বিজ্ঞান

ই.সি.জর্জ সুদর্শন

বিংশ শতাব্দীর একজন জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিদ হলেন ই.সি.জর্জ সুদর্শন (E.C.George Sudarshan)। পরবর্তীকালে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করা এই ইন্দো-আমেরিকান তাত্ত্বিক পদার্থবিদ আধুনিক পদার্থবিদ্যার বহু বিখ্যাত তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। রচনা করেছিলেন বহু বিজ্ঞান নির্ভর গ্রন্থ। সারা জীবনে মোট নয় বার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তিনি।

১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের কেরালা রাজ্যের অন্তর্গত ত্রিবাঙ্কুরের পাল্লামে ই.সি.জর্জ সুদর্শন এর জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম এনাকেল কান্ডি জর্জ সুদর্শন (Ennackel Chande George Sudarshan)। তাঁর বাবার নাম ই.আই.কান্ডি ও মায়ের নাম ছিল আচাম্মা। একটি সিরিয়ান খ্রীষ্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে ‘বেদান্তিক হিন্দু’ বলে উল্লেখ করতেন। ঈশ্বরের ধারণাকে নিয়ে চার্চের পাদ্রীদের সঙ্গে মতবিরোধ এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে তিনি খ্রীষ্টধর্ম ত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তী জীবনে ললিতা নামে এক মহিলার সঙ্গে সুদর্শনের বিবাহ হয়। এই দম্পতির আলেক্সান্ডার, অরবিন্দ ও অশোক নামে তিনটি পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছিল।

তাঁর বড় ভাইয়ের স্কুলপাঠ্য একটি বই পড়েই তাঁর পদার্থবিদ্যার প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয়েছিল। সমগ্র বইটি পড়ে সুদর্শন হোঁচট খেয়েছিলেন এই বাক্যটিতে, ‘সাধারণ পেন্ডুলামের সমসাময়িক সূত্রের উৎপত্তি এই বইয়ের আওতার বাইরে’। ছোট্ট সুদর্শন ঠিক করে ফেলেন যে তিনি সেই বইটি খুঁজে বের করবেন যেখানে এই সূত্রের সম্পর্কে লেখা আছে। এইভাবেই তিনি ভালোবেসে ফেলেছিলেন এই বিষয়টিকে। কোট্টায়মের সি.এম.এস কলেজে সুদর্শন ভর্তি হয়েছিলেন এবং ১৯৫১ সালে মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজ তিনি স্নাতক হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর অন্য শিক্ষার্থীদের মতো তিনিও ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’ (TIFR)-এ বিজ্ঞানী হোমি জাহাঙ্গীর ভাবার অধীনে অল্প সময়ের জন্য গবেষণার কাজে নিযুক্ত হন। পরে সুদর্শন নিউ ইয়র্কের ‘ইউনিভার্সিটি অফ রচেস্টার’ (University of Rochester)-এ চলে যান। সেখানে তিনি বিজ্ঞানী রবার্ট মার্শাক (Robert Marshak)-এর অধীনে গবেষণা করতে থাকেন। ১৯৫৮ সালে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞানী জুলিয়েন শোয়িংগার (Julian Schwinger)-এর তত্ত্বাবধানে পোস্ট-ডক্টরেট এর কাজে নিযুক্ত হন।

পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ই.সি.জর্জ সুদর্শন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিনি উইক ফোর্সের ভি-এ তত্ত্ব (V-A theory of the weak force) করেছিলেন, ইলেকট্রোউইক তত্ত্বের পথ সুগম করেছিল। বিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) এবং মারে গল-ম্যান (Murray Gell-Man) এই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। ডক্টরেট পড়াকালীন তিনি পদার্থবিদ্যার একটি বিশেষ শাখা ‘কোয়ান্টাম অপটিক্স’ (quantum optics) নিয়ে গবেষণা করতেন। সেই সময় বিজ্ঞানী আর.যে.গ্লোবার (R.J.Glauber) অপটিক্যাল শাখাকে বিশ্লেষণ করার জন্য ব্যবহৃত ক্লাসিক্যাল ইলেকট্রোম্যাগনেটিক থিওরি (Classical Electromagnetic Theory)-র বিরূপ সমালোচনা করেন। এই কাজে সুদর্শন কারণ তিনি মনে করতেন এই তত্ত্ব সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন। পরবর্তীকালে সুদর্শন এই বিষয়ে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লেখেন এবং একটি কপি গ্লোবারকেও পাঠান। কিন্তু গ্লোবার তাঁকে একই ফলাফলের কথা জানিয়ে তাঁর এই কাজের সমালোচনা করেন। জনৈক পদার্থবিদের মতে, “গ্লোবার সুদর্শনের উপস্থাপনার সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু কোয়ান্টাম অপটিক্স সংক্রান্ত কোনো সুযোগ্য তত্ত্ব তিনি নিজে প্রমাণ করতে পারেন নি। তাই তিনি সুদর্শনের কাজকেই ‘P Representation’ নাম দিয়ে নিজের থিসিসের অন্তর্ভুক্ত করে নেন।”

পরবর্তীকালে অবশ্য বিশ্বের বিজ্ঞানীমহল কর্তৃক এই তত্ত্বকে ‘গ্লোবার-সুদর্শন উপস্থাপনা’ (Glauber-Sudarshan Representation) নামে অভিহিত করা হয় যা সুদর্শনের কৃতিত্বকে সমর্থন করে। কোয়ান্টাম অপটিক্স-এর উপর এই গবেষণার জন্য ই.সি.জর্জ সুদর্শন এর অবদানকে উপেক্ষা করে একা গ্লোবারকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত বিজ্ঞানী এই ঘটনার সমালোচনা করেছিলেন। তাঁদের মতে যে কাজের জন্য গ্লোবার এই পুরস্কার পেয়েছেন, সেই কাজে সুদর্শনের কৃতিত্ব অধিক। গ্লোবারের উচিত নিজের পুরস্কার সুদর্শনের সাথে ভাগ করে নেওয়া। পরবর্তীকালে ‘হিন্দুস্থান টাইমস’ পত্রিকাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে সুদর্শন বলেছিলেন, “এই পুরস্কার দেওয়া হল আমার কাজের জন্য, অথচ আমি সেটা পেলাম না।” তাঁর গলায় একই রকম হতাশা দেখা দিয়েছিল ১৯৭৯ সালের নোবেল পুরস্কার হাতছাড়া হওয়ার পরেও। তিনি বলেছিলেন, “স্টিভেন উইনবার্গ, শেলডন গ্ল্যাশো এবং আবদুস সামাদ আজ যে কাজ করলেন, আমি নিজের ছাত্রাবস্থায় ২৬ বছর বয়সেই সেই কাজ করেছিলাম। যদি একটি বাড়ি তৈরির জন্য পুরস্কার প্রদান করা হয়ে থাকে, তবে প্রথম তলা নির্মাণকারী ব্যক্তিকে দ্বিতীয় তলা নির্মাণকারী ব্যক্তির আগে পুরস্কার প্রদান করা হবে, এটা হওয়াই কি উচিত নয়?”

সুদর্শনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ হল কোয়ান্টাম অপটিক্স-এর ক্ষেত্রে তাঁর অবদান। তাঁর তত্ত্ব প্রাচীনকালের ওয়েভ অপটিক্স (wave optics)-এর সঙ্গে কোয়ান্টাম অপটিক্স-এর সমতুল্যতা প্রমাণ করে। সুদর্শন মুক্ত কোয়ান্টাম সিস্টেম (open quantum system)-এর তত্ত্ব অধ্যয়নের জন্য ‘ডায়নামিক্যাল ম্যাপস’ (dynamical maps) নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা তৈরি করেছিলেন। বিজ্ঞানী বৈদ্যনাথ মিশ্রের সহযোগিতায় তিনি ‘কোয়ান্টাম জেনো এফেক্ট’ (Quantum Zeno Effect) তত্ত্বের প্রস্তাবনা করেন।
সুবিখ্যাত বিজ্ঞানী আইন্সটাইনের তত্ত্বকে ভুল প্রমাণিত করেছিলেন সুদর্শন। আইনস্টাইনের মতে, ‘কোনো কিছুই আলোর চেয়ে দ্রুতগতিতে চলতে পারে না।’ সুদর্শন ‘ট্যাকিয়ন’ (Tachyons) নামক কণার অস্তিত্বের কথা বলেছিলেন, যার গতিবেগ আলোর চেয়েও বেশী। এই কণার অস্তিত্বের কথা বলে তিনি এই তত্ত্বটিকে ভুল প্রমাণিত করেছিলেন। ট্যাকিয়ন শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘takhus’ থেকে যার অর্থ হল ‘দ্রুত’ (fast)। অন্যান্য বৈজ্ঞানিকদের মতে, ট্যাকিয়নের কাল্পনিক ভর আছে। আইনস্টাইন বলেছিলেন, যেকোনো কণা এমনকী প্রবল দ্রুত গতি সম্পন্ন মহাকাশযানের পক্ষেও আলোর গতি (৩×১০৮ মিটার/সেকেন্ড) অথবা তার বেশি গতিতে চলা অসম্ভব, কারণ তার জন্য অসীম শক্তির প্রয়োজন। কিন্তু সুদর্শন এবং তাঁর সহকর্মীরা পরামর্শ দিয়েছিলেন যে কণার সংঘর্ষের সময় আলোর চেয়ে দ্রুত গতির সাহায্যে ট্যাকিয়ন কণা প্রস্তুত করা যায়, তাহলে ত্বরণ বা অসীম শক্তির প্রয়োজন হবে না।

সুদর্শন এবং তাঁর সহকর্মীরা ডিরাক সমীকরণ (Dirac equation) ব্যবহার করে চৌম্বকীয় চতুর্ভুজ (magnetic quadruple)-এর ফোকাসিং অ্যাকশনের উপর কাজ করে ‘চার্জড পার্টিকল বিম অপটিক্স-এর কোয়ান্টাম তত্ত্ব’ (Quantum Theory of Charged Particle Beam Optics)-এর প্রচলন করেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন ‘টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’ (TIFR), ‘ইউনিভার্সিটি অফ রচেস্টার’, ‘সাইরাকিউজ ইউনিভার্সিটি’ এবং হার্ভার্ডে সউদর্শন শিক্ষকতা করেছিলেন। ১৯৬৯ সাল থেকে তিনি অস্টিনের ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস’-এ পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক এবং ভারতের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স’-এ ঊর্ধ্বতন অধ্যাপক (senior professor) রূপে যুক্ত হন। ১৯৮০ সাল থেকে তিনি চেন্নাইয়ের ‘ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স’ (IMSc)-এ ডিরেক্টর হিসেবে পাঁচ বছর কাজ করেছিলেন। এইসময় তিনি নিজের সময় ভাগ করে নিয়েছিলেন ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। তাঁর আমলে তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে শ্রেষ্ঠত্বের কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন শাখায় তাঁর আগ্রহ ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ‘এলিমেন্টারি পার্টিকল ফিজিক্স’, ‘কোয়ান্টাম অপটিক্স’, ‘কোয়ান্টাম ইনফরমেশন’, ‘কোয়ান্টাম ফিল্ড থিয়োরি’, ‘গেজ ফিল্ড থিওরি’, ‘ক্লাসিক্যাল মেকানিকস’, পদার্থবিদ্যার ভিত্তিতত্ব ইত্যাদি। তবে শুধু বিজ্ঞান নয়, দর্শন ও হিন্দুধর্ম বিষয়েও তাঁর জ্ঞান ছিল অপরিসীম। বিখ্যাত দার্শনিক জে.কৃষ্ণমূর্তি সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল এবং তাঁরা দুজনে অনেক আলোচনা চক্রে যোগ দিয়েছিলেন। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ‘বেদান্ত’-এর উপরেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। প্রায়সই তিনি এই বিষয়ের উপর বক্তৃতা দিতেন।

সুদর্শন অনেকগুলি বিজ্ঞান নির্ভর গ্রন্থও রচনা করেছিলেন। তাঁর রচিত কতগুলি বইয়ের নাম হল, ‘ইন্ট্রোডাকশন টু এলিমেন্টারি ফিজিক্স পার্টিকল’, ‘ফান্ডামেন্টাল অফ কোয়ান্টাম অপটিক্স’, ‘ক্লাসিক্যাল ডায়নামিকস: এ মডার্ন পার্সপেকটিভ’, ‘পাউলি অ্যান্ড দ্য স্পিন-স্ট্যাটিসটিক থিয়োরেম’, ‘ফ্রম ক্লাসিক্যাল টু কোয়ান্টাম মেকানিকস: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য ফরমালিজম’, ‘ফান্ডামেন্টাল অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন’, ‘অ্যাডভান্স কনসেপ্টস অফ কোয়ান্টাম মেকানিকস’ ইত্যাদি।

মোট নয় বার বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েও সুদর্শন এই সম্মান লাভ করতে পারেন নি। কিন্তু সারা জীবনে আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন তিনি। ভারত সরকার তাঁকে তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসাম্রিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ প্রদান করেছিল। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স’ তাঁকে TWAS পুরস্কার দিয়েছিল। এছাড়াও তিনি পেয়েছিলেন ‘মাজোরানা পুরস্কার’, ‘ডিরাক পদক’, ‘বোস পদক’, ‘সি ভি রমণ পুরস্কার’। কেরালা সরকার বিজ্ঞানে তাঁর সারাজীবনের অবদানের জন্য তাঁকে ‘কেরালা সাস্ত্র পুরস্কারম’ প্রদান করে। ‘ইউনিভার্সিটি অফ কেরালা’ তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। তাঁর আশি বছরের জন্মদিনে ইউনিভার্সিটি অফ মেডিক্যাল সায়েন্স তাঁকে সম্বর্ধনা প্রদান করেছিল।

২০১৮ সালের ১৩ মে ৮৬ বছর বয়সে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস শহরে ই.সি.জর্জ সুদর্শন এর মৃত্যু হয়।

এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।