত, কণাদ সর্বপ্রথম সেই পরমাণুর ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বলেই তিনি আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন। কথিত আছে এই পরমাণু তত্ত্বের ধারণাটিও কণাদ তাঁর হাতে থাকা খাবারের থেকেই পেয়েছিলেন। কণাদ তাঁর হাতের খাবারকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম অংশে ভাঙতে ভাঙতে একসময় বুঝতে পেরেছিলেন যে, অবশিষ্ট খাবারকে আরও ক্ষুদ্র করে ভাঙা যাবে না, এবং তাঁর হাতে সেই খাবারের গন্ধ রয়ে যায়। এখান থেকেই অবিভাজ্য পদার্থের এবং অনু ও পরমাণুর ধারণার উদ্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়। অবশ্য একটি কিংবদন্তি অনুযায়ী এই খাদ্য ভাঙার গল্পটি একটু অন্যরকম। কণাদ দেখতে কুৎসিত ছিলেন বলে মেয়েরা তাঁকে ভয় পেত। তাই তিনি রাতে গোপনে শস্যভান্ডার থেকে খাবার খেতেন। একদিন তিনি যখন খাবার নিয়ে হাঁটছিলেন তখন কিছু লোকজন এসে তাঁর হাতের খাবার টুকরো করে দূরে নিক্ষেপ করতে থাকেন। সেখান থেকেই পরমাণু তত্ত্বের ধারণা কণাদ পেয়েছিলেন বলে মনে করা হয়।

কণাদের তত্ত্ব অনুযায়ী পরমাণু শাশ্বত, অবিনশ্বর এবং তাদের সংমিশ্রণের ফলেই অভিজ্ঞতামূলক বস্তুজগত গঠিত হয়ে থাকে। তাঁর মতে, সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু পরমাণু দিয়ে তৈরি এবং একেকটি পরমাণু পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে অণু গঠন করে। সহজ করে বলতে গেলে, পরমাণুর সংযোগ-বিয়োগের ফলেই এই জগতের সৃষ্টি হয়েছে।

পদার্থবিদ্যা কণাদের আলেচনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। তিনি দাবি করেছিলেন যে, সমস্ত পদার্থ চার ধরনের পরমাণুর সমন্বয়ে গঠিত,  যার মধ্যে দুটি ভরযুক্ত এবং দুটি ভরবিহীন।

কণাদের মতে ভাব-পদার্থ ছয়টি এবং অভাব পদার্থ একটি। ছয়টি ভাব পদার্থ হল, যথাক্রমে, দ্রব্য, গুণ, কর্ম, সামান্য, বিশেষ ও সমবায়। এই যে, পঞ্চম পদার্থ বিশেষ, এর থেকেই তাঁর দর্শনের নাম হয়েছে বৈশেষিক দর্শন। এই বৈশেষিক দর্শনের মধ্যেই কণাদের পারমাণবিক তত্ত্ব সম্পর্কিত ধারণার বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। কণাদের পারমাণবিক তত্ত্বের সারকথাগুলি হল –

সমস্ত কিছু বিভাজন করা যেতে পারে এবং একটা সময় পর পরমাণু তৈরি হয়। এই পরমাণু হল অবিভাজ্য, তাকে আর বিভক্ত করা যায় না। পরমাণুই হল সমস্ত বস্তুগত অস্তিত্বের ভিত্তি। পরমাণুকে কখনই খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা যায় না। পরমাণুর দুটি অবস্থা থাকতে পারে, গতির অবস্থা এবং বিশ্রামের অবস্থা।

কণাদ জীবনকে যেমন অণু ও পরমাণুর সংগঠিত রূপ বলে বর্ণনা করেছেন তেমনই, মৃত্যুকে বলেছেন পরমাণুর অসংগঠিত রূপ।

কণাদ ভারতীয় ঋষিদের মধ্যে এমন একজন ছিলেন, যিনি ঈশ্বর ছাড়াই মানুষের অস্তিত্ব বোঝার এবং মোক্ষে পৌঁছনোর ক্ষমতায় বিশ্বাস করতেন। এই কারণে অনেকে তাঁকে নাস্তিক বলে থাকেন।

কণাদের মতে নয় প্রকার দ্রব্য পদার্থ হল, পরমাণুর চারটি শ্রেণি যথা পৃথিবী, জল, আলো, বায়ু এবং স্থান, সময়, দিক, আত্মার অসীমতা ও মন। তাঁর মতে গুণ পদার্থ হল ২৪ প্রকার।

বৈশেষিক সূত্রের পঞ্চম অধ্যায়ে কণাদ তাপের উপর দিকে ওঠা, ঘাসের উপরদিকে বৃদ্ধি, মাটিতে বস্তুর পতন, বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাত ইত্যাদি বিভিন্ন অভিজ্ঞতামূলক পর্যবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। পর্যবেক্ষিত ঘটনাগুলিকে তিনি দুটি ভাগে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন, যথা, ইচ্ছের কারণে সৃষ্ট এবং বিষয় ও বস্তুর সংযোগ দ্বারা সৃষ্ট। এই প্রসঙ্গে তিনি বেদান্তের অপরা জ্ঞান অর্থাৎ স্বাভাবিক সহযোগী জ্ঞান এবং পরা জ্ঞান অর্থাৎ গভীর বিষয়গত জ্ঞানের কথা বলেন। ধর্মের প্রসঙ্গে কণাদ বলেন, ধর্ম হল তাই যা থেকে উচ্চতা এবং মুক্তি অর্জন করা যায়।

কণাদের লেখায় বল ও গতির সম্পর্ক নিয়ে দার্শনিক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়, যেগুলির সঙ্গে আধুনিক পদার্থবিদ্যার কিছু ধারণার সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। তিনি গতি পরিবর্তনের কারণ, ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়ার ধারণা, বলের প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কে দার্শনিক পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেছিলেন।

একটি প্রবাদ অনুযায়ী কণাদ কঠোর যোগাভ্যাসের ফলে শিবের অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হয়েছিলেন এবং শিব তাঁর কঠোর তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে কণাদের সম্মুখে উলুকা অর্থাৎ পেঁচা রূপে আবির্ভূত হয়ে ষটপদার্থের উপদেশ দান করে গিয়েছিলেন। বায়ুপুরাণেও উল্লিখিত রয়েছে যে, কণাদ একজন শিবভক্ত অর্থাৎ শৈব ছিলেন।

কণাদ শুধু যে দর্শনশাস্ত্রের পণ্ডিতদেরই প্রভাবিত করেছিলেন তাই নয়, চরকের মতো চিকিৎসাশাস্ত্রেরও বিখ্যাত মানুষদের প্রভাবিত করেছিলেন তিনি।

উনিশ শতকের বৈজ্ঞানিক জন ডাল্টনকে পারমাণবিক তত্ত্বের জনক বলা হলেও তাঁর চেয়ে প্রায় ২৬০০ বছর আগে কণাদের বৈশেষিক দর্শনে পরমাণু তত্ত্বের হদিশ মেলে, ফলে এই তত্ত্বের জনক হিসেবে ডাল্টনের নাম করা হলেও তাকে ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধে উঠেছে। তবে ডাল্টন আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরমাণুবাদের জনক যেখানে কণাদের পরমাণুবাদ মূলত দার্শনিক ও তাত্ত্বিক মতবাদ।

কণাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য পাওয়া যায় না, ফলে তাঁর মৃত্যুর সময়কালটি নির্ণয় করাও প্রায় দূরূহ হয়ে পড়েছে পন্ডিতদের পক্ষে। তবে, ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ থেকে দ্বিতীয় শতাব্দী—এই সময়কালের মধ্যেই কণাদ জীবিত ছিলেন। ভারতীয় দর্শনের প্রভাবশালী দার্শনিকদের মধ্যে কণাদ নিঃসন্দেহে অন্যতম একজন।

কণাদের বৈশেষিক দর্শন শুধু ভারতীয় দর্শনের ভাণ্ডারেই সীমাবদ্ধ নয়, আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। তিনি যে পরমাণু তত্ত্বের ধারণা দিয়েছিলেন, তা পরবর্তীকালে গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাসের ভাবনার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায় এবং বহু শতাব্দী পরে জন ডাল্টনের বৈজ্ঞানিক পরমাণু তত্ত্বে নতুন রূপে প্রকাশ পায়। কণাদ প্রথম দেখিয়েছিলেন যে সমস্ত পদার্থ ক্ষুদ্রতম অবিভাজ্য কণা দিয়ে গঠিত, যাকে তিনি পরমাণু বলেছেন, এবং এই পরমাণুগুলি মিলিত হয়ে অণু তৈরি করে দৃশ্যমান জগতের সৃষ্টি করে। তাঁর পর্যবেক্ষণভিত্তিক যুক্তি—যেমন তাপের ঊর্ধ্বগতি, বস্তুর পতন, বজ্রপাত—প্রকৃতির নিয়মকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার এক প্রাথমিক প্রচেষ্টা ছিল। আধুনিক পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের মৌলিক ধারণার সঙ্গে কণাদের চিন্তার মিল থাকায় তাঁকে অনেক গবেষক প্রাচীন ভারতের এক বৈজ্ঞানিক মননশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখেন। এই কারণে কণাদের দর্শন শুধু আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ নয়, বরং বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবজাতির যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের এক অমূল্য অধ্যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading