বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ক্রিকেটার এবং মিডিয়াম ফাস্ট বোলার কপিল দেব (Kapil Dev)। ১৯৮৩ সালে ভারতের প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ২০০২ সালে উইজডেন তাঁকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় ভারতীয় ক্রিকেটার হিসেবে সম্মানিত করে। ১৯৯৪ সালে তাঁর অবসর গ্রহণের সময় টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সংখ্যক উইকেট নেওয়ার রেকর্ড ছিল তাঁরই। তবে টেস্ট হোক বা ওয়ান ডে বিগত শতাব্দীর ক্রিকেটের জগতে ‘হরিয়ানা হারিকেন’ নামে খ্যাত কপিল দেব ছিলেন অপ্রতিহত এক উইকেট-সংগ্রাহক। সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট-সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সেই টেস্ট ক্রিকেটে ১০০টি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব ছিল কপিল দেবের। সমগ্র ক্রীড়া জীবনে ৪০০-এরও বেশি উইকেট নেওয়া আর টেস্টে ৫০০০-এর বেশি রান করার মধ্য দিয়ে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউণ্ডার ক্রিকেটারের শিরোপা পেয়েছেন কপিল দেব। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় দলের প্রশিক্ষকের পদে আসীন ছিলেন তিনি। ২০১০ সালে তাঁকে ‘আইসিসি ক্রিকেট হল অফ ফেম’ সম্মানে ভূষিত করা হয়।
১৯৫৯ সালের ৬ জানুয়ারি চণ্ডীগড়ে কপিল দেবের জন্ম হয়। তাঁর আসল নাম কপিলদেব রামলাল নিখাঞ্জ। তাঁর বাবা রামলাল নিখাঞ্জ পেশায় একজন কাঠ ব্যবসায়ী ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল রাজকুমারী দেবী। চণ্ডীগড়ে আসার আগে তাঁর পরিবার দেশভাগের পরবর্তী সময়ে ফাজিলকায় থাকতেন। কপিল দেবের পৈতৃক নিবাস ছিল মন্টেগোমারিতে আর তাঁর মায়ের জন্ম হয়েছিল ওকারার পাকপত্তনে। কপিল দেবের স্ত্রীয়ের নাম রোমি ভাটিয়া দেব এবং তাঁদের কন্যাসন্তানের নাম অমিয়া দেব।
দয়ানন্দ অ্যাংলো বৈদিক স্কুলে কপিল দেবের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন হয়। স্কুলে পড়াশোনার সময় থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন কপিল এবং হরিয়ানার ঘরোয়া ক্রিকেট দলে খেলার সুযোগ পান তিনি। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে হরিয়ানার হয়ে একটি ম্যাচে মোট ৬টি উইকেট নিয়ে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেন। তাঁর কৃতিত্বেই হরিয়ানা সেই ম্যাচটি জিতে যায়। ঐ মরশুমে ৩০টি ম্যাচে মোট ১২১টি উইকেট নেন কপিল দেব। ১৯৭৬-৭৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের বিরুদ্ধে সেশনে মোটামুটি ভালো খেলে হরিয়ানা দলকে প্রাক-কোয়ার্টার ফাইনাল স্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে সাহায্য করেন তিনি। এই মরশুমের পরে কপিল দেব তাঁর অন্যতম সেরা কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন ৯ ওভারে মাত্র ২০ রানে ৮টি উইকেট নিয়ে। অনূর্ধ্ব ১৯ খেলায় বাংলার দলকে ৫৮ রানে পরাজিত করে কপিল দেবের নেতৃত্বে হরিয়ানার ক্রিকেট দল। ১৯৭৭-৭৮ সালের মরশুমে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রথমবার তিনি সার্ভিসেসের বিরুদ্ধে ১০টি উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েন। ঐ মরশুমেই ৪টি ম্যাচে মোট ২৩টি উইকেট নিয়ে কপিল দেব ইরানি ট্রফি, দলীপ ট্রফি এবং উইলস ট্রফি অর্জন করেন। ১৯৭৮-৭৯ সালের মরশুমে বাংলার দলের সঙ্গে হরিয়ানার পুনরায় একটি প্রাক-কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ৪টি ম্যাচে ১২টি উইকেট নেন কপিল দেব। গ্রুপ স্তরের ম্যাচে পরপর দুটি অর্ধ শতরান করেন তিনি। এই ম্যাচের প্রথম ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিলেও পরের ইনিংসে খুব একটা ভালো না খেলায় হরিয়ানা বাংলার কাছে হেরে যায়। ইরানি ট্রফি ম্যাচে ৬২ রান করে অষ্টম স্থানে উন্নীত হন তিনি। দলীপ ট্রফির ফাইনাল ম্যাচে ২৪ ওভারে মাত্র ৬৫ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট নিয়ে কপিল দেব জাতীয় স্তরে খেলার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। এরপরে দেওধর ট্রফি এবং উইলস ট্রফিতে নর্থ জোন স্কোয়াডের হয়ে খেলতে নেমেছিলেন কপিল দেব। ঐ বছরই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলেন তিনি। ১৯৭৯-৮০ সালে দিল্লির বিরুদ্ধে একটি ম্যাচে ক্রীড়া জীবনের প্রথম শত রান করেন কপিল। ঐ বছরই হরিয়ানার অধিনায়ক হিসেবে উত্তর প্রদেশের বিরুদ্ধে খেলতে নামেন তিনি। ১৯৯০-৯১ সালের রঞ্জি মরশুমে বাংলার বিরুদ্ধে সেমি ফাইনাল ম্যাচে ১৪১ রান করার পাশাপাশি ৫ উইকেট নিয়ে হরিয়ানাকে ৬০৫ রান করতে সাহায্য করেছিলেন কপিল দেব। ঐ ম্যাচেই প্রথম তিনি রঞ্জি ট্রফি জেতেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে ইংল্যাণ্ডের নর্থ্যাম্পটনশায়ারে এবং ১৯৮৪-৮৫ সাল নাগাদ ওরচেস্টারশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছিলেন তিনি। কাউন্টি ক্রিকেটের পূর্ণ সময়কালে মোট ৪০টি ফার্স্টক্লাস ম্যাচ খেলেছেন কপিল দেব। মোট ৬৪টি ইনিংসে ৪টি সেঞ্চুরি, ১৪টি অর্ধ শতরান মিলিয়ে মোট ২৩১২ রান করেন তিনি।
১৯৭৮ সালের ১৬ অক্টোবর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে প্রথম টেস্ট ক্রিকেটের জগতে পদার্পণ করেন কপিল দেব। পেস এবং বাউন্সার বোলিং রীতিতে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের হতভম্ব করে দিয়েছিলেন তিনি। আউট-সুইঙ্গার বল করে প্রথম তিনি সাদিক মহম্মদের উইকেট নেন। এরপরে করাচির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচ খেলার সময় মাত্র ৩৩ বলে ভারতের দ্রুততম অর্ধ শতরান করেন কপিল দেব। এই ম্যাচে প্রত্যেক ইনিংসে দুটি করে ছয় মেরেছিলেন তিনি। এরপরে দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের বিরুদ্ধে সিরিজে প্রথম টেস্ট ম্যাচের শত রান অর্জন করেন কপিল। ১২৪ বলে ১২৬ রান করার কৃতিত্বের সঙ্গে ৩৩ ওভারে ১৭টি উইকেট নিয়ে প্রথম অলরাউণ্ডার ক্রিকেটারের শিরোপা অর্জন করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে মোট ২৮ উইকেট নিয়ে ভারতের প্রথম প্রিমিয়ার ফাস্ট বোলার হিসেবে নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন তিনি। এই ম্যাচে মোট ২১২ রান করেছিলেন কপিল দেব। ১৯৭৯-৮০ সালে প্রথমে বম্বের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ব্যাটিং এবং পরে মাদ্রাজের চিপক স্টেডিয়ামে ব্যাটিং ও বোলিং উভয়ের কৃতিত্ব দেখান তিনি। এই টেস্ট সিরিজ খেলার সময়েই তিনি সর্বকনিষ্ঠ অলরাউণ্ডার ক্রিকেটার হিসেবে ১০০ উইকেট এবং ১০০০ রানের রেকর্ড তৈরি করেন কপিল দেব। ১৯৮০-৮১ সালে ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্রিসবেনে নিউজিল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রথম অর্ধ শতরান করেন কপিল দেব। ১৯৮১-৮২ সালে ইংল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে ঘরোয়া খেলায় বম্বের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে পাঁচটি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান তিনি। একইসঙ্গে তিনি মোট ২১৮ রান আর ২২ উইকেট নিয়ে ‘ম্যান অফ দ্য সিরিজ’ সম্মানে ভূষিত হন। এরপরে ১৯৮২-৮৩ সালের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ম্যাচে কপিল দেব এবং মহিন্দর অমরনাথের কাছে সবথেকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ছিলেন অলরাউণ্ডার ইমরান খান। এই সিরিজে প্রথমে করাচির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে ১০২ রানের বিনিময়ে ৫ উইকেট, পরে ফয়সালাবাদের ইকবাল স্টেডিয়ামে ২২০ রানের বিনিময়ে ৭ উইকেট এবং সবশেষে লাহোরের গদ্দাফি স্টেডিয়ামে ৮৫ রানের বিনিময়ে ৮ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন কপিল দেব। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই টেস্ট ম্যাচে পরাজয়ের পরেই সুনীল গাভাস্কারের পরিবর্তে ২৪ বছর বয়সী কপিল দেবকেই ভারতীয় জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত করা হয়।
১৯৮৩ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনিই। এর আগে বেশ কয়েকটি টেস্ট ম্যাচে ভারতের পরাজয় ক্রিকেটার এবং আপামর ভারতবাসীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ওয়েস্ট ইণ্ডিজকে পরাজিত করে ভারতীয় দল। এর পরে দ্বিতীয় ম্যাচে জিম্বাবোয়েকেও পরাজিত করে তৃতীয় ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলায় বেশ সমস্যার সম্মুখীন হয় ভারতীয় ক্রিকেট দল। এই ম্যাচে ১৬২ রানের ব্যবধানে হেরে যায় ভারতীয় দল। এর পরে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের কাছে পরাজিত হয়ে ভারত জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে এক কঠিন পরিস্থিতিতে খেলতে শুরু করে। প্রথমে টসে জিতে ব্যাটিং করতে নামলেও একের পর এক দুর্ধর্ষ ব্যাটসম্যানেরা জিম্বাবোয়ের বোলারদের কাছে আউট হতে থাকেন। মাত্র ১৭ রানে পাঁচ উইকেট চলে যাওয়ার পরে কপিল দেব মাঠে নামেন এবং অভাবনীয়ভাবে শত রান করে দলের সকলকে উজ্জীবিত করে তোলেন। ১৩৮ বলে ১৭৫ রান করতে সক্ষম হয়েছিলেন কপিল দেব। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারতীয় কোনো ব্যাটসম্যানের করা সেটাই ছিল প্রথম সেঞ্চুরি। জিম্বাবোয়েকে পরাজিত করার পরে অস্ট্রেলিয়াকেও পরাজিত করে ভারতীয় ক্রিকেট দল। তারপর চূড়ান্ত ম্যাচে ওয়েস্ট ইণ্ডিজকে পরাজিত করে প্রথম ভারতকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিততে সাহায্য করেন কপিল দেব। শেষ ম্যাচে ভিভ রিচার্ডসের মারা শট কপিল দেবের ক্যাচ ধরার অপূর্ব কৌশল আজও ভারতীয়রা মনে রেখেছে।
১৯৯৪ সালে তাঁর অবসর গ্রহণের সময় টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সংখ্যক উইকেট নেওয়ার রেকর্ড ছিল তাঁরই। সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বোচ্চ উইকেট-সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। মাত্র ২১ বছর বয়সেই টেস্ট ক্রিকেটে ১০০টি উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব ছিল কপিল দেবের। সমগ্র ক্রীড়া জীবনে ৪০০-এরও বেশি উইকেট নেওয়া আর টেস্টে ৫০০০-এর বেশি রান করার মধ্য দিয়ে ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউণ্ডার ক্রিকেটারের শিরোপা পেয়েছেন কপিল দেব।
১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রশিক্ষকের পদে আসীন ছিলেন কপিল দেব। এছাড়া ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ইণ্ডিয়ান টেরিটোরিয়াল আর্মির একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেলের পদে অধিষ্ঠিত হন তিনি। ২০১৯ সালে হরিয়ানার স্পোর্টস ইউনিভার্সিটির প্রথম উপাচার্য হিসেবে নির্বাচিত হন কপিল দেব।
মোট তিনটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ রচনা করেছেন কপিল দেব যেগুলি হল যথাক্রমে বাই গডস ডিক্রি (১৯৮৫), ক্রিকেট মাই স্টাইল (১৯৮৭) এবং স্ট্রেট ফ্রম দ্য হার্ট (২০০৪)। ২০১৯ সালে ‘উই, দ্য শিখস’ নামে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়।
১৯৭৯-৮০ সালে অর্জুন পুরস্কার, ১৯৮২ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার এবং ১৯৯১ সালে পদ্মভূষণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কপিল দেব। ২০১০ সালে তাঁকে আইসিসি ক্রিকেট হল অফ ফেম সম্মানে ভূষিত করা হয়।
সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ১৯৮৩ সালের সেই গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপ জয়ের প্রেক্ষাপটে ‘৮৩’ নামের একটি ছবি মুক্তি পেয়েছে যেখানে কপিল দেবের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রণবীর সিং।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান