বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করতে বসলে যে সব রাজনীতিবিদদের উপেক্ষা করা যাবে না, তাঁদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান (Shah Azizur Rahman)। মুসলীম লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন থেকে শুরু এবং তারপর বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযোগ গড়ে ওঠে আজিজুর রহমানের। আওয়ামী লীগ, বিএনপি উভয় দলের সদস্য হিসেবেই কাজ করেছিলেন তিনি। তবে আজিজুর রহমানকে ঘিরে বিতর্কের ঘূর্ণাবর্তও তৈরি হয়েছিল। প্রথমত ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকসেনাদের সমর্থনের জন্য তিনি নিন্দিত হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর গ্রেপ্তারও করা হয় তাঁকে। জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার আমন্ত্রণে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন পুনরায়।
১৯২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কুষ্টিয়ার (বর্তমানে বাংলাদেশে) দৌলতপুরে শাহ আজিজুর রহমানের জন্ম হয়।
শাহ আজিজুর রহমান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি আইন নিয়ে অধ্যয়নের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। সেখান থেকে বিএল ডিগ্রি অর্জনে সফলতা লাভ করেন তিনি।
ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে থাকেন আজিজুর। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে তিনি অল বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা এবং তারপর ভারত বিভাজনের পরে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাল। সেই বছরই দেশজুড়ে ভাষা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। উর্দু ভাষার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মাতৃভাষার বাংলার দাবি নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের যুবক-যুবতীর দল। পাকসেনার গুলিতে জীবন দিয়েছিল তরতাজা প্রাণ। সেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। এমনকি ১৯৭৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন দিবসের দিন সংসদে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে ভাষণ দিয়ে ভাষা শহীদদের অপমান করেছিলেন আজিজুর। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বলে অনেক পন্ডিত সেদিন এর প্রতিবাদ করেননি, চুপ করেছিলেন। কেবল ড. মযহারুল ইসলাম এই জঘন্য আচরণের বিরোধিতা করেছিলেন। ক্রমে বাংলা এবং পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় একটি মুখ হয়ে উঠতে থাকেন আজিজুর রহমান।
শাহ আজিজুর রহমান ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি কুষ্টিয়া থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও পরাজিত হয়েছিলেন। সেই বছরই, অর্থাৎ ১৯৬২ সালেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট বা এনডিএফ-এ যোগদান করেন আজিজুর এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৬৪ সালের মার্চ মাসে আজিজুর আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার নির্বাচনে তিনি কুষ্টিয়া এনই-৩৩ নির্বাচনী এলাকা থেকে লড়াই করে জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালের জুন মাসে জাতীয় পরিষদে সম্মিলিত বিরোধী দলের উপনেতা নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এই বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিবাদী আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন আজিজুর। ১৯৭০ সালে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবার জন্য আওয়ামী লীগ থেকে তাঁকে বহিষ্কার করে দেওয়া হয়েছিল। সেবছরই জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন আজিজুর।
কিছুকাল পরেই সারা দেশ আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছিল। চতুর্দিকে বেজে উঠেছিল মুক্তিযুদ্ধের দামামা। দেশকে স্বাধীন করতে পাকসেনাদের বিরূদ্ধে মরনপণ লড়াই করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধারা। রক্তক্ষয়ী সেই সংগ্রামই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল। তবে এই যে মুক্তিযুদ্ধ, আজিজুর রহমান কিন্তু তারও বিপক্ষে ছিলেন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের নিন্দা ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সেনাদের সমর্থন করেছিলেন তিনি। সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়তেই আজিজুর জাতিসংঘে পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বিপক্ষে পাকিস্তান রাষ্ট্রকেই সমর্থন করেছিলেন। এমনকি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কুখ্যাত অপারেশন সার্চলাইট যে এক নির্মম গণহত্যায় পর্যবসিত হয়েছিল, সেকথা খুব দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর বাংলাদেশ স্বাধীন হলে এবং পাকসেনা পরাজিত হলে সহযোগী আইনের অধীনে আজিজুরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। অবশ্য ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা করলে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন।
১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনী দ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পরে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে পুনরুজ্জীবিত মুসলীম লীগে যোগদান করেছিলেন আজিজুর। এরপর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি-তে যোগদান করেন তিনি। জিয়াউর রহমানকে বিএনপি দল গঠনেও সহায়তা করেছিলেন আজিজুর। ১৯৭৯ সালে এই দল সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছিল। জিয়াউরের মন্ত্রীসভায় তিনি শ্রম ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তিনি মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। জিয়াউরের ইচ্ছানুসারেই মশিউর রহমান প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন কিন্তু ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ আকস্মিকভাবে মৃত্যু হয় মশিউর রহমানের। মনে করা হয়, যে, এরপর প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বদরুদ্দোজা চৌধুরী বা সাইফুর রহমানের মতো ব্যক্তিরাই জিয়াউরের পছন্দ ছিল। তবে তিনি চেয়েছিলেন যে দলের সংসদ সদস্যরা গোপন ব্যালটের মাধ্যমে তাঁদের নেতা নির্বাচন করুক। আজিজুর রহমান সেই প্রক্রিয়ায় জয়লাভ করেন। জিয়াউর তাঁর মন্ত্রীদের পছন্দকে উপেক্ষা করতেই পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। অবশেষে ১৯৭৯ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন শাহ আজিজুর রহমান। জিয়াউর রহমানের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই খুবই সমালোচনা করেছিলেন। যে ব্যক্তি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকসেনাদের সমর্থন করে, জাতিসংঘে গিয়ে পাকিস্তানের সমর্থনে কথা বলে তাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করায় চতুর্দিকে নিন্দার ঝড় উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজিজুর খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক প্রবর্তিত কুখ্যাত ক্ষতিপূরণ আইনটিকে অনুমোদনে সহায়তা করেছিলেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পরেও আজিজুর প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল ছিলেন। জিয়াউর রহমানের জায়গায় নতুন রাষ্ট্রপতি হয়ে আসেন আব্দুস সাত্তার। তিনিও আজিজুরকে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল রেখেছিলেন। কিন্তু ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে এবং আব্দুস সাত্তার ও শাহ আজিজুর রহমান দুজনেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন আজিজুর রহমান।
১৯৮৫ সালে বিএনপি দলে ফাটল দেখা দেয় এবং আজিজুর বিএনপি-এর উপদলের চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্ব দেন। তবে খুব শীঘ্রই জেনারেল হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কর্মসূচিকে সমর্থন করেন এবং ১৯৮৫ সালের ১৭ আগস্ট এরশাদের জাতীয় ফ্রন্টে যোগদান করেন। অবশ্য খুব বেশিদিন সেখানে থাকতে পারেননি। কয়েক মাসের মধ্যেই ফ্রন্ট ত্যাগ করেন তিনি। ১৯৮৯ সালে আগস্ট মসে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পুনরায় আজিজুর বিএনপি দলের মূলধারায় ফিরে এসেছিলেন।
১৯৮৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ৬৩ বছর বয়সে ঢাকায় এই প্রভাবশালী ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান