বিবিধ

যে সব বিজ্ঞানীরা একটুর জন্য নোবেল পাননি

যে সব বিজ্ঞানীরা একটুর জন্য নোবেল পাননি

সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, শান্তি ইত্যাদি বিবিধ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করার প্রথা বহুদিনের। নোবেল পুরস্কারের ঐতিহ্য ও সম্মান অনস্বীকার্য। নোবেল পুরস্কারের থেকেও প্রাচীন রয়্যাল সোসাইটির কোপলি পদক কিংবা নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্যের থেকেও বেশি পুরস্কারমূল্য সমন্বিত ব্রেকথ্রু পুরস্কার ইত্যাদি দেওয়া হলেও, নোবেল পুরস্কারের জনপ্রিয়তা আজও অটুট। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বহু বহু প্রাচীনকাল থেকে মানব-কল্যাণকর নানা আবিষ্কার হয়ে এসেছে। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বহু বিজ্ঞানী নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে বহু বিজ্ঞানী বিশেষ অবদান সত্ত্বেও নোবেল পাননি। এমনকি তাঁদের কাজের সঠিক মূল্যায়নও করা হয়নি। পুরস্কারে ভূষিত না হওয়ায় তাঁরা যুগের ইতিহাসে একপ্রকার অনালোচিতই থেকে গিয়েছেন। চলুন জেনে নেওয়া যাক যে সব বিজ্ঞানীরা একটুর জন্য নোবেল পাননি, তাদের কথা।

১. বোলৎজম্যান (Boltzman) : তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র অনুসারে এনট্রপির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছিলেন তিনি। তাছাড়া বিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে কাজ করে তিনি বোলৎজম্যান সমীকরণ প্রণয়ন করেন। ১৯০৩, ১৯০৫ এবং ১৯০৬ সালে পরপর তিনবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও, পুরস্কার পাননি তিনি। তাঁর জীবনও ছিল দুর্বিষহ। কঠোর সমালোচনা আর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে ১৯০৬ সালেই আত্মহত্যা করেন বোলৎজম্যান।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

২. আর্নল্ড সোমারফিল্ড (Arnold Sommerfield) : কোয়ান্টাম তত্ত্বের জগতে তিনি একজন যোগ্য পথপ্রদর্শক। ১৯১৭ থেকে ১৯৫১ সালের মধ্যে ৮৪ বার তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রত্যেকবারই তাঁর অবদানকে পুরস্কৃত করার মত গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি নোবেল কমিটির। আশ্চর্যের বিষয় তাঁর বহু ছাত্র পরবর্তীকালে নোবেল প্রাপক হন, কিন্তু নোবেল পাননি সেই হতভাগ্য মাস্টারমশাই সোমারফিল্ড।  

৩. লিজ মেইটনার (Lise Meitner) : আইনস্টাইন তাঁকে ডাকতেন ‘জার্মান মারি কুরি’ নামে। ১৯৩৮ সালে অটো হান এবং ফ্রিৎজ স্ট্রাসম্যান নিউট্রন দ্বারা ইউরেনিয়ামকে আঘাতের ফলে বেরিয়াম উৎপন্ন হওয়ার কথা বললেও লিজ মেইটনারই প্রথম এই ঘটনার ফলাফলের যথাযথ ব্যাখ্যা দেন। তিনিই প্রথম পদার্থবিদ্যার জগতে নিউক্লীয় সংযোজন (Nuclear Fission) এই শব্দবন্ধটি প্রয়োগ করেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে ৪৮ বার তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও, পুরস্কৃত হননি। ১৯৪৪ সালে অটো হান রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেলেও অবহেলিত থেকে গিয়েছেন লিজ মেইটনার।

৪. এডুইন হাব্‌ল (Edwin Hubble) : কার্নেগি ইনস্টিটিউটের মাউন্ট উইলসন অবজারভেটরি থেকে নিরলস গবেষণা করে এডুইন হাব্‌লই প্রথম মহাবিশ্বের প্যারাডাইম-শিফটের (Paradigm-Shift) কথা বলেন। আইনস্টাইনের মতের বিরোধিতা করে হাব্‌লই প্রথম বলেন যে, মহাবিশ্ব সর্বদা প্রসারণশীল। ১৯৫৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও পুরস্কৃত হননি।

৫. রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন (Rosalind Franklin) : ১৯৫২ সালে তিনি এক্স-রশ্মির সাহায্যে ডিএনএ-র দ্বিতন্ত্রী গঠন আবিষ্কার করেন। কিন্তু তাঁর এই কাজ গুরুত্ব পায়নি। তার বদলে ১৯৬২ সালে নিউক্লিক অ্যাসিডের আণবিক গঠন আবিষ্কারের জন্য অন্য তিনজন বিজ্ঞানী চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পান। পরে পোলিও ভাইরাস বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন রোজালিন্ড। তাঁর সঙ্গী ছিলেন অ্যারন ক্লুগ এবং জন ফ্লিঞ্চ। এই গবেষণা চলার সময়েই জরায়ুর ক্যান্সারে মৃত্যু হয় তাঁর। অথচ তাঁর স্মৃতিতে তাঁরই গবেষণাপত্র প্রকাশ করে ১৯৮২ সালে পোলিও ভাইরাসের আণবিক গঠন আবিষ্কারের সুবাদে রসায়নে নোবেল পান অ্যারন ক্লুগ।

৬. জোনাস স্যাক (Jonas Salk) : ১৯০০ সালের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোলিও মহামারী আকার নিয়েছিল। ১৯৫২ সালে পোলিও আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার। আমেরিকান জীবাণু বিশেষজ্ঞ জোনাস স্যাক প্রথম এই ভয়ানক রোগের জীবাণুর প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন,  তাও আবার একটি মৃত পোলিও ভাইরাসের সাহায্যে। প্রথমে নিজে এবং নিজের পরিবারের উপর এই টিকা পরীক্ষার পরে ১৯৫৪ সালে প্রায় ১০ লক্ষ শিশুকে এই পোলিও টীকা দেওয়া হয়। এর ফলেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পোলিও রোগের হার ৯৫ শতাংশ হ্রাস পায়। এই টীকা আবিষ্কারের জন্য কোনও পেটেন্ট না করানোর ফলে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকলেও নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হননি জোনাস স্যাক।

৭. অ্যালবার্ট স্ক্যাৎজ (Albert Schatz) :  যক্ষ্মা রোগের প্রতিষেধক হিসেবে প্রথম স্ট্রেপ্টোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছিলেন স্ক্যাৎজ। শুধুই যক্ষ্মা নয়, তার পাশাপাশি কলেরা, টাইফয়েড, প্লেগ ইত্যাদি নানা রোগের প্রতিকারে এই স্ট্রেপ্টোমাইসিন কার্যকরী ভূমিকা নিত। কিন্তু যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্বীকৃতি পাননি তিনি। স্ক্যাৎজের এই গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক বিখ্যাত মৃত্তিকা-অণুজীব বিশেষজ্ঞ সেলম্যান ওয়াকস্‌ম্যান নিজেকে এই স্ট্রেপ্টোমাইসিন আবিষ্কারের পূর্ণ দাবিদার বলে ঘোষণা করেন। এমনকি পেটেন্টের রয়্যালটির অর্থও লাভ করেন তিনি। আশ্চর্যের বিষয় ১৯৫২ সালে এই কাজের জন্যই সেলম্যান নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। অথচ অনালোচিত থেকে যান অ্যালবার্ট স্ক্যাৎজ।

ভারতীয়রাও এই বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের যোগ্য হিসেবে ভারতীয় কৃতী ব্যক্তিদের সাধারণভাবেই ঔপনিবেশিক শাসনকালে অবজ্ঞা করা হত। এমনকি বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর মত মানুষেরাও নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন আরও কয়েকজন কৃতী ভারতীয় বিজ্ঞানী। জেনে নেওয়া যাক তাঁদের কথাও।

৮. জগদীশচন্দ্র বসু (Jagadish Chandra Bose) – ১৮৯৫ সালে ইতালীয় উদ্ভাবক গুগলিয়েলমো মার্কনিকে প্রথম টেলিগ্রাফ আবিষ্কার করার কৃতিত্ব দেওয়া হলেও জগদীশচন্দ্র বসুই প্রথম বেতার তরঙ্গ আবিষ্কার করেন এবং তার আচরণ বোঝার চেষ্টা করেন। অথচ জগদীশচন্দ্র বসুর নাম পৃথিবী তখন জানতেই পারেনি, এমনকি তিনি কোনও স্বীকৃতিও পাননি।

৯. সত্যেন্দ্রনাথ বসু (Satyendra Nath Bose) – ১৯২০ সালের গোড়ার দিকে তিনিই প্রথম কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। পরবর্তীকালে আইনস্টাইনের সঙ্গে একত্রে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান এবং বোস-আইনস্টাইন কনডেনসেট আবিষ্কার করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কিন্তু বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও তিনি নোবেল পাননি।

১০. গোপালাসমুদ্রম নারায়ণা আইয়ার রামচন্দ্রন (GopalaSamudram Narayana Iyer Ramachandran)

ব্যাঙ্গালোরে তড়িৎ-প্রকৌশলীবিদ্যা চর্চার সময় তাঁর গবেষণার গভীরতা বিচার করে মান্যতা দিয়েছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল প্রাপক আরেক বিজ্ঞানী সি ভি রামন। পরবর্তীকালে কোলাজেনের ত্রি-তন্ত্রী গঠন আবিষ্কার করেন রামচন্দ্রন এক্স-রশ্মি পৃথকীকরণ পদ্ধতির সাহায্যে। আণবিক জৈব-পদার্থবিদ্যার জগতে এ এক যুগান্তকারী কাজ হলেও নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হননি তিনি।

১১. এন্নাকাল চান্ডি জর্জ সুদর্শন (Ennakkal Chandy George Sudarshan) – ট্যাকিয়ন নামের এক বিশেষ কণা আবিষ্কার করেছিলেন তিনিই প্রথম যা কিনা শূন্যে আলোর চেয়েও বেশি গতিবেগে ভ্রমণ করে। আবার বিজ্ঞানী রবার্ট মারশাক্সের সঙ্গে একত্রে ভি-এ তত্ত্ব (V-A Theory) প্রণয়ন করেছিলেন তিনি। বহুবার মনোনীত হয়েও নোবেল পাননি বিজ্ঞানী সুদর্শন।

১২. মেঘনাদ সাহা (Meghnad Saha) – সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সহপাঠী মেঘনাদ সাহা আবিষ্কার করেন সাহা আয়নীকরণ সমীকরণ যা কিনা নক্ষত্রের রাসায়নিক ও শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দেয়। জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা (Astro-physics)-এর একটি মৌলিক অংশ হওয়া সত্ত্বেও এই গবেষণার জন্য কখনও তিনি নোবেল পাননি।

১৩. উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী (Upendranath Brahmachari) – ১৯২২ সালে ইউরিয়া স্টিবামাইন আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের বহু আগে এই ইউরিয়া স্টিবামাইনের সাহায্যেই কালাজ্বর মহামারীর হাত থেকে বহু মানুষকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিদ্যায় নোবেল পাননি তিনি।

নোবেল না পেলেও তাঁদের বিজ্ঞানে তাঁদের অসামান্য অবদান মানব সমাজের কল্যাণকর কাজেই নিয়োজিত হয়েছে। পুরস্কারের স্বীকৃতি ছাড়াই আজও এই মহান বিজ্ঞানীরা আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন।   

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন