মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা

মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যেমন সশস্ত্র গুপ্ত বিপ্লবী অভ্যুত্থানের এক গভীর সংযোগ ছিল, তেমনই এই সশস্ত্র বিপ্লবের হাত ধরেই রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শে ভারতেও কমিউনিস্ট ভাবধারার বীজ রোপিত হয়। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্ন থেকে নানাবিধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তাকে যেতে হয়েছে। কমিউনিজমে দীক্ষিত বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ভারতের শাসনকারী ইংরেজদের পরাহত করে পূর্ণ স্বরাজ অর্জন করতে চেয়েছিল। সেই ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার পরে আরেকটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ মামলা হল মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা (Meerut Conspiracy Case)। ভারতে ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলা কমিউনিস্ট প্রভাবকে খর্ব করতে এভাবেই একের পর এক মামলা দায়ের করতে থাকে ব্রিটিশ সরকার আর ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে শুরু হওয়া এই মামলা ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন দিক উন্মোচন করে।

১৯২৯ সালের ২০ মার্চ শুরু হওয়া এই মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা ১৯৩৩ সালের ৩ আগস্ট পর্যন্ত চলেছিল। মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন ২৭ জন কমিউনিস্ট নেতা। অভিযুক্তদের নাম হল যথাক্রমে – মুজফ্‌ফর আহমেদ, এস. এ. ডাঙ্গে, এস. ভি. ঘাটে, কে. এন. যোগলেকর, আর. এস. নিম্বকর, এস. এস. মিরজকর, শওকত ওসমানী, মীর আবদুল মজিদ, ধরনীকান্ত গোস্বামী, সোহন সিং যশ, অযোধ্যা প্রসাদ, গঙ্গাধর অধিকারী, পূরণ চাঁদ যোশী, এম. জি. দেশাই, গোপেন্দ্র চক্রবর্তী, গোপাল চন্দ্র বসাক, রাধারমণ মিত্র, কেদারনাথ সেহগাল, শামসুল হুদা, এ.এ. আলভে, জি. আর. কাসলে, গৌরীশঙ্কর, লক্ষ্মণ রাও কদম এবং দুজন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট ফিলিপ স্প্রাট ও বি. এফ. ব্রাডলে। এছাড়াও অভিযুক্ত ছিলেন এইচ. এল. হাচিনসন এবং এস. এইচ. ঝাবওয়ালা। তবে অনেক ঐতিহাসিক বলে থাকেন ব্রিটিশ পুলিশ মোট ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করে তাদের বিরুদ্ধে এই মামলা রুজু করেছিল। এই মামলায় কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পক্ষে আদালতে সওয়াল-জবাব করেছিলেন জওহরলাল নেহেরু, এম. সি. চাগলা, এম. এ. আনসারী প্রমুখ। আর ব্রিটিশদের পক্ষে মামলা লড়েছিলেন আর. এ. হর্টন এবং চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি মিস্টার আর. এল. ইয়র্ক।

উত্তরপ্রদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর এই মীরাট যেখানে প্রথম ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। সেই সিপাহি বিদ্রোহই ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ। আর এই মীরাটেই কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে শুরু হয় এই মামলা। মামলার প্রেক্ষাপট সুবিস্তৃত। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে মোটামুটিভাবে ১৯২০ সালের পর থেকেই কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয় এবং সমগ্র ভারতে কমিউনিস্ট ভাবধারা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রাশিয়ার বলশেভিক বিপ্লব এই ক্ষেত্রে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করেছিল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা, কারাবাস ইত্যাদি বাধাকে তুচ্ছ করে কমিউনিস্ট নেতারা প্রাণ বাজি রেখে দেশের মধ্যে দলীয় সংগঠন গড়ে তোলার কাজে লিপ্ত হয়। ব্রিটিশরা এই কমিউনিস্টদেরই মোক্ষম প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে একের পর এক দমনমূলক মামলা রুজু করতে থাকে। ১৯২৪ সালে পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা এবং ঐ বছরই কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯২৮ সালের শেষ দিকে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক সংগঠনগুলি একত্রিত হয়ে তৈরি হয় ‘ওয়ার্কার্স অ্যাণ্ড পিজ্যান্টস্‌ পার্টি’ অর্থাৎ শ্রমিক-কৃষক সংগঠন। অল ইণ্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসে তখন কমিউনিস্ট নেতারাই প্রধান হয়ে উঠেছেন। ফলে সমগ্র ভারত জুড়ে কৃষক ও শ্রমিকরা এক ছাতার তলায় আসেন যা এক প্রকারের কৃষক-শ্রমিক অভ্যুত্থান বলা চলে। ইতিমধ্যে রাশিয়ায় গড়ে উঠেছে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল যাকে সংক্ষেপে বলা হতো কমিন্টার্ণ। এই কমিন্টার্ণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও শাখা বিস্তার করতে শুরু করে। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সমস্ত দেশের বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো। এই উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলি গড়ে ওঠে। আর এই উদ্দেশ্যে ব্রিটেনেও একটি কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয় যার শাখা হিসেবে ব্রিটিশ শাসিত ভারতে ১৯২১ সালে স্থাপিত হয় ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি। কমিন্টার্ণের পক্ষ থেকে দুজন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতা ফিলিপ স্প্রাট এবং বি.এফ ব্রাডলিকে ভারতে এই পার্টি তৈরির বিন্যাস ও সজ্জা স্থিরীকরণের জন্য পাঠানো হয়। তাদের সহায়তাতেই গড়ে ওঠা শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনের প্রথম অধিবেশন আয়োজিত হয় মীরাটে। ফলে ভারতে আবার কমিউনিস্ট ভাবধারার ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি লক্ষ করে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেপ্তার শুরু করে। ১৯২৯ সালের ১৪ মার্চ তারিখে ইণ্ডিয়া ইন কাউন্সিলের গভর্নর জেনারেল ভারতীয় কয়েকজন কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২১-এ ধারা অনুসারে মামলা দায়ের করেন। সেই মতো মীরাটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ অনুসারে ১৫ মার্চ সন্দেহভাজন কমিউনিস্টদের গ্রেপ্তার করা শুরু করে। সমগ্র দেশ জুড়ে শুরু হয় তল্লাশি ও ধরপাকড়। এই সময় বইপত্র, কাগজ, ইস্তাহার, প্রচারপত্র সবকিছুই পুলিশ বাজেয়াপ্ত করে। ভারতের কৃষক ও স্রমিক সংগঠন, কিছু ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে দুজন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট নেতা সহ মোট ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা ছাড়াও আরো দুই জন সন্দেহভাজন ছিলেন ব্রিটিশ কমিউনিস্ট এইচ. এল. হাচিনসন এবং আমির হায়দার খান। আমির হায়দার খান আমেরিকার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়ে পরে মস্কোয় চলে যান প্রশিক্ষণ নিতে এবং মস্কো থেকে ভারতে ফিরে জেনারেল মোটরস কোম্পানিতে কাজে যুক্ত হন। কিছুদিন পরে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে কৌশলে ইউরোপে পালিয়ে যান তিনি। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। অন্যদিকে হাচিনসনও আমেরিকায় পালিয়ে গিয়ে নাবিকের কাজ নেন। শোনা যায় মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার একেবারে শেষে গ্রেপ্তার করা হয় আমির হায়দার খানকে। মাদ্রাজ জেলে বন্দি করে রেখেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে শুরু হয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা যা ইতিহাসে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা নামেই বেশি পরিচিত। ‘কমিউনিস্টস চ্যালেঞ্জ ইম্পেরিয়ালিজম ফ্রম দ্য ডক’ বইয়ের ভূমিকায় মুজফ্‌ফর আহমেদের বয়ান থেকে জানা যায় যে, ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে মামলা লড়ার জন্য উকিল নির্বাচিত হয়েছিলেন ব্যারিস্টার মিস্টার ল্যাংফোর্ড জেমস এবং তাঁকে সহায়তা করেন বাঙালি ব্যারিস্টার জ্যোতিপ্রকাশ রায়। অভিযুক্তদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল মীরাট জেলা কারাগারে। ড. আর. এ. নর্টনের নেতৃত্বেই এই পুরো মামলাটি সাজানো হয় এবং তা আদালতে পেশ করা হয়। মামলা শুরুর প্রস্তুতি নিতেই সাত মাস সময় লেগে যায় যার ফলে ১৯৩০ সালের ১৪ জানুয়ারি আদালতে মূল সওয়াল-জবাব শুরু হয়। তেরো মাস ধরে সওয়াল-জবাব চলে, তারপরে প্রমাণাদি বিচারপূর্বক অপরাধীদের বয়ান সংগ্রহ করতে আরো দশ মাস সময় লাগে। আরো নানা কাজে সাড়ে ছয় মাস সময় ব্যয়িত হয় এবং অবশেষে মীরাটের সেশন আদালতের বিচারপতি চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন পাঁচ মাস পরে।

১৯৩৩ সালের ১৭ জানুয়ারি সেশন আদালতের মুখ্য বিচারপতি চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন যেখানে পাঁচ জনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়, ১ জন অভিযুক্ত জেলের মধ্যেই মারা যান এবং বাকি ২৭ জনের বিরুদ্ধে কঠোর সাজা ঘোষণা হয়। মুজফ্‌ফর আহমেদের যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর; ডাঙ্গে, স্প্রাট, ঘাটে, যোগলেকার, নিম্বকারের বিরুদ্ধে ঘোষিত হয় ১২ বছরের দ্বীপান্তরের সাজা। এছাড়া বাকিদের মধ্যে তিনজনের ১০ বছরের, আরো তিনজনের ৭ বছরের, চার জনের ৫ বছর, অন্য ছয় জনের ৪ বছর এবং বাকি পাঁচজনের ৩ বছরের দ্বীপান্তর ঘোষণা করা হয়। এলাহাবাদ উচ্চ আদালতে কমিউনিস্ট নেতাদের হয়ে সাজা মকুবের আবেদন জমা দেওয়া হয়। মুখ্য বিচারপতি সুলাইমানের নির্দেশে ১৯৩৩ সালের ২৪ জুলাই আবার এই মামলার নতুন করে শুনানি হয়। অভিযুক্তদের পক্ষে সওয়াল করেন স্যার তেজ এবং স্যার কে. এন. কাটজু আর ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে মামলা লড়েন মি. আই. কেম্প ও জে.পি.মিত্র।

ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে এই মামলা বিরাট প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। এই মামলার পরেই ব্রিটিশ সরকার সারা দেশে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। শুধু ভারত নয়, ভারতের বাইরেও গ্রেট ব্রিটেনে এই মামলার প্রভাবে ‘দ্য রেড মেগাফোন্স’ নামে একটি ভ্রাম্যমান গ্রুপ থিয়েটার ইংল্যাণ্ডে ‘মীরাট’ নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করে।

One comment

আপনার মতামত জানান