১৯৪০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের আয়োজন হয়েছে জাপানের টোকিওতে। ইউরোপের বাইরে প্রথম কোন দেশে সেবার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আসর বসতে চলেছে। ভারত থেকে প্রথম বাঙালি মহিলা হিসেবে কলকাতার কিশোরী ইলা মিত্র অলিম্পিক -এর অ্যাথলেটিক্স বিভাগে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করেছেন । বাংলার আ্যকাউন্ট্যান্ট জেনারেল নগেন্দ্রনাথ সেনের মেয়ে ইলা পড়াশোনায় যেমন তুখোড় তেমনি পারদর্শী খেলাধূলায়। অ্যাথলেটিক্স ছাড়াও সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যান্ডমিন্টনে তাঁর সমকক্ষ তখন বাংলাতে কেউ নেই বললেই চলে। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল টানা তিনবছর ইলা রাজ্য জুনিয়র আ্যথলেটিক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই কলকাতা তথা সমগ্র বাংলা জুড়ে ইলাকে নিয়ে প্রত্যাশার পারদ ক্রমশ চড়তে শুরু করেছে।
হঠাৎই জাপান সরকার ঘোষণা করে তারা অলিম্পিক আয়োজক দেশ হিসেবে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। কারণ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণ হুঙ্কার তখন ইউরোপ আমেরিকা ছাড়িয়ে এশিয়াতেও আছড়ে পড়েছে। যুদ্ধের এই আবহে জাপান সরকার সারা বিশ্ব থেকে অংশগ্রহণ করা খেলোয়াড়দের সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে চায় না। জাপান নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিতেই ফিনল্যান্ড আবেদন জানায় অলিম্পিক আয়োজন করার। ঠিক হল ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিঙ্কিতে আয়োজিত হবে ১৯৪০ এর অলিম্পিক। কিন্তু ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতেই অলিম্পিক কমিটি সিদ্ধান্ত নিল অনির্দিষ্টকালের জন্য অলিম্পিক বন্ধ থাকবে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন ইলা। ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সর্বশ্রেষ্ঠ মঞ্চে বাংলা তথা পরাধীন ভারতের নাম উজ্জ্বল করার যে স্বপ্ন ইলাকে নিয়ে সারা বাংলা তথা ভারত দেখতে শুরু করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সেই স্বপ্নকে অধরাই রেখে দিল।
স্বপ্ন হয়ত অধরা থেকে গেল। ইলা মিত্র অলিম্পিক -এ লড়তে পারলেন না কিন্তু লড়াই করে জেতার যে সহজাত প্রবৃত্তি সেটা যাবে কোথায়? উনিশ বছর বয়সে ইলার বিয়ে হল মালদার নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুরহাটের জমিদার মহিমচন্দ্রের ছেলে কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সাথে। বিয়ের আগেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করে ইলা হয়ে ওঠেন কমিউনিস্ট পার্টির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। জমিদার গিন্নি ইলার মধ্যে তখন থেকেই ভিত তৈরি হতে থাকে এক অনমনীয় সংগ্রামী নেত্রীর।
বৃটিশ ভারতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার ফলে চাষীদের জমির অধিকার চলে যায় জমিদারদের হাতে। সেই সময়ে জমিদাররা জমির উর্বরতা ও জমির পরিমাণ অনুযায়ী বৃটিশদের খাজনা দিত। জমিদার ও কৃষকদের মাঝখানে এই সময়ে এক নতুন শ্রেণীর জন্ম হয় যারা জমিদারদের থেকে জমি ইজারায় নিয়ে কৃষকদের চাষ করার জন্য দিত সাথে চাষ তদারকি ও খাজনা আদায় করত। জমির ওপর সম্পূর্ণ মালিকানা না থাকার দরুন কৃষকেরা জমির ফসল উৎপাদনের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেও উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক জোতদারদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য থাকত। এই ব্যবস্থাকে বলা হত ‘আধিয়ারী ব্যবস্হা’। এই আধিয়ারী ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন কৃষকদের উৎপন্ন ফসলের প্রতি অধিকার কমতে থাকে অন্যদিকে তাদের ওপর জোতদারদের শোষণ বাড়তে থাকে। এই অত্যাচারের মাত্রা চরমে উঠলে কৃষকরা বাধ্য হয় বিক্ষোভ কর্মসূচী গ্রহণ করতে। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে কৃষকদের উপর এই অত্যাচার চরমে ওঠে। উৎপাদিত তিনভাগ ফসলের দুইভাগের দাবীতে কৃষকরা সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। শুরু হল ঐতিহাসিক ‘তেভাগা আন্দোলন’। এই আন্দোলনের পুরোভাগে যোগ্য ক্যাপ্টেনের মত নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইলা মিত্র।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাংলাদেশে মুসলীম লীগ ক্ষমতায় এলে আন্দোলনকে স্তিমিত করতে নানান দমননীতি গ্রহণ করে সরকার। সেই সময় শক্ত হাতে আন্দোলনের হাল ধরেন ইলা ও রমেন্দ্র। তাঁদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নাচোলে হাজার হাজার অত্যাচারিত ভূমিহীন কৃষক ও সাঁওতালদের নিয়ে এক শক্তিশালী তীরন্দাজ বাহিনী তৈরি হয়। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পুলিশের একটি বাহিনী নাচোলে এলে উন্মত্ত জনতা বাহিনীর সকল পুলিশকে ঘিরে ধরে হত্যা করে। এই ঘটনার পর কৃষকদের উপর পুলিশী অত্যাচার চরমে ওঠে। আন্দোলনের নেতাদের খোঁজে বারোশোটি গ্রামে পুলিশ নির্মমভাবে অত্যাচার চালায়। গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশ কনষ্টেবল হত্যার মামলা করে সরকার। মামলা রাজশাহী কোর্টে উঠলে রমেন্দ্র মিত্র ও প্রথম সাঁওতাল কমিউনিস্ট নেতা মাতলা মাঝি নিরুদ্দেশ হন। ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি ইলা সাঁওতালি মেয়ের ছদ্মবেশে কলকাতায় পালিয়ে যাওয়ার সময়ে রোহানপুর রেল ষ্টেশনে ধরা পড়ে যান।
পাকিস্তানি পুলিশ এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। ইলা সহ আরো বেশকিছু আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে নাচোল থানায় নিয়ে আসা হয়। এরপর শুরু হয় স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অমানুষিক অত্যাচার। আন্দোলনকারীদের কেবল একটাই কথা স্বীকার করতে বলা হয়- ইলা মিত্রের নির্দেশেই নাচোলে পুলিশ হত্যা করা হয়েছিল। শত অত্যাচার সত্ত্বেও এমনকি বেশ কিছু বন্দিকে মারতে মারতে মেরে ফেলা সত্ত্বেও কেই মুখ খোলেননি। আন্দোলনকারীদের থেকে স্বীকারোক্তি আদায় না করতে পেরে শুরু হয় ইলার ওপর পাশবিক অত্যাচার। ইলাকে বিবস্ত্র করে মারতে মারতে প্রথমে বন্দুকের বাঁটের আঘাতে নাক মুখ ও মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। তারপর মুখে রুমাল গুঁজে দিয়ে ইলার যৌনাঙ্গে গরম ডিম সেদ্ধ ঢুকিয়ে ও ডান পায়ের গোড়ালিতে পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় সংজ্ঞাহীন ইলাকে পাকিস্তানি পুলিশ পর পর ধর্ষণ করে। শেষে অচেতন ইলাকে দিয়ে জোর করে পুলিশের লেখা ইলার জবানবন্দিতে সই করিয়ে নেওয়া হয়। অত্যাচারের অভিঘাতে প্রায় এক বছরের ওপর ইলা নিজের পায়ে হাঁটতে পারতেন না। জেলের এক নির্জন কক্ষে প্ৰবল অসুস্থ ইলা মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন কেবল।
জেলের মধ্যে ইলার এই দুরাবস্থার কথা জনসমক্ষে আসতেই ঢাকার রাজপথ জুড়ে হাজারে হাজারে মানুষ ইলার সুচিকিৎসার দাবিতে বিক্ষোভ প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে। জনমতের প্রবল চাপে ইলাকে প্রথমে ঢাকা সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয় পরে সেখান থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ। মেডিক্যাল কলেজে প্রায় আট মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
সেই যে কলকাতায় এলেন আর বাংলাদেশে থাকার জন্য ফিরে যাননি ইলা। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পর মাঝে দু একবার গেছিলেন। ১৯৯৬ সালে ৭১ বছরের বৃদ্ধা ইলা যখন এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে নাচোলে পা রাখেন কেবল তাঁকে দেখতে ও তাঁর কথা শুনতে লাখ মানুষ জড়ো হয় স্থানীয় হরতাল উপেক্ষা করে। এঁরা কেউই তাঁর সাথে লড়েননি, তাঁকে চোখেও দেখেনি আগে তবু বংশ পরম্পরায় ইলা মিত্র নামে এক দুর্দমনীয় নারীর অকুতোভয় সংগ্রাম ও অনমনীয় জেদের কথা শুনে এসেছে। ইলা মঞ্চে উঠে মাইক ধরতেই লাখ লাখ জনতার কন্ঠ আকাশ বাতাস বিদারিত করে বলে উঠল- জয় রানীমার জয়।
অলিম্পিক চিরকালই কিংবদন্তী তৈরি করে রেসের মাঠে, সুইমিং পুলে, জিমন্যাস্টিক রুমে। ইলা মিত্র অলিম্পিক -এ গেলে অ্যাথলেটিক্সে ভারতকে হয়ত সোনা এনে দিতে পারতেন কিন্তু ৬ গ্রাম সোনার একটা মেডেল কি আর হাজার হাজার সাঁওতালের নয়নের মনি ‘রানিমা’ তৈরি করতে পারত?
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- ইলা মিত্রের জবানবন্দি, প্রকাশক- শেখ রফিক, প্রকাশনা- বিপ্লবীদের কথা, অধ্যায়- আদালতে ইলা মিত্রের জবানবন্দি, ১৯৫০, পৃষ্ঠা-১৬-১৮
-
“Otiter Jed” or Times of Revolution: Ila Mitra, the Santals and Tebhaga Movement, KAVITA PANJABI, Economic and Political Weekly Vol. 45, No. 33 (AUGUST 14-20, 2010), pp. 53-59 (7 pages) Published by: Economic and Political Weekly


আপনার মতামত জানান