সববাংলায়

অলিম্পিক বয়কট

প্রতি চার বছর অন্তর অনুষ্ঠিত অলিম্পিক প্রতিযোগিতা বিশ্বের দরবারে সবথেকে বৃহৎ এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যেখানে সমস্ত দেশের মধ্যে ক্রীড়ার মাধ্যমে সৌভ্রাতৃত্ববোধ এবং সমগ্র বিশ্বে শান্তি বজায় রাখাই এর দার্শনিক ভিত্তি। কিন্তু তবু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে এই ঐতিহ্যশালী অলিম্পিকের মঞ্চেও দেখা যায় অনেক সমস্যা। কখনও অলিম্পিকের প্রতিযোগীদের অপহরণ ও হত্যা, কখনো ডোপিং কাণ্ড, কখনো আবার অলিম্পিক বয়কটের (Olympic boycott) মতো ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন অলিম্পিক বয়কট । ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭২, ১৯৮০, ১৯৮৪ কিংবা ১৯৮৮ সালে ছয়বার কখনো একটিমাত্র দেশ, কখনো আবার কয়েকটি দেশ মিলিতভাবে অলিম্পিকে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কখনো আবার বিশেষ কারণে কোনো কোনো দেশকে অলিম্পিকে যোগদানের অনুমতিই দেওয়া হয়নি। যদিও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আর বয়কট বিষয়টি সামান্য আলাদা। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেশগুলির নিজস্ব কিছু মতামত থাকলেও একশো পঁচিশ বছরের ঐতিহাসিক এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতার নিরিখে বয়কটের মতো ঘটনা সত্যই অভিপ্রেত নয়। তাহলে আর দেরি না করে চলুন একে একে জেনে নিই এই বয়কটগুলির ইতিহাস-প্রসঙ্গের বিষয়ে।

অলিম্পিকের ইতিহাসে প্রথম বয়কটের ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৬ সালের মেলবোর্ন অলিম্পিকে। চিন, মিশর, ইরাক, লেবানন, নেদারল্যাণ্ডস, স্পেন এবং সুইজারল্যাণ্ড এই অলিম্পিকে যোগদানে অসম্মত হয়। এর পিছনে লুকিয়ে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের হাঙ্গেরি আক্রমণ। অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরুর প্রায় এক মাস আগে, হাঙ্গেরিতে কমিউনিস্ট আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঘটে চলা বিপ্লব দমন করতে সোভিয়েত ইউনিয়ন হাঙ্গেরি আক্রমণ করে বসে। এই ঘটনার প্রতিবাদে নেদারল্যাণ্ড, স্পেন আর সুইজারল্যাণ্ড অলিম্পিকে যোগ দিতে অসম্মত হয়। ইতিমধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী চিনও বয়কট করে অলিম্পিক। আর অন্যদিকে ইজিপ্টে সুয়েজ খালের জলস্রোতের নিয়ন্ত্রণ রাখতে একাধারে ব্রিটিশ-ফরাসি এবং ইজরায়েলিদের অনুপ্রবেশের কারণে ইজিপ্ট, ইরাক এবং লেবানন ১৯৫৬ সালের অলিম্পিক বয়কট ঘোষণা করে। সেই বছর অলিম্পিকে আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গিয়েছিল যাকে ইতিহাসে ‘ব্লাড ইন দ্য ওয়াটার’ বলা হয়। হাঙ্গেরি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের অ্যাথলিটদের মধ্যে যখন ওয়াটার পোলো খেলা চলছিল, সেই সময় সোভিয়েত অ্যাথলিটদের আক্রমণে হাঙ্গেরির এক খেলোয়াড়ের মাথা ফেটে রক্তপাত ঘটে যার দরুণ দর্শক আর অ্যাথলিটদের মধ্যে প্রত্যক্ষ সংঘাত বেধে যায়। যদিও হাঙ্গেরিই সেই ম্যাচে ৪-০ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিল।

এর পরের বয়কটের ঘটনা ঘটে আট বছর পরেই, ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে। এই অলিম্পিক ইতিহাসে একটু বেশি নজর কাড়ে কারণ এটাই ছিল প্রথমবার যখন কোনো এশীয় দেশে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হল। কিন্তু এর আগের বছরই ১৯৬৩ সালে জাকার্তা ঠিক এই অলিম্পিকের মতনই একটি বহুজাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা চালু করেছিল যা প্রায় অলিম্পিকের বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল। ফলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি হঠাৎ ঘোষণা করে যে, যে সব অ্যাথলিটরা সেই জার্কাতা-আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিল তারা আর সেই বছর অলিম্পিকে অংশ নিতে পারবে না। এই ঘোষণার ফলে চিন, উত্তর কোরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া অলিম্পিক বয়কট করে কারণ তাদের সেরা কয়েকজন অ্যাথলিট সেই জাকার্তা-প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। এমন ঘটনা অলিম্পিকের ইতিহাসে সত্যই বিস্ময়কর।

এরপর ১৯৭৬ সালে কানাডার মন্ট্রিলে আয়োজিত অলিম্পিকে কুড়ির বেশি আফ্রিকান দেশ এবং তাইওয়ান অলিম্পিক বয়কট করে। এই ঘটনাটার প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যকে কেন্দ্র করে। ঐ সময় বর্ণবৈষম্যের কারণে সোয়েতো সংঘর্ষ চলছিল সারা আফ্রিকা জুড়ে যা নিয়ে আফ্রিকানরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। আর এই পরিস্থিতিতে সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গরা দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার নিউজিল্যাণ্ডের কাছে তা অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং নিউজিল্যাণ্ডের রাগবি ইউনিয়ন তিন মাসের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে অংশ নেয়। এর প্রতিবাদে আফ্রিকা মহাদেশের অন্য আরো আটাশটি দেশ অলিম্পিক বয়কট করে। এইসব দেশের মধ্যে আলজিরিয়া, বেনিন, ক্যামেরুন, চাঁদ, কঙ্গো, ইজিপ্ট, ঘানা, গুয়ানা, কেনিয়া, তাঞ্জানিয়া প্রভৃতি ছিল প্রধান। অলিম্পিকে এতদিন ধরে ট্র্যাক অ্যাণ্ড ফিল্ড প্রতিযোগিতায় কেনিয়া আর তাঞ্জানিয়া থেকেই অ্যাথলিটরা স্বর্ণপদক পেতেন বেশি, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হল অলিম্পিক এবং আপামর দর্শক। এছাড়াও এই বয়কটের কারণে হোটেল এবং টিকিট ভাড়া বাবদ প্রায় দশ লক্ষ কানাডিয়ান ডলার ফেরত দিতে হয়েছিল কানাডাকে। একইসঙ্গে কানাডার অলিম্পিক কমিটির সুপারিশে তাইওয়ান ‘গণপ্রজাতন্ত্রী চিন’-এর নামে অলিম্পিকে খেলতে অস্বীকার করে, এই ঘটনাও বয়কটের অধীনে। তাইওয়ান অনেকদিন ধরেই চিন থেকে পৃথক হতে চাইছিল ফলে তাঁদের এই বয়কট বিশ্বের সমাজ-রাজনৈতিক পটভূমিকে উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য যোগ করো

চার বছর অন্তর অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু চার বছর পরেই আবার বয়কটের ঘটনা অবিশ্বাস্য। ১৯৭৬-এ কানাডা অলিম্পিকে দক্ষিণ আফ্রিকার অনেকগুলি দেশ আর তাইওয়ানের বয়কটের পরে, ১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিকে মার্কিন যুক্তরাষ্টের নেতৃত্বে ৬৫টি দেশ অলিম্পিক থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেয়। এর পিছনে কারণ ছিল ১৯৭৯ সালের রাশিয়ার বাহিনীর আফগানিস্তান আক্রমণ। এর ফলে অলিম্পিকের ইতিহাসে ১৯৫৬ সালের পর সবথেকে কম সংখ্যক দেশ (মাত্র আশিটি) এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কানাডা, ইজরায়েল, জাপান, চিন, পশ্চিম জার্মানি সহ বহু ইসলামিক দেশ বয়কট করেছিল ১৯৮০ সালের অলিম্পিক। আফগানিস্তানের অ্যাথলিটরা প্রত্যেকেই স্বমহিমায় যোগ দেয় এই খেলায়। কিন্তু অন্য অনেক দেশের অ্যাথলিটরা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অনুমতিতে অলিম্পিকের সাধারণ পতাকা নিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। যে কারণে বয়কট হয়, সেই রাশিয়ান-আফগান যুদ্ধ কিন্তু এর ফলে একটুও কমেনি। বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন সে বছর ১৯৫টা পদক জিতে নেয়।

রইল বাকি দুই – ১৯৮৪ আর ১৯৮৮। ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিকের বয়কটের ঘটনা বলা যায় ১৯৮০ সালেরই প্রতিক্রিয়া। চার বছর আগের অলিম্পিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৬৫টি দেশ বয়কট করেছিল আর এবারে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে বয়কট ঘোষিত হল। মোট ১৪টি দেশ অংশ নিল এই বয়কটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের অলিম্পিক কমিটির বক্তব্য ছিল যে আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁদের দেশের অ্যাথলিটদের উপর হামলা হতে পারে ভেবেই এই বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তারা। কারণ তখনও রুশ-আফগান যুদ্ধ থামেনি। এই বয়কটকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে ১৪০টি দেশের সম্মিলিত যোগদান অলিম্পিকের ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড গড়লো। গতবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন পদক জয়ের সুযোগ পেয়েছিল আর এবারে সেই সুযোগ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে – ৮৩টি স্বর্ণপদক জয় করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রেকর্ড করে।

একেবারে শেষে বলতেই হয় ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে আয়োজিত অলিম্পিকে কিউবা, নিকারাগুয়া, ইথিওপিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার বয়কটের কথা। অলিম্পিকের সহ-আয়োজক না হতে দেওয়ায় উত্তর কোরিয়া অলিম্পিকে যোগদানে অস্বীকার করে আর তার সঙ্গে যোগ দেয় কিউবা, নিকারাগুয়া আর ইথিওপিয়া। যদিও এই তিনটি দেশের বয়কটের প্রেক্ষাপট ছিল পৃথক। বিগত অলিম্পিকের বয়কটের কথা স্মরণে রেখে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে আলাদা করে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে অনুরোধ করে। সোভিয়েতের যোগদানের প্রতিবাদেই বয়কট করেছিল কিউবা, নিকারাগুয়া আর ইথিওপিয়া। ঠাণ্ডা লড়াই চলাকালীন এটাই ছিল শেষ অলিম্পিক যেখানে বয়কট সত্ত্বেও মোট একশো উনষাটটি দেশের আট হাজার অ্যাথলিটের অংশগ্রহণ রেকর্ড গড়ে তোলে।

ফলে বারবারই দেখা গেছে অলিম্পিকের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কখনোই পৃথক বিষয় হয়ে থাকেনি বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে। ক্রীড়া এবং সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এমন নির্মমভাবে প্রণোদনা জাগিয়েছে আর তার ফলে অলিম্পিকের শান্তিরক্ষার যে মুখ্য দার্শনিক উদ্দেশ্য তা বিঘ্নিত হয়েছে বারবার। আন্তর্দেশীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের অলিম্পিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা কখনোই বিশ্ববাসীর অভিপ্রেত ছিল না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading