ইতিহাস

কস্তুরবা গান্ধী

কস্তুরবা গান্ধী

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যেসমস্ত নারীর অবদান স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে, কস্তুরবা গান্ধী (Kasturba Gandhi) তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি মহাত্মা গান্ধীর স্ত্রী কস্তুরবা ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার এবং স্বরাজের জন্য আজীবন লড়াই করে গেছেন। গান্ধীজীর সঙ্গে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকাতেও গিয়েছিলেন এবং সেখানে ভারতীয় অভিবাসীদের সঙ্গে ঘটা খারাপ আচরণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে কারাবাসও করেছিলেন তিনি। বিহার, গুজরাট, রাজকোট সহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনে যেমন অংশগ্রহণ করেছিলেন তেমনি নারীদের স্বাস্থ্যবিধি, শৃঙ্খলা, পড়াশুনা ইত্যাদিতে সাহায্য করেছিলেন তিনি। সারাজীবন অসংখ্য রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন কস্তুরবা। কস্তুরবা গান্ধীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জন্মদিনটি জাতীয় নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে।

১৮৬৯ সালের ১১ এপ্রিল বর্তমান গুজরাটের পোরবন্দর নামক উপকুলীয় শহরে কস্তুরবা গান্ধীর জন্ম হয়। বিবাহের আগে তাঁর নাম ছিল কস্তুরবা গোকুলদাস কাপাডিয়া। তাঁর বাবা গোকুলদাস মাকানজি কাপাডিয়া ছিলেন একজন নামজাদা ধনী বণিক। তাঁরা মূলত মোধ বেনিয়া বর্ণের গুজরাটী হিন্দু ব্যবসায়ী ছিলেন। কস্তুরবার মায়ের নাম ব্রজকুনওয়ারবা কাপাডিয়া। তিন সন্তানের মধ্যে কস্তুরবা ছিলেন মধ্যম। তাঁর এক দাদা এবং এক ভাই ছিল। কস্তুরবার বাবা গোকুলদাস মহাত্মা গান্ধীর বাবা মোহনদাস করমচাঁদের ভালো বন্ধু ছিলেন। দুই বন্ধু ঠিক করেছিলেন তাঁদের সন্তানদের বিবাহ দিয়ে একটি আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করবেন। এই প্রাথমিক চুক্তি যখন হয়েছিল তখন তাঁদের সন্তানদের বয়স মাত্র সাত বছর। অবশেষে ১৮৮৩ সালের মে মাসে মোহদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং কস্তুরবা কাপাডিয়ার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। কস্তুবার বয়স তখন চোদ্দ বছর মাত্র এবং মহাত্মা তাঁর চেয়ে বয়সে কিছুদিনের ছোট ছিলেন। বিবাহের পর কস্তুরবা রাজকোটে গান্ধী পরিবারে চলে যান। স্বামী যখন স্কুলে চলে যেতেন তখন বাড়িতে শাশুড়িকে ঘরের কাজে সাহায্য করতেন তিনি। কস্তুরবা তখন ছিলেন একেবারেই নিরক্ষর। বিবাহের প্রথম কয়েক বছর গান্ধীজী তাঁকে লেখাপড়া শেখানো শুরু করেছিলেন। কস্তুরবা অবশ্য ভয় পেতেন এই পড়াশুনা শেখার ব্যপারটি বাড়ির অন্য মেয়েদের সঙ্গে বোধহয় তাঁর সম্পর্ক খারাপ করে দেবে।


এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com


 

১৮৮৫ সালের জুন মাসে গর্ভবতী হয়েছিলেন তিনি। যদিও নভেম্বর মাসে শিশুটির অকালে জন্ম হয় এবং কয়েকদিন পর মারা যায়। ১৮৮৮ সালের জানুয়ারিতে রাজকোটের সামলদাস কলেজে যখন গান্ধীজী পড়াশুনা করতে যান তখন পুনরায় গর্ভবতী হন কস্তুরবা। এরপরেই তাঁদের প্রথম সন্তান হরিলালের জন্ম হয়। এক হিন্দু পুরোহিতের পরামর্শে ইংল্যান্ডে গিয়ে আইন অধ্যয়ন করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মহাত্মা। তখন সেই পড়াশুনার খরচ জোগাতে কস্তুরবার গয়নাও বন্ধক রাখা হয়েছিল। ১৮৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গান্ধী ইংল্যান্ডে যান এবং আগামী তিনবছর কস্তুরবা স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। ভারতে পৌঁছেও গান্ধী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের জন্য যখন সংগ্রাম করছিলেন সেসময়, ১৮৯২ সালের ২৮ অক্টোবর কস্তুরবা দ্বিতীয় পুত্র মণিলালের জন্ম দেন। এর ঠিক ছয়মাস পরে, ১৮৯৩ সালে মহাত্মা দক্ষিণ আফ্রিকা চলে যান। সেখানে আইন অধ্যয়ন করতে থাকেন ও ভারতীয়দের প্রতি অবিচারে রুখে দাঁড়ান। ১৮৯৬ সালে ভারতে ফিরে পুনরায় ছয়মাস পর কস্তুরবা এবং সন্তানদের নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান তিনি। গান্ধীরা সেখানে বিচ গ্রোভ ভিলায় তাঁদের নতুন বাড়িতে বসতি স্থাপন করেন। এখানে কস্তুরবা ক্রমশ একাকীত্ব অনুভব করতে শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে স্বামীর কাজে আগ্রহ দেখান এবং সাহায্য করতে শুরু করেন। ১৮৯৭ সালে কস্তুরবা তৃতীয় পুত্র রামদাস এবং ১৯০০ সালে চতুর্থ পুত্র দেবদাসের জন্ম দিয়েছিলেন।

১৯০৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন কস্তুরবা। তাঁর স্বামী এবং অন্যদের সঙ্গে ডারবানের কাছে ফিনিক্স সেটলমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯০৪ সালের মার্চ মাসে জোহানেসবার্গে বুবোনিক প্লেগ দেখা দিলে ভারতীয় সম্প্রদায়ের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। গান্ধী অসুস্থদের জন্য চিকিৎসা সহায়তার আয়োজন করেন এবং কস্তুরবা তাঁকে প্রভূত সাহায্য করেন। তিনি ভারতীয় মহিলাদের কাছে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে কথা বলেন এবং ব্যাখা করেন কীভাবে প্লেগের লক্ষণগুলিকে চিহ্নিত করা যায়। ১৯০৬ সালে সন্তানদের নিয়ে ফিনিক্সে চলে যান কস্তুরবা। ১৯০৭ সালে ট্রান্সভাল এশিয়াটিক রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট জারি হলে তার প্রতিবাদে মহাত্মা গান্ধী আন্দোলন শুরু করেন এবং এখান থেকেই সত্যাগ্রহের সূত্রপাত। কস্তুরবা প্রত্যক্ষভাবে তাতে অংশ না নিলেও মানসিক সমর্থন ছিল তাঁর। আন্দোলনের জেরে গান্ধীজী গ্রেফতার হলে কস্তুরবা তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়াতে জেলে যে ধরণের খাবার খেতে দেওয়া হত গান্ধীজীকে সেই খাবারই নিজে খেতেন।

১৯১৩ সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্যাগ্রহে নারীরা যে প্রভূত শক্তি আনতে পারে তা গান্ধী পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন। যদিও গান্ধীজী আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য কখনও জোর করেননি কস্তুরবাকে। ১৯১৩ সালে কস্তুরবা দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় অভিবাসীদের সাথে খারাপ আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন, যার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কারাগারে থাকাকালীন অন্যান্য মহিলাদের ঈশ্বর আরাধনায় উৎসাহ দিতেন তিনি এবং শিক্ষিত মহিলাদের উৎসাহ দিতেন কিভাবে নিরক্ষর মহিলাদের পড়া এবং লেখা শেখানো যায় সেবিষয়ে।

১৯১৪ সালে গান্ধীজীর সঙ্গে কস্তুরবা ফিরে আসেন ভারতবর্ষে। ভারতে ফিরে, কস্তুরবা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন। তিনি গান্ধীজীকে নানান উপায়ে সহায়তা করেছিলেন এই সময়ে। ১৯১৭ সালে বিহারের চম্পারনে অত্যাচারিত নীল চাষিদের পাশে যখন দাঁড়িয়েছিলেন গান্ধীজী তখন পুত্র দেবদাসকে সঙ্গে নিয়ে চম্পারনে চলে যান কস্তুরবা স্বামীকে সাহায্যের জন্য। কৃষকদের স্ত্রী এবং কন্যাদের মধ্যে গিয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। কস্তুরবা একটি বিশেষ বার্তা দিয়ে ভারতীয় মহিলাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে তাঁদের স্পিনিং এবং বুনন শিখে স্বাবলম্বী হতে শিখতে হবে। এইভাবে, তাঁদের পরিবারের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারে এবং কাপড়ের মতো বিদেশী পণ্যের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। দেশব্যাপী বিদেশী পণ্য বয়কট করার জন্য গান্ধীজীর আহ্বানের কারনে যখন ব্রিটিশ তাঁকে গ্রেফতার করে এবং বিচারের মাধ্যমে ছয় বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করে, তখন কস্তুরবা আপিল করেছিলেন তাঁর মুক্তির জন্য। গান্ধীজীর কারাবাসকালে কস্তুরবা নিজে ভারতবাসীকে বিদেশী কাপড় বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৯২৮ সালে, একটি সর্বভারতীয় সত্যাগ্রহ অভিযান ঘোষণা করা হয় যার লক্ষ্য ছিল এক বছরের মধ্যে স্বাধীনতা। এই অভিযানের অংশ হিসেবে সবরমতী আশ্রম থেকে বিখ্যাত ডান্ডি অভিযানের আয়োজন করা হয়েছিল। লবন সত্যাগ্রহের মাধ্যমে লবন আইন ভঙ্গ করার জন্য এই বিশাল অভিযানের উদ্যোগ করা হয়। কিন্তু পুরুষ সত্যাগ্রহীদের দলে দলে গ্রেফতার করা হলে কস্তুরবা বুঝতে পারেন মহিলারাই আইন অমান্য আন্দোলনকে অগ্রসর এবং ত্বরান্বিত করতে পারে। কারন পুলিশ মহিলাদের গ্রেফতার করতে কিছুটা দ্বিধা বোধ করবে। তিনি মহিলাদের দলে দলে এই আন্দোলনে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন।

ভারতের সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য ১৯৩১ সালে লন্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হলে ভারতে প্রতিবাদ দানা বেঁধে ওঠে। সরকার আইন অমান্য অভিযানকে দমন করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়। নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত করা হয় এবং ১৯৩২ সালের জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে প্রচুর ভারতীয় নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। কস্তুরবাকেও অন্যান্য মহিলাদের সাথে সবরমতী আশ্রমে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এটি ছিল ভারতে তাঁর প্রথম কারাবরণ। ১৯৩২ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন কস্তুরবা সবরমতীভি কারাগারে ছিলেন, গান্ধীজী তখন নতুন প্রস্তাবিত ভারতীয় সংবিধানের প্রতিবাদে “আমরণ অনশন” শুরু করেছিলেন। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর পুনরায় নিজের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন কস্তুরবা। হরিজন বা অস্পৃশ্য জাতিদের জন্য কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। ১৯৩২ সালের ডিসেম্বরে, তিনি মাদ্রাজে একটি অস্পৃশ্যতা বিরোধী সম্মেলনের উদ্বোধনে তাঁর স্বামীর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। সম্ভবত একটি সরকারি সতর্কতা উপেক্ষা করার জন্য তাঁকে ১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় কারাগারে যেতে হয়েছিল। আন্দোলনে নারীদের যুক্ত করবার ক্ষমতার জন্য কস্তুরবাকেও ব্রিটিশ শাসন ভয় পেতে শুরু করেছিল। ১৯৩৯ সালে, স্থানীয় রাজকুমারদের স্বেচ্ছাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ভারত জুড়ে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল। রাজকোটে ঠাকুর নামক এক এমনই প্রাদেশিক রাজকুমারের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নারীদের প্রতিবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন কস্তুরবা। নারীদের আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি ঠাকুরের বিরুদ্ধে এক হওয়ার জন্য। ফলে ১৯৩৯ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারীতে ঠাকুরের প্রশাসন তাঁকে গ্রেফতার করেছিল।

এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ভারতবর্ষে গান্ধীজীর নেতৃত্বে যে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে কস্তুরবা তাতেও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অন্যান্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং পুণের আগা খান প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়েছিল।

অনেক অল্প বয়স থেকেই কস্তুরবা নিউমোনিয়ার কারণে ব্রঙ্কাইটিসের মতো জটিল রোগে ভুগেছেন। আগা খান প্রাসাদে বন্দী থাকাকালীন তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে শুরু করে। সেসময় ১৯৪৪ সালের জানুয়ারি মাসে দুবার হৃদরোগেও আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ১৯৪৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগা খান প্রাসাদেই ৭৪ বছর বয়সে কস্তুরবা গান্ধীর মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

বিধান রায় ছিলেন আদ্যোপান্ত এক রসিক মানুষ। তাঁর রসিকতার অদ্ভুত কাহিনী



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন