ইতিহাস

রুডইয়ার্ড কিপলিং

রুডইয়ার্ড কিপলিং (Rudyard Kipling) একজন স্বনামধন্য ইংরেজ ঔপন্যাসিক, কবি এবং ছোটগল্পকার। পেশায় সাংবাদিক হলেও সারা বিশ্বে তাঁর পরিচিতি কালজয়ী সাহিত্য সৃষ্টির জন্য। ‘জাঙ্গল বুক’ তাঁর এমনই অমর এক সৃষ্টি তাঁর বেশিরভাগ লেখাই ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা। বিশ্বসাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপকদের মধ্যে রুডইয়ার্ড কিপলিং অন্যতম।

১৮৬৫ সালে ৩০ ডিসেম্বর ভারতের বোম্বে শহরে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম জোসেফ রুডইয়ার্ড কিপলিং। তাঁর বাবা জন লকউড  কিপলিং একজন নামকরা শিল্পী, ভাস্কর, শিক্ষক এবং মিউজিয়াম কিউরেটর ছিলেন এবং তাঁর মা অ্যালিস কিপলিং ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তাঁর বাবা বোম্বের স্যার জামশেদজি জিজিবয় স্কুল অফ আর্টে শিক্ষকতাও করেন এবং পরবর্তীকালে সেই স্কুলের অধ্যক্ষও হন। রুডইয়ার্ড কিপলিংকে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তাঁর বোনের  সঙ্গে ইংল্যান্ডের সাউথ সি তে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাঁরা ক্যাপ্টেন প্রেজ আগার হলোওয়ে ও সারা হলোওয়ে একটি দম্পতির সঙ্গে থাকতেন যাঁরা সেখানে ব্রিটিশ বাচ্চাদের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। ১৮৭১ সাল থেকে ১৮৭৭ সাল অবধি তাঁরা সেখানেই থাকেন।

১৮৭৭ সালে রুডইয়ার্ড কিপলিং ওয়েস্টওয়ার্ড হো’র ‘ইউনাইটেড সার্ভিস কলেজ’-এ (United Service College) ভর্তি হন। সেই স্কুলে থাকাকালীন তিনি ‘প্রিন্স’ নামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েন এবং পরে তাঁকে নিয়ে ১৮৯১ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য লাইট দ্যাট  ফেল্ড’ (The Light that Failed) লেখেন। তাঁর বাবা মায়ের ইচ্ছে ছিল তাঁর স্কুল শেষ হয়ে যাওয়ার পর তাঁকে বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাঠানোর।  কিন্তু রুডইয়ার্ড কিপলিং পড়াশোনায় তেমন মনোযোগী ছিলেন না এবং তাঁর মা বাবার তেমন অর্থের জোর না থাকায় তাঁকে বাধ্য হয়ে আবার ভারতবর্ষে ফিরে আসতে হয়।

১৮৮২ সালে রুডইয়ার্ড কিপলিং বোম্বেতে গিয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে তিনি লাহোরে চলে যান। তাঁর বাবা সেই সময় লাহোরের মায়ো কলেজ অফ আর্টের (Mayo College of Art) প্রিন্সিপাল এবং লাহোর মিউজিয়ামের (Lahore Museum) কিউরেটর ছিলেন। তিনি রুডইয়ার্ডের জন্য সেই কলেজে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেন। এর পাশাপাশি রুডইয়ার্ড সেইসময় সেখানকার ‘সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট’ (Civil and Military Gazette) নামক একটি স্থানীয় সংবাদপত্রে সহকারি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ১৮৮৩ সাল থেকে ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্রে কাজ করেন যার মধ্যে অন্যতম হল এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত ‘দ্য পাইয়োনিয়ার’ (The Pioneer)।

১৮৮৬ সালে  তাঁর লেখা প্রথম কবিতার বই ‘ডিপার্টমেন্টাল ডিটিস’ (Departmental Ditties) প্রকাশিত হয়। সেই সময় তিনি বেশ কিছু কাগজে ছোট গল্প লিখতেন। তখন থেকেই তাঁর লেখা পাঠকদের মধ্যে সমাদৃত হতে থাকে। ১৮৮৩ সালে তিনি ও তাঁর পরিবার সিমলায় যান। সেখানে তাঁর বাবা ক্রাইস্ট চার্চে (Christ Church) কাজ শুরু করেন। ১৮৮৫ সাল থেকে ১৮৮৮ সাল অবধি রুডইয়ার্ড প্রতিবছরই সিমলায় যেতেন। সেই সময়কার তাঁর অনেক লেখায় সিমলার কথা পাওয়া যায়। ১৮৮৬ সাল থেকে ১৮৮৭ সালের মধ্যে লাহোরের পত্রিকায় তাঁর প্রায় ৩৯টি গল্প প্রকাশিত হয়। সেইসব লেখার বেশিরভাগই তাঁর ‘প্লেইন টেলস ফ্রম দ্য হিলস’ (Plain Tales from the Hills) বইটিতে সংকলিত হয়। এই বইটি তাঁর প্রথম গল্পের বই এবং সেটি ১৮৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৮৮৭ সালে তিনি এলাহাবাদ চলে যান এবং সেখানে ‘ দ্য পাইয়োনিয়ার’  পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানে তিনি ১৮৮৯ সাল অবধি ছিলেন। ১৮৮৮ সালে তাঁর ছয়টি গল্পের বই প্রকাশিত হয় যেগুলি হল ‘সোলজার্স থ্রি’ (Soldiers Three), ‘দ্য স্টোরি অফ দ্য গ্যাডসবিস’ (The Story of the Gadsbys), ‘ইন ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট’ (In Black and White), ‘আন্ডার দ্য দেওদারস’ (Under the Deodars), ‘দ্য ফ্যান্টম রিক্সা’ (The Phantom Rikshaw) এবং ‘উই উইলি উইনকি’ (Wee Willie Winkie)। ১৮৮৯ সালে কিছু সমস্যার কারণে তিনি ‘দ্য পাইয়োনিয়ার’-এর কাজ ছেড়ে দেন।

লেখালেখি করে রুডইয়ার্ড যে টাকা জমিয়েছিলেন তা দিয়ে তিনি লন্ডনে ফিরে যাবেন মনস্থির করেন। লন্ডন তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র ছিল। ১৮৮৯ সালে তিনি ভারত ছেড়ে সিঙ্গাপুর ও জাপান হয়ে সানফ্রান্সিসকো যান। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে আমেরিকার নানা জায়গায় ঘুরতে থাকেন। তাঁর সেই সময়কার লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘ফ্রম সি টু সি এন্ড আদার স্কেচেস’ (From sea to sea and other sketches) এবং ‘লেটার্স অফ ট্রাভেল’ (Letters of travel) বই দুটি। সেই সময় নিউইয়র্ক শহরে তাঁর সাথে প্রখ্যাত সাহিত্যিক মার্ক টোয়েনের দেখা হয়। এরপর তিনি লিভারপুলে চলে যান এবং লন্ডনের সাহিত্য জগতে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। সেখানে বিভিন্ন  পত্রিকায় তাঁর লেখা গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। লন্ডনে তিনি ভিলিয়ের্স স্ট্রিটে থাকতেন। এর পরের বছর তিনি ওলকট ব্যালেস্টিয়েরের সাথে ‘দ্য নওলাক্ষা’ (The Naulahka) নামক একটি উপন্যাস লেখেন। ১৮৯১ সালে তিনি আবার সমুদ্র ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। সেই সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডে যান  এবং সবশেষে ভারতে আসেন। তারপর তিনি আবার লন্ডনে ফিরে যান এবং সেখানে তাঁর পরের বই ‘লাইফ’স হ্যান্ডিক্যাপ’ (Life’s Handicap) প্রকাশিত হয়।

১৮৯২ সালের ১৮ জানুয়ারি লন্ডনে রুডইয়ার্ডের সাথে ক্যারি ব্যালেস্টিয়েরের বিবাহ হয়। বিবাহকালে রুডইয়ার্ডের বয়স ছিল ছাব্বিশ এবং স্ত্রীর বয়স ছিল ঊনত্রিশ। তাঁদের বিবাহের অনুষ্ঠান অল সোলস চার্চে (All Souls Church) অনুষ্ঠিত হয়। আমেরিকার একটি কটেজে তাঁদের প্রথম সন্তান জোসেফিনের জন্ম হয়। সেই সময় থেকেই তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য জাঙ্গল বুকস’ (The Jungle Books) লেখার প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়। এরপরে তিনি রকি হিলসাইডে (Rocky hillside) দশ একর জমি কিনে একটি বাড়ি  তৈরি করেন। তিনি সেই বাড়িটির নাম ‘নওলাক্ষা’ রাখেন। সেই সময় তাঁর বাড়িতে শার্লক হোমসের রচয়িতা স্যার আর্থার কোনান ডয়েল আসতেন। ১৮৯৬ সালে তাঁর দ্বিতীয় সন্তান এলসি কিপলিংয়ের জন্ম হয়। সেই সময় তিনি কিছুদিনের জন্য কানাডার বিশপস কলেজ স্কুলে (Bishop’s College School) শিক্ষকতা করেন। এরপরে তিনি ও তাঁর পরিবার ইংল্যান্ডে ফিরে যান। সেখানে তাঁরা ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে তাঁদের তৃতীয় সন্তান জনের জন্ম হলে তিনি ও তাঁর পরিবার সাসেক্সে থাকতে শুরু করেন। সেখানেই তিনি তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন। ১৮৯৯ সালে নিমোনিয়ায় তাঁর বড় মেয়ের মৃত্যু হয়।

১৯০৭ সালে তাঁকে সাহিত্য রচনার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনিই প্রথম সাহিত্যিক যিনি ইংরেজি ভাষায় লিখে নোবেল পুরস্কার পান। সেই সময় তাঁর খ্যাতি এতটাই ছিল যে তাঁকে কানাডার নির্বাচনে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অনুরোধ করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটেনকে সমর্থন করেন এবং প্যাম্ফলেট (pamphlet) এবং প্রপাগান্ডা (propaganda) লিখতে শুরু করেন। সেই সময় তাঁর লেখা ব্রিটিশদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯১৫ সালে তাঁর ছেলে জন যুদ্ধে মারা যান। 

১৯২০ সালে লর্ড সিডেনথামের সাথে রুডইয়ার্ড ‘লিবার্টি লীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের দ্বারা তাঁরা উদারমনস্ক চিন্তা ভাবনার বীজ বপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি মার্কসবাদী চিন্তাধারাকে সমর্থন করতেন না। তিরিশের দশকের প্রথম দিক পর্যন্ত তিনি লেখালেখি করে গেলেও সেই সময়কার তাঁর লেখা তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি।

১৯৩৬ সালের ১৮ জানুয়ারি ৭০ বছর বয়সে রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের মৃত্যু হয়।  উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রীন ক্রিমেটোরিয়ামে তাঁর অন্তিম সংস্কার করা হয়। তাঁর দেহের অংশাবশেষ ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবেতে থমাস হার্ডি এবং চার্লস ডিকেন্সের সমাধির পাশে সমাধিস্থ করা হয়।

কম খরচে বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

নেতাজি জন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে সববাংলায় এর শ্রদ্ধার্ঘ্য



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

সাহিত্য অনুরাগী?
বাংলায় লিখতে বা পড়তে এই ছবিতে ক্লিক করুন।