বাংলাদেশের ‘মসজিদের শহর’ বাগেরহাটের একটি বিখ্যাত প্রাচীন মসজিদ হল ষাট গম্বুজ মসজিদ (Sixty Dome Mosque)। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান বাগেরহাট মসজিদ শহরের একটি মসজিদ। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগ এই ঐতিহাসিক মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণ করে। মুসলিম স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন এই মসজিদটি ৮১টি গম্বুজ ও ৬০টি খাম্বা দিয়ে নির্মিত। মসজিদের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে পুরোনো ঐতিহ্যগুলো দেখলে মন ভরে যায়। মসজিদের চারদিকের নির্মল ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ খুব সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যযুগীয় মসজিদ স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এটি। ষাট গম্বুজ মসজিদের নামকরণ নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। একটি জনশ্রুতি অনুসারে, এখানে সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ ছিল বলে এই মসজিদের নাম ছিল সাত গম্বুজ মসজিদ এবং পরবর্তীকালে মানুষের মুখে মুখে তা বদলে গিয়ে হয়েছে ষাট গম্বুজ মসজিদ। অন্য জনশ্রুতি অনুসারে, এই মসজিদের গম্বুজগুলো ৬০টি স্তম্ভের ওপর অবস্থিত ছিল বলে এর নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ। আরেকটি জনশ্রুতি অনুসারে, মসজিদটির ছাদ গম্বুজ আকৃতির হওয়ার জন্য তাকে ছাদগম্বুজ মসজিদ বলা হত, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ নামে পরিচিত হয়েছে। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, সংস্কৃত শব্দ ‘সপ্ত’ থেকে সাত ও ছাদের উপর গম্বুজ থাকায় এই মসজিদকে ছাদগম্বুজ বলা হত, তা থেকে হয়েছে ষাট গম্বুজ মসজিদ।
মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি না থাকায় ষাট গম্বুজ মসজিদ কে, কবে তৈরি করেছিলেন সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে বহু মানুষ বিশ্বাস করে যে, এই মসজিদটি খান জাহান আলী (Khan Jahan Ali) নির্মাণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম ধর্মপ্রচারক, সুফি সাধক ও বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। তিনি সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের (Nasiruddin Mahmud Shah) রাজত্বকালে ধর্মপ্রচার করেছিলেন। এছাড়া তিনি ছিলেন সুলতানের অধীনস্থ একজন সেনাপতি। খান জাহান আলী তাঁর হাজার হাজার সঙ্গী নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু মসজিদ তৈরি করেছিলেন। মসজিদ ছাড়াও তিনি বহু দীঘিও খনন করেছিলেন। এছাড়া তিনি খলিফাতাবাদ নামে এক শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিকদের ধারণা, খলিফাতাবাদ শহরই আজকের বাগেরহাট।
ষাট গম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে মনে হয় যে, পঞ্চদশ শতাব্দীতেই এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছিল। আবার অনেকে মনে করে যে, ১৪৪২ সালে এই মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, যা শেষ হয় ১৪৫৯ সালে। বলা হয় যে, এই মসজিদটি পূর্বে নাকি খান জাহানের একটি দরবার ছিল। এখানে বসেই নাকি তিনি তাঁর শাসন ও বিচার কাজ পরিচালনা করতেন। মসজিদটি লাল পোড়ামাটি, চুন, সুড়কি, কালোপাথর, ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। ষাট গম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ও ঐতিহাসিক মসজিদ যেখানে পোড়ামাটির অপরূপ অলঙ্করণ দেখা যায়। এই মসজিদের দেওয়ালগুলিতে লাল মাটির ব্যবহারকাজ চোখে পড়ার মত। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, খান জাহান আলী তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে ষাট গম্বুজ মসজিদের পাথর সুদূর চট্টগ্রাম, মতান্তরে ভারতের ওডিশার রাজমহল থেকে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন। এছাড়া এই মসজিদের স্থাপত্যকলার সঙ্গে মিশে রয়েছে মধ্য এশিয়ার তুঘলকি স্থাপত্যশৈলী, স্থানীয় বাঙালি স্থাপত্যরীতি ও পারস্য রীতির একটি অনন্য সংমিশ্রণ।
এই মসজিদের উত্তর-দক্ষিণের বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৩ ফুট। এছাড়া পূর্ব-পশ্চিমের বাইরের দিকের দৈর্ঘ্য ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৮ ফুট। মসজিদের দেওয়ালগুলো প্রায় ৮·৫ ফুট পুরু, যা কয়েক শতাব্দী ধরে মসজিদের মজবুত কাঠামো রক্ষা করে চলেছে। এই মসজিদে মোট ২৬টি দরজা রয়েছে। মসজিদের পূর্ব দিকে ১১টি বিরাট আকারের দরজা আছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে আছে ৭টি করে দরজা। আর পশ্চিম দেওয়ালে ১টি দরজা রয়েছে। এছাড়া ষাট গম্বুজ মসজিদে চারটি মিনার আছে। এই মিনারগুলো মসজিদের চার কোণে অবস্থিত। প্রতিটি মিনারই আকারে বড় এবং কারুকার্যমন্ডিত। মিনারগুলোর উচ্চতা ছাদের কার্নিশের চেয়ে বেশি। এই মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের বুরুজটির ভেতর দিয়ে ওপরে বা ছাদে ওঠার সিঁড়ি আছে। এর নাম রওশন কোঠা। এছাড়া আন্ধার কোঠা নামক উত্তর-পূর্ব কোণের বুরুজটি দিয়েও ওপরে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। এই মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এগুলো উত্তর থেকে দক্ষিণে ছয়টি সারিতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক সারিতে দশটি করে স্তম্ভ রয়েছে। প্রতিটি স্তম্ভই পাথর কেটে বানানো হয়েছিল, তবে কিছু স্তম্ভের বাইরের অংশে ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই স্তম্ভ ও চারপাশের দেওয়ালের ওপর তৈরি করা হয়েছে মসজিদের গম্বুজগুলি। ষাট গম্বুজ মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা মোট ৮১টি। সাতটি লাইনে ১১টি করে ৭৭টি এবং চার কোণায় ৪টি করে মোট ৮১টি গম্বুজ আছে মসজিদে। মসজিদের মাঝের সারিতে অবস্থিত সাতটি গম্বুজে বাংলার চৌচালা রীতির ছাপ দেখা যায়। এই চৌচালা রীতিটি বাংলার একান্ত নিজস্ব স্থাপত্যশৈলী, যেখানে খড়ের কুঁড়েঘরের ঢালু ছাদ থাকে। এছাড়া বাকি ৭০টি গম্বুজ অর্ধগোলাকৃতির। এই মসজিদের গম্বুজগুলি প্রতিটি ১.৮ মিটার পুরু ও ফাঁপা। ষাট গম্বুজ মসজিদে নামাজ কক্ষের পাশাপাশি একটি মাদ্রাসাও ছিল ।
মসজিদের প্রবেশের প্রধান ফটকের ডান পাশে রয়েছে বাগেরহাট জাদুঘর। এখানে প্রাচীন মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলকসহ খান জাহান আমলের অসংখ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। মসজিদ দর্শনীয় স্থানে রূপান্তরিত হওয়ায় সামনের আঙিনাকে বাহারি ফুল গাছের সমারোহে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এসব গাছের নানা রকম ফুলও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের অবশ্যই ভাল লাগবে। এছাড়া ষাট গম্বুজ মসজিদের পশ্চিম দিকে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘোড়া দীঘি। দীঘিটি অলৌকিক কোনো জলাধার বলে স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস।
ষাট গম্বুজ মসজিদে দর্শনার্থী ও স্থানীয় মানুষরা প্রতিদিন নামাজ পড়তে পারে। এই মসজিদে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। ফজর বা ভোরের নামাজ থেকে এশা বা রাতের নামাজ পর্যন্ত নামাজ পড়ার জন্য কোনো মূল্য দিতে হয় না। মসজিদের ভেতরে মহিলাদের নামাজ পড়ার পৃথক স্থান রয়েছে। মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার মুসলিম নামাজ আদায় করতে পারে।
মুসলিমদের দুটো প্রধান পরব অর্থাৎ ঈদুল ফিতর এবং ইদুজ্জোহা পালনের সময় বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় ষাট গম্বুজ মসজিদে। এই মসজিদে পবিত্র ঈদের জামাতে দেশ-বিদেশের অনেক মুসলিম অংশগ্রহণ করে। এছাড়া ষাট গম্বুজ মসজিদে রমজান মাসে ঐতিহ্যবাহী খতম তারাবি নামাজ আদায় করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মুসলমানরা আসে। খতম তারাবি এই মসজিদের এক জনপ্রিয় পরব। মসজিদ কর্তৃপক্ষ রমজান মাসে এই পরবের ব্যবস্থা করে। এই সময় সাধারণত সম্পূর্ণ কোরান মুখস্থকারী দুজন হাফেজ তারাবির নামাজে সম্পূর্ণ কোরান তিলাওয়াত করে থাকেন। এছাড়া এই সময় মুসলিমদের জন্য ইফতারের আয়োজনও করে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এই ইফতারে স্থানীয় বাসিন্দা এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থী ও মুসাফিররা একসাথে ইফতার করে। বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মুসলিম দর্শনার্থীরা এতে অংশগ্রহণ করে।
তাছাড়া দেশের অন্যতম একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ এমন এক ঐতিহাসিক মসজিদ যা সকল ধর্মের মানুষের জন্য উন্মুক্ত। প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ এখানে আসে। এছাড়া সারা বছর এখানে বিভিন্ন পর্যটকদের আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। শীতকালে সেই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান