ইতিহাস

পঞ্চানন মাহেশ্বরী

পঞ্চানন মাহেশ্বরী (Panchanan Maheshwari) একজন ভারতীয় উদ্ভিদ বিজ্ঞানী যিনি অ্যানজিওস্পার্ম (Angeosperm) অর্থাৎ সপুষ্পক উদ্ভিদের টেস্ট টিউব ফার্টিলাইজেশানের (Test tube Fertilisation)ওপর গবেষণার জন্য উদ্ভিদবিজ্ঞানের জগতে বিখ্যাত। অসামান্য পান্ডিত্যের অধিকারী পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে ‘আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক’ (Father Of Modern Embriology) বলা যায়। পৃথিবীর উদ্ভিদবিদ্যার মানচিত্রে ভারতবর্ষকে একটি লক্ষণীয় স্থানে তিনি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর আদর্শ, তাঁর গবেষণা, তাঁর আবিষ্কারের মাধ্যমে পৃথিবীর বিজ্ঞান জগতে একটি চিরস্থায়ী আসন তিনি গ্রহণ করে আছেন।

১৯০৪ সালের ৯ নভেম্বর ভারতবর্ষের জয়পুর শহরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে পঞ্চানন মাহেশ্বরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা পেশায় করণিক ছিলেন। ছেলেকে উচ্চ শিক্ষিত করার জন্য তিনি কঠিন পরিশ্রম করতেন। অল্প বয়সে শান্তি দেবীর সাথে মাহেশ্বরীর বিবাহ হয়। প্রায় নিরক্ষর শান্তি দেবীর ইংরাজী বা বিজ্ঞান বিষয়ে কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানী স্বামীর সাহচর্যে এসে ল্যাবরেটরীর নানা খুঁটিনাটি জিনিস তিনি শিখে নিয়েছিলেন এবং ল্যাবরেটরীর নানা কাজে (যেমন স্লাইড বানানো ইত্যাদিতে) তাঁকে সাহায্য করতেন। মাহেশ্বরীর তিন পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছে।

পঞ্চানন মাহেশ্বরী মাত্র ১৩ বছর বয়সে জয়পুর থেকে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবার। কিন্তু চোখের সমস্যার জন্য তিনি ডাক্তারি পড়তে পারলেন না। ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত ইউয়িং খ্রিশ্চিয়ান কলেজে (Ewing Christian College) বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। এখানেই তিনি প্রখ্যাত আমেরিকান উদ্ভিদবিদ ও ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল সোসাইটির( Indian Botanical Society) প্রথম সভাপতি প্রফেসর উইনফিল্ড স্কট ডুডজিওন (Winfield Scott Dudgeon)এর সংস্পর্শে আসেন। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি ডুডজিওনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। ডুডজিওন মাহেশ্বরীকে উদ্ভিদবিদ্যার নানা বিভাগ যেমন উদ্ভিদের অঙ্গসংস্থানবিদ্যা , উদ্ভিদ নমুনা সংগ্রহ পদ্ধতি ইত্যাদির পাঠ দিতে থাকেন। ডুডজিওনের তালিমে মেধাবী মাহেশ্বরী একের পর এক পরীক্ষায় –এম.এসসি (M .Sc) (১৯২৭),ডি. এসসি (DSc) (১৯৩১) সাফল্যের সাথে উত্তীর্ন হতে থাকে। শিক্ষা শেষে মাহেশ্বরী গুরু ডুডজিওনকে গুরু দক্ষিনা দিতে চাইলে ডুডজিওন বলেন তিনি গুরু হিসাবে যে আদর্শের শিক্ষা মাহেশ্বরীকে দিয়েছেন, সেই একই আদর্শের শিক্ষা যেন মাহেশ্বরী তাঁর শিষ্যদের দেন। এক প্রকৃত শিক্ষক যেন মাহেশ্বরী হতে পারেন। সেটাই হবে প্রকৃত গুরুদক্ষিনা। গুরুর এই নির্দেশ মাহেশ্বরী আজীবন মেনে চলে ছিলেন।

একটি সপুষ্পক উদ্ভিদের পুষ্পের পরাগরেণু যখন পতঙ্গ বা বায়ু বাহিত হয়ে সম প্রজাতির আর একটি পুষ্পের ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয় তখনই পরাগ মিলন ঘটে। পুষ্পের গর্ভাশয়ের মধ্যে পরাগমিলনের পর নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে ভ্রূন (embryo) উৎপন্ন হয়। এই ভ্রূণই ক্রমশ পরিপুষ্ট হয়ে বীজে এবং তারপর পরিপুষ্ট ও বৃদ্ধি পেয়ে চারাগাছে রূপান্তরিত হয়। মাহেশ্বরী দেখেন এই ভ্রূণ থেকে পূর্ণাঙ্গ চারাগাছে রূপান্তর পদ্ধতিটির ধরণ সপুষ্পক উদ্ভিদের প্রজাতি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়। ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যার এই গবেষণার ভিত্তিতে তিনি সপুষ্পক উদ্ভিদকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করেন। শিক্ষা সমাপ্ত করে মাহেশ্বরী ১৯৩০ সালে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যোগদান করেন। ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৭,এই দুই বছরে ইউরোপ ও ইংল্যান্ড পরিভ্রমণকালে তিনি বিভিন্ন স্বনামধন্য বিজ্ঞানীদের সংস্পর্শে আসেন। স্বদেশে ফিরে এসে প্রখাত প্রত্নউদ্ভিদবিদ প্রফেসর বীরবল সাহানির সাথে লখনৌতে কিছুদিন কাজ করেন। ১৯৩৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়তে যোগদান করেন ও জীবনবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠা করেন সেখানে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মেঘনাদ সাহার সাথে তাঁর এখানে পরিচয় হয়। প্রায় ১০ বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন ও উদ্ভিদবিদ্যা পঠনপাঠনের জন্য একটি উন্নত মানের শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৪৯ সালে দিল্লী বিশ্ব বিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর ও ভারতের শেষ ব্রিটিশ চিফ জাস্টিস স্যার মরিস গাউয়ারের আমন্ত্রনে পঞ্চানন মাহেশ্বরী দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান হিসাবে যোগ দেন। এই সময় কালটি তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। নানা সৃজনশীল ও গবেষণামূলক কাজ করে বিজ্ঞানের জগতে নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রখর অন্তর্দৃষ্টি, উদ্ভাবনী শক্তি, বিশ্লেষন ক্ষমতা, অসামান্য স্মরনশক্তির অধিকারী মাহেশ্বরী ছিলেন জীবনীশক্তিতে ভরপুর কর্মঠ এক মানুষ। “কৰ্মই জীবন” এই আদর্শে বিশ্বাসী মাহেশ্বরী একজন ভালো শিক্ষকও ছিলেন। তিনি ছাত্রদের প্রতুৎপন্নমতি হতে শেখাতেন। স্বল্পমূল্যের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও, উদ্ভাবনী শক্তির জোরে কীভাবে উন্নত মানের গবেষণা করা যায় তা তিনি শিখিয়েছিলেন ছাত্রদের। তাঁর নেতৃত্বে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের সুনাম দেশ বিদেশে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিজ্ঞানীরা ভ্রূণবিদ্যা বিষয়টির প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করেন।

সপুষ্পক উদ্ভিদের পরাগযোগের পর,পরাগরেণু ও ডিম্বাণুর নিষেক প্রক্রিয়াটি পুষ্পের গর্ভাশয়ের মধ্যে হয়। মাহেশ্বরী প্রথম ল্যাবরেটোরিতে কৃত্রিম ভাবে টেস্ট টিউবের মধ্যে এই নিষেক করাতে সক্ষম হন। এই পদ্ধতিকে টেস্ট টিউব ফার্টিলাইজেশান (Test Tube Fertilisation) বা ইন ভিট্রো ফারটিলাইজেশান (In Vitro Fertilisation) বলে। টেস্ট টিউব ফার্টিলাইজেশানের সুবিধা হলো — ১. বীজের প্রলম্বিত সুপ্তদশা কাটিয়ে নিষেক প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করা। ২.পরিবেশগত বাধাকে অতিক্রম করে নিষেকের পথ সুগম করা। ৩. জীবনচক্রের সময়সীমাকে কমিয়ে তাড়াতাড়ি প্রয়োজন মতো প্রচুর পরিমান উদ্ভিদ উৎপন্ন করা। ৪. সংকরায়নের মাধ্যমে উন্নত প্রজাতির রোগপ্রতিরোধক ক্ষমতা যুক্ত উচ্চ ফলনশীল উদ্ভিদ উৎপন্ন করা। উদ্ভিদবিদ্যার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় এই পদ্ধতির হাত ধরে। উদ্ভিদ প্রজোননকারীদের কাছে এক সুবর্ণ সুযোগ আসে। অর্থনৈতিক ও প্রয়োগভিত্তিক উদ্ভিদ বিদ্যার জগতে নতুন নতুন দিক উন্মোচিত হতে থাকে। ভারতের মতো কৃষিভিত্তিক দেশের পক্ষে এই আবিষ্কারটিকে ঈশ্বরের পরম আশীর্বাদ বলা যায়।

পঞ্চানন মাহেশ্বরীর লেখা ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দা এমব্রায়োলজি অফ অ্যাঞ্জিওস্পারম’ (An Introduction To The Embriology Of Angiosperm) বইটি উদ্ভিদবিদ্যা পাঠরত সমস্ত শিক্ষর্থীদের কাছে অবশ্য পাঠ্য। রাশিয়ান সহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এই বইটি অনূদিত হয়েছে। মাহেশ্বরী ও তাঁর ছাত্ররা মিলে প্রায় ১০০টির বেশী সপুষ্পক উদ্ভিদের ওপর পরীক্ষা চালান। তাঁর তত্ত্বাবধানে ‘অ্যান ইলাস্ট্রেটেড ফ্লোরা অফ দিল্লী’ ( An illustrated flora of Delhi) বইটি লেখা হয়। এই তথ্য ভিত্তিক বইটি যে কোনো মানুষের কাছে গাইডের মতো। ১৯৫১ সালে মাহেশ্বরী ফাইটোমর্ফোলজি (Phytomorphology) নামের একটি তথ্য সমৃদ্ধ জার্নাল প্রকাশ করেন। স্নাতক স্তরে পাঠরত ছাত্রদের লেখনশৈলী বাড়ানোর জন্য দিল্লি ইউনিভার্সিটির বোটানিক্যাল সোসাইটির পক্ষ থেকে ‘দ্য বোটানিকা’ (The Botanica) নামের একটি ম্যাগাজিন প্রকাশও শুরু করেন তিনি। মনজ্ঞ ও তথ্য সমৃদ্ধ প্রবন্ধের জন্য এই ম্যাগাজিনটি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এনসিইআরটি (NCERT)র অনুরোধে তিনি একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য জীববিদ্যার পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ভারতীয় উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের নানা অনুপ্রেরণামূলক তথ্য দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের জীববিদ্যা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। শিক্ষা ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটি তাঁর অন্যতম অবদান। ডুডজিয়নের আদর্শে দীক্ষিত ব্যাক্তিত্বময় মাহেশ্বরীকে ছাত্ররা যেমন ভয় পেত তেমন ভালোওবাসতো। তাঁর ছাত্ররা তাঁদের আবিষ্কৃত অনেক নতুন উদ্ভিদ প্রজাতির নামকরণ শিক্ষক মাহেশ্বরীর নামে করেছিল, যেমন – Panchanania jaipuriensis , Isoetes panchananii ইত্যাদি।

বিজ্ঞান ক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান পেয়েছেন। ১৯৩৪ সালে ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমী অফ সায়েন্সের (ব্যাঙ্গালোর) ফেলো হন। ১৯৫৮ সালে দা ইন্ডিয়ান বোটানিক্যাল সোসাইটি বীরবল সাহানি মেডেল প্রদান করে তাঁকে। ১৯৬৬ সালে তিনি ফেলো অফ রয়েল সোসাইটি নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অ্যাসোসিয়েশনের জেনারেল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। প্রচার বিমুখ এই মানুষটি নিজের সাফল্যের কথা কাউকে এমনকি নিজের পরিবারকেও জানাতে খুব একটা ভালোবাসতেননা। সংবাদপত্রের মাধ্যমে তাঁরা মাহেশ্বরীর সাফল্যের কথা জানতে পারতেন।

১৯৬৬ সালের ১৮ মে, এনকেফেলাইটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে দিল্লীতে পঞ্চানন মাহেশ্বরীর মৃত্যু হয়।

 

তথ্যসূত্র


  1. College Botany, Volume III, Dr.B P Pandey(S.Chand) Biology – Text Book For Class XI ,XII(NCERT)
  2. https://en.wikipedia.org/
  3. https://www.jstor.org/
  4. http://nobelprizeseries.in/

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন