সববাংলায়

লোকদেবতা সত্যপীর | সত্যনারায়ণ

মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী সত্যপীর হলেন একজন ঈশ্বরপ্রতীপ সন্ত। সেই ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমদিক থেকেই মূলত দক্ষিণ-এশীয় উপমহাদেশের বাংলাভাষী মানুষদের মধ্যে সত্যপীর (Satya Peer) খুবই জনপ্রিয়। এতই জনপ্রিয় যে, বহু কবিতা, গান কিংবা কিংবদন্তি সত্যপীরের মহিমা বর্ণনা করে রচিত হয়েছে। পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য, রোগ-বালাই নিরাময়ের কামনায় এবং অশুভ শক্তিকে দূর করবার জন্যই বাঙালি মুসলমানেরা সত্যপীরের পূজা বা উপাসনা করে থাকেন। এই সত্যপীর নামক ঐশ্বরিক এক শক্তির উদ্ভব নিয়ে ঐতিহাসিকেরাও নানারকম তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। তবে গবেষণার ফলে উঠে আসা সবচেয়ে জনপ্রিয় তত্ত্ব মুসলমানদের এই সত্যপীরের সঙ্গে হিন্দু বাঙালির সত্যনারায়ণের একটি সাদৃশ্য তুলে ধরে। কীভাবে এমন একটি সংমিশ্রণ ঘটা সম্ভব হল বাংলার ইতিহাসের দিকে তাকালেই তা বোঝা যাবে। তবে এখনও সত্যনারায়ণের পূজো হিন্দুদের মধ্যে দারুণভাবে প্রচলিত থাকলেও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবেই কেবল সত্যপীরের পূজা প্রচলিত রয়েছে।

এই বাংলা থেকেই উদ্ভুত জনপ্রিয় এক ধর্মীয় অনুশীলন হল সত্যপীরের উপাসনা। এই সত্যপীরকে ফকিরের পোশাকে খোদা বা ঈশ্বর হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। কিছু মুসলিম কবি তাঁকে মক্কার পীর বলেও বর্ণনা করেছেন। মোট কথা একজন ঈশ্বরপ্রতিম মুসলিম ফকির ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন পীর হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে তাঁকে। প্রাথমিকভাবে সত্যপীর কেন্দ্রিক ধর্মীয় আচার মুসলমান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও সত্যপীরের উত্থানের সঙ্গে হিন্দুধর্মের সম্পর্ক ওতপ্রোত৷

অনেকের মতে, বাংলায় আদি-মধ্যযুগে সত্যনারায়ণের পূজার প্রচলন হয় এবং মুসলমানদের হাতে শাসনক্ষমতা গিয়ে ইসলামী যুগের সূচনা যখন হয় তখন, বহু ধর্মান্তরিত মুসলমান তাঁদের সংস্কারবশত সেই সত্যনারায়ণের পূজাকে ত্যাগ করেননি। কিন্তু কট্টর ও গোঁড়া মুসলিম মৌলভীদের আপত্তির কারণে তাঁরা হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিভু ‘নারায়ণ’ শব্দটিকে তুলে দিয়ে মুসলমান সন্তকে নির্দেশ করে যে ‘পীর’ শব্দটি, তা বসিয়ে নেয়। ফলে সত্যনারায়ণের স্থলে তখন সত্যপীর হলে আর মৌলভীদের আপত্তি থাকে না বরং মুসলমান সমাজে সেই সত্যপীরের পূজা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিজেন্দ্রনাথ নিয়োগীও এমনই এক তত্ত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, বাংলায় যখন ইসলামী যুগ তখন ব্রাহ্মণরা নারায়ণকে পীর হিসেবে রূপান্তরিত করে নিয়েছিলেন, যাতে মুসলমান শাসকদের মনে হয় তাঁরা হিন্দু দেবতার পরিবর্তে মুসলিম সন্তের উপাসনা করছেন। অতএব এই তত্ত্ব অনুযায়ী হিন্দুদের নারায়ণই পরবর্তীকালে পীর হয়ে উঠেছিল। অথচ অন্য আরেক তত্ত্ব বলছে যে, মুসলিম সাধক বা পীরের পূজাই প্রথমে প্রচলিত ছিল, সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সত্যনারায়ণ পূজা হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত হয়। এবিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থে লিখেছিলেন যে, ‘মুসলমানের পীরকে লোকে যেমনি পুজো দিতে আরম্ভ করেছে অমনি তাকে সত্যনারায়ণ বলে প্রচার করে ব্রতটির উপর হিন্দুধর্ম দখল বসালেন। কিন্তু বাংলায় সত্যনারায়ণের যে পাঁচালী তাতে পীরকে মুসলমানী পোষাকই দেওয়া হয়েছে।…এই মুসলমান পীরের উপাসনা ও শিরনি ভট্টাচার্যদেরও ঘরে চলে এসেছে ও চলছে।’

অন্যদিকে আবার আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেছেন যে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে মঙ্গলকাব্যের মতো করেই হিন্দুরা পীরপাঁচালি রচনায় হাত দিয়েছিলেন এবং এই সূত্রেই হিন্দু পৌরাণিক দেবতা সত্যনারায়ণ কোন এক ঐতিহাসিক মুসলমান পীরের ছায়া অবলম্বনে সত্যপীর হিসেবে পরিকল্পিত হয়েছিলেন। অথচ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কিন্তু আবার বলছেন, আসলে ‘মুসলমান শাসকের চন্ডনীতি’ থেকে আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যেই হিন্দুরা এইরকম একটি ইসলাম ঘেঁষা মিশ্রদেবতার উদ্ভাবন ঘটিয়েছিল। তবে অনেকেই মনে করেন এমন ধরনের কোন রাজনৈতিক কারণ সত্যপীরের উদ্ভাবনের পিছনে সক্রিয় নয়। ড. হক যেমন বলেছেন সত্যপীরের ধারণা সম্পূর্ণরূপেই মুসলমানদের কল্পনাজাত এবং হিন্দুরা পরে এর থেকেই সত্যনারায়ণ তৈরি করেছেন। আসলে দুই ধর্মের  দীর্ঘদিন পাশাপাশি সহাবস্থান, উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহের ফলে উভয়ের অন্দরমহলে ধর্মীয় আচার সংস্কারের অনুপ্রবেশ, নিম্নবর্গীয়, অবহেলিত মানুষের মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া ও পীর, গাজীদের সংস্পর্শে আসা ইত্যাদি কারণে একটা পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক আদান-প্রদানের ফলাফলই হল এই সত্যনারায়ণ এবং সত্যপীর।

তবে সত্যপীরের পরিচয় নিয়ে বেশ কয়েকটি মতামত প্রচলিত রয়েছে। আসলে সত্যপীরকে অনেকে কাল্পনিক এক ঐশ্বরিক চরিত্রের বদলে অনেকেই ঐতিহাসিক চরিত্র বলে মনে করে থাকেন। উত্তরবঙ্গের একজন কবি কৃষ্ণ হরিদাস তাঁর সত্যপীরের পাঁচালি কাব্যে বলেছেন যে, মালঞ্চার রাজা বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ ময়দানবের অবিবাহিত কন্যা সন্ধ্যাবতীর গর্ভেই সত্যপীরের জন্ম। আরেকটি মতানুসারে, আদি-মধ্যযুগের একজন সাধক পীর মনুসুর হাল্লাদ নিজেকে ‘সত্যদর্শী’ বা সত্য বলে প্রচার করেছিলেন। স্বধর্মের মানুষের হাতেই তিনি নিহত হন এবং পরবর্তীকালে সেই পীরের শিষ্যেরা তাঁকে ‘সত্যপী’ আখ্যা দিয়েছিলেন। তসলীমুদ্দিন আহমদ আবার বোগদাদের পীর শেখ আবদুল কাদের জিলানীকে সত্যপীরের সঙ্গে এক করে দেখেছিলেন, যদিও এই বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ কিছুই নেই৷ তবে সত্যপীর ঐতিহাসিক কোন চরিত্র হলেও মানুষের মনে তাঁর ঐশ্বরিক রূপটিই বিরাজমান। এখানে উল্লেখ্য যে, মনে করা হয়, সুলতান হুসেন শাহ সত্যপীরের মতবাদের প্রথম প্রচারক ছিলেন। যদিও এর ঐতিহাসিক কোন নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। তবে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের কামনায় তিনি সংস্কৃত শব্দ সত্য এবং ফারসী ভাষা পীর মিশিয়ে সত্যপীর নামক এক ঐশ্বরিক শক্তির মাহাত্ম্য প্রচলন করেছিলেন বলে অনেকের মত।
সত্যপীরকে কেন্দ্র করে প্রায় ১১টি কাহিনি বাংলায় প্রচলিত রয়েছে বলে জানিয়েছিলেন সুকুমার সেন। সেগুলির মধ্যে কাঠুরিয়া, সদাগর, লালমোহন, মালঞ্চা, শিশুপাল রাজার পালা, বগজোড়ের যশমন্ত সাধুর পালা প্রভৃতি খুবই উল্লেখযোগ্য।

হিন্দুদের সত্যনারায়ণ পূজার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই সত্যপীরের পূজা বা উপাসনার অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচারের মধ্যে এতখানি মিল খুব কম ক্ষেত্রেই চোখে পড়ে। হিন্দু সমাজের মধ্যে সত্যনারায়ণের কোন মূর্তিপূজার প্রচলন নেই, তেমনই সত্যপীরের ক্ষেত্রেও কোনও বিগ্রহ দেখা যায় না৷ তবে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ‘সত্যপীরের পাট’ নামক এক প্রতীককে দেবতাজ্ঞানে পূজা করা হয়। একটি কাঠের তক্তার তৈরি পাটাকে ফুল এবং আরও নানা সামগ্রী সহকারে মানুষ পাট পুজো করে থাকেন। আশুতোষ ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, নিম্নশ্রেণীর মানুষের মধ্যে ধর্মঠাকুরের পাট পূজার প্রচলন রয়েছে। সেটি এই সত্যপীরের পাটপূজা থেকেই অনুপ্রাণিত বলে মনে হয়। মুসলমান সমাজে প্রতীক পূজার প্রচলন নেই, অথচ প্রান্তিক পল্লীগ্রামে কোথাও কোথাও একটি পিঁড়ির ওপরে বৃত্ত এঁকে তার মাঝখানে মাটির একটি স্তুপ বসিয়ে, তার উপরে ক্ষুদ্র এক লোহার অস্ত্র ও ফুল বসিয়ে সত্যপীর হিসেবে পূজা করা হয়ে থাকে। উচ্চবর্ণীয় হিন্দু ব্রাহ্মণেরা বিষ্ণুরই এক রূপ হিসেবে সত্যনারায়ণকে দেখেন বলে তাঁরা অনেকসময় সত্যনারায়ণ পুজোতে শালগ্রাম শিলা বিগ্রহ হিসেবে ব্যবহার করেন, যদিও সব স্থানে তা হয় না। বরং নিম্নবর্গীয়দের মধ্যে সত্যনারায়ণের বিগ্রহ হিসেবে লােহার সরু শিক দিয়ে খানিক লম্বা ধরনের গদার মতো দেখতে একরকম প্রতীক তৈরি করে নেওয়া হয়। এছাড়াও মাটির ভাঁড়ে কিংবা পিতলের কলসীতে সিঁদুর মাখিয়ে নিয়েও সত্যনারায়ণের প্রতীক হিসেবে কল্পনা করে নেওয়া হয়। হিন্দুদের কোন দেবদেবীর আসনে অস্ত্র রাখবার প্রথা নেই কিন্তু সংস্কৃত মন্ত্রে পূজার্চনাকারী ব্রাহ্মণেরা সত্যনারায়ণের আসনে অস্ত্র রাখার যে বিধান পালন করেন তা যে মুসলিম সংস্কার দ্বারাই অনুপ্রাণিত বোঝা যায়।
শুধু এই সাদৃশ্যই নয়, সত্যপীর এবং সত্যনারায়ণ উভয় পূজার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘শিরনি’। মঙ্গল কামনা করে সত্যপীরের উদ্দেশে শিরনি দেওয় হয়।  রামেশ্বর ভট্টাচার্যের ‘সত্যপীরের পাঁচালি’তে সদানন্দ নামের এক বণিকের  সত্যপীরকে শিরনি দিয়ে কন্যা লাভের কথা রয়েছে। এছাড়াও ভারতচন্দ্রের সত্যপীরকে নিয়ে লেখা কাব্যেও দেখা যায়  সত্যপীরের শিরনি দিয়ে ধনসম্পদ লাভ করেছিল বিষ্ণুশর্মা। দেবতার উদ্দেশে এই শিরনি ও মোকাম নিবেদনের প্রথা দুই পূজাতেই প্রচলিত।

সত্যনারায়ণ পূজার শেষে দেবতার স্তববিধায়ক যে ব্রতকথা পাঠ করা হয়, তার মধ্যেও কিন্তু বলা আছে যে, সত্যনারায়ণ পীরের রূপ ধরেছিলেন, সত্যনারায়ণ এবং সত্যপীর অভিন্ন।

রামেশ্বর ভট্টাচার্য, ভারতচন্দ্র রায়গুনাকরের কাব্যে যেমন সত্যপীরের উল্লেখ রয়েছে, তেমনই শঙ্করাচার্যের লেখা ‘সত্যনারায়ণের পুঁথি’ও এপ্রসঙ্গে স্মরণীয়। তাতে শঙ্করাচার্য লিখেছিলেন, ‘কেহ বা ডাকিবে মোরে সত্যপীর বলি/ পীর আর নারায়ণ একই সকলি।’ এছাড়াও বহু মুসলমান কবি যেমন, ফয়েজুল্লাহ, ওয়াজিদ আলি প্রমুখ তাঁদের রচনায় সত্যপীরের পরিবর্তে কখনও কখনও সত্যনারায়ণ লিখেছেন।

মোট কথা এই হিন্দু ও মুসলমানের এই দুই ধর্মবিশ্বাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে হাত ধরাধরি করে বাংলার সংস্কৃতিতে চলে আসছে বহুকাল ধরে। বর্তমানে বহু হিন্দু বাড়িতে বিশেষ বিশেষ সময়ে মূলত মঙ্গল প্রার্থনার জন্য কিংবা কোন শুভ কর্মারম্ভের আগে বা কর্মশেষে সত্যনারায়ণ পূজার প্রচলন থাকলেও সত্যপীরের পূজা মুসলমান ঘরে ঘরে এতখানি সচল নেই, তবে একেবারেই যে তার অস্তিত্ব ঘুচে গেছে তা নয়। বিক্ষিপ্তভাবে কিছু জায়গায় আজও সত্যপীরের পুজো দেখতে পাওয়া যায়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading