সববাংলায়

সুন্দরী মোহন দাস

ব্রিটিশ শাসিত ভারতে চট্টগ্রামের প্রথম এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জনকারী চিকিৎসক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবেই বিখ্যাত সুন্দরী মোহন দাস (Sundari Mohan Das)। সমাজকর্মী হিসেবে জাতিভেদ প্রথা এবং অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি এবং একইসঙ্গে তিনি নারীমুক্তি ও বিধবা বিবাহের জন্য বহু সংগ্রাম করেছিলেন। বিদেশি পণ্য বর্জনের জন্য সমাজকে সচেতন করে তোলার জন্য বহু চেষ্টা করেছেন তিনি। ঔষধশাস্ত্র ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন সুন্দরী মোহন দাস। কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন তিনি। স্বদেশি আন্দোলনের একজন মহান নেতা হিসেবে জাতীয় শিক্ষা প্রবর্তনের কথা বলেন তিনি এবং তাঁরই উদ্যোগে গঠিত জাতীয় শিক্ষা পরিষদের সংগঠক হিসেবে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট তথা অধুনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে সাহায্য করেন সুন্দরী মোহন দাস। দেশের কর্মহীন যুবকদের কর্মে নিয়োজিত করতে দেশীয় ঔষধ প্রস্তুতকারক কারখানা স্থাপন করেছিলেন তিনি। দেশীয় ঔষধি গাছ-গাছড়া থেকে কীভাবে আধুনিক প্রক্রিয়ায় ঔষধ তৈরি সম্ভব তা জানতে নিজের পুত্র প্রেমানন্দ দাসকে তিনি ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি পড়তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি যুক্ত ছিলেন ন্যাশনাল মেডিকেল ইন্সটিটিউট, চিত্তরঞ্জন হাসপাতাল, কলকাতা কর্পোরেশনের সঙ্গেও। ডা. রাধাগোবিন্দ করের মেডিক্যাল স্কুলে বেশ কিছুদিন সাম্মানিক অধ্যাপকের কাজ করেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে সুন্দরীমোহন দাসের একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করেন।

১৮৫৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর অধুনা বাংলাদেশের শ্রীহট্টের বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজি ইউনিয়নের অন্তর্গত দিঘলী গ্রামে সুন্দরীমোহন দাসের জন্ম হয়। তাঁর বাবা দেওয়ান স্বরূপ চন্দ্র দাস সেকালের কৌড়িয়া পরগণার বিখ্যাত জমিদার ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম ছিল অন্নপূর্ণা দেবী। পরবর্তীকালে শ্রীহট্ট কালেক্টরেটে দেওয়ান পদে এবং কিছুদিনের মধ্যেই কালীঘাটের প্রধান দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত হন স্বরূপ চন্দ্র দাস। সুন্দরী মোহনের জন্মের আগে দেশে শুরু হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহ। শ্রীহট্ট জেলার পূর্ব সীমান্তে লাটু গ্রামে বিদ্রোহ শুরু হলে সকলে শ্রীহট্ট ছেড়ে পালিয়ে আসতে শুরু করে এবং স্বরূপচন্দ্র ও অন্নপূর্ণাও নৌকায় করে পালিয়ে আসছিলেন। সেই সময় নৌকাতেই গর্ভবতী অন্নপূর্ণা দেবী অপরিণত শিশু প্রসব করেন। নবজাতক দুর্বল থাকায় শোনা যায় তাঁকে নাকি বেশ কিছুদিন সুতোর ঝুড়িতে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীকালে জয়পুরের মন্ত্রী সংসারচন্দ্র সেনের বিধবা ভাগ্নি হেমাঙ্গিনী দেবীকে বিবাহ করেন সুন্দরী মোহন দাস।

অধুনা সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। তার আগে প্রাইজ সাহেবের স্কুলে কিছুকাল পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। ১৮৭৩ সালে সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন সুন্দরী মোহন দাস। ১৮৭৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফ.এ পাশ করে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৮৮২ সালে প্রসূতিবিদ্যা ও ঔষধশাস্ত্রে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থানে উত্তীর্ণ হন তিনি এবং এম.বি.বি.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। সেকালে শ্রীহট্টের প্রথম এম.বি.বি.এস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ছিলেন তিনিই। শিক্ষাজীবনের সমস্ত স্তরেই মেধাবী সুন্দরী মোহন বৃত্তি পেতেন। মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় হিন্দুমেলার সদস্য হন তিনি। সেখানে লাঠিখেলা, কুস্তি ইত্যাদির প্রশিক্ষণ নেন সুন্দরী মোহন। কবি আনন্দচন্দ্র মিত্র, দেশনেতা বিপিনচন্দ্র পালের সঙ্গে তিনিও একত্রে প্রখ্যাত ব্রাহ্মনেতা শিবনাথ শাস্ত্রীর উপস্থিতিতে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন এবং গড়ে তোলেন ‘শ্রীহট্ট সম্মিলনী’। শ্রীহট্টে শিক্ষার প্রসারে এবং নারীশিক্ষার বিস্তারে এই সংগঠন বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৮৭৬ সালে তারা একত্রে চারটি শপথ গ্রহণ করেন। প্রথমত স্বরাজের জন্মগত অধিকার পালনে তাঁরা বিশেষ উদ্যোগী হবেন এবং বিদেশির সেবাকে তাঁদের ধর্ম বলে মানবেন না। দ্বিতীয়ত ব্রিটিশ প্রশাসনের কোনোরকম সহায়তা করবেন না তাঁরা। তৃতীয়ত, বিধবা বিবাহের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলবেন তাঁরা এবং চতুর্থত, বিদেশি পণ্য কেনা এবং ব্যবহার করা কোনোটাই করবেন না তাঁরা। আজীবন তাঁরা সকলেই এই শপথ অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেছিলেন।

সুন্দরী মোহন দাসের কর্মজীবন শুরু হয় হবিগঞ্জ জেলার চিকিৎসা বোর্ডের একজন চিকিৎসক হিসেবে। কিন্তু এই কাজের পরিসরে সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি। শ্রীহট্টে স্থানীয় মানুষদের সহায়তায় ব্রাহ্মধর্ম প্রচার ও সংগঠন গড়ে তোলেন তিনি। বিধবা বিবাহে উৎসাহী হওয়ার জন্য বাড়ি থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি সুন্দরী মোহন। শ্রীহট্টের গ্রামগুলিতে ঘুরে ঘুরে তিনি লক্ষ করেন নারীশিক্ষার অভাব, বিস্তৃত কুসংস্কারের বেড়াজাল, শিশুদের জন্ম ও বেড়ে ওঠার সংকীর্ণ অনুপযুক্ত পরিসর। স্থানীয় কিছু উৎসাহী মানুষকে একত্রে নিয়ে নারীশিক্ষার লক্ষ্যে তিনি মেয়েদের কিছু স্কুল খোলেন। বাংলার ইতিহাসে বিংশ শতকের শুরুতে কলকাতার ভয়ঙ্কর প্লেগ মহামারীর কথা ভোলা যায় না। সেই সময় কলকাতা কর্পোরেশনের হেলথ ইনস্পেক্টরের দায়িত্বে থাকা ডা. সুন্দরী মোহন দাস মহামারী দূরীকরণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কিন্তু কিছুদিন পরে ব্রিটিশ কর্মকর্তার সঙ্গে মনোমালিন্য হওয়ায় ১৯০০ সালে তিনি পদত্যাগ করেন। ‘মিউনিসিপাল দর্পণ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন সুন্দরী মোহন দাস ঐ সময়ে। তাঁর লেখা আরো একটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের নাম ‘সরল ধাত্রীশিক্ষা’। দুটি বইয়েরই মূল উদ্দেশ্য ছিল, সহজ ভাষায় স্বাস্থ্য সম্পর্কে বাংলার মানুষদের আরও সচেতন করা। কলকাতার প্লেগ মহামারীর সময় তাঁর লেখা ‘মিউনিসিপাল দর্পণ’ বইটি বহু মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলেছিল। 

ডা. সুন্দরী মোহন দাস স্বদেশি ভাবধারায় উদ্দীপিত হয়ে দেশীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে মনোযোগী হন। আর এই স্বদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠন করেন তিনি। এই পরিষদের উদ্যোগে সুন্দরী মোহন দাসের অনুপ্রেরণায় ও উৎসাহে গড়ে ওঠে বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট যা বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত। বিদেশি সমস্ত পণ্য বর্জনের ধারণায় নিজের দেশের ঔষধি গাছের প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় ঔষধ কারখানা গড়ে তোলার কথা ভেবেছিলেন তিনি যাতে বহু দেশীয় কর্মহীন যুবককে দিশা দেখানো যেতে পারে। আর এই কারণে তিনি নিজের পুত্র প্রেমানন্দ দাসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি পড়তে পাঠান ১৯০৮ সালে। তাঁর সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল স্বদেশি বিপ্লবীদের গুরুত্বপূর্ণ আস্তানা যেখানে তাঁরা গোপনে বোমাও বানাতেন। সুন্দরী মোহন বিশ্বাস করতেন যে ব্রিটিশদের মতো একটি বণিক জাতিকে পরাজিত করতে গেলে তাঁদের বাণিজ্যের মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। তাই বিদেশি শিল্প ও পণ্য পরিহার করে দেশীয় শিল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রাথমিকভাবে তাঁর নিজের বাড়িতে হোসিয়ারি পণ্য তৈরি একটি বুনন যন্ত্র আমদানি করে কর্মহীন যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার প্রেরণা দিয়েছিলেন সুন্দরী মোহন দাস। প্রায় পঁচিশ হাজার টাকার এই প্রকল্প ব্যর্থ হয়, কিন্তু এতে দমে যাননি তিনি।

এর পাশাপাশি ‘চিত্তরঞ্জন সেবা সদন’ তৈরির ক্ষেত্রে প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন তিনি এবং তিনিই সেখানকার প্রথম সুপারিন্টেনডেন্ট পদে আসীন হন। কলকাতা মেডিকেল কলেজের বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে দেশীয় ভাবধারায় দীক্ষিত ছাত্রদের নিয়ে সুন্দরী মোহন দাস গড়ে তোলেন ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ। সেই সময় অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে বহু ছাত্র এই কলেজ তৈরির কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ হলেন সুন্দরী মোহন দাস। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। বর্তমানে এই কলেজটি ‘কলকাতা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ’ নামে পরিচিত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের অন্যতম ছাত্র ডা. সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে আপামর বাঙালি আজও মনে রেখেছে। ডা. রাধাগোবিন্দ করের মেডিক্যাল স্কুলে বেশ কিছুদিন সাম্মানিক অধ্যাপকের কাজ করেছেন তিনি।

স্বদেশি আন্দোলন চলার সময়ে প্রায় তিনশোটিরও বেশি স্বদেশি গান লিখেছিলেন তিনি। তার পাশাপাশি কীর্তন রচনাতেও তাঁর দক্ষতা ছিল অতুলনীয়। চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কিত তাঁর লেখা অন্যতম একটি বইয়ের নাম ‘শুশ্রুষা বিদ্যা’।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে সুন্দরীমোহন দাসের একটি মর্মর মূর্তি স্থাপন করেন।

১৯৫০ সালের ৪ এপ্রিল কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ৯২ বছর বয়সে সুন্দরী মোহন দাসের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading