ইতিহাস

নারায়ণ দেবনাথ

নারায়ণ দেবনাথ

নারায়ণ দেবনাথ (Narayan Debnath) ভারত তথা বাংলার অন্যতম বিখ্যাত একজন কমিকস-শিল্পী, আলঙ্কারিক তথা শিশু সাহিত্যিক। ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘নন্টে ফন্টে’ ইত্যাদি কালজয়ী সব কমিকসের স্রষ্টা তিনি। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে সমান জনপ্রিয়তা সহকারে তাঁর লেখা ‘হাঁদা ভোঁদা’ পাঠককে মুগ্ধ করেছে। তিনিই একমাত্র ভারতীয় তথা বাঙালি কমিকস-শিল্পী ছিলেন যিনি ডি.লিট উপাধি পেয়েছিলেন। ২০২১ সালে ভারত সরকার নারায়ণ দেবনাথ কে ভারতের চতুর্থ শ্রেষ্ঠ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। ইউরোপের লরেল এবং হার্ডির আদলে গড়া তাঁর হাঁদা ভোঁদার চরিত্র দুটি আজও বাঙালি পাঠকের একান্ত আপন।  

১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর হাওড়ার শিবপুরে নারায়ণ দেবনাথের জন্ম হয়। শিবপুর রোডে শিবপুর হিন্দু গার্লস স্কুলের কাছে একটা দোতলা বাড়িতে থাকতেন তিনি। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে। তাঁর বাবা-কাকাদের পারিবারিক সূত্রে গয়নার ব্যবসা ছিল। নারায়ণের কাকা ছিলেন পেশায় নকশাদার সাথে রিলিফের কাজও করতেন। কাকার কাজ দেখেই নারায়ণ দেবনাথের ছবি আঁকার শুরু হয়। শৈশব এবং কৈশোরে ভালো কোন ছবি দেখলেই অনুকরণ করার চেষ্টা করতেন তিনি। আত্মীয় ও প্রতিবেশিরা তাঁর বাবাকে প্রায়ই নারায়ণকে আর্ট কলেজে ভর্তি করার কথা বলতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পাড়ার এক বন্ধুর উৎসাহে ও জোরাজুরিতে একটি বেসরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হন নারায়ণ দেবনাথ । সেই কলেজের প্রিন্সিপ্যাল লণ্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ আর্ট থেকে পাশ করে এসেছিলেন। নারায়ণকে তিনি খুবই ভালোবাসতেন। দুই বছর পর সেই কলেজ যুক্ত হয়ে যায় ইণ্ডিয়ান আর্ট কলেজের সঙ্গে। কমার্শিয়াল আর্ট বিষয় নিয়ে পড়তে শুরু করেন নারায়ণ । কিন্তু পাঁচ বছর পড়ার পরেও চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা না দেওয়ায় আর্ট কলেজ থেকে কোন ডিগ্রি পাননি তিনি।  

আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর প্রথম দিকে লেবেল, সিনেমা স্লাইড ইত্যাদির কাজ করতে শুরু করেন নারায়ণ দেবনাথ। ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থায় লোগো আঁকার কাজও করতেন তিনি। সারা জীবনে কখনও কোথাও কোন বাঁধা বেতনের চাকরি করেননি তিনি। তবে একসময় গরাণহাটার ‘দাস ব্রাদার্স’ প্রেসে আলতা ও সিঁদূরের প্যাকেটের উপর লেটারিং করার কাজ করতেন। লেটারিং শিল্পী হিসেবে নারায়ণ দেবনাথ ঐ প্রেসে ধরা-বাঁধা কাজ করেছিলেন কিছুদিন। এই সময়পর্বেই বিখ্যাত কবি কালিদাস রায়ের ‘ত্রিবেণী’ নামের একটি কবিতার বইয়ের একটা সংস্করণের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নারায়ণ। সেই সূত্রেই ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ প্রকাশনীর সুবোধ মজুমদারের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয় এবং দেব সাহিত্য কুটীরেই কাজ করতে শুরু করেন তিনি তখন থেকে। ১৯৫০ সাল থেকে ‘দেব সাহিত্য কুটীর’-এর ছোটোদের ‘শুকতারা’ পত্রিকার অলংকরণ এবং প্রচ্ছদ করার কাজ শুরু করেন নিয়মিতভাবে। শিল্পী প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজ দেখেও বহু কিছু শিখেছেন নারায়ণ। তাঁর সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা ছিল নারায়ণের। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুরনো ইলাস্ট্রেটেড ইংরেজি পত্রিকার ছবি দেখে অলংকরণের খুঁটিনাটি সম্পর্কে আরও উৎসাহী হয়ে পড়েন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের একটি স্বতন্ত্র মৌলিক ঘরানা তৈরি হয়ে যায় তাঁর। প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে পরামর্শ দিতেন হিউম্যান ফিগার আঁকতে গেলে সবার আগে অ্যানাটমিকে জলের মতো আয়ত্ত করে ফেলতে হবে। সে কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ।

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ছোটোদের বিভাগ ‘আনন্দমেলা’তে কাজ করতে শুরু করেন তিনি। ১৯৬১ সালে ‘আনন্দমেলা’ নামের সাপ্তাহিকী পত্রিকাতে রবীন্দ্রনাথের শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘রবি ছবি’ নামে একটি ধারাবাহিক কমিকস করেন  নারায়ণ দেবনাথ। এই কমিকসের পাতার লেখক ছিলেন সেকালের ‘আনন্দমেলা’র সম্পাদক বিমল ঘোষ। তারপর একইভাবে বিবেকানন্দ, শিবাজী প্রমুখদের নিয়েও কমিকস করেছেন তিনি। ১৯৬২ সালে সুবোধ মজুমদারের ছোট ভাই ক্ষীরোদ মজুমদারের অনুরোধে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় নারায়ণ দেবনাথ প্রথম ‘হাঁদা ভোঁদা’ কমিকস আঁকা শুরু করেন। বিদেশি কিছু কমিকসের অনুসরণ করে বাংলায় কমিকস তৈরি করতে বলেছিলেন ক্ষীরোদবাবু। এদিকে নারায়ণের বিশেষ বিদেশি কমিকস পড়া ছিল না, একমাত্র টারজান ছাড়া। তিনি তাই তাঁদের বাড়ির, পাড়ার ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের দস্যিপনা, বিদঘুটে কাণ্ডকারখানাকে অবলম্বন করে দুটি ছেলের চরিত্র তৈরি করেছিলেন। দু-চারটে সংখ্যা প্রকাশ পাওয়ার পরেই ‘হাঁদা ভোঁদা’ বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথমে ‘হাঁদা ভোঁদা’ প্রকাশিত হত সাদা-কালো ছবিতে। ১৯৬৫ সালে বাঁটুলকে নিয়ে নতুন এক রঙিন কমিকস আঁকতে শুরু করেন তিনি যার নাম দেন ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় এই বাঁটুলের কমিকসেই তিনি আঁকেন কিছু অদ্ভুত ছবি যেখানে দেখা যায় বাঁটুল প্রতিপক্ষের যুদ্ধবিমানকে ল্যাসো দিয়ে বেঁধে অন্যত্র ছুঁড়ে ফেলছে কিংবা প্রতিপক্ষের ট্যাঙ্ক তুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে ইত্যাদি। ১৯৬৯ সাল থেকে ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকার দীনেশ চট্টোপাধ্যায়ের অনুরোধে নারায়ণ দেবনাথ শুরু করেন ‘নন্টে ফন্টে’ কমিকস। হাঁদা ভোঁদার মতোই খানিকটা মজাদার, দুই ছেলের কাণ্ডকারখানা। কমিকস আঁকার সময় সিনেমার মতোই চিত্রনাট্য তৈরি করে, শট ডিভিশন করে নিতে হয়। শুধু কমিকস আঁকাই নয়, তার লেখাগুলিও তিনি শুরু থেকেই নিজে লিখে এসেছেন। সেকালের আনন্দবাজার পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত ‘গোয়েন্দা রিপ’ কমিকস ছিল তাঁর খুবই প্রিয়। এই কমিকসের শিল্পী জন প্রেন্টিসের শৈলী তাঁকে খুবই আকৃষ্ট করতো। পরে এক সাক্ষাৎকারে নারায়ণ দেবনাথ বলেছেন যে জন প্রেন্টিসের আঁকার শৈলীকেই ভারতীয় ঘরানায় ফেলে নিজস্ব করে তুলেছেন তিনি। একইসঙ্গে ‘বাহাদুর বেড়াল’, ‘সিক্রেট এজেন্ট কৌশিক রায়’ ইত্যাদি কমিকসও আঁকতে শুরু করেন নারায়ণ দেবনাথ। নারায়ণ দেবনাথের লেখা গোয়েন্দা কৌশিক রায়ের প্রথম গল্প প্রকাশ পায় ১৯৭৫ সালে ‘সর্পরাজের দ্বীপে’ নামে। অলংকরণের সময় কখনও কোন ফাঁকিবাজি করতে দেখা যায়নি নারায়ণ দেবনাথকে, তাঁর অলংকরণে যে কোন বস্তুই নিখুঁত হয়ে উঠত। কোন একটি বিশেষ চরিত্রের পোশাক কী হবে তা ঠিক করার জন্য প্রচুর বইয়ের দোকানে ঘুরে ঘুরে রেফারেন্স বই জোগাড় করতে হয়েছে তাঁকে। সেকেণ্ড হ্যাণ্ড বিদেশি ছবির বই সংগ্রহ করে সেখান থেকে ধারণা পেয়েছেন তিনি। ১৯৭২ সালে মনোরঞ্জন ঘোষের লেখা ‘পরিবর্তন’ বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। এই বইটি প্রথম ১৯৫০ সালে প্রকাশ পেয়েছিল, পরে এই বইয়ের কাহিনী অবলম্বনে ১৯৫৫ সালে ‘জাগৃতি’ নামে একটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। কিছুদিন এই বই নিষিদ্ধও ছিল। পরে ১৯৭২ সালে পুনর্মুদ্রিত হয় এই বই, সেই সংস্করণেই প্রচ্ছদ আঁকেন নারায়ণ। এই বইয়ের কাহিনীতে যে দুই হোস্টেল-নিবাসী বালকের কথা ছিল, সেই থেকেই ‘নন্টে ফন্টে’-র কাহিনীর রূপ দেন তিনি। হোস্টেলের এক সুপারিনটেণ্ডেন্ট, নন্টে আর ফন্টের সিনিয়র দাদা কেল্টুরাম এইসব চরিত্র আজও বাঙালিদের স্মৃতিতে অমলিন। নন্টে আর ফন্টে থাকতো এক মফস্বলের হোস্টেলে, একই হোস্টেলে থাকে কেল্টুরাম যে কিনা সবসময় তাদের দিয়ে নানাবিধ কাজ করিয়ে নিতে চায়, তাদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করে। সেই হোস্টেলের সুপারিনটেণ্ডেন্ট ছিলেন এক মোটাসোটা ব্যক্তি যিনি আবার খাদ্যরসিক ছিলেন। সবসময় কেল্টুরাম স্যারের চোখে ভালো হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষে দেখা যায় সবসময়ই তাঁর বদমাইসির জন্য স্যারের কাছে বেদম মার খায় কেল্টু। ১৯৮১ সালে প্রথম এই কমিকসটি বই আকারে প্রকাশ পায়।  তাঁর সৃষ্টি বাঁটুল ছিল বাংলার একমাত্র অতিমানব। চল্লিশ ইঞ্চি বুকের ছাতি নিয়ে সে অসীম দুঃসাহসে সমাজের সকল দুষ্কৃতি, অপরাধীদের সাজা দেয় আর ভালোমানুষদের সাহায্য করে। কোন ভয়কেই তোয়াক্কা করে না সে।  

তাঁর কমিকস অঙ্কনের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৩ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি’ এবং ‘বঙ্গবিভূষণ’ পুরস্কার পান নারায়ণ দেবনাথ । তিনিই একমাত্র ভারতীয় তথা বাঙালি কমিকস-শিল্পী যিনি ডি.লিট উপাধি পেয়েছেন। ২০২১ সালে ভারত সরকার নারায়ণ দেবনাথকে ভারতের চতুর্থ শ্রেষ্ঠ বেসামরিক সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি নারায়ণ দেবনাথের মৃত্যু হয়।  

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়