ইতিহাস

নীলম সঞ্জীব রেড্ডি

স্বাধীন ভারতের ষষ্ঠ এবং সর্বকালের সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন নীলম সঞ্জীব রেড্ডি( Neelam Sanjiva Reddy )। 

১৯১৩ সালে ১৯ মে, অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলায় নীলম সঞ্জীব রেড্ডির জন্ম হয়৷  তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় মাদ্রাজের থিওসোফিকাল হাই স্কুলে (Theosophical High School)৷ এরপর তিনি অনন্তপুরে ইউনিভার্সিটি অফ মাদ্রাজের অন্তর্ভুক্ত একটি আর্ট কলেজে ভর্তি হন৷ কিম্তু সেই সময়ে গান্ধীজীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই কলেজ ছেড়ে দেন৷ পরবর্তী কালে ১৯৮৮ সালে শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে আইন বিভাগের সম্মানসূচক ডক্টর ডিগ্রি প্রদান করেছিল। 

তাঁর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব বলতে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কথা বলতে হয়৷ ১৯২৯ সালের জুলাই মাসে মহাত্মা গান্ধী অনন্তপুরে আসেন৷ তাঁর বক্তৃতায় প্রভাবিত হয়ে রেড্ডি স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন৷ ছাত্রদের সত্যাগ্রহ আন্দোলনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। ১৯৩৮ সালে নীলম সঞ্জীব রেড্ডি অন্ধ্রপ্রদেশের কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দশ বছরের জন্য এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তিনি কারাগারে বন্দী ছিলেন এবং ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৫ সালের বেশীর ভাগ সময়ই তাঁকে কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়৷ তিনি ১৯৪২ সালের মার্চ মাসে মুক্তি পান, অগাস্টে আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসাবে মাদ্রাজ বিধানসভায় তিনি নির্বাচিত হন এবং কংগ্রেসের আইনসভা দলের সেক্রেটারি হন । তিনি মাদ্রাজ থেকে ভারতীয় গণপরিষদের সদস্যও ছিলেন।  ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে থেকে ১৯৫১ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত তিনি মাদ্রাজ রাজ্যের আবাসন ও বন মন্ত্রী ছিলেন।১৯৫১ সালের নির্বাচনে তিনি এন জি রাঙ্গাকে পরাজিত করে অন্ধ্রপ্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি  হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালে যখন অন্ধ্র রাজ্য গঠিত হয়েছিল, তখন টি.প্রকাশম এর মুখ্যমন্ত্রী হন এবং তিনি ছিলেন উপপরিচালক।  পরে অন্ধ্রপ্রদেশের সঙ্গে তেলেঙ্গানাকে অন্তর্ভুক্ত করে অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠনের পরে নীলম সঞ্জীব রেড্ডি সেখানকার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন( ১ নভেম্বর ১৯৫৬ – ১১ জানুয়ারি ১৯৬০)।  ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রীত্বের পদ সামলান৷ নিলম সঞ্জীব রেড্ডি ১৯৬০ -১৯৬২ সাল পর্যন্ত বেঙ্গালুরু, ভাওয়ানগর এবং পাটনায় কংগ্রেসের  অধিবেশনগুলিতে তিনবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি তিনবার রাজ্যসভার সদস্য পদ লাভ করে ছিলেন।  ১৯৬৪ সালের জুন মাস থেকে তিনি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী সরকারের কেন্দ্রীয় স্টিল ও খনি মন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় ১৯৬৬ – ১৯৬৭ সালের মার্চ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় পরিবহণ, নাগরিক বিমান পরিবহন, নৌ পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশের হিন্দুপুর থেকে লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালের ১লা মার্চ নীলম সঞ্জীব রেড্ডি চতুর্থ লোকসভার স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি জাকির হুসেনের মৃত্যুর পরে কংগ্রেস পার্টি নীলম সঞ্জীব রেড্ডিকে সিন্ডিকেট গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার দরুন রাষ্ট্রপতির পদপ্রার্থী হিসাবে মনোনীত করে যদিও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি রেড্ডিকে কংগ্রেস পার্টির অফিসিয়াল প্রার্থী হিসাবে গ্রহণ করতে অখুশি ছিলেন৷ তিনি বলেছিলেন  “vote according to their conscience” ফলস্বরূপ ভি ভি গিরি ভোটে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতির পদাধিকার পান৷ নির্বাচনটি কংগ্রেস পার্টির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং ১৯৯৯ সালে কংগ্রেসের ঐতিহাসিক বিভাজন দেখা যায়৷  নীলম সঞ্জীব  রেড্ডি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য লোকসভার স্পিকার হিসেবে আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন এবং অনন্তপুরে ফিরে এসে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন। 

১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে বেরিয়ে আসেন । ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে জনতা পার্টি কমিটির সদস্য করা হয় এবং মার্চ মাসে তিনি নন্দল থেকে লোকসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ  করেন এবং তিনিই ছিলেন অন্ধ্র প্রদেশ থেকে নির্বাচিত একমাত্র নন-কংগ্রেস প্রার্থী। সেই বছর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস পার্টি পরাজিত হয় তারই সঙ্গে ভারতে কংগ্রেসের ৩০ বছরের শাসন অবসান হয়। রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমেদের মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই এই পদের জন্য ননসিউজ রুক্মিনী দেবী অরুন্দলেকে মনোনীত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু  তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর বিরোধী কংগ্রেস দলসহ সকল রাজনৈতিক দলের সর্বসম্মতভাবে সমর্থন পাওয়ার পরে নীলম সঞ্জীব রেড্ডি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ৬৪ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন তিনি ছিলেন ভারতের সর্বকনিষ্ঠতম রাষ্ট্রপতি৷  তিনি এমন একজন রাষ্ট্রপতি যিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দুবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন – একবার ১৯৬৯ সালে ভি ভি গিরির বিরুদ্ধে এবং আরেকবার ১৯৭৭ সালে। রাষ্ট্রপতি পদের জন্য ৩৭ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৩৬ জনকে রিটার্নিং অফিসার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এরপর নীলম সঞ্জীব রেড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একমাত্র বৈধ প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন।  তিনি ছিলেন  ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

নীলম সঞ্জীব রেড্ডি ১৯৭৭ সালের ২১ জুলাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২৫ জুলাই ১৯৭৭ সালে ভারতের ষষ্ঠ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। নীলম সাঞ্জীব রেড্ডি তিনটি সরকারের সঙ্গে কাজ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই, চরণ সিং এবং ইন্দিরা গান্ধী। ভারতের স্বাধীনতার ত্রিশতম বার্ষিকীর সময় তিনি ঘোষণা করেছিলেন রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে তিনি একটি ছোট আবাসে চলে যাবেন এবং ভারতের দরিদ্র জনগণের কথা ভেবে তিনি তাঁর বেতনের সত্তর শতাংশ হ্রাস করবেন । নীলম সঞ্জীব রেড্ডি’র পর রাষ্ট্রপতি হন জ্ঞানী জৈল সিং

ভারতীয় ডাক বিভাগ নীলম সঞ্জীব রেড্ডির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর সম্মানে একটি স্মারক স্ট্যাম্প এবং বিশেষ কভার প্রকাশ করেছে। হায়দ্রাবাদে রয়েছে নীলাম সঞ্জীব রেড্ডি কলেজ অফ এডুকেশন। তাঁর জন্মের শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসাবে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে অন্ধ্র প্রদেশের রাজস্ব একাডেমি, গভর্নমেন্ট আর্টস কলেজের নাম রেড্ডির নামে রাখা হবে। নীলম সঞ্জীব রেড্ডি একটি বই লিখেছিলেন “Without Fear or Favour: Reminiscences and Reflections of a President” যেটি ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয়৷ 

১ জুন ১৯৯৬ সালে নীলম সঞ্জীব রেড্ডি’র মৃত্যু হয়৷ 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।