খেলা

অলিম্পিক ও ওমেগা ঘড়ি

২০২১ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক শুরু হয়ে গেছে টোকিওতে। শুরু হয়ে গেছে টিক্‌টিক করে কাঁটা দেওয়া ডায়ালে চোখ রেখে অ্যাথলিটদের সময় নিরীক্ষণ। অলিম্পিকে সময়ই যে আসল ভাগ্য-নিয়ন্তা আর সেই ভাগ্য-নিয়ন্তা ঘড়ি কী আর যে সে কোম্পানি বানাতে পারে! একটা আস্ত ঘড়ি-নির্মাণ শিল্প ফুলে-ফেঁপে উঠলো শুধু মাত্র অলিম্পিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘ আশি বছর ধরে অলিম্পিক প্রতিযোগিতার অ্যাথলিটদের অফিসিয়াল সময়-পরিমাপক হিসেবে ঘড়ি তৈরি করে এসেছে এই বিশেষ কোম্পানিটি এবং ক্রমান্বয়ে ঘড়ির সূক্ষ্মতা বৃদ্ধি করে চলেছে। ভাবছেন কী নাম এই ঘড়ি ব্র্যান্ডটির? ওমেগা (Omega)। আসুন জেনে নিই অলিম্পিক ও ওমেগা -র অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ইতিকথা।

সেই অতীতে ১৯৩২ সাল থেকে অলিম্পিকে সময়-পরিমাপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ওমেগার ঘড়ি। বিগত আটাশটি অলিম্পিকে ক্রমান্বয়ে ওমেগা প্রতিযোগিতার চাহিদা অনুসারে ঘড়ির সূক্ষ্মতা বৃদ্ধি করে চলেছেন। ১৯৬৫ সাল থেকে নাসা-র প্রায় প্রতিটি চন্দ্রাভিযানে মহাকাশচারীদের সঙ্গে ছিল এই ওমেগা ঘড়ি।

কিভাবে অলিম্পিক ও ওমেগা একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠলো এবারে সেই গল্পে ফেরা যাক। ১৯৩২ সালের অলিম্পিকের আসর বসেছে আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে। অন্যান্য অলিম্পিকের মত এবারেও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম সময় মাপার জন্য না ছিল কম্পিউটার, না ছিল কোনো উন্নত প্রযুক্তি। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে ওমেগা সুইজারল্যান্ডের বিয়েন (ওমেগার সদর দপ্তর) থেকে একজন মেকানিককে ত্রিশটি উচ্চমানের স্টপ ওয়াচ সহ লস অ্যাঞ্জেলেস পাঠালো। এই স্টপওয়াচগুলির প্রতিটি এক সেকেণ্ডের এক দশমাংশ সময়ের ব্যবধান পরিমাপ করতে পারতো। সেই অলিম্পিকে মোট চোদ্দোটি প্রতিযোগিতায় সময় পরিমাপক হিসেবে এই ঘড়িগুলি ব্যবহৃত হয়েছিল। ওমেগার ‘ক্যালিবার ১১৩০’ মডেলের ঘড়িই প্রথম ব্যবহৃত হয় লস অ্যাঞ্জেলেসে। ১৯৩৬ সালের শীতকালীন অলিম্পিকে ওমেগা দুটি পৃথক ক্রনোগ্রাফ ব্যবহার করেছিল স্কি-প্রতিযোগিতার সময়। ঐ বছরই ওমেগা তাদের ঘড়িতে যুক্ত করে একশো পঁচাশিটি ক্রনোগ্রাফ। এরপর ১৯৫৬ সালে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে ওমেগার স্টপ ওয়াচে প্রায় আঠারো ক্যারাট সোনা ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। ক্রমশ এই ঘড়ি আরো উন্নত হয়েছে। ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে ‘রিও সিমাস্টার ডাইভার ৩০০ এম’ নামে ওমেগার একটি বিশেষ মডেল খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। সাঁতারুদের সাঁতার শেষ করার সময়, দৌড়বিদ্‌দের দৌড়ের সময়ের অতি সূক্ষ্ম ব্যবধান পরিমাপ করতে এই অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ওমেগা ঘড়ির বিকল্প নেই।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


ওমেগা তাদের ঘড়ির বিবর্তনে সময়ে সময়ে নতুন থেকে নতুন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে গেছে। একঝলক দেখে নেওয়া যাক সেইসব উল্লেখযোগ্য মডেলগুলির দিকে।

১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে ওমেগা ঘড়ির একটি নতুন ধরনের কোয়ার্টজ মডেল বেরোয় যা এক সেকেণ্ডের একশো ভাগের এক ভাগ সময়ের ব্যবধান পরিমাপের পাশাপাশি ফলাফলের প্রিন্ট-আউটও দিতে পারতো। এ জন্য নির্মাতারা ‘ক্রয়ে দু মেরিট অলিম্পিক’ (Croix du Mérite Olympique) নামে একটি পুরস্কারও পান।

১৯৫৬ সালের মেলবোর্নে আয়োজিত অলিম্পিকে সাঁতারের ক্ষেত্রে ওমেগা ঘড়ির ‘সুইম-এইট-ও ম্যাটিক’ (Swim-Eight-O-Matic) নামে একটি মডেল বেরোয় যা কিনা আধা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সাঁতারুদের সময় নিরূপণ করতে পারতো। একই সময়ে সাঁতার শেষ করা সাঁতারুদের সময়ের সূক্ষ্ম ব্যবধান বের করতে এর জুড়ি ছিল না।

এরপর একে একে ১৯৬৪ সালের ইন্সব্রুক অলিম্পিকে ওমেগাস্কোপ, ১৯৬৮ সালে মেক্সিকো অলিম্পিকে সাঁতারের ক্ষেত্রে ওমেগা টাচ্‌ কন্ট্রোল্ড টাইমারস, ১৯৯২ সালে ওমেগা স্ক্যান-ও-ভিশন, ২০১০ সালে লাল রঙের ইলেক্ট্রিক ফ্ল্যাশ গান এবং ২০১২ লণ্ডন অলিম্পিকে ওমেগা নিয়ে আসে কোয়ান্টাম টাইমার এবং চাপ-নিয়ন্ত্রিত স্টার্টিং বক্স। এভাবে ক্রম বিবর্তিত হতে হতে আজকের এই উন্নত প্রযুক্তির অবতারণা করেছে ওমেগা। ১৯৬৮’র ওমেগা টাচ্‌-কন্ট্রোল্ড টাইমার আসার পরে সাঁতারের ক্ষেত্রে আর আলাদা করে কোনো সময়-পরিমাপককে পুলের বাইরে বসে থাকতে হতো না, প্রতিযোগীরা নিজেরাই সাঁতারের গন্তব্যে পৌঁছে স্টপওয়াচ বন্ধ করতে পারতেন।

ভাবলে অবাক হতে হয় সুইস ওমেগা প্রতি অলিম্পিকে চারশো টন সরঞ্জাম সরবরাহ করে থাকেন কেবল সময় পরিমাপের জন্য। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি প্রায় ন’শো জন স্বেচ্ছাসেবক, পঁচাশিটি পাবলিক স্কোরবোর্ড, সাড়ে তিনশোটি স্পোর্টস-স্কোরবোর্ড, পাঁচশো তিরিশ জন দক্ষ সময়-নিরীক্ষক এবং দুশো কিমি দীর্ঘ তারের সাহায্যে আজকের অলিম্পিকের অ্যাথলিটদের সময় নিরুপণ করে ওমেগা। এখন আর আগেকার দিনের মতো শুধু ঘড়ির সময় দেখা হয় না – ফোটো সেল প্রযুক্তি, টাচপ্যাড, কোয়ান্টাম টাইমারের সাহায্যে এক সেকেণ্ডের দশ লক্ষ ভাগের এক ভাগ ব্যবধানও অনায়াসে পরিমাপ করা সম্ভব। ১৯৪৮ সালেই প্রথম ফোটো সেল প্রযুক্তি, ফোটো ফিনিশ ক্যামেরার সাহায্যে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে সময় পরিমাপ করা শুরু হয়। ঐ বছরই সাঁতারের ক্ষেত্রে টাচপ্যাড, দৌড়ের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রনিক স্টার্ট গান, স্টার্টিং ব্লক ইত্যাদি তৈরি হয়ে যায়। বিস্ময়কর তথ্য হল, এই ফোটো ফিনিশ ক্যামেরা সেকেণ্ডে দশ হাজার ছবি তুলতে সক্ষম যা অলিম্পিকে প্রতিযোগিতার বিচারপদ্ধতিকে আরো সহজসাধ্য করে তুলেছে।

২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক উপলক্ষে ওমেগা তাদের নতুন মডেল ‘নিউ সী মাস্টার অ্যাকুয়া টেরা টোকিও ২০২০ গোল্ড এডিশন’ তৈরি করেছে যা অলিম্পিকে সর্বাধিক স্বর্ণপদকজয়ী সাঁতারু মাইকেল ফেল্পসই প্রথম ব্যবহার করেন। সাঁতার, বিচ ভলিবল, জিমন্যাস্টিক, স্পোর্টস ক্লাইম্বিং ইত্যাদি নানাবিধ জটিলতর ক্ষেত্রেও অনায়াসে ওমেগা ঘড়ি সময় পরিমাপ করে চলেছে। কীভাবে এই পরিমাপ করা হয় একটু উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। অ্যাথলেটিক্সের ক্ষেত্রে প্রযুক্ত পন্থাটি হল আরটিটিএস অর্থাৎ রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং সিস্টেম। কোনো দৌড়বিদের দৌড়ানোর সময় তাঁর প্রকৃত অবস্থান নিরীক্ষণ করে নেয় ওমেগা ঘড়ি তার অন্যান্য সরঞ্জামের সাহায্যে। আবার বিচ ভলিবলের ক্ষেত্রে দলগত খেলা হলেও ইমেজ-ট্র্যাকিং ক্যামেরার সাহায্যে খেলোয়াড়দের অবস্থান, লাফের উচ্চতা, কত দূরত্ব সে অতিক্রম করছে সবই পরিমাপ করতে পারে ওমেগার তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।

২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিকেও সমান গুরুত্বসহকারে ওমেগা অফিসিয়াল সময়-পরিমাপক হিসেবে স্থান পেয়েছে অন্যান্যবারের মতোই। এত উন্নতমানের প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কারণেই আশি বছরেরও বেশি সময় ধরে অলিম্পিকের অফিসিয়াল সময়-পরিমাপক হিসেবে ওমেগার কোনো বিকল্প তৈরি হয়নি, অলিম্পিক ও ওমেগা সমার্থক হয়ে গেছে একে ওপরের।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য