ইতিহাস

শাহরুখ খান

বলিউড চলচ্চিত্রের জগতের ‘বাদশা’ হিসেবে পরিচিত ভারতের অন্যতম তারকা অভিনেতা শাহরুখ খান (Shah Rukh Khan)। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও জনপ্রিয়তার নিরিখে তিনি আজও বলিউডের ‘কিং খান’। ১৯৮০ সালে টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ফৌজি’তে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর রূপোলি পর্দার জগতে পদার্পণ। তারপর ‘সার্কাস’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেই ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাঁর। ১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে বলিউডের রঙিন দুনিয়ায় প্রবেশ করেন শাহরুখ খান। ১৯৯৩ থেকে ২০০০ সালের মধ্যেই পরপর অসংখ্য জনপ্রিয় ও বাণিজ্য-সফল ছবিতে অভিনয়ের জন্য তারকা অভিনেতায় পরিণত হন তিনি। ‘বাজিগর’ (১৯৯৩), ‘ডর’ (১৯৯৩), ‘আনজাম’ (১৯৯৪) ইত্যাদি ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করলেও এখনও পর্যন্ত তাঁর অভিনীত শতাব্দীর সেরা জনপ্রিয় ও বহুচর্চিত ছবি বলতে এক ঝলকেই মানুষের মনে আসে ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’। এই একটি ছবি আপামর ভারতীয় তরুণ-তরুণীদের বিপুলভাবে মোহিত করেছিল। তাঁর অভিনয় জীবনে রোমান্টিক ছবির যাত্রাপথ এর মাধ্যমেই শুরু হয়। তারপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ (১৯৯৭), ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (১৯৯৮), ‘মহব্বতে’ (২০০০), ‘কভি খুশি কভি গম’ (২০০১) ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শাহরুখ খান। ১৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের পাশাপাশি ফরাসী সরকারের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন ‘লিজিয়ন অফ অনার’-এর সম্মানও।

১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর নয়া দিল্লির একটি মুসলমান পরিবারে শাহরুখ খানের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মীর তাজ মহম্মদ খান একজন সক্রিয় স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে খান আবদুল গফফর খান পরিচালিত ‘খুদা-ই-খিদমতগার’ বাহিনীর হয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর মা লতিফ ফতিমা একজন ইঞ্জিনিয়ারের কন্যা ছিলেন। তাঁর বড়ো দিদির নাম ছিল শাহনাজ লোলারুখ। জাতিগতভাবে তাঁর বাবা ছিলেন একজন পাঠান এবং তাঁর মা ছিলেন হায়দ্রাবাদী। জীবনের প্রথম পাঁচ বছর শাহরুখ ম্যাঙ্গালোরে তাঁর মামাতো দাদু ইফতিকার আহমেদের কাছে কাটান। পরে তাঁর বাল্যকালের অধিকাংশ সময় কাটে দিল্লির রাজেন্দ্রনগরে। তাঁর তিন সন্তান – দুই পুত্র আরিয়ান ও আব্রাহাম এবং কন্যা সুহানা।

মধ্য দিল্লির সেন্ট কলম্বাস স্কুলে শাহরুখ খানের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ হয়। সেই স্কুলে পরাশোনা বাদে হকি এবং ফুটবল খেলায় চূড়ান্ত দক্ষতা প্রদর্শন করে তিনি স্কুলের সর্বোচ্চ সম্মান ‘সোর্ড অফ অনার’ অর্জন করেন। ধরা-বাঁধা পড়াশোনায় তাঁর মন বসতো না। খেলাধুলার জগতেই কেরিয়ার গড়ে তুলবেন বলে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু বাধ সেধেছিল পিঠের ব্যথা আর আর্থ্রাইটিস। এরপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হংসরাজ কলেজে অর্থনীতি পড়তে ভর্তি হন শাহরুখ খান এবং এই কলেজ থেকেই ১৯৮৮ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপরে জনসংযোগ (Mass Communication) বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া সংস্থায় ভর্তি হন তিনি। ততদিনে বহু থিয়েটার দলে অভিনয় করার শুরু করেছেন শাহরুখ। অভিনয়ের দক্ষতায় পরিশীলন আনতে দিল্লিতেই ব্যারি জনের অধীনে একটি দলে থিয়েটার প্রশিক্ষণ নিতে থাকেন তিনি। এর পাশাপাশি বলিউডের চলচ্চিত্র দেখার অভ্যাসও হয়েছে তাঁর – অমিতাভ বচ্চন, দিলীপ কুমার, মুমতাজ প্রমুখরা তাঁর অত্যন্ত প্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলেন। বলিউডের জগতে পা রাখার প্রাথমিক পর্বে ভারতের ‘ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা’ প্রতিষ্ঠানেও বেশ কিছু বছর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন শাহরুখ খান। ১৯৮১ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তাঁর বাবা মারা যান এবং তাঁর মাত্র দশ বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে ডায়াবেটিসের কারণে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে দিদির সঙ্গেই মুম্বাইয়ের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন শাহরুখ খান।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


১৯৮৮ সালে লেখ ট্যাণ্ডন পরিচালিত টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘দিল দরিয়া’তেই প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান শাহরুখ। এরপরে ১৯৮৯ সালে রাজকুমার কাপুর নির্দেশিত ‘ফৌজি’ ধারাবাহিকেও ‘অভিমন্যু রাই’ নামের একজন সেনার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। এই ধারাবাহিকে অভিনয় করে বহু মানুষের প্রশংসা অর্জন করেন তিনি এবং তার সঙ্গে জনপ্রিয়তাও বাড়তে থাকে তাঁর। এরপরে আজিজ মির্জার ‘সার্কাস’ নামে আরেকটি ধারাবাহিকে অভিনয় করেন শাহরুখ। মনে করা হয় এই ধারাবাহিকে অভিনয়ই তাঁকে আপামর ভারতবাসীর মনে চিরস্থায়ী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এইসব ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় দেখে চলচ্চিত্র সমালোচকেরা অনেকেই শাহরুখ খানের অভিনয়ের সঙ্গে দিলীপ কুমারের তুলনা করেন। ১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিওয়ানা’ ছবিতে সেকালের বিখ্যাত অভিনেত্রী দিব্যা ভারতী এবং কিংবদন্তী অভিনেতা ঋষি কাপুরের সঙ্গে দ্বিতীয় পুরুষ চরিত্র হিসেবে অভিনয় করেন তিনি আর এই ছবিটি প্রভূতভাবে বাণিজ্য-সফল হয়। এই ছবিতে অভিনয়ের জন্যে শাহরুখ খান ‘ফিল্মফেয়ার বেস্ট মেল ডেবিউ অ্যাওয়ার্ড’-এ ভূষিত হন। ঐ বছরই পরপর ‘চমৎকার’, ‘দিল আশমা হ্যায়’, ‘রাজু বন গ্যয়া জেন্টলম্যান’ ইত্যাদি জনপ্রিয় সব ছবিতে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। ১৯৯৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বাজিগর’ এবং ‘ডর’ ছবি দুটিতে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে শাহরুখ খান দর্শকদের মুগ্ধ করে দেন। অভিনেত্রী কাজলের সঙ্গে ‘বাজিগর’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি এবং এই অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে ‘আনজাম’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি পুনরায় ফিলফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন। রাকেশ রোশান পরিচালিত এবং শাহরুখ খান অভিনীত ‘করণ অর্জুন’ ছবিটিও বক্স অফিসে সাফল্য এনে দেয়। এই বছরেই তিনি পরপর কয়েকটি রোমান্টিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তাঁর অভিনীত শতাব্দীর সেরা জনপ্রিয় ও বহুচর্চিত ছবি বলতে এক ঝলকেই মানুষের মনে আসে ১৯৯৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’। এই একটি ছবি আপামর ভারতীয় তরুণ-তরুণীদের বিপুলভাবে মোহিত করেছিল এবং কাজল-শাহরুখ জুটির অভিনয়ে এই ছবিটি তখনো পর্যন্ত ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবথেকে বেশি অর্থ উপার্জন করে রেকর্ড তৈরি করেছিল। আদিত্য চোপড়া পরিচালিত ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’ মোট দশটি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পায় এবং শাহরুখ খান শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মানে ভূষিত হন। তাঁর অভিনয় জীবনে রোমান্টিক ছবির যাত্রাপথ এর মাধ্যমেই শুরু হয়। তারপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ (১৯৯৭), ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ (১৯৯৮), ‘মহব্বতে’ (২০০০), ‘কভি খুশি কভি গম’ (২০০১) ইত্যাদি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন শাহরুখ খান। প্রতিটি ছবিই বক্স অফিসে চূড়ান্তভাবে সাফল্য লাভ করে। ২০০১ সালে সঞ্জয় লীলা বনশলীর পরিচালনায় ‘দেবদাস’ ছবিটিতে শাহরুখ খানের অভিনয় ভারতবাসীর মনে দাগ কেটে যায়। ২০০৪ সালে ‘ম্যায় হুঁ না’, ‘ভীর জারা’ এবং ‘স্বদেশ’ নামে তিনটি ছবি মুক্তি পায় যার মধ্যে তিনটির জন্যই শাহরুখ খান শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার সম্মান পান। এরপরে ‘পহেলি’ নামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। শাহরুখ অভিনীত এই ছবিটি অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

একবিংশ শতাব্দীর প্রাথমিক পর্বে এসে ‘ফির ভি দিল হ্যায় হিন্দুস্তানি’ (২০০০), ‘হে রাম’ (২০০০), ‘কভি আলভিদা না কহেনা’ (২০০৬), ‘চাক দে ইণ্ডিয়া’ (২০০৭), ‘রব নে বানা দে জোড়ি’ (২০০৮), ‘ওম শান্তি ওম’ (২০০৭), ‘মাই নেম ইজ খান’ (২০১০) ইত্যাদি ছবিতে পরপর তাঁর অসামান্য অভিনয় দক্ষতার সাক্ষী থেকেছে আপামর ভারতীয় দর্শক। কমল হাসানের সঙ্গে অভিনীত ‘হে রাম’ ছবিটি তামিল ভাষাতেও মুক্তি পেয়েছিল। মাই নেম ইজ খান ছবিতে অ্যাসপারগার সিনড্রোমে আক্রান্ত ‘রিজওয়ান’ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সমালোচক মহলে যথেষ্ট প্রশংসিত হয়েছিলেন তিনি। তবে ২০১০ সালের পর থেকে রা-ওয়ান, চেন্নাই এক্সপ্রেস, দিলওয়ালে, হ্যাপি নিউ ইয়ার, ফ্যান ইত্যাদি ছবিগুলির কোনোটায় দুর্বল কাহিনি বা চিত্রনাট্য, কোনোটায় পরিচালনার খামতি বা অন্যান্য আরো কারণে শাহরুখ খান মুখ্য চরিত্রাভিনেতা হিসেবে সেরা অভিনয় করলেও সমালোচক ও দর্শক মহলে তাঁর দক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন জেগেছে। পুনরাবৃত্তি-দোষে দুষ্ট তাঁর অভিনয়, এমনও অনেক সমালোচক বলে থাকেন। কিন্তু তাঁর পরেও তাঁর অনুরাগী দর্শকসংখ্যায় কোনো খামতি লক্ষ্য করা যায় না।

ছোটো পর্দায় কিছু কিছু শো-তে সঞ্চালনা করলেও সেগুলি খুব একটা সাড়া জাগাতে পারেনি দর্শক মনে। ২০০৮ সালে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য ইণ্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে জুহি চাওলার সঙ্গে যুগ্মভাবে ‘কলকাতা নাইট রাইডার্স’ দলটি কেনেন তিনি। শুধুমাত্র শাহরুখ খানের জন্য কলকাতার এই দলটির ব্র্যাণ্ড ভ্যালু বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। শাহরুখ খান তাঁর স্ত্রী গৌরী খানের সঙ্গে যৌথভাবে ‘রেড চিলিস এন্টারটেইনমেন্ট’ নামে একটি প্রযোজনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যা আজ পর্যন্ত দশটির বেশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছে। শুধু ভারতেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও সমীক্ষার বিচারে শাহরুখ খান অন্যতম একজন ধনী অভিনেতা। বিজ্ঞাপনের বাজারেও তাঁর ব্র্যাণ্ড ভ্যালু আকাশছোঁয়া। ২০০৮ সালে ‘নিউজউইক’ পত্রিকা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম পঞ্চাশ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় নথিভুক্ত করেছিল।

১৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের পাশাপাশি ফরাসী সরকারের কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন ‘লিজিয়ন অফ অনার’-এর সম্মানও। ২০০৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে। বেডফোর্ডশায়ার, জর্জটাউন, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানীয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে।

এখনও সমানভাবে চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপনে অভিনয় করে যাচ্ছেন শাহরুখ খান। তাঁর মুম্বাইয়ের বাড়ির সামনে প্রতিদিনই অগণিত অনুরাগীর সমাবেশ দেখা যায়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য