সববাংলায়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

মানব সভ্যতার ইতিহাসে ভয়াবহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে শান্তি স্থাপনার্থে এবং সেই শান্তি বজায় রাখতে জাতিসংঘ তৈরি করলেও সভ্যতার বুকে পুনরায় বেজে উঠেছিল যুদ্ধের দামামা। গোটা ইউরোপ জুড়ে আবার এক মহাযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, যাকে আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (Second World War বা World War – II) বলেই জানি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের থেকেও এই যুদ্ধ ছিল আরও বেশি ধ্বংসাত্মক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে যে নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়েছিল সেটি হল, অ্যাডলফ হিটলার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতো এই যুদ্ধেও জার্মানির সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই যুদ্ধ কিন্তু ইউরোপ ছাড়িয়ে আফ্রিকা এবং এশিয়ার মধ্যেও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশ এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত ছিল। টানা ছয় বছর ধরে চলা এই যুদ্ধ মানব সভ্যতার ইতিহাসের এক ভয়াবহ অন্ধকার অধ্যায়।

সঠিকভাবে বলতে গেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর, তবে যুদ্ধ-সমাপ্তির নির্দিষ্ট তারিখ কোনটি, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। তবে কেউ কেউ ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জাপানের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের দিনটিকেই বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ছিল মিত্রশক্তি (allies) এবং অক্ষশক্তি (Axis Powers)। অক্ষশক্তির অন্তর্গত ছিল সেসময়কার বিশ্বের তিন ফ্যাসিস্ট শক্তি জার্মানি, ইতালি এবং জাপান। অন্যদিকে বাকি ইউরোপ এই তিন একনায়কতন্ত্রের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রের বিরূদ্ধে একজোট হয়ে মিত্রশক্তি গঠন করেছিল। এই মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল মূলত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত রাশিয়া।

মনে রাখতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাজনীতিতে বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে দুটি হল, জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলারের হাত ধরে নাৎসি বাহিনীর উত্থান এবং ইতালীতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের জন্ম। একনায়কতান্ত্রিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দুই বৃহৎ শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনের পিছনে গুরুতরভাবে সক্রিয় ছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর মাত্র ২১ বছরের মাথাতেই বিশ্ব আরেকটি যে ভয়াবহ মহাযুদ্ধ অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখল, তার নেপথ্যের কারণগুলি দেখা যাক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সংঘটিত ভার্সাই সন্ধির ত্রুটি, জাতিসংঘের ব্যর্থতা, একনায়কতন্ত্রের উত্থান, মিত্রশক্তিগুলির মধ্যে স্বার্থের সংঘাত ইত্যাদি কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।

প্রথমত, বলতে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে স্বাক্ষরিত ভার্সাই সন্ধির কথা। ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন যে, এই ভার্সাই সন্ধির মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ নিহিত ছিল। ভার্সাই সন্ধিতে জার্মানিকে যেভাবে সমস্তদিক থেকে কোনঠাসা করা হয়েছিল, তা জার্মানির প্রতিশোধস্পৃহাকে জাগিয়ে দিয়েছিল। সেই সন্ধির মাধ্যমে জার্মানির নৌবাহিনী ধবংস করে দেওয়া হল, তার সামরিক অস্ত্রশস্ত্র কমিয়ে তাকে দুর্বল করে দেওয়া হল, এমনকি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণের একটা বিরাট অংশ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল জার্মানির ওপর। জার্মানির ক্রমবর্ধমান এই সংকটের পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিল সেসময় জার্মানিতে গড়ে ওঠা ভাইমার সাধারণতন্ত্র। ১৯২৪-২৫ সাল নাগাদ জার্মানির অর্থনৈতিক কাঠামোটিও দুর্বল হয়ে পড়ে, এমনকি ১৯২৯-এর অর্থনৈতিক মহামন্দার ঢেউ জার্মানিকেও সাঙ্ঘাতিকভাবে আঘাত করেছিল। জার্মানির এমনই এক সংকট মুহূর্তে অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসীদের উত্থান ঘটে। ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হন হিটলার এবং প্রথমে ইউরোপে শান্তি বজায় রাখার কথা বললেও ভিতরে ভিতরে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে পরবর্তীতে এক আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করেন। ১৯৩৪ সাল থেকেই হিটলারের যুদ্ধ-প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৬ সালে জার্মানি ভার্সাই সন্ধি ও লোকার্নো চুক্তি অগ্রাহ্য করে। হিটলারের উচ্চাকাঙ্খা ছিল যথেষ্ট এবং বাহুবলের দ্বারা জার্মানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় আনার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। হিটলারের এই আগ্রাসন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল।

হিটলারের পাশাপাশি অন্যদিকে জাপানের মতো আগ্রাসী শক্তির উত্থান ঘটে৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে জাপানের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মাথাচাড়া দেয়। জাপান তার নৌশক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। জাতিসংঘের সদস্য-রাষ্ট্রগুলির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বলপূর্বক মাঞ্চুরিয়া দখল করে। ১৯৩৭ সালে পুনরায় চীনে প্রবেশ করে তারা চীনের বন্দর শহরগুলি দখল করতে থাকে। চীনের বারংবার আবেদন সত্ত্বেও লীগ অব নেশনস জাপানকে শাস্তিদানে ব্যর্থ হয়েছিল। চীন-জাপান যুদ্ধের এই ধারাবাহিকতা ক্রমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আহ্বান করে আনে।

অন্যদিকে হিটলারের হাত ধরে যেমন জার্মানির উত্থান তেমনি বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ইতালিতে একনায়কতন্ত্র গড়ে ওঠে এবং ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। মুসোলিনি জাতিপুঞ্জ বা লীগ অব নেশসন ত্যাগ করে। ইতালি কর্তৃক জাতিসংঘের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করে আবিসিনিয়া, ইথিওপিয়া ইত্যাদি আক্রমণ উগ্র সাম্রাজ্যবাদ এবং জাতিসংঘের চূড়ান্ত ব্যর্থতারই ইঙ্গিত দেয় গোটা বিশ্বকে।

এই তিন (জার্মানি, ইতালী ও জাপান) সাম্রাজ্যবাদী, ফ্যাসিস্ট শক্তি কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে বৈশ্বিক উপনিবেশ ও কাঁচামালের বন্টনে সবচেয়ে বঞ্চিত থেকেছিল, সেই কারণেই এমন আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের ক্ষুধা জ্বলে ওঠে তাদের মধ্যে। অবিলম্বেই এই তিন আগ্রাসী শক্তির মিলনে গঠিত হয় রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি।

একদিকে এই তিন উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জোট এবং অন্যদিকে মিত্রশক্তির পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার জন্য দায়ী ছিল। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে ঔপনিবেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। তবে জার্মানির প্রতি ইংল্যান্ডের তোষণনীতি জার্মানির সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকেই আসলে যেন প্রশ্রয় দিয়েছিল। আসলে ব্রিটেন সাম্যবাদী শক্তিকে রুখে দেবার জন্য জার্মানিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। সোভিয়েত রাশিয়া তাই জার্মান-বিরোধী জোটের প্রস্তাব দিলেও ব্রিটেন সেই প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। ১৯৩৫ সালে জার্মানির সঙ্গে নৌচুক্তি সম্পন্ন করে জার্মানিকে অস্ত্রসজ্জারও অনুমতি দিল ব্রিটেন। সুদেতান অঞ্চলে জার্মানি সৈন্য মোতায়েন করলেও ইংল্যান্ড ওই অঞ্চলের ওপর জার্মানির অধিকার স্বীকার করে নেয়। এমনকি ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করলেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স তাতে পূর্ণ সমর্থন জানায়। এই তোষণনীতি জার্মানির তথা অক্ষশক্তির সাম্রাজ্যবাদী ক্ষুধা বাড়িয়ে তোলে।

এছাড়াও শান্তি স্থাপনে লীগ অব নেশনস-এর অকর্মন্যতা ও ব্যর্থতার কথা তো বলা হয়েছে আগেই। নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াও পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ১৯৩২ সালে জাতিসংঘের নেতৃবর্গ নিরস্ত্রীকরণের জন্য একটি বিশ্বসম্মেলন আহ্বান করেন। কিন্তু জার্মানি ফ্রান্সের মতোই অস্ত্র রাখবার দাবি জানায় এবং হিটলার নিরস্ত্রীকরণের বিরোধিতা করে লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। হিটলার, মুসোলিনিরা সামরিকভাবে ক্রমাগত নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করতে থাকে। ইউরোপ পুনরায় দুটি শক্তিশালী শিবিরে ভাগ হয়ে যায়।

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর হিটলারের নাৎসী বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তার আগে জার্মানি এবং সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যে একটি অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু এই আক্রমণের খবর পেয়ে ইংল্যান্ড পেল্যান্ডের সমর্থনে এগিয়ে আসে এবং ৩ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কয়েকদিন বাদে রাশিয়া পোল্যান্ডের কিছু অংশ দখল করে এবং ফিনল্যান্ড আক্রমণ করলেও তা দখল করতে পারেনি। ১৯৪০ সালের ১৩ জুন জার্মান সৈন্যরা প্যারিসের দখল নিয়েছিল। তার আগে তারা নরওয়ে, বেলজিয়াম, হল্যান্ড ইত্যাদি অধিকার করেছিল। সেবছরই ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দরে জার্মানির সাঙ্ঘাতিক আক্রমণ মিত্রপক্ষকে প্রায় ধরাশায়ী করে ফেলেছিল। ১৯৪০ সালেই আবার মুসোলিনির ইতালী জার্মানির সঙ্গে পূর্বের সন্ধি অনুসারে অক্ষশক্তিতে যোগ দিয়েছিল। ইতিমধ্যে ব্রিটেনে চেম্বারলেন সরকারের পতন হয় এবং চার্চিলের উত্থান হয়। অন্যদিকে ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী পল রেনো জার্মানির আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে পদত্যাগ করেন ও জেনারেল পেঁতা তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং ১৯৪০ সালেই ফরাসিদের আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করানো হয়।

সেই ১৯৪০ সালেই জার্মান বাহিনী লাগাতার বিমান হামলা চালায় ব্রিটেনের ওপর। জার্মান বোমারু বিমানগুলি গ্রেট ব্রিটেন এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রধান শহরগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করে ৪০,০০০-এরও বেশি বেসামরিক লোককে হত্যা করে এবং এক মিলিয়নেরও বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দেয়।

১৯৪১ সালে হিটলার সোভিয়েত রাশিয়া আক্রমণের নির্দেশ দেন, যা অপারেশন বারবারোসা নামে পরিচিত। এই আক্রমণের ফলে রাশিয়া সরাসরি মিত্রশক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নিজেকে। অপারেশন বারবারোসায় জার্মানি চূড়ান্ত ব্যর্থ হয় এবং রাশিয়ার ইতিহাসে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধটি স্মরণীয় হয়ে থেকে যায়।

অন্যদিকে জাপানের আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে লড়বার ক্ষমতা তখন একমাত্র ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। সাম্রাজ্যবাদের নেশায় বুঁদ জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর হাওয়াইয়ের পার্ল হার্বার বন্দরে মার্কিন নৌ-ঘাঁটিতে অকস্মাৎ আক্রমণ করে। সেই আকস্মিক আক্রমণে ২৩০০ মার্কিন সৈন্যের প্রাণ যায়। ৮ ডিসেম্বর মার্কিন কংগ্রেস জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রবেশ ঘটেছিল।

পার্ল হারবার ঘটনার ছয়মাস পরে ১৯৪২ সালে মিডওয়ের যুদ্ধে মার্কিন নৌবাহিনীর জয়লাভ যুদ্ধের গতি অনেকখানিই ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এরপর জাপান দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সলোমন দ্বীপপুঞ্জের অংশ গুয়াডালকানালে একটি কৌশলগত বিমানঘাঁটি নির্মাণ শুরু করার কয়েক সপ্তাহ পরে, মার্কিন বাহিনী এক আশ্চর্য আক্রমণ শুরু করে এবং জাপানিদের পিছু হটতে বাধ্য করে।

১৯৪৩ সাল নাগাদ উত্তর আফ্রিকাতে ব্রিটিশ এবং আমেরিকান বাহিনী জার্মান ও ইতালীয়দের পরাস্ত করেছিল। ১৯৪৩ সালের জুলাই মাসে ইতালীতে মুসোলিনির সরকারের পতন ঘটে।

১৯৪৪ সালের ৬ জুন জার্মান অধিকৃত ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য-সহ আরও কয়েকটি দেশের সৈন্যরা আক্রমণ করে। এই দিনটি ইতিহাসে ডি-ডে নামে পরিচিত। অনেক ঐতিহাসিক বলে থাকেন এই ডি-ডে-র মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির বীজ নিহিত ছিল। মিত্রশক্তির দেড় লক্ষেরও বেশি সৈন্য নরম্যান্ডির উপকূলে অবতরণ করেছিল এবং কিছুদিনের মধ্যে আরও প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ সৈনিক সহ যুদ্ধ সামগ্রী সেখানে পৌঁছায়। ১৯৪৪ সালের আগস্টের মধ্যেই সমস্ত উত্তর ফ্রান্সকে মুক্ত করা হয়েছিল এবং ১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তি জার্মানদের পরাজিত করে। এই ডি-ডে থেকেই জার্মানির পতন শুরু হয়। ১৯৪৫ সালের ২ মে রাশিয়া বার্লিন দখল করে নিলে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে জার্মানির পটসড্যাম শহরে মিত্রপক্ষেরা মিলিত হয়ে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে বললে জাপান তা অস্বীকার করে। ফলস্বরূপ আমেরিকা তার আবিষ্কৃত দুই ভয়ংকর পারমানবিক বোমা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষেপ করে যথাক্রমে ৬ ও ৯ আগস্ট। ফলত, বাধ্য হয়ে ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব ইউরোপ-সহ অন্যান্য অনেক দেশের ওপরেও পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেই প্রথমত বিশ্বশান্তি রক্ষার্থে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সঠিকভাবে জানা না গেলেও অনেকের মতে, এই যুদ্ধে প্রায় ৬০ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ গিয়েছিল৷ হিরোশিমা, নাগাসাকিতে পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণ তো এক পঙ্গু প্রজন্মের জন্ম দেওয়ার জন্য দায়ী। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব হিসেবে বিভিন্ন দেশে দুর্ভিক্ষ, মহামারী, কালোবাজারী, মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি ঘটনা তো ঘটেইছিল এমনকি আমাদের দেশ ভারতবর্ষও একইরকমভাবে বিশেষত অর্থনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। আমেরিকার হাতে সূচনা এবং তারপর একে একে অনেক দেশ পারমানবিক শক্তিতে নিজেদের শক্তিশালী করে তুলতে শুরু করেছিল। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বের গড়ে ওঠা কিন্তু এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই, তারই প্রভাবে। এমনকি রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারমানবিক শক্তিকে কেন্দ্র করে একপ্রকার ঠান্ডা লড়াই চালাতে থাকে। সর্বোপরি হিটলার ও মুসোলিনির পতনের ফলে একনায়কতন্ত্রের ধ্বংস এবং গণতান্ত্রিক ভাবধারা জয়লাভ করেছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘আধুনিক ইয়োরোপের ইতিহাস (১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত)’, ডঃ গৌতম নিয়োগী ও অধ্যাপক গৌরদাস হালদার, ব্যানার্জি পাবলিশার্স, কলকাতা
  2. ‘আধুনিক ইওরোপ ও বিশ্বের ইতিহাস (১৮৭১-১৯৫০)’ (দ্বিতীয় সংস্করণ), অতুল চন্দ্র রায়, মৌলিক লাইব্রেরি, কলকাতা, ১৩৬৭
  3. https://en.m.wikipedia.org/
  4. https://www.history.com/
  5. https://www.history.com/
  6. https://www.75thwwiicommemoration.org/
  7. https://www.newworldencyclopedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading