পৃথিবীর প্রাচীনতম দলবদ্ধ খেলাগুলির মধ্যে অন্যতম একটি খেলা হল পোলো খেলা (Polo)। অনেকটা হকি খেলার মতোই এর ধরণ তবে এই খেলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে খেলতে হয়। মূলত একটি বলকে হাতে থাকা লাঠির সাহায্যে আঘাত করে প্রতিপক্ষের গোলে ঢোকানোই এই খেলার মূল উদ্দেশ্য। প্রতি দলে মোট চারজন করে খেলোয়াড় থাকে। এই খেলাটি ‘রাজাদের খেলা’ হিসেবে পরিচিত। অভিজাত শ্রেণীর মধ্যেই এই খেলাটি বেশি জনপ্রিয়। আর্জেন্টিনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই খেলা খুবই জনপ্রিয়। অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিলি, ফ্রান্স, জার্মানি-সহ বর্তমানে মোট ৭৭টি দেশে এই খেলার প্রচলন রয়েছে।
পোলো নামটির উৎপত্তি প্রসঙ্গে ধারণা করা হয় নামটি এসেছে বাল্টি ভাষা থেকে। বাল্টিতে এর অর্থ ‘বল’। অনেকে মনে করেন পোলো শব্দটির উৎপত্তি তিব্বতী শব্দ ‘পুলু’ থেকেও হয়ে থাকতে পারে কারণ পুলু শব্দটির অর্থও ‘বল’। এই খেলার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি গবেষকরা, তবে অধিকাংশের মতে মধ্য এশিয়ার ইরানী ও তু্র্কি অশ্বারোহী যাযাবরদের মধ্যে এই খেলাটি জনপ্রিয় ছিল। পোলোর একটি প্রাচীন রূপ যাকে আঞ্চলিক ভাষায় বলা হত বুজকাশি বা কোকপার, এখনও মধ্য এশিয়ার কিছু অংশে খেলাটির প্রচলন আছে৷ প্রাচীন ইরানে এই খেলাটি ‘চোভগান’ নামে পরিচিত ছিল যা মূলত অভিজাত ইরানিদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল।
তবে পোলো খেলাটির আধুনিক রূপ এসেছে মণিপুরে সাগোল কাংজেই নামক হকি খেলার একটি প্রাচীন ধরণ থেকে। এছাড়াও মণিপুরে তিব্বতী নাম পুলুও ব্যবহার করা হয়েছিল। বিশ্বের প্রাচীনতম পোলো মাঠ হল মণিপুর রাজ্যের ইম্ফল পোলো গ্রাউন্ড। ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আর্জেন্টিনার পোলো খেলার ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বব্যাপী পোলো খেলার রাজধানী বলা হয়ে থাকে।
ফেডারেশন অফ ইন্টারন্যাশনাল পোলো এই খেলার আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন তৈরি করে থাকে। পোলো খেলায় উভয় দলে মোট চারজন করে খেলোয়াড় থাকে। সেই চারজনের মধ্যে কেউ আক্রমণভাগ এবং কেউ রক্ষণভাগে খেলে। এখানে উল্লেখ্য যে, খোলা মাঠে খেলা হলে প্রতি দলে চারজন থাকলেও কোনো সীমাবদ্ধ স্থানে খেলা হলে দলে থাকে তিনজন করে খেলোয়াড়৷ মূলত প্রতিপক্ষকে গোল দিতে পারলেই গোলদাতারা একটি পয়েন্ট স্কোর করতে পারে। সর্বাধিক পয়েন্ট স্কোর করা দলই বিজয়ী হিসেবে ঘোষিত হয়।
পোলো খেলার মাঠটি সাধারণত ৩০০ গজ লম্বা এবং ২০০ গজ চওড়া হয়ে থাকে। এই খেলায় গোলপোস্টের প্রস্থ ৮ গজ হয় এবং এর ওপরটা খোলা থাকে। পোলোতে ব্যবহৃত ঘোড়াগুলিকে বলা হয় পোলো পনি। প্রত্যেক পোলো খেলোয়াড়ের হাতে থাকে একটি করে কাঠের লাঠি যাকে ম্যালেট বলা হয়। এই ম্যালেটের সাহায্যে বলে আঘাত করে বলটিকে গোলে ঢোকাতে হয়।
পোলো খেলা সাধারণত এক থেকে দুই ঘন্টা স্থায়ী হয় এবং সাত মিনিটের চার থেকে ছয়টি পর্বে খেলাটি ভাগ করা থাকে। এই ভাগগুলিকে বলা হয়, চুক্কা বা চুকার। প্রতিটি চুক্কার মাঝে তিন মিনিটের বিরতি থাকে। দুইজন ঘোড়ায় চড়া আম্পায়ার পোলো খেলার তত্ত্বাবধানের জন্য মাঠে থাকেন। অবশ্য দুইজন কোনো সিদ্ধান্তে আটকে গেলে একজন তৃতীয় রেফারি যিনি থার্ড ম্যান নামে পরিচিত, তাঁর মতামত চাইতে পারেন। আম্পায়ার দুই দলের মধ্যে বল ছুঁড়ে দিলে খেলা শুরু হবে। যখন একটি গোল হয় তখনই দলের দিক পরিবর্তন হয়ে যায়। ফাউল হলে ফ্রি-হিটের সুযোগ থাকে, যা গোল করার সুযোগ বাড়িয়ে দেয়৷
পোলো খেলার কিছু নিয়মকানুনকে পোলো খেলোয়াড় এবং ঘোড়ার সুরক্ষার কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম একটি হল ‘লাইন অব দ্য বল’-এর ধারণাটি। ঠিক যেমন রাস্তার মাঝের হলুদ লাইন দুদিকের গাড়িকে তাদের সঠিক পথে সুরক্ষিতভাবে চলাচলে সাহায্য করে, পোলোর এই কাল্পনিক লাইনটিও খানিকটা তেমনই। বলকে হিট করলে বলটির গমনের পথ আসলে একটি কাল্পনিক রেখা হিসেবে গুরুত্ব পায় পোলোতে। এই রেখাটি ‘লাইন অব দ্য বল’ নামে পরিচিত। বলের দিক পরিবর্তন হলে এই কাল্পনিক রেখাটিরও দিক পরিবর্তন হয়। প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড় সেই কাল্পনিক অদৃশ্য রেখাটিকে সামনে থেকে অতিক্রম করতে পারবে না খেলোয়াড় এবং ঘোড়ার সুরক্ষার জন্যই। একজন খেলোয়াড় তখনই বলের লাইন অতিক্রম করতে পারে যদি না কোন বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। ভুলভাবে লাইন অতিক্রম করলে খেলোয়াড়দের জরিমানাও হয়।
একজন খেলোয়াড় অন্য খেলোয়াড়কে বা অন্য খেলোয়াড়ের ঘোড়াকে নিজের ম্যালেট দিয়ে কোনো অজুহাতে আঘাত করলে তা অবৈধ বলে বিবেচিত হয় এবং শাস্তি হিসেবে পেনাল্টি প্রদান করা হয়। পেনাল্টি হলে ফাউল করা দলের গোলের কাছাকাছি ৪০ গজ লাইনের মাঝখান থেকে শট মারা হয় বলে। এছাড়াও ফাউলের সময় বল যেখানে পড়েছিল সেখান থেকেও পেনাল্টি নেওয়া হয়ে থাকে অনেকসময়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পোলো খেলাটির কিছু নিয়মেরও বদল ঘটেছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি নিয়মের বিবর্তন ঘটেছে পোলোর ঘোড়াকে কেন্দ্র করে। ১৮৯৫ সালে পোলো পনির উচ্চতা নির্ধারিত ছিল ১৪.২ হাত। ১৯১৯ সালে উচ্চতার এই সীমাবদ্ধতা উঠিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ পোলো পনিই ১৫.১ হাতের দেখতে পাওয়া যায়।
বিভিন্ন দেশে পোলো খেলার নানারকম প্রতিযোগিতা, টুর্নামেন্ট আয়োজিত হয়ে থাকে। বিশ্ব পোলো চ্যাম্পিয়নশিপ তিন বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এছাড়াও ক্লাব পর্যায়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট হল – আবিয়ের্তো দে তোর্তুগাস, আবিয়ের্তো দে হার্লিংহাম, আবিয়ের্তো আর্জেন্টিনো দে পোলো। এছাড়াও আরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টুর্নামেন্ট হল, ইউএস ওপেন পোলো চ্যাম্পিয়নশিপ, বিচ পোলো কাপ, কারটিয়ের কুইনস কাপ, আর্জেন্টিনার পোলো ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ, ইউএসপিএ অ্যাসপেন ওয়ার্ল্ড স্নো পোলো চ্যাম্পিয়নশিপ, ইস্ট কোস্ট ওপেন, ব্রিটিশ লেডিস পোলো চ্যাম্পিয়নশিপ ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে ইউএস ওপেন পোলো চ্যাম্পিয়নশিপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সারা বিশ্ব থেকে পোলো উৎসাহীরা এসে ভিড় জমায়। আবার আর্জেন্টিনার পোলো ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপ হল বিশ্বের পঞ্চম প্রাচীনতম পোলো টুর্নামেন্ট। অন্যদিকে স্নো পোলোকে বলা হয় ‘রাজাদের খেলা’।
বিশ্বের বিখ্যাত পোলো খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন অ্যাডল্ফো ক্যামবিয়াসো যিনি আর্জেন্টিনা ওপেনে একাই ৫৩৫টি গোল করে বাউটিস্তা হেগুইয়ের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। অসংখ্য ট্রফি রয়েছে এই ক্যামবিয়াসোর। লা ডলফিনা নামে একটি এছাড়াও আরও কয়েকজন কৃতী পোলো খেলোয়াড় হলেন যথাক্রমে ডেভিড স্টার্লিং জুনিয়র, নিকোলাস রোল্ডান, বব জার্নাইভাজ, টমি বেরেসফোর্ড, ফাকুন্ডো পিয়েরেসে, জুয়ান মার্টিন নেরো, কাবলো ম্যাক ডনাফ, মারিয়ানো আগুয়েরে প্রমুখ।
ভারতবর্ষের মণিপুরে প্রচলিত প্রাচীন হকির ধরন থেকে বর্তমান পোলো খেলার যে ধরন তার উদ্ভব হয়েছে মনে করা হয়। অতএব এই খেলার সঙ্গে ভারতের নাম ইতিহাসগতভাবেই জড়িত৷ মণিপুরে ঐতিহ্যগতভাবে পোলো খেলা হয় সাতজন খেলোয়াড়কে নিয়ে। ভারতের প্রথম পোলো ক্লাবটি ১৮৩৪ সালে আসামের শিলচরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আবার ক্যালকাটা পোলো ক্লাব হল বিশ্বের প্রাচীনতম পোলো ক্লাবগুলির একটি৷ ইন্ডিয়ান পোলো অ্যাসোসিয়েশন (আইপিএ) ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাদুর্ভাব এবং অশ্বারোহী বিভাগের যান্ত্রিকীকরণের ফলে ভারতে পোলো খেলার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। ক্যালকাটা পোলো ক্লাব ছিল দেশের প্রথম পোলো ক্লাব যারা স্বাধীনতার পর পোলো টুর্নামেন্টের পুনরায় আয়োজন শুরু করে। জয়পুর, দিল্লি, বোম্বে এবং হায়দ্রাবাদের পোলো ক্লাবগুলি পরবর্তীতে নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে শুরু করে। ভারতীয় জাতীয় পোলো দল ফ্রান্সে ১৯৫৭ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেছিল এবং টুর্নামেন্টটি জিতেওছিল।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য একটা সময় ছিল যখন গোটা ভারতের মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার একটি গ্রাম দেউলপুরে একমাত্র বাঁশের তৈরি পোলো বল তৈরি হত। এই গ্রামে তৈরি বাঁশের গোড়ার পোলো বলের চাহিদা দেশে তো বটেই, বিদেশেও ছিল। পরবর্তীকালে সিন্থেটিক বলের আগমনে বাঁশের বলের কদর কমেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান