ইতিহাস

ওমর খৈয়াম

ওমর খৈয়াম (Omar Khayyam) ছিলেন একজন ইরানীয় কবি, গণিতবিদ, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ। তাঁর সম্পূর্ণ নাম গিয়াসউদিন আবুল‌ ফাতেহ ওমর ইবনে ইব্রাহিম আল-খৈয়াম ( Abu’l Fath Omar ibn Ibrahim al-Khayyam) । 

১০৪৮ সালের ১৮ মে ইরানের নিশাপুর গ্রামে ওমর খৈয়ামের জন্ম হয়৷ তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল খোরাসানের অন্যতম সেরা শিক্ষক ইমাম মোয়াফককের ( Imam Muwaffaq Nishaburi) অধীনে৷ তারপর গণিতবিদ আবু হাসান বহমনার বিন্ মারজাবন(Abu Hassan Bahmanyar bin Marzban)এর কাছে ওমর খৈয়াম তাঁর শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন৷ নিশাপুরে থেকে বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন এবং জ্যোতির্বিদ্যার ওপর পড়াশোনা করার পর তিনি ১০৬৮ সালে প্রথমে বুখরা এবং ১০৮০ সালে সমরখন্দে চলে যান সেখানে গিয়ে তিনি শহরের গভর্নর ও প্রধান বিচারপতি আবু তাহির আবদুল-রহমান ইবনে-আলাকের পৃষ্ঠপোষকতায় বীজগণিত সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করা শুরু করেন। 

ওমর খৈয়ামের উল্লেখযোগ্য কৃতিত্বের মধ্যে পড়ে তাঁর গণিতচর্চা৷ গণিতবিদ হিসাবে তাঁর খ্যাতি সারা বিশ্বে ছিল৷ তাঁর বীজগণিত সংক্রান্ত বই ‘Treatise on Demonstration of Problems of Algebra’ গ্রন্থে তিনি ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধানের পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন৷ এছাড়া তিনি  দ্বিপদীয় উপপাদ্য এবং প্রাকৃতিক সংখ্যার নবম মূল নিষ্কাশনের ( extracting binomial theorem and the ninth root of natural numbers) বিষয়ে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন বলে জানা যায় যেটি অবশ্য খুঁজে পাওয়া যায় নি৷  এছাড়া তিনি সমান্তরালের তত্ত্ব ( Theory of parallels) , অনুপাতের তত্ত্ব এবং অনুপাতের মিশ্রণের ক্ষেত্র ( Theory of proportions and with the compounding of ratios),  বীজগণিতে ঘনকের সমীকরণ (The solution of cubic equations) ইত্যাদি তত্ত্ব লিপিবদ্ধ করেন। কেবল গণিতচর্চাই নয় ওমর খৈয়াম জ্যোতির্বিদ হিসাবেও পরিচিত ছিলেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চ্চার পাশাপাশি জালালি বর্ষপঞ্জি সংশোধনেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে৷ সুলতান মালিক- শাহ্( Sultan Malik-Shah) তাঁকে ইস্পাহান-এ পর্যবেক্ষণকেন্দ্র(observatory at Isfahan)  তৈরি করার এবং পারস্য বর্ষপঞ্জি সংস্কারের দায়িত্বভার দিয়েছিলেন৷ সেলজুক সাম্রাজ্যের উজির ‘নিজাম-উল-মুলক্’-এর কাছে ওমর খৈয়াম নক্ষত্রপুঞ্জ ও জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের জন্য একটি মান-মন্দির প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা চাইলে নিজাম তাঁকে একটি মান-মন্দির নির্মাণ করে দিয়েছিলেন এবং রাজকোষ থেকে বার্ষিক ১২০০ মিথকাল (পারস্যের প্রাচীন স্বর্ণমূদ্রা) বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।

ওমর খৈয়াম তাঁর কাব্য প্রতিভার জন্য প্রধানত খ্যাত হয়ে আছেন। তিনি বেশ কিছু চতুষ্পদী রচনা করেছেন যা ‘রুবাই’ নামে পরিচিত এবং তাঁর সব চতুষ্পদী একত্রে সংকলিত হয়ে ‘রুবাইয়্যাৎ-এ- ওমর খৈয়াম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ফিটজেরাল্ড, ওমর খৈয়ামের রুবাইগুলি ইংরেজিতে অনুবাদ ও সংকলিত করে  ‘রুবাইয়্যাৎ-এ- ওমর খৈয়াম’ নামে প্রকাশ করেন। ইংরেজিতে অনূদিত এই সংকলন থেকেই ওমর খৈয়ামের কবি প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায় এবং তিনি সাহিত্যানুরাগীদের কাছে  বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন৷গত শতকের ত্রিশের দশকে বাংলা ভাষায় এই কবির অমর কাব্য রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম অনুবাদ করতে শুরু করেন নজরুল ইসলাম। পারস্যের এই কবির সঙ্গে পরিচিতি বাড়তে থাকে জনসাধারনের৷ এছাড়া বাংলা ভাষায় কান্তিচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে রুবাই গুলি বাঙালি পাঠকের কাছে এসে পৌঁছয়।

তাঁর লেখা রুবাইয়ের একটি উদাহরণ ও এর অনুবাদ নিচে দেওয়া হল-

মূল ফারসি: “তাঙ্গি মা’ইয়ে লাল খোয়াহাম উ দিওয়ানিসাদ-এ রামাকে বয়াদ ও নিস্ফ-এ না’নিওয়া আংগাহ মান উ তু নিশাস্তা দর বিরানিখুশতার বুওয়াদ আজ মামলাকাত-এ-সুলতানি।”
ফিটজেরাল্ডের অনুবাদ:Here with a Loaf of Bread beneath the Bough/ A flask of wine, a book of verse and Thou/ Beside me singing in the wilderness/ And wilderness is Paradise enow.”
কান্তিচন্দ্রের অনুবাদ: “সেই নিরালা পাতায় ঘেরা বনের ধারে শীতল ছায়/ খাদ্য কিছু পেয়ালা হাতে ছন্দ গেথে দিনটা যায়!/ মৌন ভাঙ্গি মোর পাশেতে গুঞ্জে তব মঞ্জু সুর/ সেই তো সখি স্বপ্ন আমার, সেই বনানী স্বর্গপুর!”
নজরুলের অনুবাদ: “এক সোরাহী সুরা দিও,একটু রুটির ছিলকে আর/ প্রিয়া সাকী, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার/ জীর্ন আমার জীবন জুড়ে রইবে প্রিয়া আমার সাথ/ এই যদি পাই চাইব নাকো তখৎ আমি শাহানশার!”

নজরুল ওমর খৈয়াম সম্পর্কে লিখেছেন, ”ওমরের কাব্যে শারাব-সাকির ছড়াছড়ি থাকলেও তিনি জীবনে ছিলেন আশ্চর্য রকমের সংযমী। তাঁর কবিতায় যেমন ভাবের প্রগাঢ়তা, অথচ সংযমের আঁটসাঁট বাঁধুনী, তাঁর জীবনও ছিল তেমন।…” ইউরোপীয় অনেকগুলি ভাষাতেই তাঁর রুবাইয়াৎ অনূদিত হয়েছিল। তাঁর রচিত প্রায় বারোশো রুবাইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। মার্কিন কবি জেমস রাসেল লোয়েল ওমর খৈয়ামের রুবাই বা চতুষ্পদী কবিতাগুলোকে ‘পারস্য উপসাগরের মনিমুক্তা’ বলে অভিহিত করেছেন। রুবাইগুলির মধ্যে তাঁর নিজস্ব দর্শন চিন্তা ধরা পড়েছে। তাঁর রুবাইগুলির মধ্যে তিনি জীবন এবং জগতের ও পারলৌকিক জীবনের রহস্য বা দর্শন সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

ওমর খৈয়াম আর্কিমিডিসের নীতির(Archimedes’ principle) উপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এছাড়াও সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর তিনি বই লিখেছিলেন যেখানে তিনি সংগীত এবং পাটিগণিতের মধ্যে সংযোগ নিয়ে আলোচনা করেছেন। 

 ১১৩১ সালের ৪ ডিসেম্বর ওমর খৈয়ামের মৃত্যু হয়৷ মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৮৩ বছর৷ ‘চাহার মকালা ‘গ্রন্থে ওমরের সাথে তাঁর শিষ্য নিজামি আরুজির শেষ সাক্ষাৎকারের এক চমকপ্রদ বর্ণনা আছে যেখানে তিনি অনেক আগেই তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে ভবিষ্যৎবানী করে বলেছিলেন, “my tomb shall be in a spot where the north wind may scatter roses over it.” সত্যিই তাঁর সমাধির চারপাশ অজস্র ফুল গাছে ভরা। তাঁর কবরের ওপর তাঁরই লেখা একটি ছত্র লেখা আছে- “আয় দিল চুন জামানা মীকুনাদ গম নাকাৎনাগাহ দে রওয়াদ যে তন রুয়ানে পাকাৎবর সবজা নেশীন ও খোশ্ জী রোসে চন্দ্যাঁ পেশকে সব্জা বর দমদ আয খাকাৎ।” 

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।