ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম একজন নারী বিপ্লবী ছিলেন শান্তি ঘোষ (Shanti Ghosh)। ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রতিমূর্তি ছিলেন তিনি। ১৯৩১ সালে কুমিল্লার অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলা শাসক সিজিবি স্টিভেন্সকে মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন শান্তি ঘোষ । স্বাধীনতার পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদ উভয় কক্ষের সদস্য হয়েছিলেন।
১৯১৬ সালের ২২ নভেম্বর কলকাতায় শান্তি ঘোষের জন্ম হয়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের বরিশাল জেলার পিরোজপুরের রায়েরকাঠি গ্রামে। শান্তির বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। মা শৈলবালা ঘোষ ছিলেন গৃহবধূ। দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ মনে প্রাণে একজন স্বদেশপ্রেমী ছিলেন। শান্তি ঘোষের স্বামীর নাম চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি চট্টগ্রামের একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে শান্তি ঘোষের শৈশব কেটেছে কুমিল্লায়।
শান্তির শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয় থেকে। এই বিদ্যালয়ে পড়তে পড়তেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী ভাবধারার প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হন। শান্তি ঘোষকে বিপ্লবী আদর্শে প্রেরণা দেন তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে আর তাঁর বড়দাদাকে জাতীয় নেতা নেত্রীদের জীবনী শোনাতেন তিনি। বিভিন্ন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মিটিংয়ে তিনি শান্তিকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। ১৯২৬ সালে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী সরোজিনী নাইডু কুমিল্লায় এলে তাঁকে সম্বর্ধনার অনুষ্ঠানে শান্তি উদ্বোধনী সঙ্গীতে অংশ নেন। বাড়িতে ফিরেই তাঁর বাবা তাঁকে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে সামিল হওয়ার জন্য উৎসাহ দেন এবং সরোজিনী নাইডুর মত নেত্রী হতে বলেন। ১৯২৭ সালে মহাত্মা গান্ধী ও তাঁর স্ত্রী কস্তুরবা গান্ধী কুমিল্লায় এলে শান্তির বাবা কিছু টাকা তাঁর হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কস্তুরবা গান্ধীর হাতে দেওয়ার জন্য। এভাবেই ধীরে ধীরে একটু একটু করে শান্তির মনে দেশ সেবার আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিলেন তাঁর বাবা।
১৯২৮ সালে কুমিল্লা ফয়জুন্নিসা বালিকা বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী থাকাকালীন শান্তি ঘোষ স্কুলের পাশ দিয়ে একটি মিছিল যেতে দেখেন যেখানে জনগণ সমবেত কন্ঠে বলছিল “গো ব্যাক সাইমন” (Go back Simon)। মিছিলের সেই সমবেত কণ্ঠের দাবি শান্তির মনের মধ্যে প্রথমবার এক প্রবল আলোড়ন তৈরি করে। সেই বয়সেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন বিদেশিদের হাত থেকে দেশের শাসন ব্যবস্থা নিজের দেশের মানুষদের হাতে না এলে তাঁদের দুঃখ দুর্দশা দূর হবে না কোনদিন।
সহপাঠিনী প্রফুল্লনন্দিনী ব্রহ্মের হাত ধরেই মূলত শান্তির সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনের সাথে পরিচয় হয়। প্রফুল্লনন্দিনীই শান্তি ও তাঁর আর এক বান্ধবী সুনীতি চৌধুরীকে ‘যুগান্তর’ দলে নিয়ে আসেন। ১৯২৮ সালের সাইমন কমিশন-বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আইন অমান্য আন্দোলনের সময় শান্তি ঘোষ এই দলের হয়ে কাজ করতে থাকেন। মিথ্যা অজুহাতে মায়ের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে তিনি দলের দাদাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করতে থাকেন। কখনও দলের অর্থের প্রয়োজন হলে মায়ের আলমারি থেকে টাকা এমনকি মায়ের সোনার গলার হারও সরিয়ে নিয়ে আসতেন।
১৯৩১ সালে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত ছাত্র কনফারেন্সের পর শান্তি ও তাঁর সহপাঠিনীরা মিলে ছাত্রসংঘ গড়ে তোলেন। এই ছাত্রসংঘের সভানেত্রী ছিলেন প্রফুল্লনন্দিনী, সম্পাদিকা শান্তি এবং ক্যাপ্টেন ছিলেন সুনীতি। শহর থেকে দশ মাইল দূরে ময়নামতী-কোঠাবাড়ির পাহাড়ে-জঙ্গলে বীরেন্দ্র ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে তাঁদের বন্দুক চালনার অনুশীলন শুরু হয়। পাশাপাশি তাঁরা লাঠি চালনা, ছোরা চালনা, ব্যায়াম প্রভৃতিতেও পটু ছিলেন। দলের সভায় শান্তি ঘোষ এবং সুনীতি চৌধুরীকে অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসক সিজিবি স্টিভেন্সকে হত্যার ভার দেওয়া হয়। কুমিল্লার জেলা শাসক সিজিবি স্টিভেন্স একজন অত্যন্ত অত্যাচারী হিসেবে কুখ্যাত ছিলেন।
১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর স্কুলে অনুষ্ঠান আছে বলে শাড়ি ও শাল পরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়েন শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী। চাদরের নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন রিভলভার। সঙ্গে নিয়েছিলেন বেশ কিছু লজেন্স। সকাল দশটা নাগাদ সিজিবি স্টিভেন্সের সরকারি বাংলোতে গিয়ে তাঁরা বলেন বড়দিনের আগে তাঁরা লজেন্স ও ক্যাডবেরি উপহার দিতে এসেছেন মি স্টিভেন্সকে। প্রবেশের অনুমতি পেয়ে তাঁরা সোজা প্রবেশ করেন স্টিভেন্সের কক্ষে। সিজিবি স্টিভেন্স একটি লজেন্স মুখে নিয়ে অত্যন্ত আনন্দের সাথে তাঁদের উদ্দেশ্যে বলেন – “ বাহ্ ! দারুণ খেতে তো!” উত্তরে শান্তি শালের ভেতর থেকে রিভলভার বের করে স্টিভেন্সের দিকে তাকিয়ে বললেন – “ এবার খেয়ে বলুন মি. ম্যাজিস্ট্রেট এটা কেমন খেতে?” এটা বলেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে শান্তি স্টিভেন্সকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। ম্যাজিস্ট্রেটের পাশে থাকা আর্দালি শান্তি ও সুনীতিকে ধরে ফেলেন। তারপর চার-পাচঁজন আর্দালি মিলে দলবদ্ধভাবে তাঁদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায়।
দুপুর একটায় তাঁদের থানায় নিয়ে যাওয়ার জন্য স্টিভেন্সের বাংলো থেকে বের করা হয়। এরই মধ্যে স্টিভেন্স হত্যার খবর সমগ্র শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। যে রাস্তা দিয়ে তাঁদের যাওয়ার কথা তার দুধারে অগণিত মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে ছিল। সেই জনতাকে উদ্দেশ্য ক’রে দুজনেই চিৎকার করে বলতে লাগলেন ‘‘বন্দেমাতরম্’’।
এই ঘটনায় কুমিল্লা কোতয়ালী থানায় মামলা হয় সেদিনই। পুলিশ তাঁদের ওপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালিয়েও কোনো গোপন কথা আদায় করতে পারেনি। এরপর শান্তি ও সুনীতিকে নিয়ে আসা হয় আলিপুরে সেন্ট্রাল জেলে। কোর্ট থেকে জেল, জেল থেকে আরেক জেলে স্থানান্তর করা হচ্ছিল বার বার। সেই সঙ্গে চলছিল অমানবিক অত্যাচার ও ধর্ষণ।
১৯৩২ সালের ২৭ জানুয়ারি আদালতের রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ার কারণে তাঁদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদন্ডকে হাসিমুখে বরণ করতে চেয়েছিলেন শান্তি ঘোষ। তাঁরা চেয়েছিলেন শহীদের মর্যাদা পেতে। আর তাই মৃতুদন্ড না পেয়ে শান্তি ও সুনীতি আদালতে চিৎকার করে বলেন ‘‘আমাদের দেশের জন্য শহীদ হওয়া থেকে বঞ্চিত করা হল। ’’
যাবজ্জীবন কারাদন্ড হওয়ায় দুজনকেই জেলখানায় কয়েদ করা হল। শান্তিকে করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণির কয়েদি আর সুনীতিকে তৃতীয় শ্রেণির কয়েদি। জেলে প্রবেশ করবার সময় তাঁরা একসঙ্গে গাইতে থাকেন ‘‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট’’। শান্তি ও সুনীতিকে মাঝে মাঝে একই কারাগারে রাখা হলেও অধিকাংশ সময়েই তাঁদের আলাদা আলাদা করে রাজশাহী, মেদিনীপুর, হিজলী, প্রেসিডেন্সি প্রভৃতি জেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে স্থানান্তরিত করা হত।
সারা দেশে ছড়িয়ে পরে শান্তি ঘোষ ও সুনীতির নাম ছড়িয়ে পড়ে। রাজশাহীতে শান্তি ও সুনীতির ছবি দিয়ে পোস্টার লাগান হয়। পোস্টারে লেখা হয়, “THOU ART FREEDOM’S NOW, AND FAMES.” শান্তি ও সুনীতির পাশাপাশি দুটি ছবি যার পাশে ইংরেজ কবি রবার্ট বার্নস এর লেখা ‘Scots Wha Hae’ কবিতার দুটি লাইন লেখা হয়
“Tyrants fall in every foe!
Liberty’s in every blow!”
১৯৩৯ সালে ব্রিটিশদের সাথে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সাত বছর পর গান্ধীজির প্রচেষ্টায় অন্য সকল রাজনৈতিক বন্দির সঙ্গে মুক্তি পান শান্তি ও সুনীতিও।
কারামুক্তির পর শান্তি ঘোষ কলকাতার উইমেনস্ কলেজে ভর্তি হন। কিছুদিন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর কংগ্রেসে যোগ দেন। মাঝে রাজাবাজারে একটি বিড়ির কারখানায় কিছুদিন সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।
পরবর্তীকালে তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে ১৯৬২-৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য এবং ১৯৫২-৬২ ও ১৯৬৭-৬৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই তিনি রচনা করেন তাঁর বৈপ্লবিক জীবনী নিয়ে গ্রন্থ ‘অরুণ বহ্নি’ যেটি প্রকাশিত হয়েছিল বসুমতি প্রকাশনা থেকে। প্রকাশক ছিলেন শ্রী সুকুমার গুহমজুমদার।
১৯৮৯ সালের ২৭ মার্চ ৭৩ বছর বয়সে শান্তি ঘোষের মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান