ভারতের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত পুরী, শুধু জগন্নাথ মন্দির বা সমুদ্রসৈকতের জন্যই বিখ্যাত নয়, এখানে রয়েছে অনেকগুলো ঘোরার জায়গা। তাই প্রতি বছর লক্ষ পর্যটক ভক্তির টানেই হোক কিংবা ইতিহাস, প্রকৃতি ও অফবিট গন্তব্যের টানেই হোক, ছুটে যান এই শহরে। পুরী ভ্রমণ মানেই রথযাত্রার আবেগ, সূর্যোদয়-সূর্যাস্তে সোনালী সমুদ্র এবং আশেপাশের গ্রামীণ সংস্কৃতির টান। এই লেখাতে আমরা তুলে ধরেছি পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা, যেখানে আপনি শুধু ঘোরার আনন্দই পাবেন না, সঙ্গে পাবেন ঐতিহ্য আর অভিজ্ঞতার স্পর্শও। আপনার আগামী পুরী ট্রিপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা নিয়ে এই তালিকা।
১) জগন্নাথ মন্দির
পুরী মানে জগন্নাথ মন্দির তথা জগন্নাথধাম। পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা বললে প্রথমেই আসবে জগন্নাথধামের কথা। শহরের ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্দির শুধু একটি ধর্মস্থান নয়, এটি কোটি কোটি হিন্দুর বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন দেব তৎকালীন পুরীতে বিষ্ণুর আরাধনার জন্য মন্দিরটি গড়ে তুলেছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে গঙ্গ বংশীয় রাজা চৌধগঙ্গা দেবের আমলে এই মন্দিরের কাজ শুরু হয়। তারপরে রাজা অনঙ্গভীম দেব মন্দিরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে অন্য গঙ্গ বংশীয় রাজা এবং তারও পরে গজপতি বংশীয় রাজাদের আমলে এই মন্দির পরিবর্ধন করা হয়। প্রাচীনকালে ইউরোপীয় নাবিকদের কাছে মন্দিরটি “সাদা প্যাগোডা” নামে পরিচিত ছিল।
মন্দিরের গর্ভগৃহে কাঠের তৈরি জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ এক অদ্ভুত রহস্যময়তা বহন করে। বিশেষ করে রথযাত্রার সময় মন্দিরের আবহ একেবারে অন্যরকম হয়ে যায়—প্রতিটি প্রান্ত থেকে ভক্তেরা এসে রথ টানেন, আবেগে চোখে জল আসে। মন্দিরের ভিতরে রান্না হওয়া মহাপ্রসাদ নিয়ে রয়েছে রোমাঞ্চকর কাহিনী। শুধু দেখা নয়, অনুভবের জন্য এখানে আসা জরুরি। জগন্নাথধাম ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
২) পুরী সমুদ্র সৈকত
পুরী মানে শুধুই জগন্নাথধাম নয়, পুরী মানে ঘোরার এক দারুণ জায়গা। যারা ঘুরতে পছন্দ করেন, তাঁদের কাছে পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা বলতেই প্রথমে আসবে পুরীর সমুদ্রের কথা। সকালে সূর্য ওঠার সময় সোনালী আলোয় ঝলমল করা বালি আর সমুদ্রের নরম গর্জন এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করে। স্বর্গদ্বার এলাকা দিয়ে সৈকতে পৌঁছলে আপনি দেখবেন উটের পিঠে শিশুদের আনন্দ, নারকেল জল হাতে হাঁটাহাঁটি করা দম্পতি, আর তাজা ভাজা মাছের গন্ধ ভেসে আসছে কাছের দোকান থেকে।
পুরীতে বেশ কয়েকটি সমুদ্রসৈকত আছে। তাদের মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত অবশ্যই স্বর্গদ্বার সৈকত। স্বর্গদ্বারে রয়েছে একটি মহাশ্মশান। এই মহাশ্মশানের পাশেই যে সমুদ্র সৈকত সেটিই স্বর্গদ্বার সমুদ্র সৈকত নামে পরিচিত। সেখানকার জলকে খুব পবিত্র বলে জ্ঞান করা হয়। বলা হয় শ্রীচৈতন্যদেবও এই স্বর্গদ্বারে স্নান করতেন।পুরীর প্রধান সমুদ্র সৈকতগুলির একটি হল ‘গোল্ডেন বীচ’। পুরীর মে ফেয়ার হোটেল থেকে শুরু করে দিগাবারেনি পর্যন্ত ৮৭০ মিটার সুদীর্ঘ অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই গোল্ডেন বীচ। বন ও প্রকৃতি দফতরের ইন্টিগ্রেটেড কোস্টাল জোন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট পুরীর এই সমুদ্র সৈকতটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে এবং নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ব্লু ফ্ল্যাগ প্রোগ্রাম’। গোল্ডেন সমুদ্র সৈকতের একেবারে কাছেই অবস্থিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র সৈকত হল এই নীলাদ্রি সমুদ্র সৈকত। মূলত বঙ্কিমুহান এবং মে ফেয়ার হোটেলের মাঝখানে ৫০০ মিটার জুড়ে বিস্তৃত এই নীলাদ্রি সী বীচ।
এখানের বিভিন্ন সৈকতে ভোরে হাঁটলে মনে হয় একা আপনি আর প্রকৃতি। বিকেলের দিকে যদিও কিছুটা ভিড় থাকে, কিন্তু সেই ভিড়েও যেন ছন্দ আছে। ক্যামেরা হাতে রাখবেন, এখানে প্রতিটি মুহূর্তই ফ্রেমে ধরার মতো। পুরীর বিভিন্ন সমুদ্র সৈকত নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন এখানে।
৩) বিমলা মন্দির
অনেকেই জানেন না, জগন্নাথ মন্দিরের ভিতরেই রয়েছে ৫১ শক্তিপীঠের একটি পীঠ হল বিমলা মন্দির। মন্দিরটি চার আদি শক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ। এই মন্দিরের গুরুত্ব তান্ত্রিক ও শাক্তদের কাছে জগন্নাথ মন্দিরের থেকেও বেশি। তাই তাঁদের কাছে পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা বলতেই প্রথমে বিমলা মন্দিরের নাম আসবে। শাক্তদের বিশ্বাস অনুযায়ী বিমলাদেবী হলেন পুরীর শক্তিপীঠের প্রধান দেবী এবং জগন্নাথের তান্ত্রিকা পত্নী। একটি কাহিনী অনুসারে এখানে সতীর নাভি পড়েছিল, আবার অন্য মতে এখানে সতীর পা পড়েছিল। এই মন্দিরে বিমলাদেবীর জন্য আলাদা করে ভোগ রান্না করা হয় না। জগন্নাথকে নিবেদন করা ভোগই বিমলা দেবীকে নিবেদন করা হয়। তারপর সেটা মহাপ্রসাদের মর্যাদা পায়। বিমলা মন্দির ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৪) গুণ্ডিচা মন্দির
জগন্নাথদেবের “রথযাত্রা” উৎসব নিয়ে যে এত আবেগ, তার গন্তব্য হল গুণ্ডিচা মন্দির। পুরীর জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় ৩ কিমি দূরে অবস্থিত এই মন্দিরে রথে করে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা আসেন এবং সাতদিন এখানেই থাকেন। মন্দিরটি ভক্তদের কাছে “মাসির বাড়ি” নামে পরিচিত। পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গা বলতেই গুণ্ডিচা মন্দির অন্যতম। গুণ্ডিচা মন্দিরের চারপাশে সবুজ গাছপালা, আর মন্দিরের নীরবতা এক ধরণের পবিত্র পরিবেশ তৈরি করে। রথযাত্রার বাইরে সময় গেলে আপনি এখানে খুবই শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে পারবেন, তবে রথযাত্রার সময় খুব ভিড় হয়। গুণ্ডিচা মন্দিরের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
৫) রঘুরাজপুর
পুরীর সেরা ৫টি ঘোরার জায়গার তালিকায় নিঃসন্দেহে রঘুরাজপুরের নাম থাকবে। পুরী থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে অবস্থিত এক শান্ত গ্রাম হল রঘুরাজপুর। এই গ্রামের প্রতিটা ঘরেই শিল্পীর বাস। প্রবেশ করলেই আপনি দেখবেন, ঘরের দেওয়াল জুড়ে পটচিত্র, তালপাতার ওপর আঁকা মূর্তি, কাঠের খোদাই করা মূর্তি। প্রতিটি বাড়িই যেন এক একটি আর্ট গ্যালারি। এখানকার শিল্পীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছেন। এখানে আপনি শুধু কেনাকাটা করবেন না, নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে পারবেন কীভাবে হাতে তৈরি হয় একেকটা পটচিত্র। কেউ কেউ আপনাকে শেখাতেও রাজি, যদি আগ্রহ দেখান। এই অভিজ্ঞতা শুধুই শপিং নয় — এটি এক জীবন্ত সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার সুযোগ। রঘুরাজপুর ভ্রমণের খুঁটিনাটি জানতে পড়ুন এখানে।
সর্বশেষ সম্পাদনার সময়কাল – ২০২৫
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- নিজস্ব সংকলন


আপনার মতামত জানান