ভ্রমণ

রঘুরাজপুর ভ্রমণ

রঘুরাজপুর গ্রামের প্রবেশপথ

কথাতেই আছে যে বাঙালির প্রিয় ঘোরার জায়গা হল দী-পু-দা অর্থাৎ দীঘা, পুরী আর দার্জিলিং। সেই পুরীর চেনা সমুদ্র সৈকত, জগন্নাথ মন্দির সহ বিশেষ কিছু পরিচিত স্থান ছাড়াও রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একটি স্থান। পুরী থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে পট্টচিত্রের গ্রাম রঘুরাজপুর, যে গ্রামের প্রতিটা ঘরেই আছে পটশিল্পী। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারাল হেরিটেজ, ২০০০ সাল নাগাদ রঘুরাজপুরকে ঐতিহ্যবাহী গ্রাম হিসাবে চিহ্নিত করেছে।

পুরী থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ভার্গবী নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত পটশিল্পীদের গ্রাম রঘুরাজপুর।

পটচিত্রে দেবীর ছবি

পটচিত্র বা পট্টচিত্র শব্দটি ‘পট্ট’ অর্থাৎ বস্ত্র এবং ‘চিত্র’ অর্থ ছবি এই দুই শব্দ নিয়ে গঠিত। এই শিল্পের উৎপত্তি দ্বাদশ শতাব্দীতে বলে ধারণা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে স্নানযাত্রায় মূল গর্ভগৃহ থেকে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা, সুদর্শনের মূর্তিকে স্নানের জন্য বার করে আনা হয়। তারপর মন্দিরের উত্তর দিকের কূপ থেকে ১০৮টি কলসী দিয়ে জল ভরে মূর্তিদের স্নান করানো হয়। স্নানের পরে জগন্নাথের জ্বর আসে এবং তিনি পুরী থেকে ২০ কিমি দূরে ব্রহ্মগিরির অলরনাথ মন্দিরে অবস্থান করেন। এই সময় ভক্তেরা মূর্তিগুলোর দর্শন করতে পারে না। তখন ভক্তদের দর্শনের জন্য দেবতাদের মূর্তির বস্ত্রের উপর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার ছবি আঁকার প্রচলন শুরু হয়। এই আঁঁকিয়ে শিল্পীদের নাম হয় পটুয়া এবং কাপড়ে আঁকা ছবিগুলোর নাম হয় পটচিত্র। ধারণা করা হয় পটুয়ারা জগন্নাথ মন্দিরের স্থাপনকাল থেকেই পুরীর রাজার কৃপাদৃষ্টি লাভ করেন। তারপর রাজার সহযোগিতাতেই রঘুরাজপুর নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন।

ছোট্ট এই গ্রামে নারকেল, তাল, কাঁঠাল গাছের সারি। তার মধ্যে রয়েছে গুটিকয়ে বাড়ি, যার দেওয়ালে দেওয়ালে শিল্পের ছোঁয়া। গ্রামের প্রত্যেকটি ঘর বিভিন্ন চিত্রকর্মে ভরা। একেকটা ঘরের দেয়াল যেন একেক কথা বলে। কোনো দেওয়াল বলে শ্রীকৃষ্ণের জীবনগাথা , কোথাও বা হনুমান, কোথাও গণেশ, আবার কোনো দেওয়ালে রয়েছে রামায়ণ মহাভারতের মনোহারী সব নকশা। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাই বেশ কয়েক বছর হল এই গ্রামটা শিল্পগ্রাম হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছে। দেওয়াল পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলে পাবেন এক অন্য জগত। পূর্বপুরুষদের শিল্পের উত্তরাধিকার পটুয়াদের হাতের শিল্পকলার নিপুণতা দেখলে চোখের পলক পড়ে না। আঁকার বিষয়বস্তু প্রধানত জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা। তাছাড়াও বিষ্ণুর দশাবতার, রামায়ণ, মহাভারত এবং পুরাণের নানান ঘটনাও ফুটে ওঠে তাঁদের পটচিত্রে। এভাবেই তাঁরা তাঁদের সংস্কৃতি ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে।

বোতলকে ক্যানভাস বানিয়ে শিল্প

প্রধানত তসর বা অন্য কোনো কাপড় দিয়ে তৈরি হয় পট। প্রথমে কাপড়ের টুকরোর ওপর তেঁতুলের বীজ গুঁড়ো করে আঠা বানিয়ে তার প্রলেপ লাগানো হয়। এইভাবে দুই বা তিনটি কাপড়ের টুকরোকে একসঙ্গে জোড়া হয়। এরপর শুরু হয় আঁকার কাজ। পটচিত্র আঁকার জন্যে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহৃত হয়। যেমন শাঁখের গুঁড়ো, কেরোসিন তেলের ল্যাম্পের কালি, পাথরের গুঁড়ো বা শাকসবজি থেকে তৈরী করা হয় রঙ। সাধারণত পট হিসাবে কাপড়ের ব্যবহার হলেও এখানের পটুয়ারা তাঁদের ক্যানভাস হিসাবে বেছে নিয়েছে অনেক কিছু। কাপড় ছাড়াও তালপাতা থেকে শুরু করে বোতল, বালতি, গ্লাস, নারকেলের খোল, পাথর কি নেই সেই তালিকায়! কিন্তু পট বলতে বোঝায় কাপড়ের টুকরো জুড়ে বানানো ক্যানভাস। 

রঘুরাজপুর যেহেতু পুরী থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বেই, তাই অটো অথবা টোটো রিজার্ভ করে যাওয়াই যায়। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী এক পিঠের ভাড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এছাড়াও পুরী বাস স্ট্যাণ্ড থেকে বাসে করে গেলে চন্দনপুরে নামতে হবে। সেখান থেকে রিকশা করে রঘুরাজপুরে যেতে হবে। হাঁটাপথে ১৫ মিনিট লাগে।

রঘুরাজপুর গ্রামে সরাসরি থাকার বা খাওয়ার কোনো ব্যবস্থা সেভাবে নেই। পুরীর খুব কাছেই হওয়ার জন্য পুরীতে থেকেই ঘন্টা দুই তিনের মধ্যেই রঘুরাজপুর ঘোরা হয়ে যায়। পুরীতে থাকার জন্য বহু হোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউস, হলিডে হোম রয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী হোটেলের ভাড়া প্রতিরাতে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০০ টাকা অবধি রয়েছে।

নারকেল মালার ওপরে আঁকা জগন্নাথ

এই গ্রামের শিল্পকর্মই এখানের প্রধান দ্রষ্টব্য। প্রতিটা ঘরে ঘরে এখানে পটুয়াদের বাস। পট্টবস্ত্র বা কাপড়ের ওপর রঙের ছোঁয়াসহ যে কোনো ধরনের হস্তশিল্পই দৃষ্টি আকর্ষণ করবে পর্যটকদের। বড় বড় ক্যানভাসের ওপর পটচিত্র থেকে শুরু করে পাথরের ওপর হাতের কাজ, বা নারকেল খোলের ওপর সূক্ষ্মভাবে কারুকাজ সবটাই দেখবার মত। কিছু কিছু ঘরে আপনি পটুয়াদের কোন চিত্র বানাতেও দেখতে পারেন। চোখের সামনে দেখতে পাবেন কিভাবে তৈরি হয় সেই চিত্র। অনেকে তো বিশেষ অনুরোধে তালপাতার ওপর লোহার ছুঁচ দিয়ে ছবি খোদাই করে চোখের সামনেই দেখিয়ে দেবে।

সারা বছর ধরেই রঘুরাজপুর ঘুরতে আসা যায়। তবে গ্রামের শিল্পী বাসিন্দাদের মতে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি সবথেকে বেশি ভিড় হয়।

রঘুরাজপুর এলে অবশ্যই চোখ বন্ধ করে কিনে ফেলুন যে কোন রকমের পটচিত্র। বিশাল বড় পেইন্টিং থেকে শুরু করে কমদামের নারকেলখোল বা কাঠের ওপর বানানো চিত্র সবই পাওয়া যায়। নারকেল মালার ওপরে আঁকা জগন্নাথ তো এখানের আইকন চিত্র বলা যায়। কেউ কিছু না কিনলে এটা অন্তত কিনে এনে ঘরের দরজার ওপর ঝুলিয়ে রাখে। এছাড়াও ঘর সাজানোর জন্য বিভিন্ন রকম দামের বহু জিনিস পেয়ে যাবেন। তাছাড়া কাছের মানুষদের উপহার দেবার জন্য এখানের হাতের কাজের বিকল্প হয় না।


ট্রিপ টিপস

  • কিভাবে যাবেন – পুরী থেকে ভাড়ার গাড়ি করে যেতে পারেন রঘুরাজপুর। ২০১৯ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুরীর একটি অটো রিটার্ন ভ্রমণের জন্য প্রায় ৭০০ টাকা ভাড়া নেয়। পুরী বাস স্ট্যাণ্ড থেকে বাসে করে গেলে চন্দনপুরে নামতে হবে। সেখান থেকে রিকশা করে রঘুরাজপুরে যেতে হবে। হাঁটাপথে ১৫ মিনিট লাগে।
  • কোথায় থাকবেন – মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে পুরীতে থাকার জন্য বহু হোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউস, হলিডে হোম রয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী হোটেলের ভাড়া প্রতিরাতে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০০ টাকা অবধি রয়েছে।
  • কি দেখবেন – মূলত পটশিল্পীদের আকর্ষণীয় হাতের কাজই প্রধান দর্শনীয় যা কিনতেই এখানে পর্যটকদের আগমন। এছাড়াও ওড়িশার বিখ্যাত লোকনৃত্য সন্ধান পাবেন এখানে।
  • কখন যাবেন – সারা বছর ধরেই রঘুরাজপুর ঘুরতে আসা যায়। তবে গ্রামের শিল্পী বাসিন্দাদের মতে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি সবথেকে বেশি ভিড় হয়।
  • সতর্কতা
    • সকাল সকাল ঘুরে আসুন রঘুরাজপুর।
  • বিশেষ পরামর্শ
    • অচেনা গাড়ি বা অটোয় না গিয়ে পুরীতেই যে হোটেলে উঠবেন সেখান থেকে বিশ্বস্ত গাড়ি বুক করে যান। প্রয়োজনে সাথে হোটেলের একজন পরিচিত লোক রাখতে পারেন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর - জন্ম সার্ধ শতবর্ষ



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন