কলকাতা টাউন হল (Kolkata Town Hall) হল শহরের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং বর্তমান কলকাতার অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। এই ভবন ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সভার সাক্ষী হয়ে আজ দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার বিবাদী বাগে অবস্থিত এই ভবনটি ব্রিটিশ আমলের রোমান-ডোরিক স্থাপত্যের একটি চমৎকার উদাহরণ। ঔপনিবেশিক আমলে ইউরোপীয়রা এই ভবনকে একটি অভিজাত স্থান হিসাবে মনে করতেন। মূলত ইউরোপীয়দের সামাজিক জমায়েতের জন্য এই ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে কলকাতা পুরসভার অধীনস্থ এই ভবনটি একটি মিউজিয়াম ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়।
কলকাতা টাউন হল কোথায়
ঐতিহাসিক টাউন হল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরের বিবাদী বাগে অবস্থিত। পূর্বে এই এলাকাটি ডালহৌসি স্কোয়ার নামে পরিচিত ছিল। এছাড়া এই ভবনটি কলকাতার রাজভবন, বিধানসভা, এবং হাইকোর্টের কাছেই অবস্থিত। কলকাতা টাউন হল প্রায় বারো হাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে।
কলকাতা টাউন হলের ইতিহাস
ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় সামাজিক সমাবেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল কলকাতা টাউন হল। ১৮০৭ সালে ইউরোপীয় অধিবাসীরা শহরের মধ্যস্থলে একটি সভাগৃহ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। তবে সেই সময়ে কলকাতায় নগর পরিকল্পনার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোনো সরাসরি অর্থ বরাদ্দ করত না। তাই কলকাতা টাউন হল নির্মাণের জন্য লটারির মাধ্যমে চাঁদা তোলা হয়। লটারি থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৭ লক্ষ টাকা ব্যয় করে ১৮১৩ সালে দোতলা একটি ভবন নির্মাণ করা হয়, যা কলকাতা টাউন হল নামে পরিচিত। এই ভবনের স্থপতি ও প্রকৌশলী ছিলেন মেজর-জেনারেল জন গারস্টিন। এখানে ইউরোপীয়দের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন সভা অনুষ্ঠিত হত। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি অনুষ্ঠানও এখানে আয়োজন করা হত।
১৮৬৭ সালে টাউন হলটি কলকাতা পৌরসভার নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৮৭০-এর দশকে কলকাতা হাইকোর্টের বর্তমান ভবনটি নির্মাণের সময় কলকাতা টাউন হল ও তার সংলগ্ন এলাকাকে অস্থায়ীভাবে বিচারবিভাগীয় কাজের জন্য ব্যবহার করা হত। ১৮৭১ সালে কলকাতা হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি স্যার জন প্যাক্সটন নরম্যান যখন কলকাতা টাউন হলের সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন, তখন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি তাঁকে ছুরি দিয়ে হত্যা করে। ঐতিহাসিকদের মতে, নরম্যান, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ও বিপ্লবীদের কঠোর শাস্তি দিতেন বলেই তাকে এইভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তার নিজস্ব বড় ভবন না থাকায় ১৮৭২ সাল পর্যন্ত এখানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হত। এরপর ১৮৭৮ সালে এখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সভা চালু হয়। ব্রাহ্ম সমাজ ছাড়াও ভারতীয় নানা সমিতি এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই হল ব্যবহার করা হত। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতা টাউন হলে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের উপর তাঁর প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা জনসমক্ষে প্রদর্শন করেছিলেন। বেতার তরঙ্গের সাহায্যে তিনি বিনা তারে বার্তা পাঠানোর ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি এখানেই সফলভাবে দেখিয়েছিলেন। এই সময় তরঙ্গ পাঠিয়ে তিনি টাউন হলের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দেওয়াল ভেদ করে প্রায় ৭৫ ফুট দূরে থাকা একটি বৈদ্যুতিক ঘণ্টা বাজিয়ে ছিলেন ও বারুদের স্তূপে আগুন ধরিয়েছিলেন।
এরপর ১৮৯৭ সালে কলকাতা টাউন হলের অভ্যন্তর ভাগে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা টাউন হলে ব্রিটিশ সরকারের বাকস্বাধীনতা হরণের প্রচেষ্টার প্রতিবাদে আয়োজিত গুরুত্বপূর্ণ একটি সভায় অংশ নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫০তম এবং ৭০তম জন্মদিন মহাসমারোহে এখানে উদযাপন করা হয়েছিল। ভাইসরয় লর্ড কার্জনের ভারত বিভাগের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে কলকাতা টাউন হলে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়। এই সভা থেকে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির ডাক দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। কলকাতার টাউন হলে মার্বেলে রামনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত একটি মূর্তি ছাড়াও বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তবে পরবর্তীকালে রামনাথ ঠাকুরের মূর্তি ছাড়া প্রায় সমস্ত মূর্তিগুলি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। এরপর দ্বৈতশাসন চালু হওয়ার পর টাউন হলটি বঙ্গীয় আইন পরিষদের কাউন্সিল কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিশেষ করে ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কলকাতায় খাদ্য সংকট মোকাবিলার জন্য সরকার অস্থায়ীভাবে এখানে একটি রেশনের অফিস খুলেছিল। তবে স্বাধীনতার পর বেশ কিছুদিন কলকাতা টাউন হল জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। এই সময় এই ভবনটি ভাঙার প্রস্তাবও আনা হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে তহবিল সংগ্রহ করে এই ভবনটি আবার পুনর্নির্মাণ করা হয়। এরপর ১৯৯৫ সালে টাউন হলে কলকাতা পৌরসংস্থা ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যৌথ উদ্যোগে একটি ছোট থিম মিউজিয়াম চালু করা হয়েছিল। কলকাতা শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরাই ছিল এই মিউজিয়ামের উদ্দেশ্য।
১৯৯৮ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এবং কলকাতা হাইকোর্টের উদ্যোগে ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটি আবার সংস্কার করা হয়। ১৯৯৯ সালে কলকাতা পৌরসংস্থা কলকাতার ইতিহাস গবেষক ও বিশেষজ্ঞ পিটি নায়ারের কাছ থেকে কলকাতার উপর লেখা দুর্লভ বই এবং জার্নালের সম্পূর্ণ সংগ্রহ কিনে এখানে একটি রেফারেন্স লাইব্রেরি তৈরি করে। ২০০২ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের উদ্যোগে কলকাতা টাউন হলে ‘কলকাতা প্যানোরামা’ নামে একটি মিউজিয়াম তৈরি করা হয়। এটি কোনো সাধারণ জাদুঘর নয়, এখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অ্যানিমেটেড লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো-এর মাধ্যমে কলকাতার ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়।
কলকাতা টাউন হলের গঠনশৈলী
সাদা ঝলমলে দ্বিতল কলকাতা টাউন হলে রোমান-ডোরিক স্থাপত্য শৈলীর প্রভাব বিদ্যমান। এছাড়া এই স্থাপত্যে নব্যধ্রুপদী এবং প্যালাডিয়ান স্থাপত্য ও রাজকীয় রোমান সেনেটের স্থাপত্যশৈলীর মিশ্রণও দেখা যায়। এই ভবনে রয়েছে একটি বিশাল মনোরম স্তম্ভযুক্ত বারান্দা ও বড় সিঁড়ি। রোমান স্থাপত্যের অনুকরণে এখানে বড় বড় স্তম্ভ, উঁচু খিলানযুক্ত জানালা তৈরি করা হয়েছিল। কলকাতা টাউন হলের পেছনের দিকে একটি উঁচু আচ্ছাদিত পোর্টিকোর নীচে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। এই ভবনের ছাদটি সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তবে সময়ের সাথে সাথে কাঠের অংশগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরবর্তীকালে ঢালাই লোহা ও রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে শক্তিশালী ছাদ তৈরি করা হয়েছে। এই হলের ছাদটির উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট।
জনজীবনে কলকাতা টাউন হলের প্রভাব
রাজা রামমোহন রায়, রাধাকান্ত দেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, রামনাথ ঠাকুর, মতিলাল শীল, রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মতো উনিশ শতকের বিখ্যাত ব্যক্তিরা এখানে নিয়মিত সভা করতেন। এছাড়াও উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতার টাউন হল ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সভা ও চিন্তার আদান-প্রদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
কলকাতা টাউন হলের ভিতরে ‘কলকাতা প্যানোরামা’ নামক যাদুঘরে দর্শনার্থীরা শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মডেল, ভিডিও এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী উপভোগ করতে পারি। এছাড়া এখানকার সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে ঐতিহাসিক নথি, পাণ্ডুলিপি এবং পাণ্ডিত্যপূর্ণ বই গবেষকদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে এখানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন শিক্ষামূলক সেমিনার, বক্তৃতা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। আর ডোরিক স্থাপত্যের চমৎকার নিদর্শন দেখতে প্রতিবছর বহু পর্যটক এখানে আসেন। এছাড়া এই হলটি বর্তমানে বিভিন্ন প্রদর্শনী, কর্মশালা এবং জনসভার জন্য ভাড়াও দেওয়া হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান