ভৌগোলিক দিক থেকে যদি দেখা যায়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গে মরুভূমি ছাড়া প্রায় সবই আছে। উত্তরে দার্জিলিং বা ডুয়ার্স থেকে শুরু করে দক্ষিণে সুন্দরবন বা বেশ কয়েকটি সমুদ্র সৈকত, কী নেই এখানে! পাহাড় থেকে জঙ্গল, নদী থেকে সমুদ্র, ঐতিহাসিক স্থান থেকে ধর্মস্থান সবকিছু দেখতে পাওয়া যায় এই বাংলায়। যে কারণে তাকে ভারতের ছোট সংস্করণ বলাই যায়। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা দার্জিলিং এবং তার আশেপাশের জায়গাগুলো। তবে দিন যত বাড়ছে, তত দার্জিলিং এ মানুষের ভিড় বাড়ছে। সেই কারণে সকলেই পরিচিত জায়গা ছেড়ে নতুন নতুন অফবিট জায়গা খুঁজছেন। এখানে দার্জিলিং-এর আশেপাশে কয়েকটি অফবিট জায়গা নিয়ে আলোচনা করা হল।
চটকপুর – দার্জিলিং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে সেনেচাল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মধ্যে ৭৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম হল চটকপুর। গ্রামটি হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার নিয়ে গড়ে উঠেছে। উচ্চতার কারণে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দারুণ দৃশ্য দেখা যায়। যেহেতু গ্রামটি অভয়অরণ্যের ভিতর অবস্থিত, তাই এখানে প্রবেশ করতে গেলে আগে থেকে প্ল্যান করতে হবে এবং পারমিট নিতে হবে। পারমিটের জন্য মাথাপিছু খরচ ১০০ টাকা এবং এই পারমিটটি ২৪ ঘণ্টার জন্য প্রযোজ্য। তবে এখানে যাওয়ার রাস্তা খুবই খারাপ তাই যেতে অনেকটা সময় লাগে। এখানে থাকার জন্য অল্প কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে। সাধারণত নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আগে চটকপুর পৌঁছে তারপর সেখান থেকে অনেকে দার্জিলিং যায়।
দাওয়াইপানি – দার্জিলিং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ৬৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত অখ্যাত একটি গ্রাম হল দাওয়াইপানি। দাওয়াইপানি শব্দটির অর্থ হল ঔষধের জল।বলা হয় এই গ্রামে অবস্থিত নদীর জলে খনিজ পদার্থ থাকার ফলে এই জলে ক্ষত স্থান তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে। কোন এক ইংরেজ অফিসার নদীর জলের এই গুণের কথা আবিষ্কার করেন এবং গ্রামের নাম রাখেন দাওয়াইপানি। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সমস্ত গ্রাম থেকেই কাঞ্চজঙ্ঘার দারুণ দৃশ্য, পাহাড়ি উপত্যকার দৃশ্য এবং তার মাঝ দিয়ে খেলা করা মেঘেদের অসাধারণ দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এখানে থাকার জন্য কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে। দার্জিলিং থেকেও দাওয়াইপানি যেতে পারেন, আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আগে দাওয়াইপানি পৌঁছে তারপর সেখান থেকেও দার্জিলিং যেতে পারেন।

লামাহাট্টা – দার্জিলিং থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে ৫৭০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছোট্ট একটি জনপদ হল লামাহাট্টা। লামা শব্দের অর্থ হল বৌদ্ধ পুরোহিত এবং হাট্টা শব্দের অর্থ হল বাসস্থান। লামাহাট্টা শব্দটির অর্থ হল যেখানে লামারা বাস করেন। ভারতীয় সরকার এককালে তিব্বতী লামাদের বসবাস করার জন্য এই জায়গাটি বেছে দিয়েছিল বলে এখানকার নাম লামাহাট্টা। একদিকে সবুজ বিশাল পাইনের ঘন জঙ্গল এবং অপর দিকে নীল আকাশে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ দৃশ্য, সংক্ষেপে এটাই এখানের সৌন্দর্য। তবে বর্তমানে এখানের মূল আকর্ষণ হল লামাহাট্টা ইকো পার্ক যেটি ২০১২ সালে তৈরি হয়েছিল। পার্কটি গড়ে তোলার উদ্দেশ্য ছিল ছোট এই জনপদটিকে একটি ইকো-পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলা। এখানে থাকার জন্য কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে। দার্জিলিং থেকেও লামাহাট্টা যেতে পারেন, আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আগে লামাহাট্টা পৌঁছে তারপর সেখান থেকেও দার্জিলিং যেতে পারেন।
তিনচুলে – দার্জিলিং থেকে মাত্র ৩০ কিমি দূরে ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত একটি পাহাড়ি ছোট জনপদ হল তিনচুলে। এই গ্রাম থেকে তিনটি পাহাড়ি চূড়া দেখা যায়। এই চূড়াগুলো দেখতে উনুন বা চুলার মত হওয়ায় গ্রামের নাম হয়েছে তিনচুলে বা তিনটি চুলা। এখানের মূল আকর্ষণ হল চারিদিকে ঘেরা পাহাড়, যার মধ্যে প্রধান হল কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং সবুজ চা বাগান। এছাড়াও শীতে তিনচুলে ভরে ওঠে কমলালেবুর অপরূপ শোভায়। কমলালেবুর বাগান দেখতে চাইলে আসতে হবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে। এখানে থাকার জন্য বিভিন্ন হোমস্টে রয়েছে। দার্জিলিং থেকেও তিনচুলে যেতে পারেন, আবার নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আগে তিনচুলেতে পৌঁছে তারপর সেখান থেকেও দার্জিলিং যেতে পারেন।

তাবাকোশি – দার্জিলিং থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে ৩৬০০ ফুট উচ্চতায় মিরিকের কাছে অবস্থিত ছবির মত পাহাড়ি গ্রাম তাবাকোশি। এখানে গ্রামের বাড়িগুলো বেশ রংবেরঙের এবং পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রংভং নদী, পাশে রয়েছে বিভিন্ন চা বাগান। সকালে এই রাস্তায় হাঁটতে খুব সুন্দর লাগবে। নদীর ধারে একটা সুন্দর পার্ক রয়েছে এবং রয়েছে অনেক কমলা লেবুর বাগান, ভুট্টার বাগান। কমলালেবুর বাগান দেখতে চাইলে আসতে হবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে। এখানে থাকার জন্য বিভিন্ন হোমস্টে রয়েছে। তবে বাড়িগুলো একদম পাশাপাশি গায়ে গায়ে। সাধারণত দার্জিলিং থেকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন ফেরার পথে অনেকে তাবাকোশি ঘুরতে যায়।
বিজনবাড়ি – দার্জিলিং থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে ২৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছোট পাহাড়ি গ্রাম বিজনবাড়ি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট নদী রঙ্গীত, এছাড়া এখানে ঘোরার মতো তেমন কিছু নেই। তবে যারা নিরিবিলিতে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে চায়, তাদের জন্য জায়গাটি খুব সুন্দর। এখানে থাকার জন্য অল্প কয়েকটি হোমস্টে রয়েছে। এখানের হোমস্টে’র রুমগুলো প্রধানত বাঁশ দিয়ে তৈরি। বাঁশের তৈরি কটেজে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা ও ভোরবেলা পাখির ডাকে ও নদীর কুলকুল জলের আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গা এক আলাদা অনুভুতির সৃষ্টি করবে। সাধারণত দার্জিলিং থেকে অনেকে বিজনবাড়ি ঘুরতে যায়।

সিটং – দার্জিলিং থেকে প্রায় ৫০ কিমি দূরে ৪০০০ ফুট উচ্চতায় দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াং মহকুমায় অবস্থিত একটি লেপচা গ্রাম হল সিটং। শীতকাল মানেই কমলালেবু আর এই কমলালেবু মানেই দার্জিলিংয়ের সিটং। সিটংকে অনেকে কমলালেবুর দেশও বলে থাকেন, কারণ শীতে সিটং ভরে ওঠে কমলালেবুর অপরূপ শোভায়। লেপচাদেরই বাস এখানে, তাদের প্রতিটি বাড়িতেই দেখা যাবে কমলালেবুর গাছ। মানুষের থেকেও এখানে হয়ত বা কমলালেবুর বাগানের সংখ্যাই বেশি। কমলালেবুর অদ্ভুত রঙের শোভায় শীতের সিটং পর্যটকদের চোখে টেনে দেয় মায়াকাজল। তাছাড়া কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য তো রয়েছেই। কমলালেবুর বাগান দেখতে চাইলে আসতে হবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে। ঐ সময়ই সিটং-এর সমস্ত গাছ গাছালি কমলালেবুতে ভরে ওঠে। তবে বর্ষাকাল সর্বাগ্রে এড়িয়ে চলা উচিত। এখানে থাকার জন্য বিভিন্ন হোমস্টে রয়েছে। সাধারণত নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে আগে সিটং পৌঁছে তারপর সেখান থেকে অনেকে দার্জিলিং যায়।
দার্জিলিং-এর আশেপাশে কয়েকটি অফবিট জায়গা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য পাহাড় বা ভ্রমণস্থান নিয়ে জানতে এখানে পড়ুন।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৪
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান